প্রধান মেনু খুলুন


39 e চোখের বালি সেই চিঠি যদি বিষধর সাপের মূর্তি ধরিয়া তখনই আশার অঙ্গুলি দংশন করিত তবে ভালো হইত ; কারণ উগ্ৰ বিষ শরীরে প্রবেশ করিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাহার চরম ফল ফলিয়া শেষ হইতে পারে, কিন্তু বিষ মনে প্রবেশ করিলে মৃত্যুযন্ত্রণা আনে— মৃত্যু আনে না। খোলা চিঠি বাহির করিব মাত্র দেখিল, বিনোদিনীর হস্তাক্ষর । চকিতের মধ্যে আশার মুখ পাংশুবর্ণ হইয়া গেল। চিঠি হাতে লইয়া সে পাশের ঘরে গিয়া পড়িল— কাল রাত্রে তুমি যে কাগুটা করিলে, তাহাতেও কি তোমার তৃপ্তি হইল না। আজ আবার কেন খেমির হাত দিয়া আমাকে গোপনে চিঠি পাঠাইলে । ছি, ছি, সে কী মনে করিল। আমাকে তুমি কি জগতে কাহারে কাছে মুখ দেখাইতে দিবে না। আমার কাছে কী চাও তুমি । ভালোবাসা ? তোমার এ ভিক্ষাবৃত্তি কেন। জন্মকাল হইতে তুমি কেবল ভালোবাসাই পাইয়া আসিতেছ, তবু তোমার লোভের অন্ত নাই ! জগতে আমার ভালোবাসিবার এবং ভালোবাসা পাইবার কোনো স্থান নাই। তাই আমি খেলা খেলিয়া ভালোবাসার খেদ মিটাইয়া থাকি। যখন তোমার অবসর ছিল তখন সেই মিথ্যা খেলায় তুমিও যোগ দিয়াছিলে। কিন্তু খেলার ছুটি কি ফুরায় না। ঘরের মধ্যে তোমার ডাক পড়িয়াছে, এখন আবার খেলার ঘরে উকিঝুকি কেন। এখন ধুলা ঝাড়িয়া ঘরে যাও । আমার তো ঘর নাই, আমি মনে মনে একলা বসিয়া খেলা করিব, তোমাকে ডাকিব না। তুমি লিখিয়াছ, আমাকে ভালোবাস । খেলার বেলায় সে কথা শোনা যাইতে পারে— কিন্তু যদি সত্য বলিতে হয়, ও কথা বিশ্বাস করি না । এক সময় মনে করিতে, তুমি আশাকে ভালোবাসিতেছ— সেও মিথ্যা। এখন মনে করিতেছ, তুমি আমাকে ভালোবাসিতেছ- এও মিথ্যা। তুমি কেবল নিজেকে ভালোবাস । ভালোবাসার তৃষ্ণায় আমার হৃদয় হইতে বক্ষ পর্যন্ত শুকাইয়া উঠিয়াছে— সে তৃষ্ণ পূরণ করিবার সম্বল তোমার হাতে নাই, সে আমি বেশ ভালো করিয়াই দেখিয়াছি। আমি তোমাকে বারংবার বলিতেছি, তুমি আমাকে ত্যাগ করে, আমার পশ্চাতে ফিরিয়ো না ; নির্লজ্জ হইয়া আমাকে লজ্জা দিয়ে না । আমার খেলার শখও মিটিয়াছে ; এখন ডাক দিলে কিছুতেই আমার চোখের বালি ... 8 X সাড়া পাইবে না। চিঠিতে তুমি আমাকে নিষ্ঠুর বলিয়াছ ; সে যথা সত্য । হইতে পারে ; কিন্তু আমার কিছু দয়াও আছে, তাই আজ তোমাকে আমি দয়া করিয়া ত্যাগ করিলাম। এ চিঠির যদি উত্তর দাও তবে বুঝিব, ন পালাইলে তোমার হাত হইতে আমার আর নিষ্কৃতি নাই । চিঠিখানি পড়িবা মাত্র মুহূর্তের মধ্যে চারি দিক হইতে আশার সমস্ত অবলম্বন যেন খসিয়া পড়িয়া গেল, শরীরের সমস্ত স্বায়ু পেশী যেন একেবারেই হাল ছাড়িয়া দিল, নিশ্বাস লইবার জন্য যেন বাতাসটুকু পর্যন্ত রহিল না, সূর্য তাহার চোখের উপর হইতে সমস্ত আলো যেন তুলিয়া লইল । আশা প্রথমে দেয়াল, তাহার পর আলমারি, তাহার পর চৌকি ধরিতে ধরিতে মাটিতে পড়িয়া গেল। ক্ষণকাল পরে সচেতন হইয়া চিঠিখানা আর-একবার পড়িতে চেষ্টা করিল, কিন্তু উদভ্ৰান্তচিত্তে কিছুতেই তাহার অর্থ গ্রহণ করিতে পারিল না— কালো-কালো অক্ষরগুলা তাহার চোখের উপর নাচিতে লাগিল । এ-কী । এ কী হইল । এ কেমন করিয়া হইল । এ কী সম্পূর্ণ সর্বনাশ। সে কী করিবে, কাহাকে ডাকিবে, কোথায় যাইবে কিছুই ভাবিয়া পাইল না । ডাঙার উপরে উঠিয়া মাছ যেমন খাবি খায়, তাহার বুকের ভিতরটা তেমনি করিতে লাগিল । মজ্জমান ব্যক্তি যেমন কোনো-একটা আশ্রয় পাইবার জন্ত জলের উপরে হস্ত প্রসারিত করিয়া আকাশ খুজিয়া বেড়ায়, তেমনি আশা মনের মধ্যে একটা যা-হয় কিছু প্রাণপণে আঁকড়াইয়া ধরিবার জন্য একান্ত চেষ্টা করিল, অবশেষে বুক চাপিয়া উধ্ব শ্বাসে বলিয়া উঠিল, “মাসিমা !” সেই স্নেহের সম্ভাষণ উচ্ছসিত হইবা মাত্র তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। মাটিতে বসিয়া কান্নার উপর কান্না, কান্নার উপর কান্না যখন ফিরিয়া ফিরিয়া শেষ হইল, তখন সে ভাবিতে লাগিল, “এ চিঠি লইয়া আমি কী করিব।” স্বামী যদি জানিতে পারেন এ চিঠি আপার হাতে পড়িয়াছে, তবে সেই উপলক্ষে তাহার নিদারুণ লজ্জা স্মরণ করিয়া আশা অত্যন্ত কুষ্ঠিত হইতে লাগিল । স্থির করিল, চিঠিখানি সেই ছাড়া জামার পকেটে পুনরায় রাখিয়া জামাটি আলনায় ঝুলাইয়া রাখিবে, ধোবার বাড়ি দিবে না। এই ভাবিয়া চিঠি হাতে সে শয়নগৃহে আসিল । ধোবাটা ইতিমধ্যে ময়লা কাপড়ের গাঠরির উপর ঠেস দিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। মহেঞ্জের ছাড়া জামাট তুলিয়া লইয়া আশা তাহার পকেটে চিঠি পুরিবার উদযোগ করিতেছে, এমন সময় সাড়া পাইল, “ভাই বালি !” ॐ 6२ চোখের বালি তাড়াতাড়ি চিঠি ও জামাটা খাটের উপরে ফেলিয়া সে তাহা চাপিয়া বসিল । বিনোদিনী ঘরে প্রবেশ করিয়া কছিল, "ধোবা বড়ো কাপড় বদল করিতেছে । যে কাপড়গুলায় মার্ক দেওয়া হয় নাই সেগুলা আমি লইয়া যাই ।” আশা বিনোদিনীর মুখের দিকে চাছিতে পারিল না। পাছে মুখের ভাবে সকল কথা স্পষ্ট প্রকাশ পায়, এইজন্য সে জানালার দিকে মুখ ফিরাইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল ; ঠোঁটে ঠোট চাপিয়া রছিল, পাছে চোখ দিয়া জল বাহির হইয়া পড়ে । বিনোদিনী থমকিয়া দাড়াইয়া একবার আশাকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল । মনে মনে কছিল, ‘ও বুঝিয়াছি। কাল রাত্রের বিবরণ তবে জানিতে পারিয়াছ ! আমার উপরেই সমস্ত রাগ ! যেন অপরাধ আমারই!’ বিনোদিনী আশার সঙ্গে কথাবার্তা কহিবার কোনো চেষ্টাই করিল না । খানকয়েক কাপড় বাছিয়া লইয়া দ্রুতপদে ঘর হইতে চলিয়া গেল । বিনোদিনীর সঙ্গে আশা যে এতদিন সরলচিত্তে বন্ধুত্ব করিয়া আসিতেছে, সেই লঙ্গ নিদারুণ দুঃখের মধ্যেও তাহার হৃদয়ে পুঞ্জীকৃত হইয়া উঠিল । তাহার মনের মধ্যে সখীর যে আদর্শ ছিল সেই আদর্শের সঙ্গে নিষ্ঠুর চিঠিখানা আর-একবার মিলাইয়া দেখিবার ইচ্ছা হইল । চিঠিখান খুলিয়া দেখিতেছে, এমন সময় তাড়াতাড়ি মহেন্দ্র ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। হঠাৎ কী মনে করিয়া কালেজের একটা লেকচারের মাঝখানে ভঙ্গ দিয়া লে ছুটিয়া বাড়ি চলিয়া আসিয়াছে । আশা চিঠিখানা অঞ্চলের মধ্যে লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্রও ঘরে আশাকে দেখিয়া একটু থমকিয়া দাড়াইল । তাহার পর ব্যগ্র দৃষ্টিতে ঘরের এ দিক - ও দিক চাহিয়া দেখিতে লাগিল। আশা বুঝিয়াছিল, মহেক্স কী খুজিতেছে ; কিন্তু কেমন করিয়া সে হাতের চিঠিখানা অলক্ষিতে যথাস্থানে রাখিয়া পালাইয়া যাইবে, ভাবিয়া পাইল না । মহেক্স তখন একটা একটা করিয়া ময়লা কাপড় তুলিয়া তুলিয়া দেখিতে লাগিল । মহেঞ্জের সেই নিষ্ফল প্রয়াস দেখিয়া আশা আর থাকিতে পারিল না, চিঠিখানা ও জামাটা মেঝের উপর ফেলিয়া দিয়া ডান হাতে থাটের থামটা ধরিয়া সেই হাতে মুখ লুকাইল। মহেঞ্জ বিছাবেগে চিঠিখান তুলিয়া লইল । নিমেষের জন্ত স্তব্ধ হইয়া আশার দিকে চাহিল। তাহার পরে আশা সিড়ি দিয়া মহেন্দ্রের ক্ৰত ধাবনের শব্দ শুনিতে পাইল । চোখের বালি S 8VO তখন ধোবা ডাকিতেছে, “মাঠাকরুন, কাপড় দিতে আর কত দেরি করিবে । বেলা অনেক হইল, আমার বাড়ি তো এখানে নয় ।” \O8 রাজলক্ষ্মী আজ সকাল হইতে আর বিনোদিনীকে ডাকেন নাই । বিনোদিনী নিয়মমত ভাড়ারে গেল ; দেখিল, রাজলক্ষ্মী মুখ তুলিয়া চাছিলেন না। সে তাহা লক্ষ্য করিয়াও বলিল, “পিসিম, তোমার অস্থখ করিয়াছে বুঝি ? করিবারই কথা। কাল রাত্রে ঠাকুরপো যে কীর্তি করিলেন । একেবারে পাগলের মতো আসিয়া উপস্থিত। আমার তো তার পরে ঘুম হইল না।” রাজলক্ষ্মী মুখ ভার করিয়া রহিলেন ; ই, না, কোনো উত্তরই করিলেন না। বিনোদিনী বলিল, “হয়তে চোখের বালির সঙ্গে সামান্ত কিছু খিটিমিটি হইয়া থাকিবে, আর দেখে কে । তখনই নালিশ কিংবা নিম্পত্তির জন্তে আমাকে ধরিয়া লইয়া যাওয়া চাই, রাত পোহাইতে তর সয় না ! যাই বল পিসিম, তুমি রাগ করিয়ো না, তোমার ছেলের সহস্র গুণ থাকিতে পারে, কিন্তু ধৈর্ধের লেশমাত্র নাই । ঐজন্যই আমার সঙ্গে কেবলই ঝগড়া হয় ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “বউ, তুমি মিথ্যা বকিতেছ— আমার আজ আর কোনো কথা ভালো লাগিতেছে না ।” বিনোদিনী কহিল, “আমারও কিছু ভালো লাগিতেছে না পিসিমা । তোমার মনে আঘাত লাগিবে, এই ভয়েই মিথ্যা কথা দিয়া তোমার ছেলের দোষ ঢাকিবার চেষ্টা করিয়াছি । কিন্তু এমন হইয়াছে যে, আর ঢাকা পড়ে না ।” রাজলক্ষ্মী। আমার ছেলের দোষ-গুণ আমি জানি— কিন্তু তুমি ষে কেমন মায়াবিনী, তাহা আমি জানিতাম না । বিনোদিনী কী একটা বলিবার জন্য উষ্ঠত হইয়া নিজেকে সংবরণ করিল ; কহিল, “সে কথা ঠিক পিসিম, কেহ কাহাকেও জানে না। নিজের মনও কি সবাই জানে। তুমি কি কখনো তোমার বউয়ের উপর দ্বেষ করিয়া এই মায়াবিনীকে দিয়! তোমার ছেলের মন জুলাইতে চাও নাই। একবার ঠাওর করিয়া দেখো দেখি ।” রাজলক্ষ্মী অগ্নির মতো উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিলেন ; কহিলেন, “হতভাগিনী, ছেলের সম্বন্ধে মার নামে তুই এমন অপবাদ দিতে পারিস ? তোর জিৰ খসিয়া পড়িবে না ।”