প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি చి) অন্নপূর্ণ ঈষৎ হাসিয়া কছিলেন, “আমার স্বামী এখন র্যাহার মধ্যে আছেন, সেই ভগবানের কথা ভাবি ।” 制 আশা কহিল, “তাহাতে ཨཱ་ཝེ মুখ পাও ?” অন্নপূর্ণ সস্নেহে আশার মাথায় হাত বুলাইয়া কহিলেন, “আমার সে মনের কথা তুই কী বুঝিবি, বাছা । সে আমার মন জানে, আর র্যার কথা ভাবি তিনিই জানেন ।” আশা মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “আমি র্যার কথা রাত্রিদিন ভাবি, তিনি কি আমার মনের কথা জানেন না। আমি ভালো করিয়া চিঠি লিখিতে পারি না বলিয়া তিনি কেন আমাকে চিঠি লেখা ছাড়িয়া দিয়াছেন।” আশা কয়দিন মহেন্দ্রের চিঠি পায় নাই। নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে সে ভাবিল, ‘চোখের বালি যদি হাতের কাছে থাকিত, সে আমার মনের কথা ঠিকমত করিয়া লিখিয়া দিতে পারত ।” কুলিখিত তুচ্ছ পত্র স্বামীর কাছে আদর পাইবে না মনে করিয়া চিঠি লিখিতে কিছুতে আশার হাত সরিত না । যতই যত্ব করিয়া লিখিতে চাহিত ততই তাহার অক্ষর খারাপ হইয়া যাইত। মনের কথা যতই ভালো করিয়া গুছাইয়া লইবার চেষ্টা করিত ততই তাহার পদ কোনোমতেই সম্পূর্ণ হইত না । যদি একটিমাত্র ‘শ্ৰীচরণেষু লিখিয়া নাম সহি করিলেই মহেন্দ্র অন্তর্যামী দেবতার মতো সকল কথা বুঝিতে পারিত, তাহা হইলেই আশার চিঠি লেখা সার্থক হইত। বিধাতা এতখানি ভালোবাসা দিয়াছেন, একটুখানি ভাষা দেন নাই কেন । মন্দিরে সন্ধ্যারতির পরে গৃহে ফিরিয়া আসিয়া আশা অন্নপূর্ণার পায়ের কাছে বসিয়া আস্তে আস্তে র্তাহার পারে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল। অনেকক্ষণ নিঃশব্দের পর বলিল, “মাসি, তুমি যে বল, স্বামীকে দেবতার মতো করিয়া সেবা করা স্ত্রীর ধর্ম-কিন্তু যে স্ত্রী মূখ, যাহার বুদ্ধি নাই, কেমন করিয়া স্বামীর সেবা করিতে হয় যে জানে না, সে কী কৱিবে ।” অন্নপূর্ণ কিছুক্ষণ আশার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন ; একটি চাপা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “বাছা, আমিও তো মূর্খ তবুও তো ভগবানের সেবা করি: থাকি ।” আশা কছিল, “তিনি যে তোমার মন জানেন, তাই খুশি হন । কিন্তু মূল করে, স্বামী যদি মূখের সেবায় খুশি না হন ?” # অন্নপূর্ণ কহিলেন, “সকলকে খুশি করিবার শক্তি সকলের থাকে না বাছা । ు U9శి চোখের বালি স্ত্রী যদি আন্তরিক শ্রদ্ধা ভক্তি যন্ধের সঙ্গে স্বামীর সেবা ও সংসারের কাজ করে, তবে স্বামী তাহা তুচ্ছ করিয়া ফেলিয়া দিলেও স্বয়ং জগদীশ্বর তাহা কুড়াইয়। ठणन ।" আশা নিরুত্তরে চুপ করিয়া রহিল। মাসির এই কথা হইতে সাস্তুনা গ্রহণের অনেক চেষ্টা করিল, কিন্তু স্বামী যাহাকে তুচ্ছ করিয়া ফেলিয়া দিবেন, জগদীশ্বরও যে তাহাকে সার্থকতা দিতে পারিবেন, এ কথা কিছুতেই তাহার মনে হইল না । সে নতমুখে বসিয়া তাহার মাসির পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল । অন্নপূর্ণ তখন আশার হাত ধরিয়া তাহাকে আরো কাছে টানিয়া লইলেন ; তাহার মন্তকচুম্বন করিলেন ; রুদ্ধ কণ্ঠকে দৃঢ় চেষ্টায় বাধামুক্ত করিয়া কহিলেন, “চুনি, দুঃখে কষ্টে যে শিক্ষালাভ হয় শুধু কানে শুনিয়া তাহ পাইবি না। তোর এই মাসিও একদিন তোর বয়সে তোরই মতো সংসারের সঙ্গে মস্ত করিয় দেনাপাওনার সম্পর্ক পাতিয়া বসিয়াছিল। তখন আমিও তোরই মতো মনে করিতাম, যাহার সেবা করিব তাহার সন্তোষ না জন্মিবে কেন । যাহার পূজা করিব তাহার প্রসাদ না পাইব কেন । যাহার ভালোর চেষ্টা করিব সে আমার চেষ্টাকে ভালো বলিয়া না বুঝিবে কেন । পদে পদে দেখিলাম, সেরূপ হয় না। অবশেষে একদিন অসহ হইয়া মনে হইল, পৃথিবীতে আমার সমস্তই ব্যর্থ হইয়াছে— সেই দিনই সংসার ত্যাগ করিয়া আসিলাম । আজ দেখিতেছি, আমার কিছুই নিষ্ফল হয় নাই । ওরে বাছা, যার সঙ্গে আসল দেনাপাওনার সম্পর্ক, যিনি এই সংসার-হাটের মূল মহাজন, তিনিই আমার সমস্তই লইতেছিলেন, হৃদয়ে বসিয়া আজ সে কথা স্বীকার করিয়াছেন। তখন যদি জানিতাম ! যদি তার কর্ম বলিয়া সংসারের কর্ম করিতাম, তাকে দিলাম বলিয়াই সংসারকে হৃদয় দিতাম, তা হইলে কে আমাকে দুঃখ দিতে পারিত । আশা বিছানায় শুইয়া শুইয়া অনেক রাত্রি পর্যন্ত অনেক কথা ভাবিল, তবু ভালো করিয়া কিছুই বুঝিতে পারল না। কিন্তু পুণ্যবতী মাসির প্রতি তাহার অসীম ভক্তি ছিল, সেই মাসির কথা সম্পূর্ণ না বুঝিলেও একপ্রকার শিরোধায করিয়া লইল । মাসি সকল সংসারের উপরে যাহাকে হৃদয়ে স্থান দিয়াছেন, তাহার উদ্দেশে অন্ধকারে বিছানায় উঠিয়া বসিয়া গড় করিয়া প্রণাম করিল। বলিল, ‘আমি বালিকা, তোমাকে জানি না, আমি কেবল আমার স্বামীকে জাiন, সেজন্য অপরাধ লইয়ে না। আমার স্বামীকে আমি যে পূজা দিই, ভগবান, তুমি উাহাকে তাহা গ্রহণ করিতে বলিয়ো । তিনি যদি তাহ পায়ে ঠেলিয়া দেন, তবে আমি চোখের বালি ১৩৩ আর বাচিব না। আমি আমার মালিমার মতো পুণ্যবতী নই, তোমাকে আশ্রয় করিয়া আমি রক্ষা পাইব না ।” এই বলিয়া আশা বার বার বিছানার উপর গড় করিয়া প্রণাম করিল। আশার জেঠামশায়ের ফিরিবার সময় হইল। বিদায়ের পূর্বসন্ধ্যায় অন্নপূর্ণ আশাকে আপনার কোলে বসাইয়া কহিলেন, “চুনি, ম আমার, সংসারের শোক দুঃখ অমঙ্গল হইতে তোকে সর্বদা রক্ষা করিবার শক্তি আমার নাই । আমার এই উপদেশ– যেখান থেকে যত কষ্টই পাস, তোর বিশ্বাস, তোর ভক্তি স্থির রাখিল ; তোর ধর্ম যেন অটল থাকে ।* আশা তাহার পায়ের ধুলা লইয়া কহিল, “আশীৰ্বাদ করে মাসিম, তাই হইবে।” צס\ আশা ফিরিয়া আসিল । বিনোদিনী তাহার পরে খুব অভিমান করিল—“বালি, এতদিন বিদেশে রহিলে, একখানা চিঠি লিখিতে নাই ?” আশা কহিল, “তুমিই কোন লিখিলে ভাই, বালি।” বিনোদিনী । আমি কেন প্রথমে লিখিব । তোমারই তো লিখিবার কথা । আশা বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া ধরিয়া নিজের অপরাধ স্বীকার করিয়া লইল । কহিল, “জান তো ভাই, আমি ভালো লিখিতে জানি না । বিশেষ, তোমার মতো পণ্ডিতের কাছে লিখিতে আমার লজ্জা করে ।” দেখিতে দেখিতে দুইজনের বিবাদ মিটিয়া গিয়া প্রণয় উদবেলিত হইয়া উঠিল । বিনোদিনী কহিল, ‘দিনরাত্রি সঙ্গ দিয়া তোমার স্বামীটির অভ্যাস তুমি একেবারে খারাপ করিয়া দিয়াছ । একটি কেহ কাছে নহিলে থাকিতে পারে না।” আশা । সেইজন্তই তো তোমার উপরে ভার দিয়া গিয়াছিলাম। কেমন করিয়া সঙ্গ দিতে হয় আমার চেয়ে তুমি ভালো জান । বিনোদিনী । দিনটা তো একরকম করিয়া কলেজে পাঠাইয়া নিশ্চিস্ত হইতাম, কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় কোনোমতেই ছাড়াছুড়ি নাই— গল্প করিতে হইবে, বই পড়িয়া শুনাইতে হইবে, আবদারের শেষ নাই । আশা । কেমন জব্দ । লোকের মন ভুলাইতে যখন পার তখন লোকেই বা ছাড়িবে কেন । বিনোদিনী । সাবধান থাকিস ভাই ! ঠাকুরপো যেরকম বাড়াবাড়ি করেন, এক-একবার সন্দেহ হয়, বুঝি বশ করিবার বিদ্যা জানি বা ।