প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি >●● কথা— যে সুদীর্ঘ কাহিনী নানা বর্ণে চিত্রিত, জলে স্থলে পর্বতে নদীতে বিভক্ত, মানচিত্রের মতো তাহার মনের মধ্যে গুটানো ছিল— বিহারী প্রসারিত করিয়া ধরিল। যে ক্ষুদ্র জগৎটুকুর উপর সে তাহার জীবনের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল, তাহা কোনখানে কোন দুর্গ্রহের সহিত সংঘাত পাইল, তাহাই লে মনে করিয়৷ দেখিতে লাগিল। প্রথমে বাহির হইতে কে আসিল । সূর্যাস্তকালের করুণ রক্তিমছটায় আভাসিত আশার লজ্জামণ্ডিত তরুণ মুখখানি অন্ধকারে অঙ্কিত হইয়। উঠিল, তাহার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গল-উৎসবের পুণ্যশস্থধ্বনি তাহার কানে বাজিতে লাগিল । এই শুভগ্রহ অদৃষ্টাকাশের অজ্ঞাত প্রান্ত হইতে আসিয়া দুই বন্ধুর মাঝখানে দাড়াইল— একটু যেন বিচ্ছেদ আনিল, কোথা হইতে এমন একটি গৃঢ় বেদন আনিয়া উপস্থিত করিল যাহা মুখে বলিবার নহে, যাহা মনেও লালন করিতে নাই। কিন্তু তবু এই বিচ্ছেদ, এই বেদনা, অপূর্ব স্নেহ-রঞ্জিত মাধুর্যরশ্মির দ্বার পরিপূর্ণ হইয়া রহিল। তাহার পরে যে শনিগ্রহের উদয় হইল— বন্ধুর প্রণয়, দম্পতির প্রেম, গৃহের শাস্তি ও পবিত্রতা একেবারে ছারখার করিয়া দিল, বিহারী প্রবল ঘৃণায় সেই বিনোদিনীকে সমস্ত অস্তকরণের সহিত স্থদ্বরে ঠেলিয়া ফেলিতে চেষ্টা করিল। কিন্তু, কী আশ্চর্য । আঘাত যেন অত্যন্ত মুছ হইয়া গেল, তাহাকে যেন স্পর্শ করিল না । সেই পরমান্বন্দরী প্রহেলিকা তাহার দুর্ভেগুরহস্যপূর্ণ ঘনকৃষ্ণ অনিমেষ দৃষ্টি লইয়া কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে বিহারীর সম্মুখে স্থির হইয়া দাড়াইল । গ্রীষ্মরাত্রির উচ্ছ্বসিত দক্ষিণবাতাস তাহারই ঘন নিশ্বাসের মতো বিহারীর গায়ে আসিয়া পড়িতে লাগিল। ধীরে ধীরে সেই পলকহীন চক্ষুর জালাময়ী দীপ্তি স্নান হইয়া আসিতে লাগিল ; সেই তৃষাশুষ্ক খরদৃষ্টি অশ্রুজলে সিক্ত স্নিগ্ধ হইয়া গভীর ভাবরসে দেখিতে দেখিতে পরিপুত হইয়া উঠিল ; মুহূর্তের মধ্যে সেই মূর্তি বিহারীর পায়ের কাছে পড়িয়া তাহার দুই জামু প্রাণপণ বলে বক্ষে চাপিয়া ধরিল— তাহার পরে সে একটি অপরূপ মায়ালতার মতো নিমেষের মধ্যেই বিহারীকে বেষ্টন করিয়া বাড়িয়া উঠিয়া সম্ভোবিকশিত স্থগন্ধি পুষ্পমঞ্জরী-তুল্য একখানি চুম্বনোন্মুখ মুখ বিহারীর ওষ্ঠের নিকট আনিয়া উপনীত করিল। বিহারী চক্ষু বুজিয়া সেই কল্পমূর্তিকে স্মৃতিলোক হইতে নির্বাসিত করিয়া দিবার চেষ্টা করিতে লাগিল ; কিন্তু কোনোমতেই তাহাকে আঘাত করিতে যেন তাহার হাত উঠিল না— একটি অসম্পূর্ণ ব্যাকুল চুম্বন তাহার মুখের কাছে আসন্ন হইয়া রহিল, পুলকে তাহাকে আবিষ্ট করিয়া তুলিল । >仓也 চোখের বালি বিহারী ছাদের নির্জন অন্ধকারে আর থাকিতে পারিল না। আর-কোনো দিকে মন দিবার জন্য সে তাড়াতাড়ি দীপালোকিত ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। কোণে টিপাইয়ের উপর রেশমের-ঢাকা-দেওয়া একখানি বাধানো ফোটোগ্রাফ ছিল। বিহারী ঢাকা খুলিয়া সেই ছবিটি ঘরের মাঝখানে আলোর নীচে লইয়া বসিল— কোলের উপর রাখিয়া দেখিতে লাগিল । ছবিটি মহেন্দ্র ও আশার বিবাহের অনতিৰাল পরের যুগলমূর্তি। ছবির পশ্চাতে মহেন্দ্র নিজের অক্ষরে ‘মহিনদা' এবং আশা স্বহস্তে "আশা" এই নামটুকু লিখিয়া দিয়াছিল। ছবির মধ্যে সেই নবপরিণয়ের মধুর দিনটি আর ঘুচিল না। মহেন্দ্র চৌকিতে বসিয়া আছে, তাহার মুখে নূতন বিবাহের নবীন সরস ভাবাবেশ ; পাশে আশা দাড়াইয়া— ছবিওয়ালা তাহাকে মাথায় ঘোমটা দিতে দেয় নাই, কিন্তু তাহার মুখ হইতে লজ্জাটুকু খসাইতে পারে নাই। আজ মহেন্দ্র তাহার পার্শ্বচরী আশাকে কাদাইয়া কত দূরে চলিয়া যাইতেছে, কিন্তু জড় ছবি মহেন্দ্রের মুখ হইতে নবীন প্রেমের একটি রেখাও বদল হইতে দেয় নাই, কিছু না বুঝিয়া মূঢ়ভাবে অদৃষ্টের পরিহাসকে স্থায়ী করিয়া রাখিয়াছে। এই ছবিখানি কোলে লইয়া বিহারী বিনোদিনীকে ধিক্কারের দ্বারা স্থদুরে নির্বাসিত করিতে চাহিল। কিন্তু বিনোদিনীর সেই প্রেম-কাতর যৌবনে-কোমল বাহুদুটি বিহারীর জামু চাপিয়া রহিল। বিহারী মনে মনে কহিল, ‘এমন স্বন্দর প্রেমের সংসার ছারখার করিয়া দিলি !” কিন্তু বিনোদিনীর সেই উধেবাৎক্ষিপ্ত ব্যাকুল মুখের চুম্বননিবেদন তাহাকে নীরবে কহিতে লাগিল, “আমি তোমাকে ভালোবালি । সমস্ত জগতের মধ্যে আমি তোমাকে বরণ করিয়াছি।’ কিন্তু এই কি জবাব হইল। এই কথাই কি একটি ভগ্ন সংসারের নিদারুণ আর্তস্বরকে ঢাকিতে পারে । পিশাচী । পিশাচী ! বিহার এটা কি পূৰ্ব ভৎসনা করিয়া বলিল, ন, ইহার সঙ্গে একটুখানি আদরের স্বর আসিয়াও মিশিল ! যে মুহূর্তে বিহারী তাছার সমস্ত । জীবনের সমস্ত প্রেমের দাবি হইতে বঞ্চিত হইয়া একেবারে নিঃস্ব ভিখারির মতো পথে আসিয়া দাড়াইয়াছে, সেই মুহূর্তে বিহারী কি এমন অযাচিত অজস্র প্রেমের উপহার সমস্ত হৃদয়ের সহিত উপেক্ষা করিয়া ফেলিয়া দিতে পারে। ইহার তুলনায় বিহারী কী পাইয়াছে। এতদিন পর্যন্ত সমস্ত জীবন উৎসর্গ করিয়া সে কেবল প্রেমভাওরের খুদকুঁড়া ভিক্ষা করিতেছিল। প্রেমের অন্নপূর্ণ সোনার খালী ভরিয়া চোখের বালি ›¢ ግ আজ একা তারই জন্য যে ভোজ পাঠাইয়াছেন, হতভাগ্য কিসের দ্বিধায় তাহা হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিবে । ছবি কোলে লইয়া এইরকম নানা কথা যখন সে একমনে আলোচনা করিতেছিল, এমন সময় পার্থে শব্দ শুনিয়া চমকিয়া উঠিয়া দেখিল মহেন্দ্ৰ আসিয়াছে । চকিত হইয়া দাড়াইয়া উঠিতেই কোল হইতে ছবিখানি নীচে কাপেটের উপর পড়িয়া গেল— বিহারী তাহা লক্ষ্য করিল না । মহেন্দ্র একেবারেই বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী কোথায় ।” বিহারী মহেন্দ্রের কাছে অগ্রসর হইয়া তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “মহিনদা, একটু বোলো ভাই, সকল কথার আলোচনা করা যাইতেছে।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “আমার বসিবার এবং আলোচনা করিবার সময় নাই । বলো, বিনোদিনী কোথায় ।” বিহারী কহিল, “তুমি যে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করিতেছ, এক কথায় তাহার উত্তর দেওয়া চলে না। একটু তোমাকে স্থির হইয়া বসিতে হইবে।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “উপদেশ দিবে ? সে-সব উপদেশের কথা আমি শিশুকালেই পড়িয়াছি।” বিহারী । না, উপদেশ দিবার অধিকার ও ক্ষমতা আমার নাই । মহেন্দ্র । তৎসনা করিবে ? আমি জানি আমি পাষও, আমি নরাধম, এবং তুমি যাহা বলিতে চাও তাহা সবই । কিন্তু কথা এই, তুমি জান কি না दिनांज़िंनी ८कांथांब्र । देिशंख्रौ । खांनि । মহেন্দ্র । আমাকে বলিবে কিনা ৷ বিহারী । না । মহেজ। বগিতেই হইবে। তুমি তাহাকে চুরি করিয়া জানিয়া লুকাইয়া রাখিয়াছ । সে মামার, তাহাকে ফিরাইয়া দাও । বিহারী ক্ষণকাল স্তন্ধ হইয়া রছিল । তাহার পর দৃঢ় স্বরে বলিল, “সে তোমার নহে। আমি তাহাকে চুরি করিয়া জানি নাই, সে নিজে আমার কাছে জাসিয়া थव्रीं भिग्नां८छ् ।" মহেন্দ্র গর্জন করিয়া উঠিল, “মিখ্যা কথা !" 町 এই বলিয়া পার্শ্ববর্তী ঘরের রুদ্ধ স্বারে আঘাত দিতে দিতে উচ্চ স্বরে ডাকিল, *বিনোদ । বিনোদ ।” Ꮌ☾Ꮦr চোখের বালি ঘরের ভিতর হইতে কান্নার শব্দ শুনিতে পাইয়া বলিয়া উঠিল, “ভয় নাই বিনোদ । আমি মহেন্দ্র, আমি তোমাকে উদ্ধার করিয়া লইয়া যাইব— কেহ তোমাকে বন্ধ করিয়া রাখিতে পারিবে না ।” বলিয়। মহেন্দ্র সবলে ধাক্কা দিতেই দ্বার খুলিয়া গেল। ভিতরে ছুটিয়া গিয়া দেখিল ঘরে অন্ধকার । অক্ষুট ছায়ার মতো দেখিতে পাইল, বিছানায় কে যেন ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া অব্যক্ত শব্দ করিয়া বালিশ চাপিয়া ধরল। বিহারী তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বসস্তকে বিছানা হইতে কোলে তুলিয়া সাশুনার স্বরে বলিতে লাগিল, "ভয় নাই বসন্ত, ভয় নাই, কোনো ভয় নাই ।” মহেন্দ্র তখন দ্রুতপদে বাহির হইয়া বাড়ির সমস্ত ঘর দেখিয়া আসিল । যখন ফিরিয়া আসিল তখনো বসন্ত ভয়ের আবেগে থাকিয়া থাকিয়। কাদিয়া উঠিতেছিল, বিহারী তাহার ঘরে মালো জালিয় তাহাকে বিছানায় শোয়াইয়া গায়ে হাত বুলাইয়া তাহাকে ঘুম পাড়াইবার চেষ্টা করিতেছিল। মহেন্দ্ৰ আসিয়া কহিল, “বিনোদিনীকে কোথায় রাখিয়ছি।” বিহারী কহিল, “মহিনদা, গোল করিয়ো না, তুমি অকারণে এই বালককে যেরূপ ভয় পাওয়াইয়া দিয়াছ, ইহার অম্লখ করিতে পারে। আমি বলিতেছি, বিনোদিনীর খবরে তোমার কোনো প্রয়োজন নাই ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “সাধু ! মহাত্মা ! ধর্মের আদর্শ খাড়া করিয়ো না । আমাৰ স্ত্রীর এই ছবি কোলে করিয়া রাত্রে কোন দেবতার ধ্যানে কোন পুণ্যমন্ত্র জপ করিতেছিলে ? ভণ্ড !" বলিয়া ছবিখানি মহেন্দ্র ভূমিতে ফেলিয়া জুতাম্বুদ্ধ পা দিয় তাহার কাচ চূর্ণ চূৰ্ণ করিল এবং প্রতিমূর্তিটি লইয়া টুকর টুকরা করিয়া ছিড়িয়া বিহারীর গায়ের উপর ফেলিয়া দিল । তাহার মত্তত দেখিয়া বসন্ত আবার ভয়ে কাদিয়া উঠিল । বিহারীর কণ্ঠ রুদ্ধপ্রায় হইয়া আসিল ; দ্বারের দিকে হস্তনির্দেশ করিয়া কহিল, “যাও !” মহেন্দ্র ঝড়ের বেগে বাহির হইয়া গেল । عربی \ বিনোদিনী যখন যাত্রিশূন্ত মেয়েদের গাড়িতে চড়িয়া বাতায়ন হইতে চব মাঠ ও ছায়াবেষ্টিত এক-একখানি গ্রাম দেখিতে পাইল, তখন তাহার মনে ক্ষিঞ্চনিভূত পীর জীবনযাত্রা জাগিয়া উঠিল । সেই তরুচ্ছায়াৰেটনের মধ্যে তাহার স্বরচিত