প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি । २०९ পরিত। এখন তাহার মনে একট-কী ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছে, আগে তাঁহাকে নিবৃত্ত না করিয়া অন্য কিছুতেই তাহার আসক্তি হয় না। পূর্বেকার অভ্যাসমতে সে এটা-ওটা নাড়িয়া দেখে, পরক্ষণেই সে-সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া নিষ্কৃতি পাইতে চায় । বিহারীর মধ্যে যে যৌবন নিশ্চলভাবে সুপ্ত হইয়া ছিল, যাহার কথা সে কখনো চিন্তাও করে নাই, বিনোদিনীর সোনার কাঠিতে সে আজ জাগিয়া উঠিয়াছে। সদ্যোজাত গরুড়ের মতো সে আপন খোরাকের জন্য সমস্ত জগৎটাকে ঘাটিয় বেড়াইতেছে। এই ক্ষুধিত প্রাণীর সহিত বিহারীর পূর্বপরিচয় ছিল না, ইহাকে লইয়া সে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে ; এখন কলিকাতার ক্ষীণজীর্ণ স্বল্পায়ু কেরানিদের লইয়া সে কী করিবে । আষাঢ়ের গঙ্গা সম্মুখে বহিয়া চলিয়াছে। থাকিয়া থাকিয়া পরপারে নীল মেঘ ঘনশ্রেণী গাছপালার উপরে ভারাবনত নিবিড়ভাবে আবিষ্ট হইয়া উঠে ; সমস্ত নদীতল ইস্পাতের তরবারির মতো কোথাও-বা উজ্জল কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে, কোথাওবা আগুনের মতো ঝকঝক করিতে থাকে । নববর্ষার এই সমারোহের মধ্যে যেমনি বিহারীর দৃষ্টি পড়ে অমনি তার হৃদয়ের দ্বার উদঘাটন করিয়া আকাশের এই নীলক্ষিপ্ত আলোকের মধ্যে কে একাকিনী বাহির হইয়া আসে, কে তাহার স্নানসিক্ত ঘনতরঙ্গায়িত কৃষ্ণকেশ উন্মুক্ত করিয়া দাড়ায়, বর্ষাকাশ হইতে বিদীর্ণ-মেঘচ্ছরিত সমস্ত বিচ্ছিন্ন রশ্মিকে কুড়াইয়া লইয়া কে একমাত্র তাহারই মুখের উপরে অনিমেষ দষ্টির দীপ্ত কাতরতা প্রসারিত করে । পূর্বের যে জীবনটা তাহার স্বখে সন্তোষে কাটিয়া গেছে, আজ বিহারী সেই জীবনটাকে পরম ক্ষতি বলিয়া মনে করিতেছে। এমন কত মেঘের সন্ধ্যা, এমন কত পূর্ণিমার রাত্রি আসিয়াছিল, তাহারা বিহারীর শূন্ত হৃদয়ের দ্বারের কাছে আসিয়া স্থধাপাত্রহস্তে নি:শব্দে ফিরিয়া গেছে— সেই দুর্লভ শুভক্ষণে কত সংগীত অনারব্ধ, কত উৎসব অসম্পন্ন হইয়াছে, তাহার আর শেষ নাই । বিহারীর মনে যে-সকল পূর্বস্মৃতি ছিল বিনোদিনী সেদিনকার উদ্যত চুম্বনের রক্তিম আভার দ্বারা সেগুলিকে আজ এমন বিবর্ণ অকিঞ্চিৎকর করিয়া দিয়া গেল। মহেন্দ্রের ছায়ার মতো হইয়া জীবনের অধিকাংশ দিন কেমন করিয়া কাটিয়াছিল । তাহার মধ্যে কী চরিতার্থতা ছিল । প্রেমের বেদনায় সমস্ত জল-স্থল-আকাশের কেন্দ্রকুহর হইতে যে এমন রাগিণীতে এমন বঁাশি বাজে, তাহা তো অচেতন বিহারী পূর্বে কখনো অল্পমান করিতেও পারে নাই। যে বিনোদিনী দুই বাস্থতে বেষ্টন ૨ ૭ છ চোখের বালি করিয়া এক মুহূর্তে অকস্মাৎ এই অপরূপ সৌন্দৰলোকে বিহারীকে উত্তীর্ণ করিয়া দিয়াছে, তাহাকে সে জার কেমন করিয়া ভুলিবে । তাহার দৃষ্টি তাহার আকাঙ্ক আজ সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছে, তাহার ব্যাকুল ঘননিশ্বাস বিহারীর রক্তস্রোতকে অহরহ তরঙ্গিত করিয়া তুলিতেছে এবং তাহার স্পর্শের স্বকোমল উত্তাপ বিহারীকে বেষ্টন করিয়া পুলকাবিষ্ট হৃদয়কে ফুলের মতো ফুটাইয়া রাখিয়াছে। কিন্তু, তবু সেই বিনোদিনীর কাছ হইতে বিহারী আজ এমন দূরে রহিয়াছে কেন । তাহার কারণ এই বিনোদিনী যে সৌন্দর্যরসে বিহারীকে অভিষিক্ত করিয়া দিয়াছে, সংসারের মধ্যে বিনোদিনীর সহিত সেই সৌন্দর্ষের উপযুক্ত কোনো সম্বন্ধ সে কল্পনা করিতে পারে না। পদ্মকে তুলিতে গেলে পঙ্ক উঠিয়৷ পড়ে । কী বলিয়া তাহাকে এমন কোথায় স্থাপন করিতে পারে যেখানে স্বন্দর বীভৎস হইয়া না উঠে। তাহা ছাড়া মহেন্দ্রের সহিত যদি কাড়াকড়ি বাধিয়া যায়, তবে সমস্ত ব্যাপারটা এতই কুৎসিত আকার ধারণ করিবে যে, সে সম্ভাবনা বিহারী মনের প্রান্তেও স্থান দিতে পারে না । তাই বিহারী নিভৃত গঙ্গাতীরে বিশ্বসংগীতের মাঝখানে তাহার মানসী প্রতিমাকে প্রতিষ্ঠিত করিয়া আপনার হৃদয়কে খুপের মতো দগ্ধ করিতেছে। পাছে এমন কোনো সংবাদ পায় যাহাতে তাহার স্বথস্বপ্নজাল ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তাই সে চিঠি লিখিয়া বিনোদিনীর কোনো খবরও লয় না । তাহার বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে ফলপূর্ণ জামগাছের তলায় মেঘাচ্ছন্ন প্রভাতে বিহারী চুপ করিয়া পড়িয়া ছিল, সম্মুখ দিয়া কুঠির পানসি যাতায়াত করিতেছিল, তা’ই সে অলসভাবে দেখিতেছিল ; ক্রমে বেলা বাড়িয়া যাইতে লাগিল । চাকর আসিয়া আহারের আয়োজন করিবে কি না জিজ্ঞাসা করিল ; বিহারী কহিল, “এখন থাকৃ।” মিস্ত্রির সর্মার আসিয়া বিশেষ পরামর্শের জন্ত তাহাকে কাজ দেখিতে আহবান কৱিল ; ৰিহারী কহিল, “আর-একটু পরে।” । এমন সময় বিহারী হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া দেখিল, সম্মুখে অন্নপূর্ণ। শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল, দুই হাতে তাহার পা চাপিয়া ধরিয়া ভূতলে মাথা রাখিয়া প্ৰণাম কৰিল। অন্নপূর্ণ তাহার দক্ষিণ হস্ত দিয়া পরমগ্রেহে বিহারীর মাথা ও গা ম্পর্শ করিলেন। অশ্রুজড়িত স্বরে কছিলেন, “বিহারী, তুই এত রোগ হইয়া গেছিল কেন ।” বিহাৰী কছিল, “কাকীমা, তোমার দেহ ফিরিয়া পাইবার জন্ত ।” চোখের বালি રહ ૧ শুনিয়া অন্নপূর্ণর চোখ দিয়। ঝর ঝর করিয়৷ জল পড়িতে লাগিল। বিহারী ব্যস্ত হইয় কহিল, “কাকীমা, তোমার এখনে খাওয়া হয় নাই ?” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “ন, এখনো আমার সময় হয় নাই।” বিহারী কহিল, “চলে, আমি রাধিবার জোগাড় করিয়া দিই গে । আজ অনেক দিন পরে তোমার হাতের রান্ন এবং তোমার পাতের প্রসাদ খাইয়। বাচিব ।” মহেন্দ্র-আশার সম্বন্ধে বিহারী কোনো কথাই উত্থাপন করিল না । অন্নপূর্ণ একদিন স্বহস্তে বিহারীর নিকটে সে দিক্কার দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিয়াছেন । অভিমানের সহিত সেই নিষ্ঠুর নিষেধ সে পালন করিল। আহারান্তে অন্নপূর্ণ কহিলেন, “নৌকা ঘাটেই প্রস্তুত আছে বিহারী, এখন একবার কলিকাতায় চল।” বিহারী কহিল, “কলকাতায় আমার কোন প্রয়োজন।" অন্নপূর্ণ কহিলেন, “দিদির বড়ো অসুখ, তিনি তোকে দেখিতে চাহিয়াছেন।” শুনিয়া বিহারী চকিত হইয়া উঠিল। জিজ্ঞাসা করিল, “মহিনদা কোথায় ।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “সে কলিকাতায় নাই, পশ্চিমে চলিয়া গেছে।” শুনিয়া মুহূর্তে বিহারীর মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। সে চুপ করিয়া রহিল। অন্নপূর্ণ জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুই কি সকল কথা জানিস নে।” বিহারী কহিল, “কতকটা জানি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানি না।” তখন অন্নপূর্ণ, বিনোদিনীকে লইয়া মহেন্দ্রের পশ্চিমে পলায়নের বার্তা বলিলেন । বিহারীর চক্ষে তৎক্ষণাৎ জল-স্থল-আকাশের সমস্ত রঙ বদলাইয়া গেল, তাহার কল্পনাভাণ্ডারের সমস্ত সঞ্চিত রস মুহূর্তে তিক্ত হইয়া উঠিল – ‘মায়াবিনী বিনোদিনী কি সেদিনকার সন্ধ্যাবেলায় আমাকে লইয়া খেলা করিয়া গেল । তাহার ভালোবাসার আত্মসমর্পণ সমস্তই ছলনা ! সে তাহার গ্রাম ত্যাগ করিয়া নির্লজ্জভাবে মহেন্দ্রের সঙ্গে একাকিনী পশ্চিমে চলিয়া গেল । ধিক্‌ তাহাকে এবং ধিক্ আমাকে যে আমি মূঢ়, তাহাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করিয়াছিলাম ' হায় মেঘাচ্ছন্ন আষাঢ়ের সন্ধ্যা, হায় গতবৃষ্টি পূর্ণিমার রাত্রি, তোমাদের ইন্দ্ৰজাল কোথায় গেল । l,