প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি S (-\o আশা কহিল, “জানি না।” রাত্রি তখন আটটা হইবে, মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি ঝড়ের মতে বিনোদিনীর ঘরের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল ; দেখিল— ঘরে আলো নাই, সমস্ত অন্ধকার । পকেট হইতে একটা দেশালাইয়ের বাক্স বাহির করিয়া দেশালাই ধরাইল ; দেখিল— ঘর শূন্ত। বিনোদিনী নাই, তাহার জিনিসপত্রও নাই। দক্ষিণের বারান্দায় গিয়া দেখিল, বারান্দা নির্জন ৷ ডাকিল, “বিনোদ !” কোনো উত্তর আসিল না। ‘নিবোধ ! আমি নির্বোধ ! তখনই সঙ্গে করিয়া লইয়া যাওয়া উচিত ছিল । নিশ্চয়ই মা বিনোদিনীকে এমন গঞ্জনা দিয়াছেন যে, সে ঘরে টিকিতে পারে নাই।’ সেই কল্পনামাত্র মনে উদয় হইতেই, তাহা নিশ্চয় সত্য বলিয়া তাহার মনে বিশ্বাস হইল। মহেন্দ্র অধীর হইয়া তৎক্ষণাৎ মার ঘরে গেল। সে ঘরেও আলো নাই ; কিন্তু রাজলক্ষ্মী বিছানায় শুইয়া আছেন, তাহ অন্ধকারেও লক্ষ্য হইল । মহেন্দ্র একেবারে রুষ্ট স্বরে বলিয়া উঠিল, “মা, ভোমরা বিনোদিনীকে কী বলিয়াছ ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কিছুই বলি নাই ।” মহেন্দ্র । তবে সে কোথায় গেছে । রাজলক্ষ্মী । আমি কী জানি । মহেন্দ্র অবিশ্বাসের স্বরে কহিল, “তুমি জান না ? আচ্ছা, আমি তাহার সন্ধানে চলিলাম— সে যেখানেই থাকুক, আমি তাহাকে বাহির করিবই।” বলিয়া মহেন্দ্র চলিয়া গেল । রাজলক্ষ্মী তাড়াতাড়ি বিছানা হইতে উঠিয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে চলিতে বলিতে লাগিলেন, “মহিন, যাস নে মহিন, ফিরিয়া আয়, আমার একটা কথা শুনিয়া যা ।” মহেন্দ্র এক নিশ্বাসে ছুটিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল। মুহূর্ত পরেই ফিরিয়া আসিয়া দরোয়ানকে জিজ্ঞাসা করিল, “বস্থঠাকুরানী কোথায় গিয়াছেন।” দরোয়ান কহিল, “আমাদের বলিয়া যান নাই, আমরা কিছুই জানি না।” মহেন্দ্র গর্জিত ভৎপনার স্বরে কহিল, “জান না ।” দরোয়ান করজোড়ে কহিল, “না মহারাজ, জানি না ।" মহেন্দ্ৰ মনে মনে স্থির করিল, ‘মা ইহাদের শিখাইয়া দিয়াছেন । কহিল, *আচ্ছা, তা হউক ।” মহানগরীর রাজপথে গ্যালালোকবিদ্ধ সন্ধ্যান্ধকারে বরফওয়ালা তখন বরফ ও } & 8 կ চোখের বালি তপসিমাছওয়ালা তপসিমাছ স্থাকিতেছিল । কলরবক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে মহেন্দ্র প্রবেশ করিল এবং অদৃগু হইয়া গেল । ❖ዓ বিহারী একলা নিজেকে লইয়া অন্ধকার রাত্রে কখনো ধ্যান করিতে বলে না । কোনো কালেই বিহারী নিজের কাছে নিজেকে আলোচ্য বিষয় করে নাই । সে পড়াশুনা কাজকর্ম বন্ধুবান্ধব লোকজন লইয়া থাকিত । চারি দিকের সংসারকেই সে নিজের চেয়ে প্রাধান্ত দিয়া আনন্দে ছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন প্রবল আঘাতে তাহার চারি দিক যেন বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িয়া গেল ; প্রলয়ের অন্ধকারে অভ্ৰভেদী বেদনার গিরিশৃঙ্গে নিজেকে একলা লইয়া দাডাইতে হইল। সেই হইতে নিজের নির্জন সঙ্গকে সে ভয় করিতে আরম্ভ করিয়াছে ; জোর করিয়া নিজের ঘাড়ে কাজ চাপাইয়া এই সঙ্গীটিকে সে কোনোমতেই অবকাশ দিতে চায় না। কিন্তু আজ নিজের সেই আস্তরবাসীকে বিহারী কোনোমতেই ঠেলিয়া রাখিতে পারিল না। কাল বিনোদিনীকে বিহারী দেশে পৌছাইয়া দিয়া আসিয়াছে, তাহার পর হইতে সে যে-কোনো কাজে যে-কোনো লোকের সঙ্গেই আছে, তাহার গুহাশায়ী বেদনাতুর হৃদয় তাহাকে নিজের নিগৃঢ় নির্জনতার দিকে অবিশ্রাম আকর্ষণ করিতেছে । শ্রীস্তি ও অবসাদে আজ বিহারীকে পরাস্ত করিল। রাত্রি তখন নয়টা হইবে ; বিহারীর গৃহের সম্মুখবর্তী দক্ষিণের ছাদের উপর দিনাস্তরম্য গ্রীষ্মের বাতাস উতলা হইয়া উঠিয়াছে। বিহারী চন্দ্রোদয়হীন অন্ধকারে ছাদে একখানি কেদারা লইয়া বসিয়া আছে । বালক বসন্তকে আজ সন্ধ্যাবেলায় সে পড়ায় নাই— সকাল-সকাল তাহাকে বিদায় করিয়া দিয়াছে । আজ সাস্তুনার জন্য, সঙ্গের জন্য, তাহার চিরাভ্যস্ত প্রতিস্থধাম্বিন্ধ পূর্বজীবনের জন্য, তাহার হৃদয় যেন মাতৃ-পরিত্যক্ত শিশুর মতে বিশ্বের অন্ধকারের মধ্যে দুই বাহু তুলিয়া কাহাকে খুজিয়া বেড়াইতেছে । আজ তাহার দৃঢ়তা, তাহার কঠোর সংযমের বাধ কোথায় ভাঙিয়া গেছে। যাহাদের ৰখা ভাৰিবে না পণ করিয়াছিল, সমস্ত হৃদয় তাহাঙ্গের দিকে ছুটিয়াছে ; আজ জায় পৰয়োৰ কৱিৰাঁর লেশমাত্র বল নাই । মহেক্সের সহিত বাল্যকালের প্রণয় হইতে সেই প্রণয়ের অবসান পর্যন্ত সমস্ত