প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি o S 5 a. দেখিতে লাগিল। কোথায় চোখে চোখে সেই নীরব সম্ভাষণ, সেই ভাষাপূর্ণ হালি । গাড়ি চলিয়া গেল ; আশা সেইখানেই মাটির উপরে বসিয়া পড়িল। পৃথিবী, সংসার, সমস্ত বিস্বাদ হইয়া গেল। কলিকাতার কর্মপ্রবাহে তখন জোয়ার আসিবার সময় । সাড়ে দশটা বাজিয়াছে, আপিসের গাড়ির বিরাম নাই, ট্রামের পশ্চাতে ট্রাম ছুটিতেছে— সেই ব্যস্ততাবেগবান কর্মকল্লোলের অদূরে এই একটি বেদনাস্তম্ভিত মুহমান হৃদয় অত্যন্ত বিসদৃশ । হঠাৎ এক সময় আশার মনে হইল, ‘বুঝিয়াছি । ঠাকুরপো কাশী গিয়াছিলেন, সেই খবর পাইয়া উনি রাগ করিয়াছেন । ইহা ছাড়া ইতিমধ্যে আর তো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে নাই । কিন্তু আমার তাহাতে কী দোষ ছিল।’ ভাবিতে ভাবিতে অকস্মাৎ এক মুহূর্তের জন্য যেন আশার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হইয় গেল। হঠাৎ তাহার আশঙ্কা হইল, মহেন্দ্ৰ বুঝি সন্দেহ করিয়াছেন, বিহারীর কাশী যাওয়ার সঙ্গে আশারও কোনো যোগ আছে । দুইজনে পরামর্শ করিয়া এই কাজ । ছিছিছি ! এমন সন্দেহ ! কী লজ্জ ] একে তো বিহারীর সঙ্গে তাহার নাম জড়িত হইয়া ধিক্কারের কারণ ঘটিয়াছে, তাহার উপরে মহেন্দ্র যদি এমন সন্দেহ করে তবে তো আর প্রাণ রাখা যায় না । কিন্তু যদি কোনো সন্দেহের কারণ হয়, যদি কোনো অপরাধ ঘটিয়া থাকে, মহেন্দ্র কেন স্পষ্ট করিয়া বলে না— বিচার করিয়া তাহার উপযুক্ত দণ্ড কেন না দেয় । মহেন্দ্র খোলসা কোনো কথা না বলিয়া কেবলই আশাকে যেন এড়াইয়া বেড়াইতেছে, তাই আশার বারবার মনে হইতে লাগিল, মহেন্দ্রের মনে এমন কোনো সন্দেহ আসিয়াছে যাহা নিজেই সে অন্যায় বলিয়া জানে, যাহা সে আশার কাছে স্পষ্ট করিয়া স্বীকার করিতেও লজ্জা বোধ করিতেছে। নহিলে এমন অপরাধীর মতো তাহার চেহারা হইবে কেন । ক্রুদ্ধ বিচারকের তো এমন কুষ্ঠিত ভাব হইবার কথা নয়। মহেন্দ্র গাড়ি হইতে চকিতের মতো সেই যে আশার মান করুণ মুখ দেখিয়া গেল, তাহা সমস্ত দিনে সে মন হইতে মুছিতে পারিল না । কলেজের লেকচারের মধ্যে, শ্রেণীবদ্ধ ছাত্রমণ্ডলীর মধ্যে, সেই বাতায়ন, আশার সেই অস্নাত রুক্ষ কেশ, সেই মলিন বস্ত্র, সেই ব্যথিত-ব্যাকুল দৃষ্টিপাত, মুম্পষ্ট রেখায় বারংবার অঙ্কিত হইয়া উঠিতে লাগিল । কলেজের কাজ সারিয়া সে গোলদিঘির ধারে বেড়াইতে লাগিল । বেড়াইতে বেড়াইতে সন্ধ্যা হইয়া আসিল ; আশার সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার কর্তব্য তাহা সে কিছুতেই ভাবিয়া পাইল না— সদয় ছলনা, না অকপট নিষ্ঠুরতা, কোনটা উচিত । Yor চোখের বালি বিনোদিনীকে পরিত্যাগ করিবে কি না, সে তর্ক জার মনে উদয়ই হয় না। দয়া এবং প্রেম, মহেঞ্জ উভয়ের দাবি কেমন করিয়া রাখিবে। মহেক্স তখন মনকে এই বলিয়া বুঝাইল যে, আশার প্রতি এখনো তাহার যে ভালোবালা আছে তাহা অল্প স্ত্রীর ভাগ্যে জোটে। সেই স্নেহ, সেই ভালোবাস পাইলে আশা কেন না সন্তুষ্ট থাকিবে । বিনোদিনী এবং আশা, উভয়কেই স্থান দিবার মতো প্রশস্ত হৃদয় মহেঞ্জের আছে । বিনোদিনীর সহিত মহেন্দ্রের যে পবিত্র প্রেমের সম্বন্ধ তাহাতে দাম্পত্যনীতির কোনো ব্যাঘাত হইবে না । এইরূপ বুঝাইয়া মহেন্দ্র মন হইতে একটা ভার নামাইয়া ফেলিল। বিনোদিনী এবং আশা, কাহাকেও ত্যাগ না করিয়া দুই-চন্দ্র-সেবিত গ্রহের মতে এইভাবেই সে চিরকাল কাটাইয়া দিতে পারিবে, এই মনে করিয়া তাহার মন প্রফুল্প হইয়া উঠিল । আজ রাত্রে সে সকাল-সকাল বিছানায় প্রবেশ করিয়া অাদরে যত্বে স্নিগ্ধআলাপে আশার মন হইতে সমস্ত বেদনা দূর করিয়া দিবে, ইহা নিশ্চয় করিয়া দ্রুতপদে বাড়ি চলিয়া আসিল । আহারের সময় অাশা উপস্থিত ছিল না ; কিন্তু সে এক সময় গুইতে আসিবে তো, এই মনে করিয়া মহেন্দ্র বিছানার মধ্যে প্রবেশ করিল। কিন্তু নিস্তন্ধ ঘরে সেই শূন্ত শয্যার মধ্যে কোন স্থতি মহেঞ্জের হৃদয়কে আবিষ্ট করিয়া তুলিল। আশার সহিত নব পরিণয়ের নিত্যনূতন লীলাখেলা ? না। সূর্যালোকের কাছে জ্যোৎস্না যেমন মিলাইয়া যায়, সে-সকল স্মৃতি তেমনি ক্ষীণ হইয়া আসিয়াছে – একটি তীব্রউজ্জল তরুণীমূর্তি, সরলা বালিকার সলঙ্গ স্কিগুচ্ছবিকে কোথায় আবৃত আচ্ছন্ন করিয়া দীপ্যমান হইয়া উঠিয়াছে। বিনোদিনীর সঙ্গে বিষবৃক্ষ লইয়া সেই কাড়াকড়ি মনে পড়িতে লাগিল ; সন্ধার পর বিনোদিনী কপালকুণ্ডলা পড়িয়া শুনাইতে শুনাইতে ক্রমে রাত্রি হইয়া আসিত, বাড়ির লোক ঘুমাইয়া পড়িত, রাত্রে নিতৃত কক্ষের সেই স্তন্ধ নির্জনতায় বিনোদিনীর কণ্ঠস্বর যেন আবেশে মৃদ্ধতর ও রুদ্ধপ্রায় হইয়া আসিত, হঠাৎ সে আত্মসংবরণ করিয়া বই ফেলিয়া উঠিয়া পড়িত, মহেন্দ্র বলিত ‘তোমাকে সিড়ির নীচে পর্যন্ত পৌছাইয়া দিয়া আসি । সেই-সকল কথা বারংবার মনে পড়িয়া তাহার সর্বাঙ্গে পুলকসঞ্চার করিতে লাগিল। রাত্রি বাড়িয়া চলিল— মহেন্দ্রের মনে মনে ঈষৎ আশঙ্কা হইতে লাগিল এখনই আশা আসিয়া পড়িবে ; কিন্তু আশা আসিল না। মহেন্দ্র তাবিল, “আমি তো কর্তব্যের জষ্ঠ প্রভত ছিলাম, কিন্তু আশা যদি অন্তায় রাগ করিয়া না আসে তো আমি কী করিব।” এই বলিয়া নিশখরাত্রে বিনোদিনীর ধ্যানকে ঘনীভূত করিয়া তুলিল । চোখের বালি \రిa ঘড়িতে যখন একটা বাজিল, তখন মহেন্দ্র আর থাকিতে পারিল না, মশারি খুলিয়া বাহির হইয়া পড়িল। ছাদে আসিয়া দেখিল, গ্রীষ্মের জ্যোৎস্নারাত্রি বড়ো রমণীয় হইয়াছে। কলিকাতার প্রকাও নিঃশত এবং স্বপ্তি যেন স্তন্ধ সমূত্রের জলরাশির দ্যায় স্পর্শগম্য বলিয়া বোধ হইতেছে ; অসংখ্য হর্ম্যশ্রেণীর উপর দিয়া মহানগরীর নিদ্রাকে নিবিড়তর করিয়া বাতাস মৃদুগমনে পদচারণ করিয়া আসিতেছে। মহেন্দ্রের বহু দিনের রুদ্ধ আকাজক্ষ আপনাকে আর ধরিয়া রাখিতে পারিল না। আশা কাশী হইতে ফিরিয়া অবধি, বিনোদিনী তাহাকে দেখা দেয় নাই । জ্যোৎস্নামদবিহবল নির্জন রান্ত্ৰি মহেন্দ্রকে মোহাবিষ্ট করিয়া বিনোদিনীর দিকে ঠেলিয়া লইয়া যাইতে লাগিল । মহেন্দ্র সিড়ি দিয়া নামিয়া গেল। বিনোদিনীর ঘরের সম্মুখের বারান্দায় আসিয়া দেখিগ, ঘর বন্ধ নাই । ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিল, বিছানা তৈরি রহিয়াছে, কেহ শোয় নাই। ঘরের মধ্যে পদশব্দ শুনিতে পাইয়া ঘরের দক্ষিণ দিকের খোলা বারান্দা হইতে বিনোদিনী জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিল, “কে ও ।” মহেন্দ্র অভিভূত আর্দ্র কণ্ঠে উত্তর করিল, “বিনোদ, আমি।” বলিয়া সে একেবারে বারান্দায় আসিয়া উপস্থিত হইল । গ্রীষ্মরাত্রিতে বারান্দায় মাচুর পাতিয়া বিনোদিনীর সঙ্গে রাজলক্ষ্মী শুইয়া ছিলেন ; তিনি বলিয়া উঠিলেন, “মহিন, এত রাত্রে তুই এখানে যে ” বিনোদিনী তাহার ঘনকৃষ্ণ ক্রযুগের নীচে হইতে মহেঞ্জের প্রতি বঞ্জারি নিক্ষেপ করিল। মহেন্দ্র কোনো উত্তর না দিয়া দ্রুতপদে সেখান হইতে চলিয়া গেল । °Cパ○ পরদিন প্রত্যুষ হইতে ঘনঘটা করিয়া আছে। কিছুকাল অসহ উত্তাপের পর মিশ্বখ্যামল মেঘে দগ্ধ আকাশ জুড়াইয়া গেল। আজ মহেন্দ্র সময় হুইবার পূর্বেই কলেজে গেছে । তাহার ছাড়া কাপড়গুলা মেঝের উপর পড়িয়া । আশা মহেঞ্জের ময়লা কাপড় গনিয়া গনিয়া, তাহার হিসাব রাখিয়া ধোবাকে বুঝাইয়া দিতেছে । মহেন্দ্র স্বভাৰত ভোলামন অসাবধান লোক ; এইজন্য আশার প্রতি তাহার অনুরোধ ছিল ধোবার বাড়ি দিবার পূর্বে তাহার ছাড়া কাপড়ের পকেট তদন্ত করিয়া লওয়া হয় যেন। মহেঞ্জের একটা ছাড়া জামার পকেটে হাত দিতেই একখানা চিঠি আশার হাতে ঠেকিল ।