চোখের বালি । * "שף করিয়া ছিড়িয়া ফেলিল, এবং বাকি রাতটা টেবিলের উপর দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢাকিয়া নিজেকে যেন নিজের দৃষ্টি হইতে লুকাইবার চেষ্টা করিল। f তৃতীয় পত্র – যে একেবারেই অভিমান করিতে জানে না, সে কি ভালোবাসে। নিজের ভালোবাসাকে যদি অনাদর-অপমান হইতে বাচাইয়া রাখিতে না পারি, তবে সে ভালোবাসা তোমাকে দিব কেমন করিয়া । তোমার মন হয়তো ঠিক বুঝি নাই, তাই এত সাহস করিয়াছি । তাই যখন ত্যাগ করিয়া গেলে, তখনো নিজে অগ্রসর হইয়া চিঠি লিখিয়াছি ; যখন চুপ করিয়া ছিলে, তখনো মনের কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। কিন্তু তোমাকে যদি ভুল করিয়া থাকি, সে কি আমারই দোষ । একবার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সব কথা মনে করিয়া দেখো দেখি, যাহা বুঝিয়াছিলাম সে কি তুমিই বোঝাও নাই । সে যাই হোক, ভুল হোক, সত্য হোক, যাহা লিখিয়াছি সে আর মুছিবে না, যাহা দিয়াছি সে আর ফিরাইতে পারিব না, এই আক্ষেপ। ছিছি, এমন লজ্জাও নারীর ভাগ্যে ঘটে ! কিন্তু তাই বলিয়া মনে করিয়ো না, ভালো যে বাসে সে নিজের ভালোবাসাকে বারবার অপদস্থ করিতে পারে । যদি আমার চিঠি না চাও তো থাক, যদি উত্তর না লিখিবে তবে এই পর্যন্ত । ইহার পর মহেন্দ্র আর থাকিতে পারিল না। মনে করিল, ‘অত্যন্ত রাগ করিয়াই ঘরে ফিরিয়া যাইতেছি । বিনোদিনী মনে করে, তাহাকে ভুলিবার জন্যই ঘর ছাড়িয়া পালাইয়াছি।’ বিনোদিনীর সেই স্পর্ধাকে হাতে হাতে অপ্রমাণ করিবার জন্যই তখনই মহেন্দ্র ঘরে ফিরিবার সংকল্প করিল। . এমন সময় বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। বিহারীকে দেখিবা মাত্ৰ মহেন্দ্রের ভিতরের পুলক যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল । ইতিপূর্বে নানা সন্দেহে ভিতরে ভিতরে বিহারীর প্রতি তাহার ঈর্ষা জন্মিতেছিল, উভয়ের বন্ধুত্ব ক্লিষ্ট হইয়া উঠিতেছিল। পত্রপাঠের পর আজ সমস্ত ঈর্ষাভার বিসর্জন দিয়া বিহারীকে সে অতিরিক্ত আবেগের সহিত আহ্বান করিয়া লইল । চৌকি হইতে উঠিয়া, বিহারীর পিঠে চাপড় মারিয়া, তাহার হাত ধরিয়া, তাহাকে একটা কেদারার উপরে টানিয়া বসাইয়া দিল । কিন্তু বিহারীর মুখ আজ বিমৰ্ষ । মহেন্দ্ৰ ভাবিল, ‘বেচারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বিনোদিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছে এবং সেখান হইতে ধাক্কা খাইয়া আসিয়াছে।’ মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারী, এর মধ্যে আমাদের ওখানে গিয়াছিলে ?” বিহারী গম্ভীরমুখে কহিল, “এখনই সেখান হইতে আসিতেছি ।" । চোখের বালি ግሯ» মহেন্দ্র বিহারীর বেদনা কল্পনা করিয়া মনে মনে একটু কৌতুকবোধ করিল। মনে মনে কহিল, ‘হতভাগ্য বিহারী ! স্ত্রীলোকের ভালোবাসা হইতে বেচারা একেবারে বঞ্চিত। বলিয়া নিজের বুকের পকেটের কাছটায় একবার হাত দিয়া চাপ দিল— ভিতর হইতে তিনটে চিঠি খড়, খড়, করিয়া উঠিল। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিল, “সবাইকে কেমন দেখিলে ।” বিহারী তাহার উত্তর না করিয়া কহিল, “বাড়ি ছাড়িয়া তুমি যে এখানে ?” মহেন্দ্ৰ কহিল, “আজকাল প্রায় নাইট-ডিউটি পড়ে, বাড়িতে অস্ববিধা হয়।” রিহারী কহিল, “এর আগেও তো নাইট-ডিউটি পড়িয়াছে, কিন্তু তোমাকে তো বাড়ি ছাড়িতে দেখি নাই ।” * মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “মনে কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে নাকি ।” বিহারী কহিল, “না, ঠাট্ট নয়, এখনই বাড়ি চলো।” মহেন্দ্র বাড়ি ফিরিবার জন্য উদ্যত হইয়াই ছিল ; কিন্তু বিহারীর অনুরোধ শুনিয়া সে হঠাৎ নিজেকে ভুলাইল, যেন বাড়ি যাইবার জন্য তাহার কিছুমাত্র আগ্রহ নাই । কহিল, “সে কি হয় বিহারী । তা হলে আমার বৎসরটাই নষ্ট হইবে।” বিহারী কহিল, “দেখো মহিনদা, তোমাকে আমি এতটুকু বয়স হইতে দেখিতেছি, আমাকে ভুলাইবার চেষ্টা করিয়ো না। তুমি অন্যায় করিতেছ।” মহেন্দ্র । কার পরে অন্যায় করিতেছি, জজসাহেব ! বিহারী রাগ করিয়া বলিল, “তুমি যে চিরকাল হৃদয়ের বড়াই করিয়া আসিয়াছ, তোমার হৃদয় গেল কোথায়, মহিনদা !” মহেন্দ্র । সম্প্রতি কলেজের হাসপাতালে । বিহারী। থামো মহিনদা, থামো । তুমি এখানে আমার সঙ্গে হাসিয়া ঠাট্টা করিয়া কথা কহিতেছ, সেখানে আশা তোমার বাহিরের ঘরে, অন্দরের ঘরে কাদিয়া কাদিয়া বেড়াইতেছে । আশার কান্নার কথা শুনিয়া হঠাৎ মহেন্দ্রের মন একটা প্রতিঘাত পাইল । জগতে আর যে কাহারে স্বখদুঃখ আছে, সে কথা তাহার নূতন নেশার কাছে স্থান পায় নাই। হঠাৎ চমক লাগিল ; জিজ্ঞাসা করিল, “আশা কাদিতেছে কী জন্য ।” বিহার বিরক্ত হইয়া কহিল, “সে কথা তুমি জান না, আমি জানি ?” মহেন্দ্র । তোমার মহিনদা সর্বজ্ঞ নয় বলিয়া যদি রাগ করিতেই হয় তো মহিনদার স্থষ্টিকর্তার উপর রাগ করে । তখন বিহারী যাহা দেখিয়াছিল, তাহা আগাগোড়া বলিল। বলিতে বলিতে Ե, e চোখের বালি বিনোদিনীর বক্ষোলগ্ন আশার সেই অশ্রুসিক্ত মুখখানি মনে পড়িয়া বিহারীর প্রায় কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল । J. o বিহারীর এই প্রবল আবেগ দেখিয়া মহেন্দ্র আশ্চর্য হইয়া গেল। মহেন্দ্র জানিত, বিহারীর হৃদয়ের বালাই নাই— এ উপসর্গ কবে জুটিল। যেদিন কুমারী আশাকে দেখিতে গিয়াছিল, সেই দিন হইতে নাকি । বেচারা বিহারী ! মহেন্দ্র মনে মনে তাহাকে বেচার বলিল বটে, কিন্তু দুঃখবোধ না করিয়া বরঞ্চ একটু আমোদ পাইল । আশার মনটি একান্ত ভাবে যে কোন দিকে, তাহা মহেন্দ্র নিশ্চয় জানিত । ‘অন্ত লোকের কাছে যাহারা বাঞ্ছার ধন, কিন্তু আয়ত্তের অতীত, আমার কাছে তাহারা চিরদিনের জন্য আপনি ধরা দিয়াছে’— ইহাতে মহেন্দ্র বক্ষের মধ্যে একটা গর্বের স্ফীতি অনুভব করিল। মহেন্দ্র বিহারীকে কহিল, “আচ্ছা চলে, যাওয়া যাক। তবে একটা গাড়ি ভাকো (* २२ মহেন্দ্র ঘরে ফিরিয়া আসিবা মাত্র তাহার মুখ দেখিয়াই আশার মনের সমস্ত সংশয় ক্ষণকালের কুয়াশার মতো এক মুহূর্তেই কাটিয়া গেল। নিজের চিঠির কথা স্মরণ করিয়া মহেন্দ্রের সামনে সে যেন মুখ তুলিতেই পারিল না । মহেন্দ্র তাহার উপরে ভৎসনা করিয়া কহিল, “এমন অপবাদ দিয়া চিঠিগুলা লিখিলে কী করিয়া ।” বলিয়া পকেট হইতে বহুবার-পঠিত সেই চিঠি তিনখানি বাহির করিল। আশা ব্যাকুল হইয়া কহিল, “তোমার পায়ে পড়ি, ও চিঠিগুলা ছিড়িয়া ফেলো ।” বলিয়া মহেঞ্জের হাত হইতে চিঠিগুলা লইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল । মহেন্দ্র তাহাকে নিরস্ত করিয়া সেগুলি পকেটে পুরিল । কহিল, “আমি কর্তব্যের অনুরোধে গেলাম, আর তুমি আমার অভিপ্রায় বুঝিলে না ? আমাকে সন্দেহ করিলে !" আশা ছলছল চোখে কছিল, "এবারকার মতো আমাকে মাপ করে । এমন আর কখনোই হইবে না।” 羈 মহেন্দ্ৰ কহিল, "কখনো না ?” আশা কহিল, "কখনো না।” তখন মহেন্দ্র তাহাকে টানিয়া লইয়া চুম্বন করিল। আশা কহিল, “চিঠিগুলা দাও, ছিড়িয়া ফেলি।” মহেঙ্গ কছিল, “না, ও থাক্‌ ৷”