চোখের বালি ... ot দূর হইয়া সরলা বধূর নবপ্রেমে উদ্ভাসিত স্থখস্থতি আবার উজ্জল হইয়া উঠিয়াছে। শেষাশেষি প্রাত্যহিক ঘরকন্নার খুঁটিনাটি অস্ববিধ তাহাকে উত্ত্যক্ত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল ; সে-সমস্ত অপসারিত হইয়া, কেবলমাত্র কর্মহীন কারণহীন একটি বিশুদ্ধ প্রেমানন্দের আলোকে আশার মানসী মূর্তি তাহার মনের মধ্যে প্রাণ পাইয়া উঠিয়াছে। মহেন্দ্র অতি ধীরে ধীরে লেফাফা ছিড়িয়া চিঠিখানা বাহির করিয়া নিজের ললাটে কপোলে বুলাইয়া লইল । একদিন মহেন্দ্র যে এসেন্স আশাকে উপহার দিয়াছিল সেই এসেন্সের গন্ধ চিঠির কাগজ হইতে উতলা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো মহেন্দ্রের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিল। ভাজ খুলিয়া মহেন্দ্র চিঠি পড়িল । কিন্তু এ কী । যেমন বাকাচোরা লাইন, তেমন সাদাসিধা ভাষা নয় তো ! কাচ-কাচা অক্ষর, কিন্তু কথাগুলি তো তাহার সঙ্গে মিলিল না । লেখা আছে— ஆ প্রিয়তম, যাহাকে ভুলিবার জন্য চলিয়া গেছ, এ লেখায় তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিব কেন । যে লতাকে ছিড়িয়া মাটিতে ফেলিয়া দিলে, সে আবার কোন লজ্জায় জড়াইয়া উপরে উঠতে চেষ্টা করে। সে কেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া মিশিয়া গেল না । কিন্তু এটুকুতে তোমার কী ক্ষতি হইবে নাথ । না-হয় ক্ষণকালের জন্য মনে পড়িলই বা । মনে তাহাতে কতটুকুই বা বাজিবে । আর, তোমার অবহেলা যে কাটার মতো আমার পাজরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া মহিল! সকল দিন, সকল রাত, সকল কাজ, সকল চিস্তার মধ্যে যে দিকে ফিরি, সেই দিকেই যে আমাকে বিধিতে লাগিল। তুমি যেমন করিয়া ভুলিলে, আমাকে তেমনি করিয়া ভুলিবার একটা উপায় বলিয়া দাও । . . নাথ, তুমি যে আমাকে ভালোবাসিয়াছিলে, সে কি আমারই অপরাধ । আমি কি স্বপ্নেও এত সৌভাগ্য প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। আমি কোথা হইতে আসিলাম, আমাকে কে জানিত । আমাকে যদি না চাহিয়া দেখিতে, আমাকে যদি তোমার ঘরে বিনা বেতনের দাসী হইয়া থাকিতে হইত, আমি কি তোমাকে কোনো দোষ দিতে পারিতাম। তুমি নিজেই আমার কোন গুণে ভুলিলে প্রিয়তম, কী দেখিয়া আমার এত আদর বাড়াইলে । আর, আজ বিনা মেঘে যদি বজ্রপাতই হইল, তবে সে বঙ্গ কেবল দস্ত করিল কেন। একেবারে দেহ মন কেন ছাই করিয়া দিল না । এই দুটাে দিনে অনেক সহ করিলাম, অনেক ভাবিলাম, কিন্তু একটা কথা ዓ� চোখের বালি যুঝিতে পারিলাম না— ঘরে থাকিয়াও কি তুমি আমাকে ফেলিতে পারিতে না। আমার জন্তও কি তোমার ঘর ছাড়িয়া যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল। আমি কি তোমার এতখানি জুড়িয়া আছি। আমাকে তোমার ঘরের কোণে, তোমার দ্বারের বাহিরে ফেলিয়া রাখিলেও কি আমি তোমার চোখে পড়িতাম । তাই যদি হয়, তুমি কেন গেলে, আমার কি কোথাও যাইবার পথ ছিল না। ভাসিয়া আসিয়াছি, ভাসিয়া যাইতাম — 疊 এ কী চিঠি। এ ভাষা কাহার তাহা মহেঞ্জের বুঝিতে বাকি রহিল না। অকস্মাৎ আহত মূৰ্ছিতের মতো মহেন্দ্র সে চিঠিখানি লইয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে লাইনে রেলগাড়ির মতো তাহার মন পূর্ণবেগে ছটিয়াছিল, সেই লাইনের বিপরীত দিক হইতে একটা ধাক্কা খাইয়া লাইনের বাহিরে তাহার মনটা যেন উলটাপালট ভূপাকার বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিল। অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া আবার সে দুইবার তিনবার করিয়া পড়িল । কিছুকাল যাহা স্বরে আভাসের মতো ছিল, আজ তাহা যেন ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। তাহার জীবনাকাশের এক কোণে যে ধূমকেতুটা ছায়ার মতো দেখাইতেছিল, আজ তাহার উদ্যত বিশাল পুচ্ছ অগ্নিরেখায় দীপ্যমান হইয়া দেখা দিল । এ চিঠি বিনোদিনীরই । সরলা আশা নিজের মনে করিয়া তাহা লিখিয়াছে। পূর্বে যে কথা সে কখনো ভাবে নাই, বিনোদিনীর রচনামত চিঠি লিখিতে গিয়া সেই-সব কথা তাহার মনে জাগিয়া উঠিতে লাগিল। নকল-করা কথা বাহির হইতে বদ্ধমূল হইয় তাহার আস্তরিক হইয়া গেল ; যে নূতন বেদনার স্বষ্টি হইল, এমন স্বদের করিয়া তাহা ব্যক্ত করিতে আশা কখনোই পারিত না । সে ভাবিতে লাগিল, সখী আমার মনের কথা এমন ঠিকটি বুঝিল কী করিয়া। কেমন করিয়া এমন ঠিকটি প্রকাশ করিয়া বলিল। অন্তরঙ্গ সখীকে আশা আরো যেন বেশি আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় করিয়া ধরিল ; কারণ, যে ব্যথাটা তাহার মনের মধ্যে, তাহার ভাষাটি তাহার সখীর কাছে— সে এতই নিরুপায়। মহেন্দ্র চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া ভ্র কুঞ্চিত করিয়া, বিনোদিনীর উপর রাগ করিতে অনেক চেষ্টা করিল ; মাঝে থেকে রাগ হইল আশার উপর ; “দেখো দেখি, আশার এ কী মূঢ়তা, স্বামীর প্রতি এ কী অত্যাচার। বলিয়া চোঁকিতে বসিয়া পড়িয়া প্রমাণস্বরূপ চিঠিখানা আবার পড়িল । পড়িয়া ভিতরে ভিতরে একটা হর্ষসঞ্চার হইতে লাগিল। চিঠিখানাকে সে আশারই চিঠি মনে করিয়া পড়িবার অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু এ ভাষায় কোনোমতেই সরলা আশাকে মনে করাইয়া দেয় না। দু চোখের বালি । 寶 ፃ ፄ চার লাইন পড়িবা মাত্র একটা মুখোম্মাদকর সন্দেহ ফেনিল মদের মতো মনকে চারি দিকে ছাপাইয়া উঠিতে থাকে। এই প্রচ্ছন্ন অথচ ব্যক্ত, নিষিদ্ধ অথচ নিকটাগত, বিষাক্ত অথচ মধুর, একই কালে উপহৃত অথচ প্রত্যাহত, প্রেমের আভাস মহেন্দ্রকে মাতাল করিয়া তুলিল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, নিজের হাতে পায়ে কোথাও । এক জায়গায় ছুরি বসাইয়া বা আর-কিছু করিয়া নেশা ছটাইয়া মনটাকে আরকোনো দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয় । টেবিলে সজোরে মুষ্টি বসাইয়া চৌকি হইতে লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, দূর করে, চিঠিখানা পুড়াইয়া ফেলি। বলিয়া চিঠিখানি ল্যাম্পের কাছাকাছি লইয়া গেল। পুড়াইল না, আর-একবার পড়িয়া ফেলিল । পরদিন তৃত্য টেবিল হইতে কাগজপোড়া ছাই অনেক ঝাড়িয়া ফেলিয়াছিল। কিন্তু তাহা আশার চিঠির ছাই নহে, চিঠির উত্তর দিবার অনেকগুলা অসম্পূর্ণ চেষ্টাকে মহেন্দ্র পুড়াইয়া ছাই করিয়াছে। ミ> ইতিমধ্যে আরো এক চিঠি আসিয়া উপস্থিত হইল— তুমি আমার চিঠির উত্তর দিলে না? ভালোই করিয়াছ। ঠিক কথা তো লেখা যায় না ; তোমার যা জবাব, সে আমি মনে মনে বুঝিয়া লইলাম । ভক্ত যখন তার দেবতাকে ডাকে, তিনি কি মুখের কথায় তাহার উত্তর দেন । দুখিনীর বিশ্বপত্রখানি চরণতলে বোধ করি স্থান পাইয়াছে । কিন্তু ভক্তের পূজা লইতে গিয়া শিবের যদি তপোভঙ্গ হয়, তবে তাহাতে রাগ করিয়ো না, হৃদয়দেব ! তুমি বর দাও বা না দাও, চোখ মেলিয়া চাও বা ন চাও, জানিতে পার বা না পার, পূজা না দিয়া ভক্তের আর গতি নাই। তাই আজিও এই দু-ছত্র চিঠি লিখিলাম— হে আমার পাষাণ-ঠাকুর, তুমি অবিচলিত হইয়া থাকো । মহেন্দ্র আবার চিঠির উত্তর লিখিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু আশাকে লিখিতে গিয়া বিনোদিনীর উত্তর কলমের মুখে আপনি আসিয়া পড়ে। ঢাকিয়া লুকাইয়া কৌশল করিয়া লিখিতে পারে না। অনেকগুলি ছিড়িয়া, রাত্রের অনেক প্রহর কাটাইয়া একটা যদি বা লিখিল, সেটা লেফাফায় পুরিয়া উপরে আশার নাম লিখিবার সময় হঠাৎ তাহার পিঠে যেন কাহার চাবুক পড়িল ; কে যেন বলিল, পাষণ্ড, বিশ্বস্ত বালিকার প্রতি এমনি করিয়া প্রতারণা !' চিঠি মহেন্দ্র সহস্র টুকরা