প্রধান মেনু খুলুন



চোখের বালি २२ > যাইবার জন্য মহেন্দ্র ব্যগ্র হইল। যে শান্তি প্রেম এবং স্নেহ তাহার ছিল তাহাই তাহার কাছে দুর্লভতম অমৃত বলিয়া বোধ হইল। বিহারীর আশৈশব অটলনির্ভর বন্ধুত্ব তাহার কাছে মহামূল্য বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। মহেন্দ্ৰ মনে মনে কহিল, “যাহা যথার্থ গভীর এবং স্থায়ী তাহার মধ্যে বিনা চেষ্টায়, বিনা বাধায় । আপনাকে সম্পূর্ণ নিমগ্ন করিয়া রাখা যায় বলিয়া তাহার গৌরব আমরা বুঝিতে পারি না ; যাহা চঞ্চল ছলনামাত্র, যাহার পরিতৃপ্তিতেও লেশমাত্র স্থখ নাই, তাহা আমাদিগকে পশ্চাতে উধ্বশ্বাসে ঘোড়দৌড় করাইয়া বেড়ায় বলিয়াই তাহাকেই চরম কামনার ধন বলিয়া মনে করি।’ মহেন্দ্র কহিল, ‘আজই বাড়ি ফিরিয়া যাইব ; বিনোদিনী যেখানেই থাকিতে চাহে সেইখানেই তাহাকে রাখিবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়া আমি মুক্ত হইব।’ ‘আমি মুক্ত হইব’ এই কথা দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করিতেই তাহার মনে একটি আনন্দের আবির্ভাব হইল ; এতদিন যে অবিশ্রাম দ্বিধার ভার সে বহন করিয়া আসিতেছিল তাহা হালকা হইয়া আসিল । এতদিন, এই মুহূর্তে যাহা তাহার পরম অপ্রীতিকর ঠেকিতেছিল পরমুহূর্তেই তাহা সে পালন করিতে বাধ্য হইতেছিল ; জোর করিয়া 'না' কি ‘হা’ সে বলিতে পারিতেছিল না ; তাহার অন্তঃকরণের মধ্যে যে আদেশ উখিত হইতেছিল বরাবর জোর করিয়া তাহার মুখ চাপা দিয়া সে অন্য পথে চলিতেছিল— এখন সে যেমনি সবেগে বলিল আমি মুক্তিলাভ করিব আমনি তাহার দোলা-পীড়িত হৃদয় আশ্রয় পাইয়া তাহাকে অভিনন্দন করিল। মহেন্দ্র তখনই শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া মুখ ধুইয়া বিনোদিনীর সহিত দেখা করিতে গেল। গিয়া দেখিল, তাহার দ্বার বন্ধ । স্বারে আঘাত দিয়া কহিল, “ঘুমাইতেছ কি ?” বিনোদিনী কছিল, “না। তুমি এখন যাও।” মহেন্দ্র কহিল, “তোমার সঙ্গে বিশেষ কথা আছে ; আমি বেশিক্ষণ থাকিব না।” বিনোদিনী কহিল, “কথা আর আমি শুনিতে পারি না— তুমি যাও, আমাকে আর বিরক্ত করিয়ে না, আমাকে একলা থাকিতে দাও।” অন্য কোনো সময় হইলে এই প্রত্যাখ্যানে মহেন্দ্রের আবেগ আরো বাড়িয়া উঠিত। কিন্তু আজ তাহার অত্যন্ত ঘৃণাবোধ হইল। সে ভাবিল, ‘এই সামান্য এক স্ত্রীলোকের কাছে আমি নিজেকে এতই হীন করিয়াছি যে, আমাকে যখন-তখন এমনতরো অবজ্ঞাভরে দূর করিয়া দিবার অধিকার ইহার জঙ্কিয়াছে। সে অধিকার ইহার স্বাভাবিক অধিকার নহে । আমিই তাহা ইহাকে দিয়া ইহার গর্ব २२३ চোখের বালি এমন অন্যায়ক্ষপে বাড়াইয়া দিয়াছি।’ এই লাঞ্ছনার পরে মহেন্দ্র নিজের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করিবার চেষ্টা করিল। সে কহিল, ‘আমি জয়ী হইব ; ইহার বন্ধন আমি ছেদন করিয়া দিয়া চলিয়া যাইব ।” আহারাস্তে মহেন্দ্র টাকা উঠাইয়া আনিবার জন্য ব্যাঙ্কে চলিয়া গেল। টাকা উঠাইরা আশার জন্য ও মার জন্ত কিছু ভালো নূতন জিনিস কিনিবে বলিয়া সে এলাহাবাদের দোকানে ঘুরিতে লাগিল । আবার একবার বিনোদিনীর দ্বারে আঘাত পড়িল । প্রথমে সে বিরক্ত হইয়া কোনো উত্তর করিল না ; তাহার পরে আবার বারবার আঘাত করিতেই বিনোদিনী জলন্ত রোধে সবলে দ্বার খুলিয়া কহিল, “কেন তুমি আমাকে বারবার বিরক্ত করিতে আসিতেছ।” কথা শেষ না হইতেই বিনোদিনী দেখিল, বিহারী দাড়াইয়া আছে । ঘরের মধ্যে মহেন্দ্র আছে কি না, দেখিবার জন্য বিহারী একবার ভিতরে চাহিয়া দেখিল । দেখিল, শয়নঘরে শুষ্ক ফুল এবং ছিন্ন মালা ছড়ানো। তাহার মন নিমেষের মধ্যেই প্রবলবেগে বিমুখ হইয়া গেল। বিহারী যখন দূরে ছিল তখন বিনোদিনীর জীবনযাত্রা সম্বন্ধে কোনো সন্দেহজনক চিত্র যে তাহার মনে উদয় হয় নাই তাহা নহে, কিন্তু কল্পনার লীলা সে চিত্রকে ঢাকিয়াও একটি উজ্জল মোহিনীচ্ছবি দাড় করাইয়াছিল। বিহারী যখন বাগানে প্রবেশ করিতেছিল তখন তাহার হৃৎকম্প হইতেছিল— পাছে কল্পনাপ্রতিমায় অকস্মাৎ আঘাত লাগে এইজন্য তাহার চিত্ত সংকুচিত হইতেছিল। বিহারী বিনোদিনীর শয়নগৃহের দ্বারের সম্মুখে দাড়াইবা মাত্র সেই আঘাতটাই লাগিল । দূরে থাকিয়া বিহারী এক সময় মনে করিয়াছিল, সে আপনার প্রেমাভিষেকে বিনোদিনীর জীবনের সমস্ত পক্ষিলতা অনায়াসে ধৌত করিয়া লইতে পারিবে । কাছে আসিয়া দেখিল, তাহা সহজ নহে ; মনের মধ্যে করুণার বেদনা আসিল কই। হঠাৎ ঘৃণার তরঙ্গ উঠিয়া তাহাকে অভিভূত করিয়া দিল। বিনোদিনীকে বিহারী অত্যন্ত মলিন দেখিল । এক মুহূর্তেই বিহারী ফিরিয়া দাড়াইয়া “মহেন্দ্র” “মহেন্দ্র” করিয়া ডাকিল। এই অপমান পাইয়া বিনোদিনী নম্র মৃদু স্বরে কহিল, “মহেন্দ্র নাই, মহেন্দ্র শহরে গেছে।” বিহারী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে বিনোদিনী কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, তোমার পায়ে ধরি, একটুখানি বসিতে হইবে।” চোখের বালি ২২৩ বিহারী কোনো মিনতি শুনিবে না মনে করিয়াছিল, একেবারে এই ঘৃণার দৃপ্ত হইতে এখনই নিজেকে দূরে লইয়া যাইবে স্থির করিয়াছিল, কিন্তু বিনোনীির করু৭ অনুনয়ম্বর শুনিবা মাত্র ক্ষণকালের জন্ত তাহার পা যেন আর উঠিল না। বিনোদিনী কহিল, “আজ যদি তুমি বিমুখ হইয়া এমন করিয়া চলিয়া যাও, তবে আমি তোমারই শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি মরিব।” : বিহারী তখন ফিরিয়া দাড়াইয়া কহিল, “বিনোদিনী, তোমার জীবনের সঙ্গে আমাকে তুমি জড়াইবার চেষ্টা করিতেছ কেন । আমি তোমার কী করিয়াছি। আমি তো কখনো তোমার পথে দাড়াই নাই, তোমার স্বখদু:খে হস্তক্ষেপ করি নাই ।” বিনোদিনী কহিল, “তুমি আমার কতখানি অধিকার করিয়াছ তাহা একবার তোমাকে জানাইয়াছি— তুমি বিশ্বাস কর নাই। তবু আজ আবার তোমার বিরাগের মুখে সেই কথাই জানাইতেছি। তুমি তো আমাকে না বলিয়া জানাইবার, লজ্জা করিয়া জানাইবার, সময় দাও নাই । তুমি আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়াছ, তবু আমি তোমার পা ধরিয়া বলিতেছি, আমি তোমাকে—” - বিহারী বাধা দিয়া বলিল, “সে কথা আর বলিয়ে না, মুখে আনিয়ে না । সে কথা বিশ্বাস করিবার জো নাই ।” n বিনোদিনী । সে কথা ইতর লোকে বিশ্বাস কৰিতে পারে না, কিন্তু তুমি করিবে । সেইজন্ত একবার আমি তোমাকে বসিতে বলিতেছি । বিহারী। আমি বিশ্বাস করি বা না করি, তাতে কী আসে যায়। তোমার জীবন যেমন চলিতেছে তেমনি চলিবে তো । বিনোদিনী । আমি জানি তোমার ইহাতে কিছুই আসিবে-যাইবে না। আমার ভাগ্য এমন যে, তোমার সম্মান রক্ষা করিয়া তোমার পাশে দাড়াইবার আমার কোনো উপায় নাই। চিরকাল তোমা হইতে আমাকে দূরেই থাকিতে হইবে । আমার মন তোমার কাছে এই দাবিটুকু কেবল ছাড়িতে পারে না যে, আমি যেখানে থাকি আমাকে তুমি একটুকু মাধুর্ষের সঙ্গে ভাবিবে। আমি জানি, আমার উপরে তোমার অল্প একটু শ্রদ্ধা জন্সিয়াছিল, সেইটুকু আমার একমাত্র সম্বল করিয়া রাখিব । সেইজন্ত আমার সব কথা তোমাকে শুনিতে হইবে। আমি হাতজোড় করিয়া বলিতেছি ঠাকুরপো, একটুখানি বোলো । * “আচ্ছা চলো” বলিয়া বিহারী এখান হইতে অন্যত্র কোথাও যাইতে উদ্যত হইল । ३ ३ 8 চোখের বালি বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, যাহা মনে করিতেছ তাহা নহে। এ ঘরে কোনো কলঙ্ক স্পর্শ করে নাই। তুমি এই ঘরে একদিন শয়ন করিয়াছিলে— এ ঘর তোমার জন্যই উৎসর্গ করিয়া রাখিয়াছি, ঐ ফুলগুলা তোমারই পূজা করিয়া আজ শুকাইয়া পড়িয়া আছে । এই ঘরেই তোমাকে বসিতে হইবে।” শুনিয়া বিহারীর চিতে পুলকের সঞ্চার হইল। ঘরের মধ্যে সে প্রবেশ করিল। বিনোদিনী দুই হাত দিয়া তাহাকে খাট দেখাইয়া দিল । বিহারী খাটে গিয়া বলিল, বিনোদিনী ভূমিতলে তাহার পায়ের কাছে উপবেশন করিল। বিহারী ব্যস্ত হইয়া উঠিতেই বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, তুমি বোলো। আমার মাথা খাও, উঠিয়ে না। আমি তোমার পায়ের কাছে বলিবারও যোগ্য নই, তুমি দয়া করিয়াই সেখানে স্থান দিয়াছ। দূরে থাকিলেও এই অধিকারটুকু আমি রাখিব।” এই বলিয়া বিনোদিনী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তাহার পরে হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া কহিল, “তোমার খাওয়া হইয়াছে ঠাকুরপো ?” বিহারী কহিল, “স্টেশন হইতে খাইয়া আসিয়াছি।” বিনোদিনী । আমি গ্রাম হইতে তোমাকে যে চিঠিখানি লিখিয়াছিলাম, তাহা খুলিয়া, কোনো জবাব না দিয়া, মহেন্দ্রের হাত দিয়া আমাকে ফিরাইয়া পাঠাইলে কেন । 峰 বিহারী । সে চিঠি তো আমি পাই নাই। বিনোদিনী । এবারে মহেঞ্জের সঙ্গে কলিকাতায় কি তোমার দেখা হইয়াছিল। বিহারী। তোমাকে গ্রামে পৌছাইয়া দিবার পরদিন মহেক্সের সঙ্গে দেখা হুইয়াছিল, তাহার পরেই আমি পশ্চিমে বেড়াইতে বাহির হইয়াছিলাম, তাহার ज८ण उपांग्न रमथां एम्ल नांहे । 輸 বিনোদিনী । তাহার পূর্বে জার-এক দিন আমার চিঠি পড়িয়া উত্তর না দিয়া । ফিরাইয়া পাঠাইয়াছিলে ? বিহারী । না, এমন কখনোই হয় নাই । বিনোদিনী স্তজিত হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “সমস্ত বুঝিলাম। এখন আমার সব কথা তোমাকে বলি। যদি বিশ্বাস করতে ভাগ মানিব, যদি না করতে তোমাকে দোষ দিব না ; আমাকে বিশ্বাল করা কঠিন।" বিহারীর হৃদয় তখন আর্জ হইয়া গেছে । এই ভক্তিভারনম্র বিনোদিনীর পূজাকে সে কোনোমতেই অপমান করিতে পারিল না । সে কহিল, “বোঠান, চোখের বালি ૨ર ઉ তোমাকে কোনো কথাই বলিতে হইবে না, কিছু না শুনিয়া আমি তোমাকে বিশ্বাস করিতেছি। আমি তোমায় ঘৃণা করিতে পারি না । তুমি আর-একটি কথাও বলিয়ো না ।" শুনিয়া বিনোদিনীর চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল, সে বিহারীর পায়ের ধুলা মাথায় তুলিয়া লইল । কহিল, “সব কথা না বলিলে আমি বাচিব না। একটু ধৈর্ষ ধরিয়া শুনিতে হইবে— তুমি আমাকে যে আদেশ করিয়াছিলে, তাহাই আমি শিরোধার্ঘ করিয়া লইলাম। যদিও তুমি আমাকে পত্রটুকুও লেখ নাই, তবু আমি আমার সেই গ্রামে লোকের উপহাস ও নিন্দা সহ করিয়া জীবন কাটাইয়া দিতাম, তোমার স্নেহের পরিবর্তে তোমার শাসনই আমি গ্রহণ করিতাম— কিন্তু বিধাত তাহাতেও বিমুখ হইলেন। আমি যে পাপ জাগাইয়া তুলিয়াছি তাহা আমাকে নির্বাসনেও টিকিতে দিল না। মহেন্দ্র গ্রামে আসিয়া, আমার ঘরের দ্বারে আসিয়া, আমাকে সকলের সম্মুখে লাঞ্ছিত করিল। সে গ্রামে আর আমার স্থান হইল না । দ্বিতীয় বার তোমার আদেশের জন্য তোমাকে অনেক খুজিলাম, কোনোমতেই তোমাকে পাইলাম না ; মহেন্দ্র আমার খোলা চিঠি তোমার ঘর হইতে ফিরাইয়া লইয়া আমাকে প্রতারণা করিল। বুঝিলাম, তুমি আমাকে একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছ। ইহার পরে আমি একেবারেই নষ্ট হইতে পারিতাম— কিন্তু তোমার কী গুণ আছে, তুমি দূরে থাকিয়াও রক্ষা করিতে পায়— তোমাকে মনে স্থান দিয়াছি বলিয়াই আমি পবিত্র হইয়াছি— একদিন তুমি আমাকে দূর করিয়া দিয়া নিজের যে পরিচয় দিয়াছ তোমার সেই কঠিন পরিচয়,কঠিন সোনার মতে,কঠিন মানিকের মতে, আমার মনের মধ্যে রহিয়াছে, আমাকে মহামূল্য করিয়াছে। দেব, এই তোমার চরণ ছুইয়া বলিতেছি সে মূল্য নষ্ট হয় নাই।” বিহারী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিনোদিনীও আর কোনো কথা কহিল না । অপরাঙ্কুের আলোক প্রতি ক্ষণে মান হইয়া আসিতে লাগিল। এমন সময় মহেন্দ্র ঘরের দ্বারের কাছে জালিয়া বিহারীকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। বিনোদিনীর প্রতি তাহার যে-একটা ঔদাসীন্ত জন্মিতেছিল ঈর্ষার তাড়নায় তাহা দূর হইবার উপক্রম হইল। বিনোদিনী বিহারীর পায়ের কাছে স্তন্ধ হইয়া বসিয়া আছে দেখিয়া, প্রত্যাখ্যাত মহেন্দ্রের গর্বে আঘাত লাগিল। বিনোদিনীর সহিত বিহারীর চিঠিপত্র দ্বারা এই মিলন ঘটিয়াছে, ইহাতে তাহার আর সন্দেহ রহিল না। এতদিন বিহারী বিমুখ হইয়া ছিল, এখন সে যদি নিজে আসিয়া ধরা দেয় তবে বিনোদিনীকে ঠেকাইবে কে । মহেন্দ্র বিনোদিনীকে ত্যাগ করিতে পারে, কিন্তু আর-কাহারো } (t २३* চোখের বালি হাতে ত্যাগ করিতে পারে না তাহা আজ বিহারীকে দেখিয়া বুঝিতে পারিল। ব্যর্থরোলে তীব্র বিদ্রুপের স্বরে মহেন্দ্র বিনোদিনীকে কহিল, “এখন ভৰে রঙ্গভূমিতে মহেক্সের প্রস্থান, বিহারীর প্রবেশ। দৃগুটি স্বন্দর– হাততালি দিতে ইচ্ছা হইতেছে । কিন্তু আশা করি, এই শেষ অঙ্ক, ইহার পরে আর-কিছুই ভালো লাগিবে না ।” বিনোদিনীর মুখ রক্তিম হইয়া উঠিল । মহেক্সের আশ্রয় লইতে যখন তাহাকে বাধ্য হইতে হইয়াছে, তখন এ অপমানের উত্তর তাহার আর কিছুই নাই— ব্যাকুল দৃষ্টিতে সে কেবল একবার বিহারীর মুখের দিকে চাহিল । বিহারী খাট হইতে উঠিল ; অগ্রসর হইয়া কছিল, “মহেক্স, তুমি বিনোদিনীকে কাপুরুষের মতো অপমান করিয়ো না— তোমার ভদ্রত যদি তোমাকে নিষেধ না করে, তোমাকে নিষেধ করিবার অধিকার অামার আছে।” মহেন্দ্ৰ হাসিয়া কছিল, “ইহারই মধ্যে অধিকার সাব্যস্ত হইয়া গেছে ? আজ তোমার নূতন নামকরণ করা যাক— বিনোদবিহারী ।” * বিহারী অপমানের মাত্রা চড়িতে দেখিয়া মহেন্দ্রের হাত চাপিয়া ধরিল । কহিল, *মহেন্দ্র, বিনোদিনীকে আমি বিবাহ করিব, তোমাকে জানাইলাম ; অতএব এখন হইতে সংযতভাবে কথা কও ” শুনিয়া মহেন্দ্র বিস্ময়ে নিস্তব্ধ হইয়া গেল, এবং বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল— বুকের মধ্যে তাহার সমস্ত রক্ত তোলপাড় করিতে লাগিল । - বিহারী কহিল, “তোমাকে আর-একটি খবর দিবার আছে— তোমার মাতা মৃত্যুশয্যায় শয়ান, তাহার বাচিবার কোনো আশা নাই। আমি আজ রাত্রের গাড়িতেই যাইব— বিনোদিনীও আমার সঙ্গে ফিরিবে ।” বিনোদিনী চমকিয়া উঠিল ; কহিল, “পিসিমার অস্থখ ?” বিহারী কহিল, “সারিবার অসুখ নহে । কখন কী হয় বলা যায় না।” মহেন্দ্র তখন আল্প-কোনো কথা না বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল । বিনোদিনী তখন বিহারীকে বলিল, “যে কথা তুমি বলিলে তাহ তোমার মুখ দয়া কেমন করিয়া বাহির হইল। , এ কি ঠাট্টা ।” বিহারী কহিল, “না, আমি সত্যই বলিয়াছি, তোমাকে আমি বিবাহ করিব।” বিনোদিনী । এই পাপিষ্ঠাকে উদ্ধার করিবার জন্য ? বিহারী । না । আমি তোমাকে ভালোবাসি বলিয়া, শ্রদ্ধা করি বলিয়া । বিনোদিনী । এই আমার শেষ পুরস্কার হইয়াছে। এই বেটুকু স্বীকার করিলে, চোখের বালি २२१ ইহার বেশি আর আমি কিছুই চাই না। পাইলেও তাহ থাকিবে না, ধর্ম কখনো তাহা সহ করিবেন না । বিহারী । কেন করিবেন না। বিনোদিনী । ছিছি, এ কথা মনে করিতে লজ্জা হয়। আমি বিধবা, জামি নিন্দিতা, সমস্ত সমাজের কাছে আমি তোমাকে লাঞ্ছিত করিব, এ কখনো হইতেই পারে না । ছিছি, এ কথা তুমি মুখে আনিয়ে না। বিহারী। তুমি আমাকে ত্যাগ করিবে ? বিনোদিনী । ত্যাগ করিবার অধিকার আমার নাই। তুমি গোপনে অনেকের অনেক ভালো কর— তোমার একটা-কোনো ব্রতের একটা-কিছু ভার আমার উপর সমর্পণ করিয়ো, তাহাই বহন করিয়া আমি নিজেকে তোমার সেবিকা বলিয়া গণ্য করিব। কিন্তু ছিছি, বিধবাকে তুমি বিবাহ করিবে! তোমার ঔদার্ধে সব সম্ভব হইতে পারে, কিন্তু আমি যদি এ কাজ করি, তোমাকে সমাজে নষ্ট করি, তবে ইহজীবনে আমি আর মাথা তুলিতে পারিব না। বিহারী । কিন্তু বিনোদিনী, আমি তোমাকে ভালোবাসি । বিনোদিনী । সেই ভালোবাসার অধিকারে আমি আজ একটিমাত্র স্পর্ধা প্রকাশ করিব । বলিয়া বিনোদিনী ভূমিষ্ঠ হইয়া বিহারীর পদাঙ্গুলি চুম্বন করিল। পায়ের কাছে বসিয়া কহিল, “পরজন্মে তোমাকে পাইবার জন্য আমি তপস্তা করিব— এ জন্মে আমার আর-কিছু আশা নাই, প্রাপ্য নাই। আমি অনেক দুঃখ দিয়াছি, অনেক দুঃখ পাইয়াছি, আমার অনেক শিক্ষা হইয়াছে। সে শিক্ষা যদি তুলিতাম, তবে আমি তোমাকে হীন করিয়া আরো হীন হইতাম । কিন্তু তুমি উচ্চ আছ বলিয়াই আজ আমি আবার মাথা তুলিতে পারিয়াছি– এ আশ্রয় আমি ভূমিলাং করিব না।” 劇 বিহারী গম্ভীরমুখে চুপ করিয়া রহিল। বিনোদিনী হাতজোড় করিয়া কহিল, “ভুল করিয়ো না— আমাকে বিবাহ করিলে তুমি মুখী হইবে না, তোমার গৌরব যাইবে— আমিও সমস্ত গৌরব হারাইব । তুমি চিরদিন নির্লিপ্ত, প্রসন্ন। আজও তুমি তাই থাকো— আমি দূরে থাকিয়া তোমার কর্ম করি। তুমি প্রসন্ন হও, তুমি মুখী হও।”