ф е চোখের বালি প্রশ্ন করিবার পূর্বেই আশার কাছ হইতে এ সম্বন্ধে উচ্ছ্বাসপূর্ণ বিস্তারিত রিপোর্ট পাইবে, মহেন্দ্রের এরূপ দৃঢ় প্রত্যাশা ছিল । কিন্তু সেজন্য সবুর করিয়া যখন ফল পাইল না তখন লীলাচ্ছলে প্রশ্নটা উত্থাপন করিল । , আশা মুশকিলে পড়িল । চোখের বালি কোনো কথাই বলে নাই। তাহাতে আশা সখীর উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়াছিল । স্বামীকে বলিল, “রোসো, দু-চারি দিন আগে আলাপ হউক, তার পরে তো বলিবে । কাল কতক্ষণেরই বা দেখা, কটা কথাই বা হইয়াছিল ।” ইহাতেও মহেন্দ্র কিছু নিরাশ হইল এবং বিনোদিনী সম্বন্ধে নিশ্চেষ্টত দেখানো তাহার পক্ষে আরো দুরূহ হইল। এই-সকল আলোচনার মধ্যে বিহারী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কী মহিনদা, আজ তোমাদের তর্কটা কী লইয়া ।” মহেন্দ্র কহিল, "দেখো তো ভাই, কুমুদিনী না প্রমোদিনী না কার সঙ্গে তোমার বোঠান চুলের দড়ি না মাছের কাটা না কী-একটা পাতাইয়াছেন, কিন্তু আমাকে তাই বলিয়া তার সঙ্গে চুরোটের ছাই কিংবা দেশালাইয়ের কাঠি পাতাইতে হইবে, এ হইলে তো বাচা যায় না।” y আশার ঘোমটার মধ্যে নীরবে তুমুল কলহ ঘনাইয়া উঠিল । বিহার ক্ষণকাল নিরুত্তরে মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া হাসিল ; কহিল, “বোঠান, লক্ষণ ভালো নয় । এ-সব ভোলাইবার কথা । তোমার চোখের বালিকে আমি দেখিয়াছি । আরো যদি ঘন ঘন দেখিতে পাই, তবে সেটাকে দুর্ঘটনা বলিয়া মনে করিব না, সে আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি। কিন্তু মহিনদা যখন এত করিয়া বেকবুল যাইতেছেন তখন বড়ো সন্দেহের কথা ।" 帖 i মহেন্দ্রের সঙ্গে বিহারীর যে অনেক প্রভেদ, আশা তাহার আর-একটি প্রমাণ পাইল । হঠাৎ মহেন্দ্রের ফোটােগ্রাফ-অভ্যাসের শখ চাপিল। পূর্বে সে একবার ফোটােগ্রাফি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছিল। এখন আবার ক্যামের মেরামত করিয়া, আরক কিনিয়া, ছবি তুলিতে শুরু করিল। বাড়ির চাকর-বেহারাদের পর্যন্ত ছবি তুলিতে লাগিল । আশা ধরিয়া পড়িল চোখের বালির একটা ছবি লইতেই হইবে । মহেন্দ্র অত্যন্ত সংক্ষেপে বলিল, “আচ্ছা ।” চোখের বালি তদপেক্ষা সংক্ষেপে বলিল, “না ।” চোখের বালি (t ) আশাকে আবার একটা কৌশল করিতে হইল এবং সে কৌশল গোড়া হইতেই বিনোদিনীর অগোচর রহিল না। মতলব এই হইল, মধ্যাহ্নে আশা তাহাকে নিজের শোবার ঘরে আনিয়া কোনোমতে ঘুম পাড়াইবে এবং মহেন্দ্র সেই অবস্থায় ছবি তুলিয়া অবাধ্য সখীকে উপযুক্তরূপ জবা করিবে । আশ্চর্য এই, বিনোদিনী কোনোদিন দিনের বেলায় ঘুমায় না। কিন্তু আশার ঘরে আসিয়া সেদিন তাহার চোখ ঢুলিয়া পড়িল । গায়ে একখানি লাল শাল দিয়া, খোলা জানালার দিকে মুখ করিয়া, হাতে মাথা রাখিয়া, এমনি সুন্দর ভঙ্গিতে ঘুমাইয়া পড়িল যে মহেন্দ্ৰ কহিল, “ঠিক মনে হইতেছে, যেন ছবি লইবার জন্য ইচ্ছা করিয়াই প্রস্তুত হইয়াছে।” t মহেন্দ্র পা টিপিয়া টিপিয়া ক্যামেরা আনিল । কোন দিক হইতে ছবি লইলে ভালো হইবে, তাহ স্থির করিবার জন্য বিনোদিনীকে অনেকক্ষণ ধরিয়া নানা দিক হইতে বেশ করিয়া দেখিয়া লইতে হইল। এমন-কি, আর্টের খাতিরে অতি সন্তপণে শিয়রের কাছে তাহার খোলা চুল এক জায়গায় একটু সরাইয়া দিতে হইল ; পছন্দ না হওয়ায় পুনরায় তাহা সংশোধন করিয়া লইতে হইল। আশাকে কানে কানে কহিল, “পায়ের কাছে শালটা একটুখানি বা-দিকে সরাইয়া দাও।” অপটু আশা কানে কানে কহিল, “আমি ঠিক পারিব না, ঘুম ভাঙাইয়া দিব । তুমি সরাইয়া দাও।” মহেন্দ্র সরাইয়া দিল । অবশেষে যেই ছবি লইবার জন্য ক্যামেরার মধ্যে কাচ পুরিয়া দিল, অমনি যেন কিসের শব্দে বিনোদিনী নড়িয়া, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া, ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিল । আশা উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল । বিনোদিনী বড়োই রাগ করিল ; তাহার জ্যোতির্ময় চক্ষু-দুইটি হইতে মহেন্দ্রের প্রতি অগ্নিবাণ বর্ষণ করিয়া কহিল, “ভারি অন্যায় ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “অন্যায়, তাহার আর সন্দেহ নাই। কিন্তু চুরিও করিলাম, অথচ চোরাই মাল ঘরে আসিল না, ইহাতে যে আমার ইহকাল পরকাল দুই গেল । অন্যায়টাকে শেষ করিতে দিয়া তাহার পরে দণ্ড দিবেন।” আশাও বিনোদিনীকে অত্যন্ত ধরিয়া পড়িল । ছবি লওয়া হইল । কিন্তু প্রথম ছবিটা খারাপ হইয়া গেল । স্বতরাং পরের দিন আর-একটা ছবি না লইয়া চিত্রকর ছাড়িল না। তার পরে আবার দুই সখীকে একত্র করিয়া বন্ধুত্বের চিরনিদর্শনস্বরূপ (* Հ চোখের বালি একখানি ছবি তোলার প্রস্তাবে বিনোদিনী না বলিতে পারিল না । কহিল,“কিন্তু এইটেই শেষ ছবি ।” শুনিয়া মহেন্দ্র সে ছবিটাকে নষ্ট করিয়া ফেলিল। এমনি করিয়া ছবি তুলিতে তুলিতে আলাপ-পরিচয় বহুদূর অগ্রসর হইয়া গেল। Ꮌ ☾ বাহির হইতে নাড়া পাইলে ছাই-চাপা আগুন আবার জলিয় উঠে। নবদম্পতির প্রেমের উৎসাহ যেটুকু স্নান হইতেছিল, তৃতীয় পক্ষের ঘা খাইয়া সেটুকু আবার জাগিয়া উঠিল । আশার হাস্যালাপ করিবার শক্তি ছিল না, কিন্তু বিনোদিনী তাহা অজস্র জোগাইতে পারিত ; এইজন্য বিনোদিনীর অন্তরালে আশা ভারি একটা আশ্রয় পাইল । মহেন্দ্রকে সর্বদাই আমোদের উত্তেজনায় রাখিতে তাহাকে আর অসাধ্যসাধন করিতে হইত না । বিবাহের অল্পকালের মধ্যেই মহেন্দ্র এবং আশা পরস্পরের কাছে নিজেকে নিঃশেষ করিবার উপক্রম করিয়াছিল— প্রেমের সংগীত একেবারেই তারস্বরে নিখাদ হইতেই শুরু হইয়াছিল— স্বদ ভাঙিয়া না খাইয় তাহারা একেবারে মূলধন উজাড় করিবার চেষ্টায় ছিল । এই খেপামির বন্যাকে তাহারা প্রাত্যহিক সংসারের সহজ স্রোতে কেমন করিয়া পরিণত করিবে । নেশার পরেই মাঝখানে যে অবসাদ আসে, সেটা দূর করিতে মানুষ আবার যে নেশা চায়, সে নেশা আশা কোথ। হইতে জোগাইবে । এমন সময় বিনোদিনী নবীন রঙিন পাত্র ভরিয়া আশার হাতে আনিয়া দিল । আশা স্বামীকে প্রফুল্প দেখিয়া আরাম পাইল । এখন আর তাহার নিজের চেষ্টা রহিল না। মহেন্দ্র-বিনোদিনী যখন উপহাস পরিহাস করিত তখন সে কেবল প্রাণ খুলিয়া হাসিতে যোগ দিত। তাস-খেলায় মহেন্দ্র যখন আশাকে অন্যায় ফাকি দিত তখন সে বিনোদিনীকে বিচারক মানিয়া সকরুণ অভিযোগের অবতারণা করিত | মহেন্দ্র তাহাকে ঠাট্টা করিলে বা কোনো অসংগত কথা বলিলে সে প্রত্যাশা করিত, বিনোদিনী তাহার হইয়া উপযুক্ত জবাব দিয়া দিবে। এইরূপে তিনজনের সভা জমিয়া উঠিল । কিন্তু তাই বলিয়া বিনোদিনীর কাজে শৈথিল্য ছিল না। রাধাবাড়া, ঘরকন্না দেখা, রাজলক্ষ্মীর সেবা করা, সমস্ত সে নিঃশেষপূর্বক সমাধা করিয়া তবে আমোদে যোগ দিত। মহেন্দ্র অস্থির হইয়া বলিত, “চাকর-দাসীগুলাকে না কাজ করিতে