চোখের বালি ૨ છે ૧ আর কত কাল এমন একলা দাড়াইয়া থাকিবে— ‘ওগো, পার করে। মেঘের এক প্রাস্ত অপসারিত হইয়া কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয়ার চাদ দেখা দিল । জ্যোৎস্নার মায়ামন্ত্রে সেই নদী ও নদীতীর, সেই আকাশ ও আকাশের সীমান্ত পৃথিবীর অনেক বাহিরে চলিয়া গেল। মর্তের কোনো বন্ধন রহিল না । কালের সমস্ত ধারাবাহিকতা ছিড়িয়া গেল— অতীতকালের সমস্ত ইতিহাস লুপ্ত, ভবিষ্যৎ কালের সমস্ত ফলাফল অন্তৰ্হিত ; শুধু এই রজতধারাপ্লাবিত বর্তমানটুকু, যমুনা ও যমুনাতটের মধ্যে মহেন্দ্র ও বিনোদিনীকে লইয়া বিশ্ববিধানের বাহিরে চিরস্থায়ী। মহেন্দ্র মাতাল হইয়া উঠিল। বিনোদিনী যে তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিবে, জ্যোৎস্নারাত্রির এই নির্জন স্বৰ্গখণ্ডকে লক্ষ্মীরূপে সম্পূর্ণ করিয়া তুলিবে না, ইহা সে কল্পনা করিতে পারিল না। তৎক্ষণাৎ উঠিয়া সে বিনোদিনীকে খুজিতে বাড়ির দিকে চলিয়া গেল । শয়নগৃহে আসিয়া দেখিল, ঘর ফুলের গন্ধে পূর্ণ। উন্মুক্ত জানলা-দরজা দিয়া জ্যোৎস্নার আলো শুভ্র বিছানার উপর আসিয়া পড়িয়াছে। বিনোদিনী বাগান হইতে ফুল তুলিয়া মালা গাথিয়া খোপায় পরিয়াছে, গলায় পরিয়াছে, কটিতে বাধিয়াছে— ফুলে ভূষিত হইয়া সে বসন্তকালের পুপভারলুষ্ঠিত লতাটির ন্যায় জ্যোৎস্নায় বিছানার উপরে পড়িয়া আছে । মহেন্দ্রের মোহ দ্বিগুণ হইয়া উঠিল । সে অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বিনোদ, আমি যমুনার ধারে অপেক্ষ কৰিয়া বসিয়া ছিল। তুমি যে এখানে অপেক্ষা করিয়া মাছ, আকাশের আমাকে সেই সংবাদ দি, তাই আমি চলিয়া আসিলাম। এই কথা বলিয়া মহেন্দ্র বিছানায় বসিবার জন্য অগ্রসর হইল । বিনোদিনী তাড়াতাড়ি চকিত হইয়া উঠিয়া দক্ষিণবাহু প্রসারিত করিয়া কহিল, “যাও যাও, তুমি এ বিছানায় বসিয়ে না।” ভৱাপালের নেকি চড়ায় ঠেকিয়া গেল— মহেন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইল । অনেকক্ষণ তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। পাছে মহেন্দ্র নিষেধ না মানে, -খুইজন্য বিনোদিনী শয্যা ছাড়িয়া আসিয়া দাড়াইল । মহেন্দ্ৰ কহিল, “তবে তুমি কাহার জন্ত সাজিয়াছ। কাহার জন্য অপেক্ষ করিতেছ।” বিনোদিনী আপনার বুক চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “যাহার জন্য সাজিয়াছি, সে আমার অস্তরের ভিতরে आह६ !” মহেন্দ্র কহিল, “সে কে । সে বিহারী ?” ՀՖն চোখের বালি বিনোদিনী কহিল, “তাহার নাম তুমি মুখে উচ্চারণ করিয়ো না ।” মহেজ। তাহারই জন্য তুমি পশ্চিমে ঘুরিয়া বেড়াইতেছ? বিনোদিনী । তাহারই জস্ত । মহেন্দ্র । তাহারই জন্ত তুমি এখানে অপেক্ষা করিয়া আছ ? বিনোদিনী । তাহারই জন্ত । মহেন্দ্র । তাহার ঠিকানা জানিয়াছ ? f বিনোদিনী । জানি না, কিন্তু যেমন করিয়া হউক জানিবই । মহেন্দ্র । কোনোমতেই জানিতে দিব না । বিনোদিনী। না যদি জানিতে দাও, আমার হৃদয় হইতে তাহাকে কোনোমতেই বাহির করিতে পারিবে না । এই বলিয়া বিনোদিনী চোখ বুজিয়া আপনার হৃদয়ের মধ্যে বিহারীকে একবার অনুভব করিয়া লইল । মহেন্দ্র সেই পুপাভরণা বিরহবিধুরমূর্তি বিনোদিনীর দ্বারা একই কালে প্রবলবেগে আকৃষ্ট ও প্রত্যাখ্যাত হইয়া হঠাৎ ভীষণ হইয়া উঠিল ; মুষ্টি বদ্ধ করিয়া কহিল, “ছুরি দিয়া কাটিয়া তোমার বুকের ভিতর হইতে তাহাকে বাহির করিব।” বিনোদিনী অবিচলিত মুখে কহিল, “তোমার ভালোবাসার চেয়ে তোমার ছুরি আমার হৃদয়ে সহজে প্রবেশ করিবে ।” I g মহেন্দ্র । তুমি আমাকে ভয় কর না কেন, এখানে তোমার রক্ষক কে আছে। বিনোদিনী । তুমি আমার রক্ষক আছ । তোমার নিজের কাছ হইতে তুমি আমাকে রক্ষা করিবে । মহেন্দ্র । এইটুকু শ্রদ্ধা, এইটুকু বিশ্বাস, এখনো বাকি আছে ! বিনোদিনী । তা না হইলে আমি আত্মহত্যা করিয়া মরিতাম, তোমার সঙ্গে বাহির হইতাম না । মহেন্দ্র । কেন মরিলে না— ঐটুকু বিশ্বাসের ফালি আমার গলায় জড়াইয়া আমাকে দেশদেশান্তরে টানিয়া মারিতেছ কেন । তুমি মরিলে কড় মঙ্গল হইত ভাবিয়া দেখো । # 嗣 বিনোদিনী । তাহা জানি, কিন্তু যতদিন বিহারীর আশা আছে ততদিন আমি মরিতে পারিব না । মহেন্দ্র । যতদিন তুমি ন মরিবে ততদিন আমার প্রত্যাশাও মরিবে না, আমিও নিষ্কৃতি পাইব না । আমি আজ হষ্টতে ভগবানের কাছে সর্বান্তঃকরণে চোখের বালি aScm তোমার মৃত্যু কামনা করি । তুমি আমারও হইয়ে না, তুমি বিহারীরও হইয়ো না । তুমি যাও । আমাকে ছুটি দাও । আমার মা কাদিতেছেন, আমার স্ত্রী কাদিতেছে— তাহাদের অশ্র আমাকে দূর হইতে দগ্ধ করিতেছে। তুমি মা মরিলে, তুমি আমার এবং পৃথিবীর সকলের আশার অতীত না হইলে, আমি তাহাজের চোখের জল মুছাইবার অবসর পাইব না । এই বলিয়া মহেন্দ্র ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। বিনোদিনী একলা পড়িয়া আপনার চারি দিকে যে মোহজাল রচনা করিতেছিল তাহ সমস্ত ছিড়িয়া দিয়া গেল। চুপ করিয়া দাড়াইয়া বিনোদিনী বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল— আকাশভরা জ্যোৎস্না শূন্ত করিয়া দিয়া তাহার সমস্ত স্থধারস কোথায় উবিয়া গেছে। সেই কেয়ারি-করা বাগান, তাহার পরে বালুকাতীয়, তাহার পরে নদীর কালো জল তাহার পরে ও-পারের অস্ফুটতা, সমস্তই যেন একখানা বড়ো সাদা কাগজের উপরে পেনসিলে-জাক একটি চিত্রমাত্ৰ— সমস্তই নীরস এবং নিরর্থক । মহেন্দ্রকে বিনোদিনী কিরূপ প্রবলবেগে আকর্ষণ করিয়াছে, প্রচণ্ড ঝড়ের মতো কিরূপ সমস্ত শিকড়-সুদ্ধ তাহাকে উৎপাটিত করিয়াছে, আজ তাহা অমুভব করিয়া তাহার হৃদয় আরো যেন অশাস্ত হইয়া উঠিল । তাহার তো এই-সমস্ত শক্তিই রহিয়াছে, তবে কেন বিহারী পূর্ণিমার রাত্রির উদবেলিত সমুদ্রের ন্যায় তাহার সম্মুখে আসিয়া ভাঙিয়া পড়ে না। কেন একটা অনাবশ্বক ভালোবাসার প্রবল অভিঘাত প্রত্যহ তাহার ধ্যানের মধ্যে আসিয়া কাদিয়া পড়িতেছে । আর-একটা আগন্তুক রোদন বারংবার আসিয়া তাহার অন্তরের রোদনকে কেন পরিপূর্ণ অবকাশ দিতেছে না । এই-যে একটা প্রকাও আন্দোলনকে সে জাগাইয়া তুলিয়াছে, ইহাকে লইয়া সমস্ত জীবন সে কী করিবে । এখন ইহাকে শান্ত করিবে কী উপায়ে । আজ যে-সমস্ত ফুলের মালায় সে নিজেকে ভূষিত করিয়াছিল তাহার উপরে মহেক্সের মুগ্ধ দৃষ্টি পড়িয়াছিল জানিয়া সমস্ত টানিয়া ছিড়িয়া ফেলিল। তাহার সমস্ত শক্তি বৃথা, চেষ্টা বৃথা, জীবন বৃথা— এই কানন, এই জ্যোৎস্না, এই যমুনাতট, এই অপূর্বম্বন্দর পৃথিবী, সমস্তই বৃথা । এত ব্যর্থতা, তবু যে যেখানে সে সেখানেই দাড়াইয়া আছে– জগতে কিছুরই লেশমাত্র ব্যত্যয় হয় নাই। তবু কাল স্বৰ্ষ উঠিবে এবং সংসার তাহার ক্ষুদ্রতম কাজটুকু পর্যন্ত ভুলিবে না— এবং অবিচলিত বিহারী যেমন দূরে ছিল তেমনি দূরে থাকিয়া ব্রাহ্মণ-বালককে তাহার বোধোদয়ের নূতন পাঠ অভ্যাস করাইবে । বিনোদিনীর চক্ষু ফাটিয়া অশ্র বাহির হইয়া পড়িল । সে তাহার সমস্ত বল ও २३ ● চোখের বালি স্বাকাজা লইয়া কোন পাথরকে ঠেলিতেছে। তাহার হার রক্তে ভাসিয়া গেল, কিন্তু তাহার অদৃষ্ট স্বচ্যগ্রপরিমাণ সরিয়া বসিল না । (?૨ সমস্ত রাত্ৰি মহেন্দ্র ঘুমায় নাই— ক্লান্তশরীরে ভোরের দিকে তাহার ঘুম আসিল । বেলা আটটা-নয়টার সময় জাগিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল । গত রাত্রির একটা কোন অসমাপ্ত বেদন ঘুমের ভিতরে ভিতরে যেন প্রবাহিত হইতেছিল। সচেতন হইবা মাত্ৰ মহেন্দ্র তাহার ব্যথা অহুভব করিতে আরম্ভ করিল। কিছুক্ষণ পরেই রাত্রির সমস্ত ঘটনাটা মনে স্পষ্ট জাগিয়া উঠিল। সকালবেলাকার সেই রৌদ্রে, অতৃপ্ত নিদ্রার ক্লাস্তিতে সমস্ত জগৎটা এবং জীবনটা অত্যন্ত বিরস বোধ হইল । ংসার-ত্যাগের গ্লানি, ধর্মত্যাগের গভীর পরিতাপ এবং এই উদভ্ৰান্ত জীবনের সমস্ত অশান্তিভার মহেন্দ্র কিসের জন্য বহন করিতেছে। এই মোহাবেশ-শূন্ত প্রভাতরেীত্রে মহেঞ্জের মনে হইল, সে বিনোদিনীকে ভালোবাসে না। রাস্তার দিকে সে চাহিয়া দেখিল, সমস্ত জাগ্রত পৃথিবী ব্যস্ত হইয়া কাজে ছুটিয়াছে। সমস্ত আত্মগৌরব পঙ্কের মধ্যে বিসর্জন দিয়া একটি বিমুখ স্ত্রীলোকের পদপ্রান্তে অকৰ্মণ্য জীবনকে প্রতিদিন আবদ্ধ করিয়া রাখিবার যে মৃঢ়তা, তাহা মহেঞ্জের কাছে স্বম্পষ্ট হইল। একটা প্রবল আবেগের উচ্ছ্বাসের পর হৃদয়ে অবসাদ উপস্থিত হয় ; ক্লান্ত হৃদয় তখন আপন অনুভূতির বিষয়কে কিছুকালের জন্য দূরে ঠেলিয়া রাখিতে চায় । সেইভাবের ভাটার সময় তলের সমস্ত প্রচ্ছন্ন পঙ্ক বাহির হইয়া পড়ে, যাহা মোহ আনিয়াছিল তাহাতে বিতৃষ্ণ জন্মে। মহেন্দ্র যে কিসের জন্য নিজেকে এমন করিয়া অপমানিত করিতেছে, তাহা সে আজ বুঝিতে পারিল না । সে বলিল, “আমি সর্বাংশেই বিনোদিনীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তবু আজ আমি সর্বপ্রকার হীনতা ও লাঞ্ছনা স্বীকার করিয়া ঘৃণিত ভিক্ষুকের মতো তাহার পশ্চাতে অহোরাত্র ছুটিয়া বেড়াইতেছি ; এমনতরো অদ্ভূত পাগলামি কোন শয়তান আমার মাথার মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিয়াছে।” বিনোদিনী মহেন্দ্রের কাছে আজ একটি স্ত্রীলোকমাত্র, আর কিছুই নহে ; তাহার চারি দিকে সমস্ত পৃথিবীর সৌন্দর্য হইতে, সমস্ত কাব্য হইতে, কাহিনী হইতে, যে-একটি লাবণ্যজ্যোতি আকৃষ্ট হইয়াছিল, তাহা আজ মায়মরীচিকার মতো অন্তর্ধান করিতেই একটি সামান্য নারীমাত্র অবশিষ্ট রহিল— তাহার কোনো অপূর্বত্ব রহিল না । তখন এই ধিক্‌কৃত মোহচক্র হইতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়া বাড়ি ফিরিয়া