প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি רט ל মহেন্দ্র সেখান হইতে কোনোমতে উঠিয়া পালাইতে পারিলে বাচে, কিন্তু হঠাৎ উঠিতে পারিল না । মার বিছানার প্রান্তে অন্ধকারে নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল । অনেকক্ষণ পরে রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আজ রাত্রে তো এখানেই আছিল ?” মহেন্দ্ৰ কহিল, “না।” । * রাজলক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কখন যাবি।” মহেন্দ্র কহিল, “এখনই ।” রাজলক্ষ্মী কষ্টে উঠিয়া বসিয়া কহিলেন, “এখনই ? একবার বউমার সঙ্গে ভালো করিয়া দেখাও করিয়া যাবি না?” šı মহেন্দ্র নিরুত্তর হইয়া রহিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “এ কয়টা দিন বউমার কেমন করিয়া কাটিয়াছে, তাহ কি তুই একটু বুঝিতেও পারিলি না। ওরে নির্লজ্জ, তোর নিষ্ঠুরতায় আমার বুক ফাটিয়া গেল।” বলিয়া রাজলক্ষ্মী ছিন্ন শাখার মতো বিছানায় শুইয়া পড়িলেন । মহেন্দ্র মার বিছানা ছাড়িয়া বাহির হইয়া গেল। অতি মৃদুপদে নিঃশঙ্কগমনে সে সিড়ি দিয়া তাহার উপরের শয়নঘরে চলিল। আশার সহিত দেখা হয়, এ তাহার ইচ্ছা ছিল না । মহেন্দ্র উপরে উঠিয়াই দেখিল, শয়নগৃহের সম্মুখে যে ঢাকা ছাদ আছে, সেইখানে আশা মাটিতে পড়িয়া । সে মহেন্দ্রের পায়ের শব্দ পায় নাই, হঠাৎ তাহাকে সম্মুখে উপস্থিত দেখিয়া তাড়াতাড়ি কাপড় সারিয়া লইয়া উঠিয়া বসিল । এই সময়ে মহেন্দ্র যদি একটিবার ডাকিত 'চুনি – তবে তখনই সে মহেন্দ্রের সমস্ত অপরাধ যেন নিজেরই মাথায় তুলিয়া লইয়া ক্ষমাপ্রাপ্ত অপরাধিনীর মতো মহেন্দ্রের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া তাহার জীবনের সমস্ত কান্নাটা কাদিয়া লইত । কিন্তু, মহেন্দ্র সে প্রিয়নাম ডাকিতে পারিল না। যতই চেষ্টা করিল, ইচ্ছা করিল, যতই সে বেদনা পাইল, এ কথা ভুলিতে পারিল না যে, আজ আশাকে আদর করা শূন্যগর্ভ পরিহাসমাত্র। তাহাকে মুখে সাত্ত্বনা দিয়া কী হইবে, যখন বিনোদিনীকে পরিত্যাগ করিবার পথ মহেন্দ্র নিজের হাতে একেবারে বন্ধ করিয়া দিয়াছে । আশা সংকোচে মরিয়া গিয়া বসিয়া রহিল। উঠিয়া দাড়াইতে, চলিয়া যাইতে, কোনোপ্রকার গতির চেষ্টামাত্র করিতে তাহার লজ্জাবোধ হইল। মহেন্দ্র কোনো কথা না বলিয়া ধীরে ধীরে ছাদে পায়চারি করিতে লাগিল। . কৃষ্ণপক্ষের আকাশে তখনো চাদ ওঠে নাই— ছাদের কোণে একটা ছোটো গামলায় রজনীগন্ধার গাছে দুইটি ডাটায় ফুল ফুটিয়াছে। ছাদের উপরকার অন্ধকার আকাশে ঐ y Sbo , চোখের বালি নক্ষত্রগুলি, ঐ সপ্তর্ষি, ঐ কালপুরুষ, তাহাদের অনেক সন্ধ্যার অনেক নিভৃত প্রেমাভিনয়ের নীরব সাক্ষী ছিল— আজ তাহারা নিস্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিল । মহেন্দ্ৰ ভাবিতে.লাগিল, ‘মাঝখানের কয়েকটিমাত্র দিনের বিপ্লবকাহিনী এই আকাশ-ভরা অন্ধকার দিয়া মুছিয়া ফেলিয়া যদি আগেকার ঠিক সেই দিনের মতে এই খোলা ছাদে মাদুর পাতিয়া আশার পাশে আমার সেই চিরন্তন স্থানটিতে অতি অনায়াসে গিয়া বসিতে পারি ! কোনো প্রশ্ন নাই, জবাবদিহি নাই ; সেই বিশ্বাস, সেই প্রেম, সেই সহজ আনন্দ ! কিন্তু হায়, জগৎসংসারে সেইটুকুমাত্র জায়গায় ফিরিবার পথ আর নাই। এই ছাদে আশার পাশে মাদুরের একটুখানি ভাগ মহেন্দ্র একেবারে হারাইয়াছে। এতদিন বিনোদিনীর সঙ্গে মহেন্দ্রের অনেকটা স্বাধীন সম্বন্ধ ছিল ; ভালোবাসিবার উন্মত্ত স্বথ ছিল, কিন্তু তাহার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন ছিল না। এখন মহেন্দ্র বিনোদিনীকে সমাজ হইতে স্বহস্তে ছিন্ন করিয়া আনিয়াছে ; এখন আর বিনোদিনীকে কোথাও রাখিবার, কোথাও ফিরাইয়া দিবার জায়গা নাই— মহেন্দ্রই তাহার একমাত্র নির্ভর। এখন ইচ্ছা থাক বা না থাক, বিনোদিনীর সমস্ত ভার তাহাকে বহন করিতেই হইবে । এই কথা মনে করিয়া মহেন্দ্রের হৃদয় ভিতরে ভিতরে পীড়িত হইতে লাগিল। তাহদের ছাদের উপরকার এই ঘরকন্না, এই শাস্তি, এই বাধাবিহীন দাম্পত্যমিলনের নিভৃত রাত্রি, হঠাৎ মহেন্দ্রের কাছে বড়ো আরামের বলিয়া বোধ হইল। কিন্তু এই সহজস্থলভ আরাম, যাহাতে একমাত্র তাহারই অধিকার, তাহাই আজ মহেন্দ্রের পক্ষে দুরাশার সামগ্রী । চিরজীবনের মতো যে বোঝা সে মাথায় তুলিয়াছে, তাহা নামাইয়া মহেন্দ্র এক মুহূর্তও ইপি ছাড়িতে পারিবে না। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মহেন্দ্র একবার অাশার দিকে চাহিয়া দেখিল । নিস্তব্ধ রোদনে বক্ষ পরিপূর্ণ করিয়া আশা তখনো নিশ্চল হইয়া বসিয়া আছে— রাত্রির অন্ধকার জননীর অঞ্চলের ন্যায় তাহার লজ্জা ও বেদনা আবৃত করিয়া রাখিয়াছে । - মহেন্দ্ৰ পায়চারি বন্ধ করিয়া কী বলিবার জন্য হঠাৎ আশার কাছে আসিয়া দাড়াইল । সমস্ত শরীরের রক্ত আশার কানের মধ্যে গিয়া শব্দ করিতে লাগিল । সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। মহেন্দ্র কী বলিতে আসিয়াছিল ভাবিয়া পাইল না – তাহার কাঁই-লা বলিবার আছে। কিন্তু কিছু-একটা না বলিয়া আর ফিরতে পারিল না ; বলিল, “চাবির গোছাটা কোথায় ।” চাবির গোছাট ছিল বিছানার গদিটার নীচে । আশা উঠিয়া ঘরের মধ্যে চোখের বালি ) ఆలి গেল— মহেন্দ্র তাহার অনুসরণ করিল। গদির নীচে হইতে চাবি বাহির করিয়া আশা গদির উপরে রাখিয়া দিল । মহেন্দ্র চাবির গোছা লইয়া নিজের কাপড়ের আলমারিতে এক-একটি চাবি লাগাইয়া দেখিতে লাগিল । আশা আর থাকিতে পারিল না, মৃদুস্বরে কহিল, “ও আলমারির চাবি আমার কাছে ছিল না।” কাহার কাছে চাবি ছিল সে কথা আর আশার মুখ দিয়া বাহির হইল না, কিন্তু মহেন্দ্র তাহা বুঝিল। আশা তাড়াতাড়ি ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল ; ভয় হইল, পাছে মহেন্দ্রের কাছে আর তাহার কান্না চাপা না থাকে। অন্ধকার ছাদের প্রাচীরের এক কোণে মুখ ফিরাইয়া দাড়াইয়া উচ্ছসিত রোদনকে প্রাণপণে রুদ্ধ করিয়া সে কাদিতে লাগিল । কিন্তু অধিকক্ষণ কঁদিবার সময় ছিল না । হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, মহেঞ্জের আহারের সময় হইয়াছে। দ্রুতপদে আশা নীচে চলিয়া গেল । রাজলক্ষ্মী আশাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহিন কোথায় বউমা ।” আশা কহিল, “তিনি উপরে।” রাজলক্ষ্মী । তুমি নামিয়া আসিলে যে ! আশা নতমুখে কহিল, “ৰ্তাহার খাবার—” রাজলক্ষ্মী। খাবারের আমি ব্যবস্থা করিতেছি— বউম, তুমি একটু পরিষ্কার হইয় লও। তোমার সেই নূতন ঢাকাই শাড়িখানা শীঘ্র পরিয়া আমার কাছে এসো, আমি তোমার চুল বাধিয়া দিই । শাশুড়ির আদর উপেক্ষা করিতে পারে না, কিন্তু এই সাজসজ্জার প্রস্তাবে আশা মরমে মরিয়া গেল। মৃত্যু ইচ্ছা করিয়া ভীষ্ম যেমন স্তন্ধ হইয়া শরবর্ষণ সহ করিয়াছিলেন, আশাও সেরূপ রাজলক্ষ্মীর রুত সমস্ত প্রসাধন পরমধৈর্ধে সর্বাঙ্গে গ্রহণ করিল। সাজ করিয়া আশা আতি ধীরে ধীরে নিঃশব্দ পদে সিড়ি বাহিয়া উপরে উঠিল । উকি দিয়া দেখিল, মহেন্দ্র ছাদে নাই । আস্তে আস্তে দ্বারের কাছে আসিয়া দেখিল, মহেন্দ্র ঘরেও নাই, তাহার খাবার অভুক্ত পড়িয়া আছে। চাবির অভাবে কাপড়ের আলমারি জোর করিয়া খুলিয়া আবশ্বক কয়েকখান কাপড় ও ডাক্তারি বই লইয়া মহেন্দ্র চলিয়া গেছে । পরদিন একাদশী ছিল । অস্বস্থ ক্লিষ্টদেহ রাজলক্ষ্মী বিছানায় পড়িয়া ছিলেন । বাহিরে ঘন মেঘে ঝড়ের উপক্রম করিয়া আছে। আশা ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। আস্তে আস্তে রাজলক্ষ্মীর পায়ের কাছে বসিয়া তাহার পায়ে হাত Yoo 酶 চোখের বালি দিয়া কহিল, “তোমার দুধ ও ফল আনিয়াছি মা, খাবে এসো ।” করুণমূর্তি বধুর এই অনভ্যস্ত সেবার চেষ্টা দেখিয় রাজলক্ষ্মীর শুষ্ক চক্ষু প্লাবিত হইয়া গেল। তিনি উঠিয়া বসিয়া আশাকে কোলে লইয়া তাহার অশ্রজলসিক্ত কপোল চুম্বন করিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহিন এখন কী করতেছে বউমা।" আশা অত্যন্ত লজ্জিত হইল ; মৃদুস্বরে কহিল, “তিনি চলিয়া গেছেন।” রাজলক্ষ্মী । কখন চলিয়া গেল, আমি তো জানিতেও পারি নাই । আশা নতশিরে কহিল, “তিনি কাল রাত্রেই গেছেন।” শুনিবা মাত্র রাজলক্ষ্মীর সমস্ত কোমলতা যেন দূর হইয়া গেল ; বধূর প্রতি র্তাহার আদরষ্পর্শের মধ্যে আর রসলেশমাত্র রহিল না, আশা একটা নীরব লাঞ্ছনা অহুভব করিয়া নতমুখে আস্তে আস্তে চলিয়া গেল । 8X প্রথম রাত্রে বিনোদিনীকে পটলডাঙার বাসায় রাখিয়া মহেন্দ্র যখন তাহার কাপড় ও বই আনিতে বাড়ি গেল, বিনোদিনী তখন কলিকাতার বিশ্রামবিহীন জনতরঙ্গের কোলাহলে একলা বসিয়া নিজের কথা ভাবিতেছিল । পৃথিবীতে তাহার আশ্রয়স্থান কোনো কালেই যথেষ্ট বিস্তীর্ণ ছিল না, তবু তাহার এক পাশ তাতিয়া উঠিলে আর-এক পাশে ফিরাইয়া শুইবার একটুখানি জায়গা ছিল— আজ তাহার নির্ভরস্থল অত্যন্ত সংকীর্ণ। সে যে-নৌকায় চড়িয়া স্রোতে ভাসিয়াছে তাহার দক্ষিণে বামে একটু কাত হইলেই একেবারে জলের মধ্যে গিয়া পড়িতে হইবে । অতএব বড়োই স্থির হইয়া হাল ধরা চাই, একটু ভুল একটু নাড়াচাড়া সহিবে না । এ অবস্থায় কোন রমণীর হৃদয় না কম্পিত হয়। পরের মন সম্পূর্ণ বশে রাখিতে যেটুকু লীলা খেলা চাই, যেটুকু অন্তরালের প্রয়োজন, এই সংকীর্ণতার মধ্যে তাহার অবকাশ কোথায় । একেবারে মহেক্সের সহিত মুখোমুখি করিয়া তাহাকে সমস্ত জীবন যাপন করিতে প্রস্তুত হইতে হইবে। প্রভেদ এই যে, মহেন্দ্রের কুলে উঠিবার উপায় আছে, কিন্তু বিনোদিনীর তাহা নাই । বিনোদিনী নিজের এই অসহায় অবস্থা যতই সুস্পষ্ট বুঝিল ততই সে মনের মধ্যে বল সঞ্চয় করিতে লাগিল । একটা উপায় করিতেই হইবে, এভাবে তাহার চলিবে না । যেদিন বিহারীর কাছে বিনোদিনী নিজের প্রেম নিবেদন করিয়াছে, সেদিন হইতে তাহার ধৈর্ধের বাধ ভাঙিয়া গেছে। যে উদ্যত চুম্বন বিহারীর মুখের কাছ