প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি ●\つ দিয়া তুমি মাটি করিবে দেখিতেছি ।” বিনোদিনী বলিত, “নিজে কাজ না করিয়া মাটি হওয়ার চেয়ে সে ভালো । যাও, তুমি কলেজে যাও।” মহেন্দ্র । আজি বাদলার দিনটাতে— বিনোদিনী । না, সে হইবে না— তোমার গাড়ি তৈরি হইয়া আছে—কালেজে যাইতে হইবে । মহেন্দ্র । আমি তো গাড়ি বারণ করিয়া দিয়াছিলাম । বিনোদিনী । আমি বলিয়া দিয়াছি । 轉 বলিয়া মহেন্দ্রের কালেজে যাইবার কাপড় আনিয়া সম্মুখে উপস্থিত করিল। মহেন্দ্র । তোমার রাজপুতের ঘরে জন্মানো উচিত ছিল, যুদ্ধকালে আত্মীয়কে বর্ম পরাইয়া দিতে । আমোদের প্রলোভনে ছুটি লওয়া, পড়া ফাকি দেওয়া, বিনোদিনী কোনোমতেই প্রশ্রয় দিত না । তাহার কঠিন শাসনে দিনে দুপুরে অনিয়মিত আমোদ একেবারে উঠিয়াগেল,এবং এইরূপে সায়াহ্নের অবকাশ মহেন্দ্রের কাছে অত্যন্ত রমণীয় লোভনীয় হইয়া উঠিল । তাহার দিনটা নিজের অবসানের জন্য যেন প্রতীক্ষা করিয়া থাকিত । পূর্বে মাঝে মাঝে ঠিক সময়মত আহার প্রস্তুত হইত না এবং সেই ছুতা করিয়া মহেন্দ্র আনন্দে কালেজ কামাই করিত। এখন বিনোদিনী স্বয়ং বন্দোবস্ত করিয়া মহেন্দ্রের কালেজের খাওয়া সকাল-সকাল ঠিক করিয়া দেয় এবং খাওয়া হইলেই মহেন্দ্র খবর পায়— গাড়ি তৈয়ার। পূর্বে কাপড়গুলি প্রতিদিন এমন ভাজ-করা পরিপাটি অবস্থায় পাওয়া দূরে থাক, ধোপার বাড়ি গেছে কি আলমারির কোনো একটা অনির্দেশু স্থানে অগোচরে পড়িয়া আছে তাহা দীর্ঘকাল সন্ধান ব্যতীত জানা যাইত না । প্রথম-প্রথম বিনোদিনী এই-সকল বিশৃঙ্খলা লইয়া মহেন্দ্রের সম্মুখে আশাকে সহাস্য ভৎসনা করিত— মহেন্দ্রও আশার নিরুপায় নৈপুণ্যহীনতায় সক্ষেহে হাসিত । অবশেষে সখীবাৎসল্যবশে আশার হাত হইতে তাহার কর্তব্যভার বিনোদিনী নিজের হাতে কাড়িয়া লইল। ঘরের ঐ ফিরিয়া গেল। চাপকানের বোতাম ছি’ড়িয়া গেছে, আশা আশু তাহার কোনো উপায় করিতে পারিতেছে না— বিনোদিনী দ্রুত আসিয়া হতবুদ্ধি আশার হাত হইতে চাপকান কড়িয়া লইয়া চটুপটু সেলাই করিয়া দেয়। একদিন মহেন্দ্রের প্রস্তুত অন্নে বিড়ালে মুখ দিল— আশা ভাবিয়া অস্থির ; বিনোদিনী তখনই রান্নাঘরে গিয়া কোথা হইতে 6: 8 轉 চোখের বালি কী সংগ্ৰহ করিয়া গুছাইয়া কাজ চালাইয়া দিল। আশা আশ্চর্য হইয়া গেল। মহেন্দ্র এইরূপে আহারে ও আচ্ছাদনে, কর্মে ও বিশ্রামে সর্বত্রই নানা আকারে বিনোদিনীর সেবাহন্ত অনুভব করিতে লাগিল। বিনোদিনীর রচিত পশমের জুতা তাহার পায়ে এবং বিনোদিনীর বোনা পশমের গলাবন্ধ তাহার কণ্ঠদেশে একটা যেন কোমল মানসিক সংস্পর্শের মতো বেষ্টন করিল। আশা আজকাল সখীহস্তের প্রসাধনে পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন হইয়া সুন্দর বেশে সুগন্ধ মাখিয়া মহেন্দ্রের নিকট উপস্থিত হয়, তাহার মধ্যে যেন কতকটা আশার নিজের, কতকটা আর-একজনের—তাহার সাজসজ্জা-সৌন্দর্যে আনন্দে সে যেন গঙ্গাযমুনার মতো তাহার সখীর সঙ্গে মিলিয়া গেছে । বিহারীর আজকাল পূর্বের মতো আদর নাই—তাহার ডাক পড়ে না। বিহারী মহেন্দ্রকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিল, কাল রবিবার আছে, দুপুরবেলা আসিয়া সে মহেন্দ্রের মার রান্না খাইবে । মহেন্দ্র দেখিল, রবিবারটা নিতান্ত মাটি হয় ; তাড়াতাড়ি লিখিয়া পাঠাইল, রবিবারে বিশেষ কাজে তাহাকে বাহিরে যাইতে হইবে। তবু বিহারী আহারান্তে একবার মহেঞ্জের বাড়ির খোজ লইতে আসিল । শেহারার কাছে শুনিল, মহেন্দ্র বাড়ি হইতে বাহিরে যায় নাই। “মহিনদা" বলিয়া সিড়ি হইতে হাকিয়া বিহারী মহেন্দ্রের ঘরে গেল। মহেন্দ্র অপ্রস্তুত হইয়া কহিল, “ভারি মাথা ধরিয়াছে।” বলিয়া তাকিয়ায় ঠেস দিয়া পড়িল । আশা সে কথা শুনিয়া এবং মহেন্দ্রের মুখের ভাব দেখিয়া শশব্যস্ত হইয়া উঠিল— কী করা কর্তব্য, স্থির করিবার জন্য বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিল। বিনোদিনী বেশ জানিত, ব্যাপারটা গুরুতর নহে, তবু অত্যন্ত উদবিগ্ন ভাবে কহিল, “অনেকক্ষণ বসিয়া আছ, একটুখানি শোও । আমি ওডিকলোন আনিয়া দিই ।” মহেন্দ্র বলিল, “থাক, দরকার নাই ।” _ বিনোদিনী শুনিল না, দ্রুতপদে ওডিকলোন বরফ-জলে মিশাইয়া উপস্থিত করিল। আশার হাতে ভিজা রুমাল দিয়া কহিল, “মহেন্দ্রবাবুর মাথায় বাধিয়। Whe l’ মহেন্দ্র বারবার বলিতে লাগিল “থাকৃ-না”, বিহারী অবরুদ্ধহস্তে নীরবে অভিনয় দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র সগর্বে ভাবিল, ‘বিহারীটা দেখুক, আমার কত আদর।” আশা বিহারীর সম্মুখে লজ্জাকম্পিত হস্তে ভালো করিয়া বাধিতে পারিল না —ফোটাখানেক ওডিকলোন গড়াইয়া মহেন্দ্রের চোখে পড়িল । বিনোদিনী অাশার চোখের বালি te হাত হইতে রুমাল লইয়া স্বনিপুণ করিয়া বাধিল এবং আর একটি বস্ত্রখণ্ডে ওডিকলোন ভিজাইয়া অল্প-অল্প করিয়া নিংড়াইয়া দিল— আশা মাথায় ঘোমটা টানিয়া পাখা করিতে লাগিল । O বিনোদিনী স্নিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “মহেন্দ্রবাবু, আরাম পাচ্ছেন কি।” এইরূপে কণ্ঠস্বরে মধু ঢালিয়া দিয়া বিনোদিনী দ্রুত কটাক্ষে একবার বিহারীর মুখের দিকে চাহিয়া লইল । দেখিল, বিহারীর চক্ষু কৌতুকে হাসিতেছে। সমস্ত ব্যাপারটা তাহার কাছে প্রহসন। বিনোদিনী বুঝিয়া লইল, এ লোকটিকে ভোলানো সহজ ব্যাপার নহে— কিছুই ইহার নজর এড়ায় না । § বিহারী হাসিয়া কহিল, “বিনোদ-বোঠান, এমনতরো শুশ্ৰষ পাইলে রোগ সারিবে না, বাড়িয়া যাইবে ।” I বিনোদিনী । তা কেমন করিয়া জানিব, আমরা মূখ মেয়েমানুষ । আপনাদের ডাক্তারিশাস্ত্রে বুঝি এইমত লেখা আছে ? বিহারী। আছেই তো । সেবা দেখিয়া আমারও কপাল ধরিয়া উঠিতেছে। কিন্তু পোড়াকপালকে বিনা চিকিৎসাতেই চটপট সারিয়া উঠিতে হয়। মহিনদার কপালের জোর বেশি । مصو বিনোদিনী ভিজা বস্ত্রখণ্ড রাখিয়া দিয়া কহিল, “কাজ নাই, বন্ধুর চিকিৎসা বন্ধুতেই করুন।” বিহারী সমস্ত ব্যাপার দেখিয়া ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। এ কয়দিন সে অধ্যয়নে ব্যস্ত ছিল, ইতিমধ্যে মহেন্দ্র বিনোদিনী ও আশায় মিলিয়া আপনা-আপনি যে এতখানি তাল পাকাইয়া তুলিয়াছে তাহা সে জানিত না। আজ সে বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়া দেখিল, বিনোদিনীও তাহাকে দেখিয়া লইল । বিহারী কিছু তীক্ষ স্বরে কহিল, “ঠিক কথা । বন্ধুর চিকিৎসা বন্ধুই করিবে । আমিই মাথাধরা আনিয়াছিলাম, আমিই তাহা সঙ্গে লইয়া চলিলাম। ওডিকলোন আর বাজে খরচ করিবেন না।” . আশার দিকে চাহিয়া কহিল, “বোঠান, চিকিৎসা করিয়া রোগ সারানোর চেয়ে রোগ না হইতে দেওয়াই ভালো ।”