প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি 8 X করিতে।” সেই-সকল অসম্ভাবিত কল্পনার পথে মুখালোচনাকে সুদীর্ঘ করিয়া টানিয়া । লইয়া চলিতে আশারও ভালো লাগিত । বিনোদিনী কহিত, “আচ্ছ। ভাই চোখের বালি, তোর সঙ্গে যদি বিহারীবাবুর বিবাহ হইত !” আশা । না ভাই, ও কথা তুমি বলিয়ে না— ছি ছি, আমার বড়ো লজ্জা করে । কিন্তু তোমার সঙ্গে হইলে বেশ হইত, তোমার সঙ্গেও তো কথা হইয়াছিল । বিনোদিনী । আমার সঙ্গে তো ঢের লোকের ঢের কথা হইয়াছিল । না হইয়াছে, বেশ হইয়াছে— আমি যা আছি, বেশ আছি । আশা তাহার প্রতিবাদ করে। বিনোদিনীর অবস্থা যে তাহার অবস্থার চেয়ে ভালো, এ কথা সে কেমন করিয়া স্বীকার করিবে । “একবার মনে করিয়া দেখো দেখি ভাই বালি, যদি আমার স্বামীর সঙ্গে তোমার বিবাহ হইয়া যাইত আর-একটু হলেই তো হইত।” তা তো হইতই না হইল কেন । আশার এই বিছানা, এই খাট তো একদিন তাহারই জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল । বিনোদিনী এই সুসজ্জিত শয়নঘরের দিকে চায়, আর সে কথ। কিছুতেই ভুলিতে পারে না । এ ঘরে আজ সে অতিথিমাত্ৰ— আজ স্থান পাইয়াছে, কাল আবার উঠিয়া যাইতে হইবে । অপরাহে বিনোদিনী নিজে উদযোগী হইয়া অপরূপ নৈপুণ্যের সহিত আশার চুল বাধিয়া সাজাইয়া তাহাকে স্বামিসম্মিলনে পাঠাইয়া দিত। তাহার কল্পনা যেন অবগুষ্ঠিত হইয়া এই সজ্জিতা বধূর পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুগ্ধ যুবকের অভিসারে জনহীন কক্ষে গমন করিত। আবার এক-একদিন কিছুতেই আশাকে ছাড়িয়া দিত না । বলিত, “আঃ, আর-একটু বোসোই-না । তোমার স্বামী তো পালাইতেছেন না । তিনি তো বনের মায়ামৃগ নন, তিনি অঞ্চলের পোষা হরিণ।” এই বলিয়া নানা ছলে ধরিয়া রাখিয়া দেরি করাইবার চেষ্টা করিত। মহেন্দ্র অত্যন্ত রাগ করিয়া বলিত, “তোমার সখী যে নড়িবার নাম করেন না— তিনি বাড়ি ফিরিবেন কবে ।” 呜 আশা ব্যগ্র হইয়া বলিত, “না, তুমি আমার চোখের বালির উপর রাগ করিয়ো না। তুমি জান না, সে তোমার কথা শুনিতে কত ভালোবাসে– কত যত্ন করিয়া সাজাইয়া আমাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দেয় ।” রাজলক্ষ্মী আশাকে কাজ করিতে দিতেন না । বিনোদিনী বধুর পক্ষ লইয়া তাহাকে কাজে প্রবৃত্ত করাইল। প্রায় সমস্ত দিনই বিনোদিনীর কাজে আলস্য নাই, 8 Հ চোখের বালি সেইসঙ্গে আশাকেও সে আর ছুটি দিতে চায় না । বিনোদিনী পরে পরে এমনি কাজের শৃঙ্খল বানাইতেছিল যে, তাহার মধ্যে ফাক পাওয়া আশার পক্ষে ভারি কঠিন হইয়া উঠিল। আশার স্বামী ছাদের উপরকার শূন্য ঘরের কোণে বসিয়া আক্রোশে ছটফট করিতেছে, ইহা কল্পনা করিয়া বিনোদিনী মনে মনে তীব্র কঠিন হাসি হাসিত। আশা উদবিগ্ন হইয়। বলিত, “এবার যাই ভাই চোখের বালি, তিনি আবার রাগ করিবেন ।” বিনোদিনী তাড়াতড়ি বলিত, “রোসো, এইটুকু শেষ করিয়া যাও। আর বেশি দেরি হইবে না ।” খানিক বাদে আশা আবার ছট্‌ফট্‌ করিয়া বলিয়া উঠিত, “না ভাই, এবার তিনি সত্য সত্যই রাগ করিবেন— আমাকে ছাড়ো, আমি যাই ।” বিনোদিনী বলিত, “আহ, একটু রাগ করিলই বা । সোহাগের সঙ্গে রাগ না মিশিলে ভালোবাসার স্বাদ থাকে না— তরকারিতে লঙ্কামরিচের মতো।” কিন্তু লঙ্কামরিচের স্বাদটা যে কী, তাহ বিনোদিনীই বুঝিতেছিল— কেবল সঙ্গে তাহার তরকারি ছিল না । তাহার শিরায় শিরায় যেন আগুন ধরিয়া গেল । সে যে দিকে চায়, তাহার চোখে যেন ফুলিঙ্গবর্ষণ হইতে থাকে। —‘এমন স্থখের ঘরকন্ন ! এমন সোহাগের স্বামী । এ ঘরকে যে আমি রাজার রাজত্ব, এ স্বামীকে যে আমি পায়ের দাস করিয়া রাখিতে পারিতাম । তখন কি এ ঘরের এই দশা, এ মামুষের এই ছিরি থাকিত । আমার জায়গায় কিনা এই কচি খুকি, এই খেলার পুতুল !” ( আশার গলা জড়াইয়া ) “ভাই চোখের বালি, বলো-না ভাই, কাল তোমাদের কী কথা হইল ভাই ! আমি তোমাকে যাহা শিখাইয়া দিয়াছিলাম তাহা বলিয়াছিলে ? তোমাদের ভালোবাসার কথা শুনিলে আমার ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না ভাই!” N R মহেন্দ্র একদিন বিরক্ত হইয় তাহার মাকে ডাকিয়া কহিল, “এ কি ভালো হইতেছে । পরের ঘরের যুবতী বিধবাকে আনিয়া একটা দায় ঘাড়ে করিবার দরকার কী । আমার তো ইহাতে মত নাই— কী জানি, কখন কী সংকট ঘটিতে পারে।” , রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও যে আমাদের বিপিনের বউ, উহাকে আমি তো পর মনে করি না ।” মহেন্দ্র কছিল, “না মা, ভালো হইতেছে না। আমার মতে উহাকে রাখা উচিত एझ नां ।"