为心8 શ્વા চোখের বালি সর্বনাশের ব্রত সম্পূর্ণ করিয়া আসিলাম না। নিবোধ ! আমি নিবোধ ! আমি কেন বিহারীকে ভালোবাসিলাম । বিনোদিনী যখন কাঠের মূর্তির মতো ঘরের মধ্যে কঠিন হইয়া বসিয়া ছিল, এমন সময় তাহার দিদিশাশুড়ি জামাইবাড়ি হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে কছিল, “পোড়ারমুখি, কী সব কথা শুনিতেছি।” বিনোদিনী কহিল, “যাহা শুনিতেছ সবই সত্য কথা ।” দিদিশাশুড়ি । তবে এ কলঙ্ক পাড়ায় বহিয়া আনিবার কী দরকার ছিল— এখানে কেন আসিলি । রুদ্ধ ক্ষোভে বিনোদিনী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। দিদিশাশুড়ি কহিল, *বাছা, এখানে তোমার থাকা হইবে না, তাহা বলিতেছি । পোড়া অদৃষ্টে আমার সবাই মরিয়া-ঝরিয়া গেল, ইহাও সহ করিয়া বাচিয়া আছি, কিন্তু তাই বলিয়া এ-সকল ব্যাপার আমি সহিতে পারিব না। ছি ছি, আমাদের মাথা হেঁট করিলে । তুমি এখনই যাও।” বিনোদিনী কহিল, “আমি এখনই যাইব ।” এমন সময় মহেন্দ্র, স্নান নাই আহার নাই উক্ষপুষ্ক চুল করিয়া হঠাৎ আসিয়া উপস্থিত হইল। সমস্ত রাত্রির অনিদ্রায় তাহার চক্ষু রক্তবর্ণ, মুখ শুষ্ক । অন্ধকার থাকিতেই ভোরে জালিয়া সে বিনোদিনীকে লইয়া যাইবার জন্য দ্বিতীয় বার চেষ্ট করিবে, এইরূপ তাহার সংকল্প ছিল। কিন্তু পূর্ব দিনে বিনোদিনীর অভূতপূর্ব স্থণার অভিঘাত পাইয়া তাহার মনে নানাপ্রকার দ্বিধার উদয় হইতে লাগিল । ক্রমে যখন বেলা হইয়া গেল, রেলগাড়ির সময় আসন্ন হইয়া আসিল, তখন স্টেশনের যাত্রিশালা হইতে বাহির হইয়া, মন হইতে সর্বপ্রকার বিচার বিতর্ক সবলে দূর করিয়া, গাড়ি চড়িয়া মহেন্দ্র একেবারে বিনোদিনীর দ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। লজ্জা ত্যাগ করিয়া প্রকাশ্বে দুঃসাহসের কাজ করিতে প্রবৃত্ত হইলে যে একটা স্পর্ধাপূর্ণ বল জন্মে, সেই বলের আবেগে মহেন্দ্র একটা উদভ্ৰান্ত আনন্দ বোধ করিল— তাহার সমস্ত অবসাদ ও দ্বিধা চূর্ণ হইয়া গেল। গ্রামের কৌতুহলী লোকগুলি তাহার উন্মত্ত দৃষ্টিতে ধুলির নিজাব পুত্তলিকার মতো বোধ হইল । মহেন্দ্র কোনো দিকে দৃকপাতমাত্র না করিয়া একেবারে বিনোদিনীর কাছে আসিয়া কহিল, “বিনোদ, লোকনিন্দার মুখে তোমাকে একলা ফেলিয়া যাইব, এমন কাপুরুষ আমি নহি । তোমাকে যেমন করিয়া হউক, এখান হইতে লইয়া যাইতেই হইবে । তাহার পরে তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিতে চাও, পরিত্যাগ করিয়ো, আমি চোখের বালি ove তোমাকে কিছুমাত্র বাধা দিব না । আমি তোমাকে স্পর্শ করিয়া আজ শপথ করিয়া বলিতেছি, তুমি যখন যেমন ইচ্ছা কর তাহাই হইবে— দয়া যদি কর তবে . বাচিব, না যদি কর তবে তোমার পথ হইতে দূরে চলিয়া যাইব । আমি সংসারে নানা অবিশ্বাসের কাজ করিয়াছি, কিন্তু আজ আমাকে অবিশ্বাস করিয়ো না । আমরা প্রলয়ের মুখে দাড়াইয়াছি, এখন ছলনা করিবার সময় নহে ।” বিনোদিনী অত্যন্ত সহজভাবে অবিচলিত মুখে কহিল, “আমাকে সঙ্গে লইয়া চলো । তোমার গাড়ি আছে ?” মহেন্দ্র কহিল, “আছে।” বিনোদিনীর দিদিশাশুড়ি ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া কহিল, “মহেন্দ্র, তুমি আমাকে চেন না, কিন্তু তুমি আমার পর নও। তোমার মা রাজলক্ষ্মী আমাদের গ্রামেরই মেয়ে, গ্রামসম্পর্কে আমি তাহার মামী । জিজ্ঞাসা করি, এ তোমার কী রকম ব্যবহার। ঘরে তোমার স্ত্রী আছে, মা আছে, আর তুমি এমন বেহায়া উন্মত্ত হইয়া ফিরিতেছ! ভদ্রসমাজে তুমি মুখ দেখাইবে কী বলিয়া।” মহেন্দ্র যে ভাবোন্মাদের রাজ্যে ছিল, সেখানে এই একটা আঘাত লাগিল । তাহার মা আছে, স্ত্রী আছে, ভদ্রসমাজ বলিয়া একটা ব্যাপার আছে । এই সহজ কথাটা নূতন করিয়া যেন মনে উঠিল। এই অজ্ঞাত স্বদূর পল্লীর অপরিচিত গৃহদ্বারে মহেন্দ্রকে যে এমন কথা শুনিতে হইবে ইহা তাহার এক সময়ে স্বপ্নেরও অতীত ছিল । দিনের বেলায় গ্রামের মাঝখানে দাড়াইয়া সে একটি ভদ্রঘরের বিধবা রমণীকে ঘর হইতে পথে বাহির করিতেছে, মহেন্দ্রের জীবনচরিতে এমনও একটা অদ্ভুত অধ্যায় লিখিত হইল ! তবু তাহার মা আছে, স্ত্রী আছে এবং ভদ্রসমাজ আছে । মহেন্দ্র যখন নিরুত্তর হইয়। দাড়াইয়া রহিল তখন বৃদ্ধ কহিল, “যাইতে হয় তো এখনই যাও, এখনই যাও ! আমার ঘরের দাওয়ায় দাড়াইয়া থাকিয়ো না— আর এক মুহূর্তও দেরি করিয়ো না ।” বলিয়া বৃদ্ধ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া ভিতর হইতে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল । অক্ষাত অভূক্ত মলিনবস্ত্র বিনোদন শূন্তহস্তে গাড়িতে গিয়া উঠিল। মহেন্দ্র যখন গাড়িতে উঠিতে গেল বিনোদনা কহিল, "না, স্টেশন দূরে নয়, তুমি হাটিয়া যাও।” মহেন্দ্র কহিল, “তাহা হইলে গ্রামের সকল লোক আমাকে দেখিতে পাইবে ।” বিনোদিনী কহিল, “এখ•ে ] তোমার লজ্জা বাকি আছে ?” বলিয়৷ গাড়ির দরজা বন্ধ করিয়া বিনোদুনীগাড়োয়ানকে বলিল, “স্টেশনে চলো ।” চোখের বালি ونوا يج গাড়োয়ান জিজ্ঞাসা করিল, “বাৰু যাইবে না?” মহেন্দ্র একটু ইতস্তত করিয়া আর যাইতে সাহষ করিল না । গাড়ি চলিয়া গেল। মহেন্দ্র গ্রামের পথ পরিত্যাগ করিয়া মাঠের পথ দিয়া ঘুরিয়া নতশিরে স্টেশনের অভিমুখে চলিল । r তখন গ্রামবদের মানাহার হইয়া গেছে। কেবল যেসকল কর্মনিষ্ঠ প্রৌঢ় গুহিণী বিলম্বে অবকাশ পাইয়াছে, তাহারাই গামছা ও তেলের বাঢ়ি লইয়া আম্রমুকুলে আমোদিত ছায়াস্নিগ্ধ পুষ্করিণীর নিভৃত ঘাটে চলিয়াছে। 8 o মহেন্দ্র কোথায় নিরুদ্দেশ হইয়া গেল, সেই আশঙ্কায় রাজলক্ষ্মীর আহার-নিদ্রা বন্ধ । সাধুচরণ সম্ভব-অসম্ভব সকল স্থানেই তাহাকে খুজিয়া বেড়াইতেছে— এমন সময় মহেন্দ্র বিনোদিনীকে লইয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিল । পটলডাঙার বাসায় তাহাকে রাখিয়া রাত্রে মহেন্দ্র তাহার বাড়িতে আসিয়া পৌছিল। মাতার ঘরে মহেন্দ্র প্রবেশ করিয়া দেখিল, ঘর অন্ধকারপ্রায়, কেরোসিনের লণ্ঠন আড়াল করিয়া রাখা হইয়াছে। রাজলক্ষ্মী রোগীর ন্যায় বিছানায় শুইয়া আছেন এবং আশা পদতলে বসিয়া আস্তে আস্তে তাহার পায়ে হাত বুলাইয়া দিতেছে। এত কাল পরে গৃহের বধু শাশুড়ির পদতলের অধিকার পাইয়াছে। মহেন্দ্র আসিতেই আশা চকিত হইয়া উঠিয়া ঘর ছাড়িয়া চলিয়া গেল । মহেন্দ্র বলপূর্বক সর্বপ্রকার দ্বিধা পরিত্যাগ করিয়া কহিল, “মা, এখানে আমার পড়ার সুবিধা হয় না ; আমি কলেজের কাছে একটা বাসা লইয়াছি ; সেইখানেই থাকিব ।” রাজলক্ষ্মী বিছানার প্রান্তে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া মহেন্দ্রকে কহিলেন, “মহিন, একটু বোস।” தி মহেন্দ্র সংকোচের সহিত বিছানায় বসিল । রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “মহিন, তোর যেখানে ইচ্ছা তুই থাকিল, কিন্তু আমার বউমাকে তুই কষ্ট দিস নে ৷” মহেন্দ্র চুপ করিয়া রহিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আমার মন্দ কপাল, তাই আমি আমার এমন লক্ষ্মী বউকে চিনিতে পারি নাই”— বলিতে বলিতে রাজলক্ষ্মীর গলা ভাঙিয়া আসিল— “কিন্তু তুই তাহাকে এত দিন জানিয়া এত ভালোবাসিয়া শেষকালে এত দুঃখের মধ্যে ফেলিলি কী করিয়া ।” রাজলক্ষ্মী আর থাকিতে পারিলেন না, কাদিতে লাগিলেন।