প্রধান মেনু খুলুন


চোখের-বালি دعا আশা সবিনয়ে মনে করিল, “আমার শাস্তিস্বরূপ এ চিঠিগুলি উনি রাখিলেন।’ এই চিঠির ব্যাপারে বিনোদিনীর উপর আশার মনটা একটু যেন বাকিয়া দাড়াইল । স্বামীর আগমনবার্তা লইয়া সে সখীর কাছে আনন্দ করিতে গেল না— বরঞ্চ বিনোদিনীকে একটু যেন এড়াইয়া গেল। বিনোদিনী সেটুকু লক্ষ্য করিল এবং কাজের ছল করিয়া একেবারে দূরে রহিল। মহেন্দ্র ভাবিল, "এ তো বড়ো অদ্ভুত ! আমি ভাবিয়াছিলাম, এবার বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়া দেখা যাইবে— উলটা হইল। তবে সে চিঠিগুলার অর্থ কী।’ নারীহৃদয়ের রহস্য বুঝিবার কোনো চেষ্টা করিবে না বলিয়াই মহেন্দ্র মনকে দৃঢ় করিয়াছিল ; ভাবিয়াছিল, "বিনোদিনী যদি কাছে আসিবার চেষ্টা করে, তবু আমি দূরে থাকিব ।’ আজ সে মনে মনে কহিল, 'না, এ তে ঠিক হইতেছে না। যেন আমাদের মধ্যে সত্যই কী একটা বিকার ঘটিয়াছে। বিনোদিনীর সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা আমোদ-প্রমোদ করিয়া এই সংশয়াচ্ছন্ন গুমটের ভাবটা দূর করিয়া দেওয়া উচিত।’ আশাকে মহেন্দ্ৰ কহিল, “দেখিতেছি, আমিই তোমার সখীর চোখের বালি হইলাম। আজকাল তাহার আর দেখাই পাওয়া যায় না।” আশা উদাসীন ভাবে উত্তর করিল, “কে জানে, তাহার কী হইয়াছে।” এ দিকে রাজলক্ষ্মী আসিয়া কাদো-কাদো হইয়া কহিলেন, “বিপিনের বউকে আর তো ধরিয়া রাখা যায় না।” মহেন্দ্র চকিত ভাব সামলাইয়া লইয়া কহিল, “কেন মা ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কী জানি বাছা, সে তো এবার বাড়ি যাইবার জন্য নিতান্তই ধরিয়া পড়িয়াছে। তুই তো কাহাকেও খাতির করিতে জানিল না । ভদ্রলোকের মেয়ে পরের বাড়িতে আছে, উহাকে আপনার লোকের মতো আদর-যত্ন না করিলে থাকিবে কেন ।” বিনোদিনী শোবার ঘরে বলিয়া বিছানার চাদর সেলাই করিতেছিল। মহেন্দ্র প্রবেশ করিয়া ডাকিল, “বালি।” o : বিনোদিনী সংযত হইয়া বসিল । কহিল, “কী মহেন্দ্রবাৰু।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “কী সর্বনাশ । মহেশ্র জাবার বাৰু হইলেন কবে ।” বিনোদিনী আবার চাদর-সেলাইয়ের দিকে নত চক্ষু নিবন্ধ রাখিয়া কছিল, “তবে কী:বলিয়া ভাকিব ।” © ケ。 চোখের বালি মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমার সখীকে যা বল— চোখের বালি ।” বিনোদিনী অন্ত দিনের মতে ঠাট্টা করিয়া তাহার কোনো উত্তর দিল না— সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “ওটা বুঝি সত্যকার সম্বন্ধ হইল, তাই ওটা আর পাতানে চলিতেছে না !” 避 বিনোদিনী একটু থামিয়া দাত দিয়া সেলাইয়ের প্রান্ত হইতে খানিকটা বাড়তি মৃত কাটিয়া ফেলিয়া কহিল, “কী জানি, সে আপনি জানেন ।” বলিয়াই তাহার সর্বপ্রকার উত্তর চাপা দিয়া গম্ভীরমুখে কহিল, “কলেজ হইতে হঠাৎ ফেরা হইল যে ” * মহেন্দ্র কহিল, “কেবল মড়া কাটিয়া আর কত দিন চলিবে ।” আবার বিনোদিনী দন্ত দিয়া স্বতা ছেদন করিল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “এখন বুঝি জিয়স্তের আবশ্বক ?” মহেন্দ্র স্থির করিয়াছিল, আজ বিনোদিনীর সঙ্গে অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিক ভাবে হাস্যপরিহাস উত্তরপ্রত্যুত্তর করিয়া আসর জমাইয়া তুলিবে । কিন্তু এমনি গাম্ভীর্ষের ভার তাহার উপর চাপিয়া আসিল যে, লঘু জবাব প্রাণপণ চেষ্টাতেও মুখের কাছে জোগাইল না । বিনোদিনী আজ কেমন একরকম কঠিন দূরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতেছে দেখিয়া মহেন্দ্রের মনটা সবেগে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল— ব্যবধানটাকে কোনো একটা নাড়া দিয়া ভূমিসাৎ করিতে ইচ্ছা হইল। বিনোদিনীর শেষ বাক্যঘাতের প্রতিঘাত না দিয়া, হঠাৎ তাহার কাছে আসিয়া বসিয়া কহিল, “তুমি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছ কেন । কোনো অপরাধ করিয়াছি ?” বিনোদিনী তখন একটু সরিয়া সেলাই হইতে মুখ তুলিয়া দুই বিশাল উজ্জল চক্ষু মহেক্সের মুখের উপর স্থির রাখিয়া কহিল, “কর্তব্যকর্ম তো সকলেরই আছে। আপনি যে সকল ছাড়িয়া কলেজের বাসায় যান, সে কি কাহারো অপরাধে । আমারও যাইতে হইবে না ? আমারও কর্তব্য নাই ?” মহেন্দ্র ভালো উত্তর অনেক ভাবিয়া খুজিয়া পাইল না । কিছুক্ষণ থামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার এমন কী কর্তব্য যে না গেলেই নয় ?” বিনোদিনী অত্যন্ত সাবধানে স্থচিতে স্থত পরাইতে পরাইতে কহিল, “কর্তব্য আছে কিনা, সে নিজের মনই জানে। আপনার কাছে তাহার আর কী তালিকা দিব ।” 呜 藝 মহেন্দ্র গম্ভীর চিন্তিত মুখে জানালার বাহিরে একটা স্বদুর নারিকেল গাছের চোখের বালি {} . دیا মাথার দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনী নিঃশবে সেলাই করিয়া যাইতে লাগিল । ঘরে ছুঁচটি পড়িলে শব্দ শুনা যায়, এমনি হইল । অনেকক্ষণ পরে মহেন্দ্র হঠাৎ কথা কহিল। অকস্মাৎ নি:শবতাভঙ্গে বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল, তাহার হাতে ছুচ ফুটিয়া গেল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমাকে কোনো অমুনয়-বিনয়েই রাখা যাইবে না ?” বিনোদিনী তাহার আহত অঙ্গুলি হইতে রক্তবিন্দু শুষিয়া লইয়া কহিল, “কিসের জন্য এত অনুনয়-বিনয় । আমি থাকিলেই কী, আর না থাকিলেই কী । আপনার তাহাতে কী আসে যায়।” বলিতে বলিতে গলাটা যেন ভারী হইয়া আসিল ; বিনোদিনী অত্যন্ত মাথা নিচু করিয়া সেলাইয়ের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিল— মনে হইল, হয়তো বা তাহার নত নেত্রের পল্লবপ্রান্তে একটুখানি জলের রেখা দেখা দিয়াছে। মাঘের অপরাহ্ল তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলাইবার উপক্রম করিতেছিল। মহেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যে বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া রুদ্ধ সজল স্বরে কহিল, “যদি তাহাতে আমার আসে যায়, তবে তুমি থাকিবে ?” বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত ছাড়াইয়া লইয়া সরিয়া বসিল । মহেন্দ্রের চমক ভাঙিয়া গেল। নিজের শেষ কথাটা ভীষণ বঙ্গের মতো তাহার নিজের কানে বারংবার প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল । অপরাধী জিহবাকে মহেন্দ্র দন্ত দ্বারা দংশন করিল তাহার পর হইতে রসনা নির্বাক্ হইয়া রহিল । * এমন সময় এই নৈঃশব্যপরিপূর্ণ ঘরের মধ্যে আশা প্রবেশ করিল। বিনোদিনী তৎক্ষণাৎ যেন পূর্ব-কথোপকথনের অম্ববৃত্তিস্বরূপে হাসিয়া মহেন্দ্রকে বলিয়া উঠিল, “আমার গুমর তোমরা যখন এত বাড়াইলে, তখন আমারও কর্তব্য তোমাদের একটা-কথা রাখা । যতক্ষণ না বিদায় দিবে ততক্ষণ রহিলাম।” আশা স্বামীর কৃতকার্যতায় উৎফুল্প হইয়া উঠিয়া সখীকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল। কহিল, “তবে এই কথা রহিল। তাহা হইলে তিন-সত্য করে, যতক্ষণ না বিদায় দিব ততক্ষণ থাকিবে, থাকিবে, থাকিবে ।” বিনোদিনী তিনবার স্বীকার করিল। আশা কহিল, “ভাই চোখের বালি, সেই যদি রহিলেই তবে এত করিয়া সাধাইলে কেন । শেষকালে আমার স্বামীর কাছে তো হার মানিতে হইল।” বিনোদিনী হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরপো, আমি হার মানিয়াছি, না, তোমাকে হার মানাইয়াছি ?” *8 চোখের বালি মহেক্স এতক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া ছিল ; মনে হইতেছিল, তাহার অপরাধে যেন সমস্ত ঘর ভরিয়া রহিয়াছে লাঞ্ছনা যেন তাহার সর্বাঙ্গ পরিবেষ্টন করিয়া। আশার সঙ্গে কেমন করিয়া সে প্রসন্নমুখে স্বাভাবিক ভাবে কথা কহিবে। এক মুহূর্তের মধ্যে কেমন করিয়া সে আপনার বীভৎস অসংযমকে সহাস্য চটুলতায় পরিণত করিবে । এই পৈশাচিক ইন্দ্ৰজাল তাহার আয়ত্তের বহির্ভূত ছিল। সে গম্ভীরমুখে কহিল, “আমারই তো হার হইয়াছে।” বলিয়াই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল । t অনতিকাল পরেই আবার মহেন্দ্র ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বিনোদিনীকে কহিল, “আমাকে মাপ করে৷ ” বিনোদিনী কহিল, “অপরাধ কী করিয়াছ ঠাকুরপো ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “তোমাকে জোর করিয়া এখানে ধরিয়া রাখিবার অধিকার আমাদের নাই।” বিনোদিনী হাসিয়া কছিল, “জোর কই করিলে, তাহা তো দেখিলাম না । ভালোবাসিয়া ভালো মুখেই তো থাকিতে বলিলে। তাহাকে কি জোর বলে। বলে তে ভাই চোখের বালি, গায়ের জোর আর ভালোবাসা কি একই হইল।” আশা তাহার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হইয়া কহিল, “কখনোই না।” বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, তোমার ইচ্ছ। আমি থাকি, আমি গেলে তোমার কষ্ট হইবে, সে তো আমার সৌভাগ্য। কী বলে ভাই চোখের বালি, সংসারে এমন স্বহৃদ কয়জন পাওয়া যায়। তেমন ব্যথার বাধী, স্বখের স্বধী অদৃষ্টগুণে যদিই পাওয়া যায়, তবে আমিই বা তাহাকে ছাড়িয়া যাইবার জন্য ব্যস্ত হইব কেন ।” আশা তাহার স্বামীকে অপদস্থভাবে নিরুত্তর থাকিতে দেখিয়া ঈষৎ ব্যথিতচিত্তে কহিল, “তোমার সঙ্গে কথায় কে পারিবে ভাই ! আমার স্বামী তো হার মানিয়াছেন, এখন তুমি একটু থামো ।” মহেন্দ্র আবার দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইল। তখন রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করিয়া বিহারী মহেক্সের সন্ধানে আসিতেছিল। মহেন্দ্র তাহাকে স্বারের সম্মুখে দেখিতে পাইয়াই বলিয়া উঠিল, “ভাই বিহারী, আমার মতে পাষণ্ড আর জগতে নাই ।” এমন বেগে কহিল, সে কথা ঘরের মধ্যে গিয়া পৌছিল । ঘরের মধ্য হইতে তৎক্ষণাৎ আহান আসিল, “বিহারী-ঠাকুরপে ” বিহারী কছিল, "একটু বাদে আসছি, বিনোদ-বোঠান ।” চোখের বালি Եr(: বিনোদিনী কহিল, “একবার শুনেই যাও-না ।” ~ বিহার ঘরে ঢুকিয়াই মুহূর্তের মধ্যে একবার আশার দিকে চাহিল— ঘোমটার মধ্য হইতে আশার মুখ যতটুকু দেখিতে পাইল, সেখানে বিষাদ বা বেদনার কোনো চিহ্নই তো দেখা গেল না। আশা উঠিয়া যাইবার চেষ্টা করিল, বিনোদিনী তাহাকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখিল ; কহিল, “আচ্ছা বিহারী-ঠাকুরপো, আমার চোখের বালির সঙ্গে কি তোমার সতিন-সম্পর্ক । তোমাকে দেখলেই ও পালাতে চায় কেন ?” আশা অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া বিনোদিনীকে তাড়না করিল। বিহারী হাসিয়া উত্তর করিল, “বিধাতা আমাকে তেমন স্বদস্ত করিয়া গড়েন নাই বলিয়া ।” বিনোদিনী। দেখছিল ভাই বালি ? বিহারী-ঠাকুরপো বাচাইয়া কথা বলিতে জানেন— তোর রুচিকে দোষ না দিয়া বিধাতাকেই দোষ দিলেন। লক্ষ্মণটির মতো এমন স্বলক্ষণ দেবর পাইয়াও তাহাকে আদর করিতে শিখিলি না— তোরই কপাল মন্দ । {} বিহারী। তোমার যদি তাহাতে দয়া হয় বিনোদ-বোঠান, তবে আর আমার আক্ষেপ কিসের । বিনোদিনী । সমুদ্র তো পড়িয়া আছে, তবু মেঘের ধারা নহিলে চাতকের তৃষ্ণ মেটে না কেন। আশাকে ধরিয়া রাখা গেল না । সে জোর করিয়া বিনোদিনীর হাত ছাড়াইয়া বাহির হইয়া গেল। বিহাৰীও চলিয়া যাইবার উপক্ৰম করিতেছিল। বিনোদিনী কহিল, "ঠাকুরপো, মহেন্দ্রবাবুর কী হইয়াছে বলিতে পার ?” শুনিয়াই বিহারী থমকিয়া ফিরিয়া দাড়াইল। কহিল, “তাহা তো জানি না। কিছু হইয়াছে নাকি ৷” বিনোদিনী । কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ভালো বোধ হয় না। বিহারী উদবিগ্নমুখে চৌকির উপর বসিয়া পড়িল। কথাটা খোলসা শুনিবে বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে ব্যগ্ৰ ভাবে চাহিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিল। বিনোদিনী কোনো কথা না বলিয়া মনোযোগ দিয়া চাদর সেলাই করিতে লাগিল । কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া বিহারী কহিল, “মহিনদার সম্বন্ধে তুমি কি বিশেষ কিছু লক্ষ্য করিয়াছ।” বিনোদিনী অত্যন্ত সাধারণভাবে কহিল, "কী জানি ঠাকুরপো, আমার তো ూ&g চোখের বালি ভালো বোধ হয় না। আমার চোখের বালির জন্তে আমার কেবলই ভাবনা হয় ।” বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সেলাই রাখিয়া উঠিয়া যাইতে উষ্ঠত হইল। বিহারী ব্যস্ত হইয়া কহিল, “বোঠান, একটু বসে।” বলিয়া একটা চোঁকিতে বসিল । বিনোদিনী ঘরের সমস্ত জানালা-দরজা সম্পূর্ণ খুলিয়া দিয়া কেরোসিনের বাতি উসকাইয়া সেলাই টানিয়া লইয়া বিছানার দূর প্রান্তে গিয়া বসিল । কহিল, “ঠাকুরপো, আমি তো চিরদিন এখানে থাকিব না— কিন্তু আমি চলিয়া গেলে আমার চোখের বালির উপর একটু দৃষ্টি রাখিয়ো— সে যেন অমুখী না হয়।” বলিয়া যেন হৃদয়োচ্ছাস সংবরণ করিয়া লইবার জন্য বিনোদিনী অন্য দিকে মূখ ফিরাইল । বিহারী বলিয়া উঠিল, “বোঠান, তোমাকে থাকিতেই হইবে । তোমার নিজের , বলিতে কেহ নাই, এই সরলা মেয়েটিকে মুখে দুঃখে রক্ষা করিবার ভার তুমি লও— তুমি তাহাকে ফেলিয়া গেলে আমি তো আর উপায় দেখি না।” বিনোদিনী । ঠাকুরপো, তুমি তো সংসারের গতিক জান । এখানে বরাবর থাকিব কেমন করিয়া । লোকে কী বলিবে । বিহারী। লোকে যা বলে বলুক, তুমি কান দিয়ে না। তুমি দেবী— অসহায়া । বালিকাকে সংসারের নিষ্ঠুর আঘাত হইতে রক্ষা করা তোমারই উপযুক্ত কাজ । বোঠান, আমি তোমাকে প্রথমে চিনি নাই, সেজন্য আমাকে ক্ষমা করে । আমিও সংকীর্ণহৃদয় সাধারণ ইতর লোকদের মতো মনে মনে তোমার সম্বন্ধে অন্যায় ধারণা স্থান দিয়াছিলাম ; একবার এমনও মনে হইয়াছিল, যেন আশার স্বথে তুমি ঈর্ষা করিতেছ— যেন— কিন্তু সে-সব কথা মুখে উচ্চারণ করিতেও পাপ আছে। তার পরে, তোমার দেবী-হৃদয়ের পরিচয় আমি পাইয়াছি— তোমার উপর আমার গভীর ভক্তি জন্মিয়াছে বলিয়াই, আজ তোমার কাছে আমার সমস্ত অপরাধ স্বীকার না করিয়া থাকিতে পারিলাম না । 蠱 বিনোদিনীর সর্বশরীর পুলকিত হইয়া উঠিল। যদিও সে ছলনা করিতেছিল, তবু বিহারীর এই ভক্তি উপহার সে মনে মনেও মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতে পারিল না। এমন জিনিস সে কখনো কাহারো কাছ হইতে পায় নাই । ক্ষণকালের জন্য মনে হইল, সে যেন যথার্থই পবিত্র, উন্নত— আশার প্রতি একটা অনিৰ্দেশ্য দয়ায় তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। সেই অশ্রপাত সে বিহারীর কাছে গোপন করিল না, এবং সেই অশ্রধারা বিনোদিনীর নিজের কাছে চোখের বালি ** নিজেকে পূজনীয়া বলিয়া মোহ উৎপাদন করিল। বিহারী বিনোদিনীকে আশ্র ফেলিতে দেখিয়া, নিজের আশ্রবেগ সংবরণ করিয়া উঠিয়া বাহিরে মহেন্দ্রের ঘরে গেল । মহেন্দ্র যে হঠাৎ নিজেকে পাবও বলিয়া কেন ঘোষণা করিল, বিহারী তাহার কোনো তাৎপর্ষ খুজিয়া পাইল না। ঘরে গিয়া দেখিল, মহেন্দ্র নাই । খবর পাইল, মহেন্দ্র বেড়াইতে বাহির হইয়াছে। পূর্বে মহেন্দ্র অকারণে কখনোই ঘর ছাড়িয়া বাহির হইত না । স্বপরিচিত লোকের এবং স্বপরিচিত ঘরের বাহিরে মহেন্দ্রের অত্যন্ত ক্লাস্তি ও পীড়া বোধ হইত। বিহারী ভাবিতে ভাবিতে ধীরে ধীরে বাড়ি চলিয়া গেল । বিনোদিনী আশাকে নিজের শয়নঘরে আনিয়া, বুকের কাছে টানিয়া, দুই চক্ষু জলে ভরিয়া কহিল, “ভাই চোখের বালি, আমি বড়ো হতভাগিনী, আমি বড়ো অলক্ষণা ।” আশা ব্যথিত হইয়া তাহাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া স্নেহাৰ্দ্ৰকণ্ঠে বলিল, “কেন ভাই, অমন কথা কেন বলিতেছ।” বিনোদিনী রোদনোচ্ছসিত শিশুর মতো আশার বক্ষে মুখ রাখিয়া কহিল, “আমি যেখানে থাকিব, সেখানে কেবল মন্দই হইবে । দে ভাই, আমাকে ছাড়িয়া দে, আমি আমার জঙ্গলের মধ্যে চলিয়া যাই।” আশা চিবুকে হাত দিয়া বিনোদিনীর মুখ তুলিয়া ধরিয়া কহিল, “লক্ষ্মীটি ভাই, অমন কথা বলিস নে— তোকে ছাড়িয়া আমি থাকিতে পারিব না— আমাকে ছাড়িয়া যাইবার কথা কেন আজ তোর মনে আসিল ।” মহেন্দ্রের দেখা না পাইয়া বিহারী কোনো-একটা ছুতায় পুনর্বার বিনোদিনীর ঘরে আসিয়া মহেন্দ্র ও আশার মধ্যবর্তী আশঙ্কার কথাটা আর-একটু স্পষ্ট করিয়া শুনিবার জন্ত উপস্থিত হইল । মহেন্দ্রকে পরদিন সকালে তাহাদের বাড়ি খাইতে যাইতে বলিবার জন্ত বিনোদিনীকে অনুরোধ করিবার উপলক্ষ লইয়া সে উপস্থিত হইল। “বিনোদবোঠান” বলিয়া ডাকিয়া হঠাৎ কেরোসিনের উজ্জল আলোকে বাহির হইতেই আলিঙ্গনবদ্ধ সাশ্রনেত্র দুই সখীকে দেখিয়াই থমকিয়া দাড়াইল । আশার হঠাৎ মনে হইল, “নিশ্চয়ই বিহারী তাহার চোখের বালিকে কোনো অন্যায় নিন্দা করিয়া কিছু বলিয়াছে, তাই সে আজ এমন করিয়া চলিয়া যাইবার কথা তুলিয়াছে। বিহারীবাবুর ভারি অন্যায়। উহার মন ভালো নয়। আশা বিরক্ত হইয়া বাহির হইয়া আসিল । বিহারীও বিনোদিনীর প্রতি ভক্তির মাত্ৰা চড়াইয়া বিগলিত ԵԵ- - চোখের বালি, হৃদয়ে দ্রুত প্রস্থান করিল। r সেদিন রাত্ৰে মহেন্দ্র আশাকে কহিল, "চুনি, আমি কাল সকালের প্যাসোরেই কাশী চলিয়া যাইব ।” আশার বক্ষস্থল ধক করিয়া উঠিল কহিল, "কেন।” মহেন্দ্র কহিল, “কাকীমাকে অনেক দিন দেখি নাই ।” শুনিয়া আশা বড়োই লজ্জাবোধ করিল ; এ কথা পূর্বেই তাহার মনে উদয় হওয়া উচিত ছিল। নিজের স্বখদুঃখের আকর্ষণে স্নেহময়ী মাসিমাকে সে যে ভুলিয়া ছিল, অথচ মহেন্দ্র সেই প্রবাসী-তপস্বিনীকে মনে করিয়াছে, ইহাতে নিজেকে কঠিনহৃদয়া বলিয়া বড়োই ধিক্কার জন্মিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “তিনি আমারই হাতে র্তাহার সংসারের একমাত্র স্নেহের ধনকে সমর্পণ করিয়া দিয়া চলিয়া গেছেন— তাহাকে একবার না দেখিয়া আমি কিছুতেই স্বস্থির হইতে পারিতেছি না।” বলিতে বলিতে মহেন্দ্রের কণ্ঠ বাপরুদ্ধ হইয়া আসিল, স্নেহপূর্ণ নীরব আশীৰ্বাদ ও অব্যক্ত মঙ্গলকামনার সহিত বারংবার সে আশার ললাট ও মস্তকের উপর দক্ষিণ করতল চালনা করিতে লাগিল। আশা এই অকস্মাৎ স্নেহাবেগের সম্পূর্ণ মর্ম বুঝিতে পারিল না, কেবল তাহার হৃদয় বিগলিত হইয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল। আজই সন্ধ্যাবেলায় বিনোদিনী তাহাকে অকারণ স্নেহাতিশয্যে যে-সব কথা , বলিয়াছিল, তাহা মনে পড়িল । উভয়ের মধ্যে কোথাও কোনো যোগ আছে কি না, তাহা সে কিছুই বুঝিল না ; কিন্তু মনে হইল, যেন ইহা তাহার জীবনে কিসের একটা স্বচন । ভালো কি মন্দ কে জানে । ভয়ব্যাকুলচিত্তে সে মহেন্দ্রকে বাছপাশে বদ্ধ করিল। মহেন্দ্র তাহার সেই অকারণ আশঙ্কার আবেশ অনুভব করিতে পারিল। কহিল, "চুনি, তোমার উপর তোমার পুণ্যবতী মাসিমার আশীর্বাদ আছে, তোমার কোনো ভয় নাই। তিনি তোমারই মঙ্গলের জন্য র্তাহার সমস্ত ত্যাগ করিয়া গেছেন, তোমার কখনো কোনো অকল্যাণ হইতে পারে না ।” আশা তখন দৃঢ়চিত্তে সমস্ত ভয় দূর করিয়া ফেলিল। স্বামীর এই আশীৰ্বাদ অক্ষয়-কবচের মতো গ্রহণ করিল। সে মনে মনে বারংবার তাহার মাসিমার পবিত্র পদধূলি মাথায় তুলিয়া লইতে লাগিল, এবং একাগ্রমনে কহিল, মা, তোমার আশীৰ্বাদ আমার স্বামীকে সর্বদা রক্ষা করুক।” পরদিনে মহেন্দ্ৰ চলিয়া গেল, বিনোদিনীকে কিছুই বলিয়া গেল না। বিনোদিনী চোখের বালি ケ為 মনে মনে কহিল, ‘নিজে অন্যায় করা হইল, আবার আমার উপর রাগ ! এমন সাধু তো দেখি নাই! কিন্তু, এমন সাধুত্ব বেশি দিন টে'কে না।’ ミー সংসারত্যাগিনী অন্নপূর্ণ বহুদিন পরে হঠাৎ মহেন্দ্রকে আসিতে দেখিয়া যেমন স্নেহে আনন্দে আপ্লুত হইয়া গেলেন, তেমনি তাহার হঠাৎ ভয় হইল, বুঝি আশাকে লইয়া মার সঙ্গে মহেন্দ্রের আবার কোনো বিরোধ ঘটিয়াছে এবং মহেন্দ্র তাহার কাছে নালিশ জানাইয়া সাম্ভুনালাভ করিতে আসিয়াছে। মহেন্দ্র শিশুকাল হইতেই সকলপ্রকার সংকট ও সস্তাপের সময় তাহার কাকীর কাছে ছুটিয়া আসে । কাহারে। উপর রাগ করিলে অন্নপূর্ণ তাহার রাগ থামাইয়া দিয়াছেন, দুঃখবোধ করিলে তাহ সহজে সহ করিতে উপদেশ দিয়াছেন । কিন্তু বিবাহের পর হইতে মহেঞ্জের জীবনে সর্বাপেক্ষ যে সংকটের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার প্রতিকারচেষ্টা দূরে থাক, কোনোপ্রকার সান্তুনা পর্যন্ত তিনি দিতে অক্ষম । সে সম্বন্ধে যেভাবে যেমন করিয়াই তিনি হস্তক্ষেপ করিবেন, তাহাতেই মহেন্দ্রের সাংসারিক বিপ্লব আরো দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিবে, ইহাই যখন নিশ্চয় বুঝিলেন তখনই তিনি সংসার ত্যাগ করিলেন । রুগণ শিশু যখন জল চাহিয়া কাদে, এবং জল দেওয়া যখন কবিরাজের নিতান্ত নিষেধ, তখন পীড়িতচিত্তে মা যেমন অন্য ঘরে চলিয়া যান,অন্নপূর্ণ তেমনি করিয়া নিজেকে প্রবাসে লইয়৷ গেছেন। দূর তীর্থবাসে থাকিয়া ধর্মকর্মের নিয়মিত অনুষ্ঠানে এ কয়দিন সংসার অনেকটা ভুলিয়াছিলেন, মহেন্দ্র আবার কি সেই-সকল বিরোধের কথা তুলিয়া তাহার প্রচ্ছন্ন ক্ষতে আঘাত করিতে আসিয়াছে। কিন্তু মহেন্দ্র আশাকে লইয়া তাহার মা'র সম্বন্ধে কোনো নালিশের কথা তুলিল ন। তখন অন্নপূর্ণার আশঙ্ক৷ অন্য পথে গেল। যে মহেন্দ্র আশাকে ছাড়িয়া কলেজে যাইতে পারিত না, সে আজ কাকীর খোজ লইতে কাশী আসে কেন । তবে কি আশার প্রতি মহেন্দ্রের টান ক্রমে ঢিলা হইয়া আসিতেছে । মহেন্দ্রকে তিনি কিছু আশঙ্কার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “ষ্ঠ রে মহিন, আমার মাথা খা, ঠিক করিয়া বল দেখি, চুনি কেমন আছে।” মহেন্দ্র কহিল, “সে তো বেশ ভালো আছে, কাকীমা ।” “আজকাল সে কী করে মহিন । তোরা কি এখনো তেমনি ছেলেমানুষ আছিস, না, কাজকর্মে ঘরকন্নায় মন দিয়াছিস ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “ছেলেমান্তদি একেবারেই বন্ধ । সকল বঞ্চাটের মূল সেই চারু