চোখের বালি ૨ ૭ જ বিহারী কহিল, “মা, তোমার অমুখ, এ খবর আমাকে কেন জানাইলে না । তাহা হইলে কি আমি এক মুহূর্ত বিলম্ব করিতাম।” রাজলক্ষ্মী মৃদুস্বরে কহিলেন, “সে কি আর আমি জানি না বাছা । তোকে পেটে ধরি নাই বটে, কিন্তু জগতে তোর চেয়ে আমার আপনার আর কি কেহ আছে।” বলিতে বলিতে তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল । বিহারী তাড়াতাড়ি উঠিয়া ঘরের কুলুঙ্গিতে ওষুধপত্রের শিশি-কোঁটাগুলি পরীক্ষা করিবার ছলে আত্মসংবরণের চেষ্টা করিল। ফিরিয়া আসিয়া সে যখন রাজলক্ষ্মীর নাড়ি দেখিতে উদ্যত হইল রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আমার নাড়ির খবর থাক্ৰ— জিজ্ঞাসা করি, তুই এমন রোগ হইয়া গেছিস কেন বেহারি।” বলিয়া রাজলক্ষ্মী তাহার কৃশ হস্ত তুলিয়া বিহারীর কণ্ঠায় হাত বুলাইয়া দেখিলেন । বিহারী কহিল, “তোমার হাতের মাছের ঝোল না খাইলে আমার এ হাড় কিছুতেই ঢাকিবে না । তুমি শীঘ্র শীঘ্ৰ সারিয়া ওঠে মা, আমি ততক্ষণ রান্নার আয়োজন করিয়া রাখি ।” রাজলক্ষ্মী মান হাসি হাসিয়া কহিলেন, “সকাল সকাল আয়োজন কর বাছা— কিন্তু রান্নার নয় ।” * বলিয়া বিহারীর হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন, “বেহারি, তুই বউ ঘরে নিয়ে আয়, তোকে দেখিবার লোক কেহ নাই। ও মেজবউ, তোমরা এবার বেহারির একটি বিয়ে দিয়ে দাও— দেখো-না, বাছার চেহারা কেমন হইয়া গেছে।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “তুমি সারিয়া ওঠে। দিদি । এ তো তোমারই কাজ, তুমি সম্পন্ন করিবে, আমরা সকলে যোগ দিয়া আমোদ করিব।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “আমার আর সময় হইবে না মেজবউ, বেহারির ভার তোমাদেরই উপর রহিল— উহাকে সুখী করিয়ো, আমি উহার ঋণ শুধিয়া যাইতে পারিলাম না— কিন্তু ভগবান উহার ভালো করিবেন।” বলিয়া বিহারীর মাথায় তাহার দক্ষিণ হস্ত বুলাইয়া দিলেন । আশা আর ঘরে থাকিতে পারিল না— কাদিবার জন্য বাহিরে চলিয়া গেল । অন্নপূর্ণ অশ্রজলের ভিতর দিয়া বিহারীর মুখের প্রতি মেহদৃষ্টিপাত করিলেন। রাজলক্ষ্মীর হঠাৎ কী মনে পড়িল ; তিনি ডাকিলেন, “বউমা, ও বউমা ।” আশা ঘরে প্রবেশ করিতেই কহিলেন, “বেহারির খাবারের সব ব্যবস্থা করিয়াছ তো ?” > 8 * У о م চোখের বালি বিহারী কহিল, “ম, তোমার এই পেটুক ছেলেটিকে সকলেই চিনিয়া লইয়াছে । দেউড়িতে ঢুকিতেই দেখি, ডিমওয়ালা বড়ো বড়ো কইমাছ চুপড়িতে লইয়া বামি হন হন করিয়া অন্দরের দিকে ছুটিয়াছে— বুঝিলাম, এ বাড়িতে এখনো আমার খ্যাতি লুপ্ত হয় নাই।” বলিয়া বিহারী হাসিয়া একবার আশার মুখের দিকে চাহিল । আশা আজ আর লজ পাইল না । সে স্নেহের সহিত স্থিতহাস্তে বিহারীর পরিহাস গ্রহণ করিল। বিহার এ সংসারের কতখানি আশ। তাহ আগে সম্পূর্ণ জানিত না— অনেক সময় তাহাকে অনবগুক আগন্তুক মনে করিয়া অবজ্ঞ করিয়াছে, অনেক সময় বিহারীর প্রতি বিমূখ ভাব তাহার আচরণে স্বম্পষ্ট পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। সেই অনুতাপের ধিক্কারে আজ বিহারীর প্রতি তাহার শ্রদ্ধ এবং করুণা সবেগে ধাবিত হইয়াছে । রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “মেজবউ, বামুনঠাকুরের কর্ম নয়, রান্নাটা তোমায় নিজে দেখাইয়া দিতে হইবে— আমাদের এই বাঙাল ছেলে একরাশ ঝাল নহিলে খাইতে পারে না ।” বিহারী। তোমার মা ছিলেন বিক্রমপুরের মেয়ে, তুমি নদীয়া জেলার ভদ্রসন্তানকে বাঙাল বল ! এ তো আমার সহ হয় না । ইহা লইয়া অনেক পরিহাস হইল, এবং অনেক দিন পরে মহেন্দ্রের বাড়ির বিষাদভার যেন লঘু লইয়া আসিল । কিন্তু এত কথাবার্তার মধ্যে কোনো পক্ষ হইতে কেহ মহেন্দ্রের নাম উচ্চারণ করিল না। পূর্বে বিহারীর সঙ্গে মহেক্সের কথা লইয়াই রাজলক্ষ্মীর একমাত্র কথা ছিল । তাহা লইয়া মহেন্দ্র নিজে তাহার মাতাকে অনেকবার পরিহাস করিয়াছে। আজ সেই রাজলক্ষ্মীর মুখে মহেন্দ্রের নাম একবারও না জুনিয়া বিহারী মনে মনে স্তম্ভিত হইল । • রাজলক্ষ্মীর একটু নিদ্রাবেশ হইতেই বিহারী বাহিরে আসিয়া অন্নপূর্ণাকে কহিল, “মার ব্যামো তো সহজ নহে ।" । অন্নপূর্ণ কহিলেন, “সে তে স্পষ্টই দেখা যাইতেছে।” বলিয়া অন্নপূর্ণ র্তাহার ঘরের জানলার কাছে বসিয়া পড়িলেন। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয় কহিলেন, “একবার মহিনকে ভাকিয়া আনিবি ন। বিহারি ? আর তো দেরি করা উচিত হয় না ।” বিহারী কিছুক্ষণ নিরুত্তরে থাকিয় কহিল, “তুমি যেমন আদেশ করিবে চোখের বালি ཅས།, २ 9 9 আমি তাহাই করিব । তাহার ঠিকানা কেহ কি জানে।” অন্নপূর্ণ । ঠিক জানে না, খুজিয়া লইতে হইবে। বিহারি, আর-একটা কথ তোর কাছে বলি। আশার মুখের দিকে চাস । বিনোদিনীর হাত হইতে মহেন্দ্রকে যদি উদ্ধার করিতে না পারিস, তবে সে আর বঁাচিবে না। তাহার মুখ দেখিলেই বুঝিতে পারিবি তার বুকে মৃত্যুৰাণ বাজিয়াছে। বিহারী মনে মনে তীব্র হাসি হাসিয়া ভাবিল, ‘পরকে উদ্ধার আমি করিতে যাইব— ভগবান, আমার উদ্ধার কে করিবে ।” কহিল, “বিনোদিনীর আকর্ষণ হইতে চিরকালের জন্য মহেন্দ্রকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারিব, এমন মন্ত্র আমি কি জানি কাকীমা । মার ব্যামোতে সে দু-দিন শাস্ত হইয়া থাকিতে পারে, কিন্তু আবার সে যে ফিরিবে না তাহা কেমন করিয়া বলিব ।” 幡 電 এমন সময় মলিনবসনা আশা মাথায় আধখানা ঘোমটা দিয়া ধীরে ধীরে তাহার মাসিমার পায়ের কাছে আসিয়া বসিল । সে জানিত রাজলক্ষ্মীর পীড়া সম্বন্ধে বিহারীর সঙ্গে অন্নপূর্ণার আলোচনা চলিতেছে, তাই ঔংস্থক্যের সহিত শুনিতে আসিল । পতিব্ৰতা আশার মুখে নিস্তদ্ধ দুঃখের নীরব মহিমা দেখিয়া বিহারীর মনে এক অপূর্ব ভক্তির সঞ্চার হইল। শোকের তপ্ত তীৰ্থজলে অভিষিক্ত হইয় এই তরুণী রমণী প্রাচীন যুগের দেবীদের ন্যায় একটি অচঞ্চল মর্যাদা লাভ করিয়াছে— সে এখন আর সামান্য নারী নহে, সে যেন দারুণ দুঃখে পুরাণবণিতা সাধীদের সমান বয়স প্রাপ্ত হইয়াছে। বিহারী আশার সহিত রাজলক্ষ্মীর পথ্য ও ঔষধ সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া যখন আশাকে বিদায় করিল তখন একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া অন্নপূর্ণাকে কহিল, “মহেন্দ্রকে আমি উদ্ধার করিব।” বিহারী মহেঞ্জের ব্যাঙ্কে গিয়া খবর পাইল যে, তাহাদের এলাহাবাদ-শাখাৰ সহিত মহেন্দ্র অল্পদিন হইতে লেনদেন৷ আরম্ভ করিয়াছে । ф е স্টেশনে আসিয়া বিনোদিনী একেবারে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে মেয়েদের গাড়িতে চড়িয়া বসিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “ও কী কর, আমি তোমার জন্তে সেকেও, 舜忆死有 টিকিট কিনিতেছি ।” বিনোদিনী কহিল, “দরকার কী, এখানে আমি বেশ থাকিব ।”