প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি ግ© বিহারী মহেঞ্জের সন্ধানে আসিয়া দ্বারের কাছে পৌঁছিতেই দেখিল— আশা কাদিতেছে, এবং বিনোদিনী তাহাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া ধীরে ধীরে তাহার চোখ । মুছাইয়া দিতেছে। দেখিয়াই বিহারী সেখান হইতে সরিয়া দাড়াইল। পাশের শূন্ত ঘরে গিয়া অন্ধকারে বসিল। দুই করতলে মাথা চাপিয়া ধরিয়া ভাবিতে লাগিল, আশা কেন কাদিবে। যে মেয়ে স্বভাবতই কাহারো কাছে লেশমাত্র অপরাধ করিতে অক্ষম, তাহাকেও কাদাইতে পারে এমন পাষণ্ড জগতে কে আছে। তার পরে বিনোদিনী যেমন করিয়া সাৰনা করিতেছিল তাহ মনে আনিয়া মনে মনে কহিল, “বিনোদিনীকে ভারি ভুল বুঝিয়াছিলাম। সেবায়, সানায়, নিঃস্বার্থ সখীপ্রেমে সে মর্তবাসিনী দেবী ।” বিহারী অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসিয়া রহিল। অন্ধের গান থামিয়া গেলে বিহারী সশবো পা ফেলিয়া, কাশিয়া, মহেন্দ্রের ঘরের দিকে চলিল । দ্বারের কাছে না যাইতেই ঘোমটা টানিয়া আশা দ্রুতপদে অন্তঃপুরের দিকে ছুটিয়া গেল । ঘরে ঢুকিতেই বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “এ কী বিহারীবাবু! আপনার কি অমুখ করিয়াছে ।” বিহারী । কিছু না । বিনোদিনী । চোখ-দুটা আমন লাল কেন । বিহারী তাহার উত্তর না দিয়া কহিল, “বিনোদ-বোঠান মহেন্দ্র কোথায় গেল।” বিনোদিনী মুখ গম্ভীর করিয়া কহিল, “শুনিলাম, হাসপাতালে তাহার কাজ পড়িয়াছে বলিয়া কলেজের কাছে তিনি বাসা করিয়া আছেন। বিহারীবাবু, একটু সরুন, আমি তবে আসি।” Jo অন্যমনস্ক বিহারী দ্বারের কাছে বিনোদিনীর পথরোধ করিয়া দাড়াইয়াছিল। চকিত হইয়া তাড়াতাড়ি পথ ছাড়িয়া দিল । সন্ধ্যার সময় একলা বাহিরের ঘরে বিনোদিনীর সঙ্গে কথাবার্তা লোকের চক্ষে সুদৃপ্ত নয়, সে কথা হঠাৎ মনে পড়িল । বিনোদিনীর চলিয়া যাইবার সময় বিহারী তাড়াতাড়ি বলিয়া লইল, “বিনোদ-বোঠান, আশাকে তুমি দেখিয়ো । সে সরল, কাহাকেও আঘাত করিতেও জানে না, নিজেকে আঘাত হইতে বঁাচাইতেও পারে না ।” বিহারী অন্ধকারে বিনোদিনীর মুখ দেখিতে পাইল না, সে মুখে হিংসার বিদ্যুৎ খেলিতে লাগিল। আজ বিহারীকে দেখিয়াই সে বুঝিয়াছিল যে, আশার জন্য করুণায় তাহার হৃদয় ব্যথিত । বিনোদিনী নিজে কেহই নহে! আশাকে ঢাকিয়া রাখিবার জন্ত, আশার পথের কাটা তুলিয়া দিবার জন্য, আশার সমস্ত স্থখ সম্পূর্ণ ግ8 চোখের বালি করিবার জন্তই তাহার জন্ম। প্রযুক্ত মহেশ্রবাৰু আশাকে বিবাহ করবেন, সেইজন্তঅদৃষ্টর তাড়নায় বিনোদিনীকে বারাসতের বর্বর বানরের সহিত বনবাসিনী হইতে হইবে। ঐযুক্ত বিহারীবাবু সরলা আশার চোখের জল দেখিতে পারেন না, সেইজন্য বিনোদিনীকে তাহার আঁচলের প্রাস্ত তুলিয়া সর্বদা প্রস্তুত হইয়া থাকিতে হইবে। একবার এই মহেন্দ্রকে, এই বিহারীকে, বিনোদিনী তাহার পশ্চাতের ছায়ার সহিত ধুলায় লুষ্ঠিত করিয়া বুঝাইতে চায় আশাই বা কে আর বিনোদিনীই বা কে । দুজনের মধ্যে কত প্রভেদ। প্রতিকুল ভাগ্য -বশত বিনোদিনী আপন প্রতিভাকে কোনো পুরুষের চিত্তক্ষেত্রে অব্যাহত ভাবে জয়ী করিতে না পারিয়া জলন্ত শক্তিশেল উষ্ঠত করিয়া সংহারমূর্তি ধরিল। _ অত্যন্ত মিষ্টস্বরে বিনোদিনী বিহারীকে বলিয়া গেল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন বিহারীবাবু। আমার চোখের বালির জন্য ভাবিয়া ভাবিয়া নিজেকে বেশি কষ্ট দিবেন না।” 는 이 অনতিকাল পরেই মহেন্দ্র তাহার ছাত্রাবাসে চেনা-হাতের অক্ষরে একখানি চিঠি পাইল। দিনের বেলা গোলমালের মধ্যে খুলিল না— বুকের কাছে পকেটের মধ্যে পুরিয়া রাখিল। কলেজের লেকচার শুনিতে শুনিতে, হাসপাতাল ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ এক-একবার মনে হইতে লাগিল, ভালোবাসার একটা পাখি তাহার বুকের নীড়ে বাসা করিয়া ঘুমাইয়া আছে। তাহাঁকে জাগাইয়া তুলিলেই তাহার সমস্ত কোমল কুজন কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিবে। . সন্ধ্যায় এক সময় মহেন্দ্র নির্জন ঘরে ল্যাম্পের আলোকে চৌকিতে বেশ করিয়া হেলান দিয়া আরাম করিয়া বসিল । পকেট হইতে তাহার দেহতাপতপ্ত চিঠিখানি বাহির করিয়া লইল। অনেকক্ষণ চিঠি না খুলিয়া লেফাফার উপরকার শিরোনাম নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিল। মহেন্দ্র জানিত, চিঠির মধ্যে বেশি কিছু কথা নাই। আশা নিজের মনের ভাব ঠিকমত ব্যক্ত করিয়া লিখিতে পারিবে, এমন সম্ভাবনা ছিলনা। কেবল তাহার কাচা অক্ষরে বাক লাইনে তাহার মুনের কোমল কথাগুলি কল্পনা করিয়া লইতে হইবে। আশার কাচ হাতে বহু যত্নে লেখা নিজের নামটি পড়িয়া মহেন্দ্র নিজের নামের সঙ্গে যেন একটা রাগিণী শুনিতে পাইল— তাহ সাধী নারীন্ধায়ের অতি নিভৃত বৈকুণ্ঠলোক হইতে একটি নির্মল প্রেমের সংগীত । এই দুই-এক দিনের বিচ্ছেদে মহেন্দ্রের মন হইতে দীর্ঘ মিলনের সমস্ত অবসাদ