প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি 8 ● রাজলক্ষ্মী বেশ জানিতেন, মহেন্দ্রের মত অগ্রাহ করা সহজ নহে। তিনি বিহারীকে ডাকিয়া কহিলেন, “ও বেহারি, তুই একবার মহিনকে বুঝাইয়া বল । বিপিনের বউ আছে বলিয়াই এই বৃদ্ধবয়সে আমি একটু বিশ্রাম করিতে পাই। পর হউক যা হউক, আপন লোকের কাছ হইতে এমন সেবা তো কখনো পাই নাই।” বিহারী রাজলক্ষ্মীকে কোনো উত্তর না করিয়া মহেন্দ্রের কাছে গেল— কহিল, “মহিনদা, বিনোদিনীর কথা কিছু ভাবিতেছ?” মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “ভাবিয়া রাত্রে ঘুম হয় না ! তোমার বেঠিানকে জিজ্ঞাস করে-না, আজকাল বিনোদিনীর ধ্যানে আমার আর-সকল ধ্যানই ভঙ্গ হইয়াছে।” আশা ঘোমটার ভিতর হইতে মহেন্দ্রকে নীরবে তর্জন করিল। ( বিহারী কহিল, “বল কী । দ্বিতীয় বিষবৃক্ষ ' ' মহেন্দ্র । ঠিক তাই। এখন উহাকে বিদায় করিবার জন্য চুনি ছট্‌ফট, করিতেছে । ঘোমটার ভিতর হইতে আশার দুই চক্ষু আবার ভংসনা বর্ষণ করিল। বিহারী কহিল, “বিদায় করিলেও ফিরিতে কতক্ষণ । বিধবার বিবাহ দিয়া দাও —বিষদাত একেবারে ভাঙিবে ।” মহেন্দ্র । কুন্দরও তো বিবাহ দেওয়া হইয়াছিল । বিহারী কহিল, “থাক, ও উপমাটা এখন রাখে। বিনোদিনীর কথা আমি মাঝে মাঝে ভাবি । তোমার এখানে উনি তো চিরদিন থাকিতে পারেন না । তাহার পরে, যে বন দেখিয়া আসিয়াছি সেখানে উহাকে যাবজ্জীবন বনবাসে পাঠানো, সেও বড়ো কঠিন দণ্ড ।” ' মহেন্দ্রের সম্মুখে এ পর্যন্ত বিনোদিনী বাহির হয় নাই, কিন্তু বিহারী তাহাকে দেখিয়াছে। বিহারী এটুকু বুঝিয়াছে, এ নারী জঙ্গলে ফেলিয়া রাখিবার নহে। কিন্তু শিখা এক ভাবে ঘরের প্রদীপরূপে জলে, আর-এক ভাবে ঘরে আগুন ধরাইয়। দেয়— সে আশঙ্কাও বিহারীর মনে ছিল । মহেন্দ্র বিহারীকে এই কথা লইয়া অনেক পরিহাস করিল। বিহারীও তাহার জবাব দিল । কিন্তু তাহার মন বুঝিয়াছিল, এ নারী খেলা করিবার নহে, ইহাকে উপেক্ষা করাও যায় না । রাজলক্ষ্মী বিনোদিনীকে সাবধান করিয়া দিলেন । কহিলেন, “দেখো বাছা, বউকে লইয়া তুমি অত টানাটানি করিয়ো না। তুমি পাড়াগায়ের গৃহস্থ-ঘরে ছিলে —আজকালকার চালচলন জান না। তুমি বুদ্ধিমতী,ভালো করিয়া বুঝিয়া চলিয়ো ।” 88 চোখের বালি ইহার পর বিনোদিনী অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্বক আশাকে দূরে দূরে রাখিল কহিল, “আমি ভাই কে । আমার মতো অবস্থার লোক আপন মান বঁাচাইয়া চলিতে নী জানিলে, কোন দিন কী ঘটে, বলা যায় কি।” আশা সাধাসাধি কান্নাকাটি করিয়া মরে— বিনোদিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । মনের কথায় আশা আকন্ঠ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল কিন্তু বিনোদিনী আমল দিল না। এ দিকে মহেন্দ্রের বাহপাশ শিথিল এবং তাহার মুগ্ধ দৃষ্টি যেন ক্লাস্তিতে আবৃত হইয়া আসিতেছে। পূর্বে যে-সকল অনিয়ম-উচ্ছঙ্খলা তাহার কাছে কৌতুকজনক বোধ হইত, এখন তাহা অল্পে অল্পে তাহাকে পীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছে। আশার সাংসারিক অপটুতায় সে ক্ষণে ক্ষণে বিরক্ত হয়, কিন্তু প্রকাশ করিয়া বলে না। প্রকাশ না করিলেও আশা অন্তরে অস্তরে অনুভব করিয়াছে, নিরবচ্ছিন্ন মিলনে প্রেমের মর্যাদা মান হইয়া যাইতেছে । মহেন্দ্রের সোহাগের মধ্যে বেস্থর লাগিতেছিল– কতকটা মিথ্যা বাড়াবাড়ি, কতকটা আত্মপ্রতারণা । এ সময়ে পলায়ন ছাড়া পরিত্রাণ নাই, বিচ্ছেদ ছাড়া ঔষধ নাই । স্ত্রীলোকের স্বভাবসিদ্ধ সংস্কারবশে আশা আজকাল মহেন্দ্রকে ফেলিয়া যাইবার চেষ্টা করিত । কিন্তু বিনোদিনী ছাড়া তাহার যাইবার স্থান কোথায় । মহেন্দ্র প্রণয়ের উত্তপ্ত বাসরশয্যার মধ্যে চক্ষু উন্মীলন করিয়া ধীরে ধীরে সংসারের কাজকর্ম পড়াশুনার প্রতি একটু সজাগ হইয়া পাশ ফিরিল। ডাক্তারি বইগুলাকে নানা অসম্ভব স্থান হইতে উদ্ধার করিয়া ধুলা ঝাড়িতে লাগিল এবং চাপকান প্যাণ্টলুন কয়টা রৌদ্রে দিবার উপক্রম করিল। S L বিনোদিনী যখন নিতান্তই ধরা দিল না তখন আশার মাথায় একটা ফন্দি আসিল । সে বিনোদিনীকে কহিল, “ভাই বালি, তুমি আমার স্বামীর সম্মুখে বাহির হও না কেন । পালাইয়া বেড়াও কী জন্য ।” বিনোদিনী অতি সংক্ষেপে এবং সতেজে উত্তর করিল, “ছি ছি!” আশা কহিল, “কেন। মার কাছে শুনিয়াছি, তুমি তো আমাদের পর নও।” বিনোদিনী গষ্ঠীরমুখে কহিল, “সংসারে আপন-পর কেহই নাই। যে আপন মনে করে সেই আপন— যে পর বলিয়া জানে সে আপন হইলেও পর ।” আশা মনে মনে ভাবিল, এ কথার আর উত্তর নাই । বাস্তবিকই তাহার স্বামী বিনোদিনীর প্রতি অন্যায় করেন, বাস্তবিকই তাহাকে পর ভাবেন এবং তাহার