প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি גר צ হইতে সে ফিরাইয়া লইয়া আসিয়াছে, জগতে তাহা কোথাও আর নামাইয়া রাখিতে পারিতেছে না, পূজার অর্ঘ্যের ন্যায় দেবতার উদ্দেশে তাহ রাত্রিদিন বহন করিয়াই রাথিয়াছে। বিনোদিনীর হৃদয় কোনো অবস্থাতেই সম্পূর্ণ হাল ছাড়িয়া দিতে জানে না, নৈরাপ্তকে সে স্বীকার করে না । তাহার মন অহরহ প্রাণপণ বলে বলিতেছে, ‘আমার এ পূজা বিহারীকে গ্রহণ করতেই হইবে , বিনোদিনীর এই দুর্দান্ত প্রেমের উপরে তাহার আত্মরক্ষার একান্ত আকাঙ্ক্ষা যোগ দিল । বিহারী ছাড়া তাহার আর উপায় নাই। মহেন্দ্রকে বিনোদিনী খুব ভালো করিয়াই জানিয়াছে ; তাহার উপরে নির্ভর করিতে গেলে সে ভর সয় না— তাহাকে ছাড়িয়া দিলে তবেই তাহাকে পাওয়া যায়, তাহাকে ধরিয়া থাকিলে সে ছুটিতে চায় । কিন্তু নারীর পক্ষে যে নিশ্চিত বিশ্বস্ত নিরাপদ নির্ভর একান্ত আবখ্যক বিহারীই তাহা দিতে পারে । আজ আর বিহারীকে ছাড়িলে বিনোদিনীর একেবারেই চলিবে না । গ্রাম ছাড়িয়া আসিবার দিন তাহার নামের সমস্ত চিঠিপত্র নূতন ঠিকানায় পাঠাইবার জন্য মহেন্দ্রকে দিয়া বিনোদিনী স্টেশনের সংলগ্ন পোস্ট আপিসে বিশেষ করিয়া বলিয়া আসিয়াছিল। বিহারী যে একেবারেই তাহার চিঠির কোনো উত্তর দবে না, এ কথা বিনোদিনী কোনোমতেই স্বীকার করিল না ; সে বলিল, “আমি সাতটা দিন ধৈর্য ধরিয়া উত্তরের জন্য অপেক্ষা করিব, তাহার পরে দেখা যাইবে ।’ এই বলিয়া বিনোদিনী অন্ধকারে জানালা খুলিয়া গ্যাসালোকদীপ্ত কলিকাতার দিকে অন্তমনে চাহিয়া রহিল । এই সন্ধ্যাবেলায় বিহারী এই শহরের মধ্যেই আছে, ইহারই গোটাকতক রাস্ত ও গলি পার হইয়া গেলেই এখনই তাহার দরজার কাছে পৌছানো যাইতে পারে ; তাহার পরে সেই জলের-কল-ওয়ালা ছোটে আঙিনা, সেই সিড়ি, সেই সুসজ্জিত পরিপাটি আলোকিত নিভৃত ঘরটি – সেখানে নিস্তন্ধ শাস্তির মধ্যে বিহারী একল কেদারায় বসিয়া আছে – হয়তো কাছে সেই ব্রাহ্মণবালক, সেই স্বগোল স্বন্দর গৌরবর্ণ আয়তনেত্র সরলমূর্তি ছেলেটি নিজের মনে ছবির বই লইয়া পাতা উলটাইতেছে — একে-একে সমস্ত চিত্রটা মনে করিয়া স্নেহে প্রেমে বিনোদিনীর সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ পুলকিত হইয়া উঠিল। ইচ্ছা করিলে এখনই যাওয়া যায়, ইহাই মনে করিয়া বিনোদিনী ইচ্ছাকে বক্ষে তুলিয়া লইয়। খেলা করিতে লাগিল। আগে হইলে হয়তো সেই ইচ্ছা পূর্ণ করিতে সে অগ্রসর হইত ; কিন্তু এখন অনেক কথা ভাবিতে হয়। এখন শুধু বাসনা চরিতার্থ করা নয়, উদ্দেপ্ত সিদ্ধ করিতে হইবে । বিনোদিনী কহিল, ‘আগে দেখি বিহারী কিরূপ উত্তর দেয়, * १३ 尊 চোখের বালি তাহার পরে কোন পথে চলা আবগুক স্থির করা যাইবে।” কিছু না বুঝিয়া বিহারীকে বিরক্ত কল্পিতে যাইতে তাহার আর সাহস হইল না। এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যখন রাত্রি নয়টা-দশটা বাজিয়া গেল, তখন মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আসিয়া উপস্থিত । কয়দিন অনিদ্রায় অনিয়মে অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় সে কাটাইয়াছে ; আজ কৃতকার্য হইয়া বিনোদিনীকে বাসায় আনিয়া একেবারে অবসাদ ও প্রাস্তিতে তাহাকে যেন অভিভূত করিয়া দিয়াছে। আজ আর সংসারের সঙ্গে, নিজের অবস্থার সঙ্গে লড়াই করিবার বল যেন তাহার নাই । তাহার সমস্ত ভারাক্রাস্ত ভাবী জীবনের ক্লাস্তি যেন তাহাকে আজ আগে হইতে আক্রমণ করিল। রুদ্ধ দ্বারের কাছে দাড়াইয়া ঘা দিতে মহেন্দ্রের অত্যন্ত লজ্জাবোধ হইতে লাগিল। যে উন্মত্ততায় সমস্ত পৃথিবীকে সে লক্ষ্য করে নাই, সে মত্ততা কোথায় । পথের অপরিচিত লোকের দৃষ্টির সম্মুখেও তাহার সর্বাঙ্গ সংকুচিত হইতেছে কেন। ভিতরে নূতন চাকরটা ঘুমাইয়া পড়িয়াছে ; দরজা খোলাইতে অনেক হাঙ্গাম করিতে হইল। অপরিচিত নূতন বাসার অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করিয়া মহেন্দ্রের মন দমিয়া গেল। মাতার আদরের ধন মহেন্দ্র চিরদিন যে বিলাস-উপকরণে, যে-সকল টানাপাখা ও মূল্যবান চৌকি-সোফায় অভ্যস্ত, বাসার নূতন আয়োজনে তাহার অভাব সেই সন্ধ্যাবেলায় অত্যন্ত পরিস্ফুট হইয়া উঠিল । এই সমস্ত আয়োজন মহেন্দ্রকে সম্পূর্ণ করিতে হইবে, বাসার সমস্ত ব্যবস্থার ভার তাহারই উপরে। মহেন্দ্র কখনো নিজের বা পরের আরামের জন্য চিন্তা করে নাই— আজ হইতে একটি নূতনগঠিত অসম্পূর্ণ সংসারের সমস্ত খুটিনাটি তাহাকেই বহন করিডে হইবে । সিড়িতে একটা কেরোসিনের ডিবা অপর্যাপ্ত ধূমোদগার করিয়া মিট্‌মিটু করিতেছিল ; তাহার পরিবর্তে একটা ভালো ল্যাম্প, কিনিতে হইবে । বারান্দ বাহিয়া সিড়িতে উঠিবার রাস্তাটা কলের জলের প্রবাহে সঁাতস্যাত করিতেছে ; মিস্ত্রি ডাকাইয়া বিলাতি মাটির দ্বারা সে জায়গা মেরামত করা আবশু্যক । রাস্তার দিকে দুটো ঘর যে জুতার দোকানদারদের হাতে ছিল, তাহারা সে দুটো ঘর এখনো ছাড়ে নাই, তাহা লইয়া বাড়িওয়ালার সহিত লড়াই করিতে হইবে । এইসমস্ত কাজ তাহার নিজে না করিলে নয়, ইহাই চকিতের মধ্যে মনে উদয় হইয়া তাহার শ্রাস্তির বোঝায় আরো বোঝা চাপিল । মহেন্দ্র সিড়ির কাছে কিছুক্ষণ দাড়াইয়া নিজেকে সামলাইয়া লইল— বিনোদিনীর প্রতি তাহার যে প্রেম ছিল তাহাকে উত্তেজিত করিল। নিজেকে চোখের বালি 尊 ১৭৩ বুঝাইল যে, এতদিন সমস্ত পৃথিবীকে ভুলিয়া সে যাহাকে চাহিয়াছিল আজ তাহাকে পাইয়াছে, আজ উভয়ের মাঝখানে কোনো বাধা নাই ; আজ মহেঞ্জের আনন্দের দিন। কিন্তু কোনো বাধা যে নাই তাহাই সর্বাপেক্ষ বড়ো বাধা, আজ মহেন্দ্র নিজেই নিজের বাধা । বিনোদিনী রাস্ত হইতে মহেন্দ্রকে দেখিয় তাহার ধ্যানাসন হইতে উঠিয়া ঘরে আলো জালিল এবং একটা সেলাই কোলে লইয়া নতশিরে তাহাতে নিবিষ্ট হইল ; এই ৰেলাই বিনোদিনীর আবরণ, ইহার অন্তরালে তাহার যেন একটা আশ্রয় আছে । 臀 মহেন্দ্র ঘরে ঢুকিয়া কহিল, “বিনোদ, এখানে নিশ্চয় তোমার অনেক অস্ববিধ ঘটিতেছে।” বিনোদিনী সেলাই করিতে করিতে বলিল, “কিছুমাত্র না ।” মহেন্দ্র কহিল, “আমি আর দুই-তিন দিনের মধ্যেই সমস্ত আসবাব আনিয়া উপস্থিত করিব, এই কয়দিন তোমাকে একটু কষ্ট পাইতে হইবে।” বিনোদিনী কহিল, “না, সে কিছুতেই হইতে পারিবে না— তুমি আর একটিও আসবাব আনিয়ো না, এখানে যাহা আছে তাহা আমার আবশ্বকের চেয়ে চের বেশি ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “আমি-হতভাগ্যও কি সেই ঢের-বেশির মধ্যে ।” বিনোদিনী । নিজেকে অত বেশি মনে করিতে নাই, একটু বিনয় থাকা ভালো । সেই নির্জন দীপালোকে কর্মরত নতশির, বিনোদিনীর আত্মসমাহিত মূর্তি দেখিয়া মুহূর্তের মধ্যে মহেন্দ্রের মনে আবার সেই মোহের সঞ্চার হইল । বাড়িতে হইলে ছুটিয়া সে বিনোদিনীর পায়ের কাছে আসিয়া পড়িত— কিন্তু এ তো বাড়ি নহে, সেইজন্য মহেন্দ্র তাহা পারিল না। আজ বিনোদিনী অসহায়, একান্তই সে মহেন্দ্রের আয়ত্তের মধ্যে, আজ নিজেকে সংযত না রাখিলে বড়োই কাপুরুষত হয় । বিনোদিনী কহিল, “এখানে তুমি তোমার বই-কাপড়গুলা আনিলে কেন।” মহেন্দ্র কহিল, “ওগুলাকে যে আমি আমার আবশ্বকের মধ্যেই গণ্য করি । ওগুলা "ঢের-বেশি'র দলে নয় ।” ili বিনোদিনী । জানি, কিন্তু এখানে ও-সব কেন । মহেন্দ্র । সে ঠিক কথা, এখানে কোনো আবশ্বক জিনিস শোভা পায় না— እ ግß চোখের বালি বিনোদ, বইটইগুলো তুমি রাস্তায় টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়ে, আমি আপত্তিমাত্র করিব না, কেবল সেইসঙ্গে তামাকেও ফেলিয়ো না । বলিয়৷ এই উপলক্ষে মহেন্দ্র একটুখানি সরিয়া আসিয়া কাপড়ে-বাধা বইয়ের পুটুলি বিনোদিনীর পায়ের কাছে আনিয়া ফেলিল । বিনোদিনী গম্ভীর মুখে সেলাই করিতে করিতে মাথা না তুলিয়। বলিল, "ঠাকুরপো, এখানে তোমার থাকা হইবে না।” ի মহেন্দ্র তাহার সদ্যোজাগ্রত আগ্রহের মুখে প্রতিঘাত পাইয়। ব্যাকুল হইয়া উঠিল ; গদগদকণ্ঠে কহিল, “কেন বিনোদ, কেন তুমি আমাকে দূরে রাখিতে চাও । তোমার জন্য সমস্ত ত্যাগ করিয়া কি এই পাইলাম।” বিনোদিনী । আমার জন্য তোমাকে সমস্ত ত্যাগ করিতে দিব না । মহেন্দ্র বলিয়া উঠিল, “এখন সে আর তোমার হাতে নাই— সমস্ত সংসার আমার চারি দিক হইতে স্বলিত হইয়া পড়িয়াছে, কেবল তুমি একলা তাছ. বিনোদ । বিনোদ– বিনোদ-—” বলিতে বলিতে মহেন্দ্ৰ শুইয়া পড়িয়া বিহবলভাবে বিনোদিনীর পা জোর করিয়া চাপিয়া ধরিল এবং তাহার পদপল্লব বারংবার চুম্বন করিতে লাগিল । বিনোদিনী পা ছাড়াইয়া লইয়া উঠিয়া দাড়াইল । কহিল, “মহেন্দ্র, তুমি কী প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে মনে নাই ?” * সমস্ত বলপ্রয়োগ করিয়া মহেন্দ্র আত্মসংবরণ করিয়া লইল ; কহিল, “মনে আছে । শপথ করিয়াছিলাম, তোমার যাহা ইচ্ছা তাহাই হইবে, আমি কখনো তাহার কোনো অন্যথা করিব না । সেই শপথই রক্ষা করিব। কী করিতে হইবে বলে ।” বিনোদিনী । তুমি তোমার বাড়িতে গিয়া থাকিবে । মহেন্দ্র । আমিই কি তোমার একমাত্র অনিচ্ছার সামগ্রী বিনোদ । তাই যদি হইবে, তবে তুমি আমাকে টানিয়া আনিলে কেন ? যে তোমার ভোগের সামগ্রী নয়, তাহাকে শিকার করিবার কী প্রয়োজন ছিল । সত্য করিয়া ললো, আমি কি ইচ্ছা করিয়া তোমার কাছে ধরা দিয়াছি, না, তুমি ইচ্ছা করিয়া আমাকে ধরিয়াছ । আমাকে লইয়া তুমি এইরূপ খেলা করবে, ইহাও কি আমি সন্থ করিব । তবু আমি আমার শপথ পালন করিব— যে বাড়িতে আমি নিজের স্থান পদাঘাতে চুর্ণ করিয়া ফেলিয়াছি সেই বাড়িতে গিয়াই আমি থাকিব । বিনোদিনী ভূমিতে বসিয়া পুনরায় নিরুত্তরে সেলাই করিতে লাগিল । চোখের বালি እ ግ © মহেন্দ্র কিছুক্ষণ স্থিরভাবে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিয়া উঠিল, “নিষ্ঠুর। বিনোদ, তুমি নিষ্ঠুর ! আমি অত্যন্ত হতভাগ্য যে, আমি তোমাকে ভালোবাসিয়াছি।” বিনোদিনী সেলাইয়ে একটা ভুল করিয়া আলোর কাছে ধরিয়া তাহা বহু যত্বে পুনর্বার খুলিতে লাগিল। মহেঞ্জের ইচ্ছা করিতে লাগিল, বিনোদিনীর ঐ পাষাণ হৃদয়টাকে নিজের কঠিন মুষ্টির মধ্যে সবলে চাপিয়া ভাঙিয়া ফেলে। এই নীরব নির্মরত ও অবিচলিত উপেক্ষাকে প্রবল আঘাত করিয়া যেন বাহুবলের দ্বারা পরাস্ত করিতে ইচ্ছা করে । মহেন্দ্র ঘর হইতে বাহির হইয়া পুনরায় ফিরিয়া আসিল ; কহিল, “আমি না থাকিলে এখানে একাকিনী তোমাকে কে রক্ষা করিবে ।” বিনোদিনী কহিল, “সেজন্য তুমি কিছুমাত্র ভয় করিয়ো না । পিসিমা খেমিকে ছাড়াইয়া দিয়াছেন, সে আজ আমার এখানে আসিয়া কাজ লইয়াছে। দ্বারে তালা দিয়া আমরা দুই স্ত্রীলোকে এখানে বেশ থাকিব ।” - মনে মনে যতই রাগ হইতে লাগিল, বিনোদিনীর প্রতি মহেক্সের আকর্ষণ ততই একান্ত প্রবল হইয়া উঠিল। ঐ অটল মূর্তিকে বজবলে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া ক্লিষ্ট পিষ্ট করিয়া ফেলিতে ইচ্ছা করিতে লাগিল । সেই দারুণ ইচ্ছার হাত এড়াইবার জন্য মহেন্দ্র ছুটিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল । রাস্তায় ঘুরিতে ঘুরিতে মহেন্দ্র প্রতিজ্ঞা করিতে লাগিল, বিনোদিনীকে সে উপেক্ষার পরিবর্তে উপেক্ষা দেখাইবে । যে অবস্থায় বিশ্বজগতে বিনোদিনীর একমাত্র নির্ভর মহেন্দ্র, সে অবস্থাতেও মহেন্দ্রকে এমন নীরবে নিৰ্ভয়ে, এমন স্বাঢ় স্বম্পষ্ট ভাবে প্রত্যাখ্যান, এত বড়ো অপমান কি কোনো পুরুষের ভাগ্যে কখনো ঘটিয়াছে। মহেন্দ্রের গর্ব চূর্ণ হইয়াও কিছুতেই মরিতে চাহিল না, সে কেবলই পীড়িত দলিত হইতে লাগিল। মহেন্দ্ৰ কহিল, ‘আমি কি এতই অপদার্থ। আমার সম্বন্ধে এত বড়ো স্পর্ধা কী করিয়া তাহার মনে হইল। আমি ছাড়া এখন তাহার আর কে আছে।’ * 翻 ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ মনে পড়িল— বিহারী। হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য তাহার বক্ষের সমস্ত রক্তপ্রবাহ যেন স্তন্ধ হইয়া গেল। ‘বিহারীর উপরেই বিনোদিনী নির্ভর স্থাপন করিয়া আছে— আমি তাহার উপলক্ষমাত্র, আমি তাহার সোপান, তাহার পা রাখিবার, পদে পদে পদাঘাত করিবার স্থান। সেই সাহসেই আমার প্রতি এত অবজ্ঞা ? 暉 o চোখের বালি שאר מ মহেঞ্জের সন্দেহ হইল, বিহারীর সহিত বিনোদিনীর চিঠিপত্র চলিতেছে এবং বিনোদিনী তাহার কাছ হইতে কোনো আশ্বাস পাইয়াছে। তখনই মহেন্দ্র বিহারীর বাড়ির দিকে চলিল। যখন বিহারীর দ্বারে গিয়া ঘ দিল তখন রাত্রি আর বড়ো অধিক নাই। অনেক ধাক্কার পর বেহার ভিতর হইতে দরজা খুলিয়া দিয়া কহিল, “বাবুজি বাড়ি নাই।” মহেন্দ্র চমকিয়া উঠিল। ভাবিল, ‘আমি যখন নির্বোধের মতে রাস্তায় রাস্তায় ছুটিয়া বেড়াইতেছি, বিহারী সেই অবকাশে বিনোদিনীর কাছে গেছে। এইজন্তই বিনোদিনী আমাকে এই রাত্রে এমন নির্দয় ভাবে অপমান করিয়াছে, এবং আমিও তাড়িত গর্দভের মতো ছুটিয়া চলিয়া আসিয়াছি।’ মহেন্দ্র তাহার পুরাতন পরিচিত বেহারাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ভজু, বাবু কখন বাহির হইয়া গেছেন।” ভজু কহিল, “সে আজ চার-পাচ দিন হইয়া গেছে । তিনি পশ্চিমে কোথায় বেড়াইতে গেছেন।” শুনিয়া মহেন্দ্র বাচিয়া গেল। তাহার মনে হইল, এইবার একটু শুইয়া আরামে ঘুমাই, আর সমস্ত রাত ঘুরিয়া বেড়াইতে পারি না।’ বলিয়া উপরে উঠিয়া বিহারীর ঘরে কোঁচের উপর গুইয়া তৎক্ষণাৎ ঘুমাইয়। পড়িল । মহেন্দ্র যে-রাত্রে বিহারীর ঘরে আসিয়া উপদ্রব করিয়াছিল, তাহার পরদিনই বিহারী কোথায় যাইতে হইবে কিছুই স্থির না করিয়া পশ্চিমে চলিয়া গেছে। বিহারী ভাবিল, এখানে থাকিলে পূর্ববন্ধুর সহিত সংঘর্ষ কোন এক দিন এমন বীভৎস হইয়া উঠিবে যে, তাহার পর চিরজীবন অনুতাপের কারণ থাকিয়া যাইবে । * পরদিন মহেন্দ্র যখন উঠিল তখন বেলা এগারোটা । উঠিয়াই সম্মুখের টিপাইয়ের উপর তাহার দৃষ্টি পড়িল। দেখিল বিনোদিনীর হস্তাক্ষরে বিহারীর নামে এক পত্র পাথরের কাগজ-চাপা দিয়া চাপা রহিয়াছে । তাড়াতাড়ি তাহা তুলিয়া লইয়া দেখিল, পত্র এখনো খোলা হয় নাই। প্রবাসী বিহারীর জন্ত তাহা অপেক্ষা করিয়া আছে। কম্পিত হস্তে মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি তাহা খুলিয়া পড়িতে লাগিল। এই চিঠিই বিনোদিনী তাহাদের গ্রাম হইতে বিহারীকে লিখিয়াছিল এবং ইহার কোনো জবাব সে পায় নাই । চিঠির প্রত্যেক অক্ষর মছেজকে দংশন করিতে লাগিল । বাল্যকাল হইতে চোখের বালি » ጫ ዓ বরাবর বিহারী মহেন্দ্রের অন্তরালেই পড়িয়া ছিল । জগতে স্নেহ-প্রেম সম্বন্ধে মহেশ্র-দেবতার শুষ্ক নির্মাল্যই তাহার ভাগ্যে জুটিত । আজ মহেন্দ্র স্বয়ং প্রার্থী এবং বিহারী বিমূখ, তবু মহেন্দ্রকে ঠেলিয়া বিনোদিনী এই অরপিক বিহারীকেই বরণ করিল ! মহেন্দ্রও বিনোদিনীর দুই-চারিখানা চিঠি পাইয়াছে, কিন্তু বিহারীর এ চিঠির কাছে তাহা নিতান্ত কৃত্রিম, তাহা নির্বোধকে ভুলাইবার শূন্ত ছলনা। নূতন ঠিকানা জানাইবার জন্য গ্রামের ডাকঘরে মহেন্দ্রকে পাঠাইতে বিনোদিনীর ৰাগ্রতা মহেঞ্জের মনে পড়িল এবং তাহার কারণ সে বুঝিতে পারিল । বিনোদিনী তাহার সমস্ত মনপ্রাণ দিয়া বিহারীর চিঠির উত্তর পাইবার জন্য পথ চাহিয়া ৰসিয়া আছে । পূর্বপ্রথা-মত মনিব না থাকিলেও ভজু বেহারা মহেন্দ্রকে চা এবং বাজার হইতে জলখাবার আনিয়া খাওয়াইল । মহেন্দ্র স্বান ভুলিয়া গেল । উত্তপ্ত বালুকার উপর দিয়া পথিক যেমন দ্রুতপদে চলে, মহেন্দ্র সেইরূপ ক্ষণে ক্ষণে বিনোদিনীর জালাকর চিঠির উপর দ্রুত চোখ বুলাইতে লাগিল । মহেন্দ্র পণ করিতে লাগিল, বিনোদিনীর সঙ্গে আর কিছুতেই দেখা করিবে না । কিন্তু তাহার মনে হইল, আর দুই-এক দিন চিঠিব জবাব না পাইলে বিনোদিনী বিহারীর বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইবে এবং তখন সমস্ত অবস্থা জানিতে পারিয়া সাৰন লাভ করিবে । সে সম্ভাবনা তাহার কাছে অসহ বোধ হইল । তখন চিঠিখানা পকেটে করিয়া মহেন্দ্র সন্ধ্যার কিছু পূর্বে পটলডাঙার বাসায় মাসিয়া উপস্থিত হইল । মহেঞ্জের মান অবস্থায় বিনোদিনীর মনে দয়া হইল ; সে বুঝিতে পারিল, মহেন্দ্র কাল রাত্রে হয়তো পথে পথে অনিদ্রায় যাপন করিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিল, *কাল রাত্রে বাড়ি যাও নাই ?” মহেন্দ্র কছিল, “না।” বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, “আজ এখনো তোমার খাওয়া হয় নি নাকি ।” বলিয়া সেবাপরায়ণা বিনোদিনী ভংক্ষণাৎ আহারের আয়োজন করিতে উদ্যত হইল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “থাক্ থাকু, আমি খাইয়া আসিয়াছি।” বিনোদিনী । কোথায় খাইয়াছ । মহেন্দ্র । পিহারীদের বাড়িঙ্গে ।

  • চোখের বালি . טי ל

মুহূর্তের জন্ত বিনোদিনীর মুখ পাণ্ডুবৰ্ণ হইয়া গেল। মুহূর্তকাল নিরুজ্ঞর ধৰিয়া আত্মসংবরণ কৰিয়া বিনোদিনী জিজ্ঞাসা করিল, “বিহারীঠাকুরপো ভালো আছেন তো ?” মহেন্দ্ৰ কহিল, “ভালোই আছে। বিহারী যে পশ্চিমে চলিয়া গেল।” মহেন্দ্র এমনভাবে বলিল, যেন বিহারী আজই রওনা হইয়াছে। বিনোদিনীর মুখ আর-একবার পাংশুবর্ণ হইয়া গেল । পুনর্বার আত্মসংবরণ করিয়া সে কহিল, এমন চঞ্চল লোকও তো দেখি নাই – আমাদের সমস্ত খবর পাইয়াছেন বুঝি ? ঠাকুরপো খুব কি রাগ করিয়াছেন ?” মহেন্দ্র । তা না হইলে এই অসহ গরমের সময় কি মানুষ শখ করিয়া পশ্চিমে বেড়াইতে যায় । বিনোদিনী । আমার কথা কিছু বলিলেন নাকি । মহেন্দ্র । বলিবার আর কী আছে। এই লও বিহারীর চিঠি । বলিয়া চিঠিখানা বিনোদিনীর হাতে দিয়া মহেন্দ্র তীব্র দৃষ্টিতে তাহার মুখের ভাব নিরীক্ষণ করিতে লাগিল । বিনোদিনী তাড়াতাড়ি চিঠি লইয়া দেখিল, খোলা চিঠি— লেফাফার উপরে তাহারই হস্তাক্ষরে বিহারীর নাম লেখা । লেফাফা হইতে বাহির করিয়া দেখিল, তাহারই লেখা সেই চিঠি । উলটাইয়া-পালটাইয়া কোথাও বিহারীর লেখা, জয়াৰ কিছুই দেখিতে পাইল না। * একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া বিনোদিনী মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করিল, “চিঠিখান। তুমি পড়িয়াছ ?” বিনোদিনীর মুখের ভাব দেখিয়া মহেঞ্জের মনে ভয়ের সঞ্চার হইল। সে ফস করিয়া মিথ্যা কথা কহিল, “না।” বিনোদিনী চিঠিখান টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়, পুনরায় তাহা কুটিকুটি করিয়া, জানলার বাহিরে ফেলিয়া দিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “আমি বাড়ি যাইতেছি ।” বিনোদিনা তাহার কোনো উত্তর দিল না । মহেক্স । তুমি যেমন ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছ আমি তাহাই করিব। সাত দিন আমি বাড়িতে থাকিব । কলেজে আসিবার সময় প্রত্যহ একবার এখানকার . সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া খেমির হাতে দিয়া যাইব । দেখা করিয়া তোমাকে বিরক্ত করিব না । চোখের বালি ১৭৯ বিনোদিনী মহেন্দ্রের কোনো কথা শুনিতে পাইল কি না কে জানে, কিন্তু কোনো উত্তর করিল না— খোলা জানালার বাহিরে অন্ধকার আকাশে চাহিয়া রহিল । মহেন্দ্র তাহার জিনিসপত্র লইয়া বাহির হইয়া গেল । বিনোদিনী শূন্তগুহে অনেকক্ষণ আড়ষ্টের মতে বসিয়া থাকিয়া অবশেষে নিজেকে যেন প্রাণপণ বলে সচেতন করিবার জন্ত বক্ষের কাপড় ছি*ড়িয়া আপনাকে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করিতে লাগিল । খেমি শব্দ শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া আসিয়া কহিল, “বউঠাকরুন, করিতেছ কী ।” “তুই যা এখান থেকে” বলিয়া গর্জন করিয়া উঠিয়া বিনোদিনী খেমিকে ঘর হইতে বাহির করিয়া দিল । তাহার পর সশব্দে দ্বার রুদ্ধ করিয়া, দুই হাত মুঠা করিয়া, মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া, বাণাহত জন্তুর মতো আর্তম্বরে কাদিতে লাগিল । এষ্টরূপে বিনোদিনী নিজেকে বিক্ষত পরিশ্রান্ত করিয়া মূৰ্ছিতের মতো মুক্ত বাতায়নের তলে সমস্ত রাত্রি পড়িয়া রহিল । 彎 প্রাতঃকালে স্বর্যালোক গৃহে প্রবেশ করিতেই তাহার হঠাৎ সন্দেহ হইল, বিহারী যদি না গিয়া থাকে, মহেন্দ্র যদি বিনোদিনীকে ভুলাইবার জন্য মিথ্যা বলিয়া থাকে। তৎক্ষণাৎ খেমিকে ডাকিয়া কহিল, “খেমি, তুই এখনই যা— বিহারীঠাকুরপোর বাড়ি গিয়া তাহাদের খবর লইয়া আয় ।” খেমি ঘণ্টাখানেক পরে ফিরিয়া আসিয়া কহিল “বিহারীবাবুর বাড়ির সমস্ত জানালা-দরজা বন্ধ। দরজায় ঘা দিতে ভিতর হইতে বেহারা বলিল, “বাৰু বাড়িতে নাই, তিনি পশ্চিমে বেড়াইতে গিয়াছেন।” বিনোদিনীর মনে আর সন্দেহের কোনোই কারণ রহিল না । 8 রাত্রেই মহেন্দ্ৰ শয্যা ছাড়িয়া গেছে শুনিয়া রাজলক্ষ্মী বধুর প্রতি অত্যন্ত রাগ করিলেন । মনে করিলেন, আশার লাঞ্ছনাতেই মহেন্দ্র চলিয়া গেছে । রাজলক্ষ্মী আশাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহেন্দ্র কাল রাত্রে চলিয়া গেল কেন ।” আশা মুখ নিচু করিয়া বলিল, “জানি না মা ।” রাজলক্ষ্মী ভাবিলেন, এটাও অভিমানের কথা। বিরক্ত হইয়ঃ কহিলেন, “তুমি জান না তো কে জানিবে । তাহাকে কিছু বলিয়াছিলে ?” আশা কেবলমাত্র বলিল, “না।”