চোখের বালি ३३३ আশা কহিল, “তুমি একবার নিজে দেখিবে এসো— আমার তো বোধ হয়, ব্যামো আরো বাড়িয়াছে।” 疇 彎 তখন বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্র বাহিরে দাড়াইয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। আশা বাড়ির কর্তৃত্ব অনায়াসে গ্রহণ করিয়াছে— সে মহেন্দ্রকে কেমন সহজে ঘরে ঢুকিতে নিষেধ করিল। না করিল সংকোচ, না করিল অভিমান। মহেঞ্জের বল আজ কতখানি কমিয়া গেছে। সে অপরাধী, সে বাহিরে চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল— মার ঘরেও ঢুকিতে পারিল না। তাহার পরে ইহাও আশ্চর্য— বিহারীর সঙ্গে আশা কেমন অকুষ্ঠিত ভাবে কথাবার্তা কহিল । সমস্ত পরামর্শ তাহারই সঙ্গে । সেই আজ সংসারের একমাত্র রক্ষক, সকলের স্বহৃৎ । তাহার গতিবিধি সর্বত্র, তাহার উপদেশেই সমস্ত চলিতেছে। মহেন্দ্র কিছুদিনের জন্য যে জায়গাটি ছাড়িয়া চলিয়া গেছে, ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, সে জায়গা ঠিক আর তেমনটি নাই । বিহারী ঘরে ঢুকিতেই রাজলক্ষ্মী তাহার করুণ চক্ষু তাহার মুখের দিকে রাখিয়া কহিলেন, “বিহারী, ফিরিয়াছিস ?” বিহারী কহিল, “ই মা, ফিরিয়া আসিলাম।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “তোর কাজ শেষ হইয়া গেছে ?” বলিয়া তাহার মুখের দিকে একাগ্ৰদূষ্টিতে চাহিলেন । বিহারী প্রফুল্লমুখে “ই মা, কাজ স্বসম্পন্ন হইয়াছে, এখন আমার আর-কোনো ভাবনা নাই” বলিয়া একবার বাহিরের দিকে চাহিল। রাজলক্ষ্মী । আজ বউমা তোমার জন্য নিজের হাতে রাধিবেন, আমি এখান হইতে দেখাইয়া দিব । ডাক্তার বারণ করে— কিন্তু আর বারণ কিসের জন্তু বাছা । আমি কি একবার তোদের খাওয়া দেখিয়া যাইব না । বিহারী কহিল, “ডাক্তারের বারণ করিবার তো কোনো হেতু দেখি না মা— তুমি না দেখাইয়া দিলে চলিবে কেন । ছেলেবেলা হইতে তোমার হাতের রান্নাই আমরা ভালোবাসিতে শিথিয়াছি— মহিনদার তো পশ্চিমের ডালরুটি খাইয়া অরুচি ধরিয়া গেছে— আজ সে তোমার মাছের ঝোল পাইলে বাচিয়া যাইবে । আজ আমরা দুই ভাই ছেলেবেলাকার মতো রেষারেষি করিয়া খাইব, তোমার বউমা অন্নে কুলাইতে পারিলে হয় ।” যদিচ রাজলক্ষ্মী বুঝিয়াছিলেন, বিহারী মহেন্দ্রকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছে, তবু তাহার নাম শুনিতেই তাহার হৃদয় স্পন্দিত হইয়া নিশ্বাস ক্ষণকালের জন্য ఇచిe চোখের বালি কঠিন হইয়া উঠিল। সে ভাবটা কাটিয়া গেলে বিহারী কহিল, “পশ্চিমে গিয়া মহিনদার শরীর অনেকটা ভালো হইয়াছে। আজ পথের অনিয়মে সে একটু মান আছে, স্নানাহার করিলেই শুধরাইয়া উঠিবে।" রাজলক্ষ্মী তবু মহেঞ্জের কথা কিছু বলিলেন না ; তখন বিহারী কহিল, “মা, মহিনদা বাহিরেই দাড়াইয়া আছে, তুমি না ডাকিলে সে তো আসিতে পারিতেছে না ।” রাজলক্ষ্মী কিছু না বলিয়া দরজার দিকে চাহিলেন । চাহিতেই বিহারী ডাকিল, “মহিনদা, এলো ৷” মহেন্দ্র ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। পাছে হৃৎপিণ্ড হঠাৎ স্তন্ধ হইয়া যায় এই ভয়ে রাজলক্ষ্মী মহেঞ্জের মুখের দিকে তখনই চাহিতে পারিলেন না । চক্ষু অর্ধনিমীলিত করিলেন। মহেন্দ্র বিছানার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া চমকিয়া উঠিল, তাহাকে কে যেন মারিল । মহেন্দ্র মাতার পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া পা ধরিয়া পড়িয়া রহিল । বক্ষের ম্পন্দনে রাজলক্ষ্মীর সমস্ত শরীর র্কাপিয়া কঁপিয়া উঠিল । কিছুক্ষণ পরে অন্নপূর্ণ ধীরে ধীরে কহিলেন, “দিদি, মহিনকে তুমি উঠিতে বলো, নহিলে ও উঠিবে না ।” রাজলক্ষ্মী কষ্টে বাক্যশূরণ করিয়া কহিলেন, “মহিন, ওঠ, ।” মহিনের নাম উচ্চারণমাত্র অনেক দিন পরে তাহার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। সেই অশ্র পড়িয়া তাহার হৃদয়ের বেদনা লঘু হইয়। আসিল । তখন মহেন্দ্র উঠিয়া, মাটিতে হাটু গাড়িয়া খাটের উপর বুক দিয়া তাহার মার_পাশে আসিয়া বসিল । রাজলক্ষ্মী কষ্টে পাশ ফিরিয়া দুই হাতে মহেঞ্জের মাথা লইয়া তাহার মস্তক আভ্রাণ করিলেন, তাহার ললাট চুম্বন করিলেন । মহেন্দ্র রুদ্ধকণ্ঠে কহিল, “মা, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়াছি, আমাকে মাপ করো ।” বক্ষ শান্ত হইলে রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “ও কথা বলিস নে মহিন, আমি তোকে মাপ না করিয়া কি বাচি । বউমা, বউমা কোথায় গেল।” আশা পাশের ঘরে পথ তৈরি করিতেছিল— অন্নপূর্ণ তাহাকে ভাকিয় আনিলেন । চোখের বালি ২৩১ তখন রাজলক্ষ্মী মহেক্সকে ভূতল হইতে উঠিয়া তাহার খাটে বসিতে ইঙ্গিত করিলেন। মহেন্দ্র খাটে বসিলে রাজলক্ষ্মী মহেক্সের পার্থে স্থান-নির্দেশ করিয়া আশাকে কহিলেন, “বউমা, এইখানেই তুমি বোলো— আজ আমি একবার তোমাদের দুজনকে একত্রে বসাইয়া দেখিব, তাহা হইলে আমার সকল দুঃখ ঘুচিবে। বউমা, আমার কাছে আর লজ্জা করিয়ো না, আর মহিনের পরেও মনের মধ্যে কোনো অভিমান না রাখিয়া একবার এইখানে বোসো— আমার চোখ জুড়াও মা ।” তখন ঘোমটা-মাথায় আশা লজ্জায় ধীরে ধীরে আসিয়া কম্পিতবক্ষে মহেঞ্জের পাশে গিয়া বসিল । রাজলক্ষ্মী স্বহস্তে আশার ভান হাত তুলিয়া লইয়া মহেক্সের ডান হাতে রাখিয়া চাপিয়া ধরিলেন ; কহিলেন, “আমার এই মাকে তোর হাতে দিয়া গেলাম মহিন— আমার এই কথাটি মনে রাখিস, তুই এমন লক্ষ্মী আর কোথাও পাবি নে। মেজবউ, এসো, ইহাদের একবার আশীর্বাদ করো— তোমার পুণ্যে ইহাদের মঙ্গল হউক।” অন্নপূর্ণ সম্মুখে আসিয়া দাড়াইতেই উভয়ে চোখের জলে তাহার পদধূলি গ্রহণ করিল। অন্নপূর্ণ উভয়ের মস্তকচুম্বন করিয়া কহিলেন, “ভগবান তোমাদের কল্যাণ করুন ।” রাজলক্ষ্মী। বিহারী, এসে বাবা, মহিনকে তুমি একবার ক্ষমা করে। বিহারী তখনই মহেন্দ্রের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইতেই মহেন্দ্র-উঠিয়া দৃঢ় বাছ দ্বারা বিহারীকে বক্ষে টানিয়া লইয়া কোলাকুলি করিল। রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “মহিন, আমি তোকে এই আশীৰ্বাদ করি— শিশুকাল হইতে বিহারী তোর যেমন বন্ধু ছিল চিরকাল তেমনি বন্ধু থাক — ইহার চেয়ে তোর সৌভাগ্য আর-কিছু হইতে পারে না।” এই বলিয়া রাজলক্ষ্মী অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া নিস্তব্ধ হইলেন । বিহারী একটা উত্তেজক ঔষধ তাহার মুখের কাছে আনিয়া ধরিতেই রাজলক্ষ্মী হাত সরাইয়া দিয়া কহিলেন, “আর ওষুধ না বাবা! এখন আমি ভগবানৰুে স্মরণ করি— তিনি আমাকে আমার সমস্ত সংসারদাহের শেষ ওষুধ দিবেন। মহিন, তোরা একটুখানি বিশ্রাম কর গে। বউমা, এইবার রান্না চড়াইয়া দাও।” সন্ধ্যাবেলায় বিহার এবং মহেন্দ্র রাজলক্ষ্মীর বিছানার সম্মুখে নীচে পাত পাড়িয়া খাইতে বসিল। আশার উপর রাজলক্ষ্মী পরিবেশনের ভার দিয়াছিলেন, সে পরিবেশন করিতে লাগিল । ર૭૨ 聽 চোখের বালি মহেক্সের বক্ষের মধ্যে অশ্রু উজবেলিত হইয়া উঠিতেছিল, তাহার মুখে অল্প উঠিতেছিল না। রাজলক্ষ্মী তাহাকে বারবার বলিতে লাগিলেন, “মহিন, তুই কিছুই খাইতেছিল না কেন । ভালো করিয়া খা, আমি দেখি।” বিহারী কহিল, “জানই তো মা, মহিনদা চিরকাল ঐ রকম, কিছুই খাইতে পারে না । বোঠান, ঐ ঘটটা আমাকে আর-একটু দিতে হইবে, বড়ো চমৎকার হইয়াছে।” s রাজলক্ষ্মী খুশি হইয়া ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, “আমি জানি, বিহারী ঐ ঘণ্টটী ভালোবাসে। বউম, ওটুকুতে কী হইবে, আর-একটু বেশি করিয়া দাও।” বিহারী কহিল, “মা, তোমার এই বউটি বড়ো কৃপণ, হাত দিয়া কিছু গলে না।” রাজলক্ষ্মী হাসিয়া কহিলেন, “দেখো তো বউমা, বিহারী তোমারই মুন খাইয়া তোমারই নিন্দ করিতেছে ।” আশা বিহারীর পাতে একরাশ ঘণ্ট দিয়া গেল । বিহারী কহিল, “হায়, হায়, ঘণ্ট দিয়াই আমার পেট ভরাইবে দেখিতেছি, আর ভালো ভালো জিনিস সমস্তই মহিনদার পাতে পড়িবে।” আশা ফিসফিস করিয়া বলিয়া গেল, “নিন্দুকের মুখ কিছুতেই বন্ধ হয় না।” বিহারী মৃদুস্বরে কহিল, “মিষ্টান্ন দিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখো, বন্ধ হয় কি না।” দুই বন্ধুর আহার হইয়া গেলে রাজলক্ষ্মী অত্যন্ত তৃপ্তিবোধ করিলেন । কহিলেন, “বউমা, তুমি শীঘ্ৰ খাইয়া এসো।” রাজলক্ষ্মীর আদেশে আশা খাইতে গেলে তিনি মহেন্দ্রকে কহিলেন, “মহিন, তুই শুইতে যা ।” 峰 মহেন্দ্র কহিল, “এখনই শুইতে যাইব কেন ।” মহেন্দ্র রাত্রে মাতার সেবা করিবে স্থির করিয়াছিল । রাজলক্ষ্মী কোনোমতেই তাহা ঘটিতে দিলেন না । কহিলেন, “তুই শ্রাস্ত আছিল মহিন, তুই শুইতে যা ।” আশা আহার শেষ করিয়া পাখা লইয়া রাজলক্ষীর শিয়রের কাছে আসিয়া বসিবার উপক্রম করিলে, তিনি চুপি চুপি তাহাকে কহিলেন, “বউমা, মহেক্সের বিছানা ঠিক হইয়াছে কি না দেখো গে, সে একলা আছে।” আশা লজ্জায় মরিয়া গিয়া কোনোমতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। ঘরে কেবল বিহার এবং অন্নপূর্ণ রহিলেন । তখন রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “বিহারী, তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। বিনোদিনীর কী হইল বলিতে পারিস ? সে এখন কোথায় ।” চোখের বালি ২৩৩ বিহারী কহিল, “বিনোদিনী কলিকাতায় আছে।” রাজলক্ষ্মী নীরব দৃষ্টিতে বিহারীকে প্রশ্ন করিলেন। বিহারী তাহা বুঝিল । কহিল, “বিনোদিনীর জন্য তুমি আর কিছুমাত্র ভয় করিও না মা ।” রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “সে আমাকে অনেক দুঃখ দিয়াছে বিহারী, তবু তাহাকে আমি মনে মনে ভালোবাসি।” বিহারী কহিল, “সেও তোমাকে মনে মনে ভালোবাসে মা ।” রাজলক্ষ্মী। আমারও তাই বোধ হয় বিহারী । দোষগুণ সকলেরই আছে, কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসিত । তেমন সেবা কেহ ছল করিয়া করিতে পারিত 져 || বিহারী কহিল, “তোমার সেবা করিবার জন্য সে ব্যাকুল হইয়া আছে।” রাজলক্ষ্মী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “মহিনরা তো এখন শুইতে গেছে, রাত্রে তাহাকে একবার আনিলে কি ক্ষতি আছে।” বিহারী কহিল, “ম, সে তো এই বাড়িরই বাহির-ঘরে লুকাইয়া বসিয়া আছে। তাহাকে আজ সমস্ত দিন জলবিন্দু পর্যন্ত মুখে দেওয়াইতে পারি নাই। সে পণ করিয়াছে, যতক্ষণ তুমি তাহাকে ডাকিয়া না মাপ করিবে ততক্ষণ সে জলস্পর্শ করিবে না।” রাজলক্ষ্মী ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, “সমস্ত দিন উপবাস করিয়া আছে ! আহা, তাহাকে ভাব, ডাক্‌ ৷” বিনোদিনী ধীরে ধীরে রাজলক্ষ্মীর ঘরে প্রবেশ করিতেই তিনি বলিয়া উঠিলেন, “ছি ছি বউ, তুমি করিয়াছ কী। আজ সমস্ত দিন উপোস করিয়া আছ ! যাও যাও, আগে খাইয়া লও, তাহার পরে কথা হইবে।” বিনোদিনী রাজলক্ষ্মীর পায়ের ধুলা লইয়া প্ৰণাম করিয়া কহিল, “আগে তুমি পাপিষ্ঠীকে মাপ করে পিসিমা, তবে আমি খাইব ।” রাজলক্ষ্মী । মাপ করিয়াছি বাছা, মাপ করিয়াছি, আমার এখন কাহারো উপর আর রাগ নাই । 椿 বিনোদিনীর ডান হাত ধরিয়া তিনি কহিলেন, “বউ, তোমা হইতে কাহারো মন্দ না হউক, তুমিও ভালো থাকো ।” বিনোদিনী । তোমার আশীর্বাদ মিথ্যা হইবে না পিসিমা, আমি তোমার পা ছুইয়া বলিতেছি, আমা হইতে এ সংসারের মন্দ হইবে না । অন্নপূর্ণাকে বিনোদিনী ভূমিষ্ঠ হইয়া প্ৰণাম করিয়া খাইতে গেল। খাইয়া ২৩৪ | চোখের বালি 鄂 আসিলে পর রাজলক্ষ্মী তাহার দিকে চাহিয়া কছিলেন, "উ, এখন তুমি ভৰে চলিলে ?” বিনোদিনী । পিসিমা, আমি তোমার সেবা করিব। ঈশ্বর সাক্ষী, আমা হইতে তুমি কোনো অনিষ্ট আশঙ্কা করিয়ো না । রাজলক্ষ্মী বিহারীর মুখের দিকে চাহিলেন । বিহার একটু চিস্তা করিয়া কহিল, “বোঠান থাকুন মা, তাহাতে ক্ষতি হইবে না।” রাত্রে বিহারী বিনোদিনী এবং অন্নপূর্ণ তিনজনে মিলিয়া রাজলক্ষ্মীর শুশ্রুষা করিলেন । এ দিকে আশ সমস্ত রাত্রি রাজলক্ষ্মীর ঘরে আসে নাই বলিয়া লজ্জায় অত্যন্ত প্রত্যুষে উঠিয়াছে। মহেন্দ্রকে বিছানায় স্থপ্ত অবস্থায় রাখিয়া তাড়াতাড়ি মুখ ধুইয়া কাপড় ছাড়িয়া প্রস্তুত হইয়া আসিল । তখনো অন্ধকার একেবারে যায় নাই। রাজলক্ষ্মীর স্বারের কাছে আসিয়া যাহা দেখিল তাহাতে আশা অবাক হইয়া গেল । ভাবিল, “একি স্বপ্ন । বিনোদিনী একটি ম্পিরিট-ল্যাম্প, জালিয়া জল গরম করিতেছে। বিহারী রাত্রে ঘুমাইতে পায় নাই, তাহার জন্য চা তৈরি হইবে। আশাকে দেখিয়া বিনোদিনী উঠিয়া দাড়াইল । কহিল, “আমি আমার সমস্ত অপরাধ লইয়া তোমার আশ্রয় গ্রহণ করিলাম— আর কেহ আমাকে দূর করিতে পারিবে না— কিন্তু তুমি যদি বল যাও তো আমাকে এখনই যাইতে হইবে।” আশা কোনো উত্তর করিতে পারিল না— তাহার মন কী বলিতেছে তাও সে যেন ভালো করিয়া বুঝিতে পারিল না, অভিভূত হইয়া রহিল। বিনোদিনী কহিল, “আমাকে কোনোদিন তুমি মাপ করিতে পারিবে না— সে চেষ্টাও করিয়ো না। কিন্তু আমাকে আর ভয় করিয়ো না । যে কয়দিন পিসিমার দরকার হইবে সেই ক'টা দিন আমাকে একটুখানি কাজ করিতে দাও, তার পরে আমি চলিয়া যাইব ।” কাল রাজলক্ষ্মী যখন আশার হাত লইয়া মহেন্দ্রের হাতে দিলেন, তখন আশা তাহার মন হইতে সমস্ত অভিমান মুছিয়া ফেলিয়া সম্পূর্ণভাবে মহেক্সের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছিল। আজ বিনোদিনীকে সম্মুখে দেখিয়া তাহার খণ্ডিত প্রেমের দাহ আর শাস্তি মানিল না। ইহাকে মহেন্দ্র একদিন ভালোবাসিয়াছিল, ইহাকে এখনো হয়তো মনে মনে ভালোবাসে— এ কথা তাহার বুকের ভিতরে ঢেউয়ের মতো ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরেই মহেন্দ্র জাগিয়া চোখের বালি ఇ\రిe ' উঠবে, বিনোদিনীকে দেখিবে— কী জানি কী চক্ষে দেখিবে। কাল রাত্রে আশা তাহার সমস্ত সংসারকে নিষ্কণ্টক দেখিয়াছিল—আজ প্রত্যুষে উঠিয়াই দেখিল, কাটগাছ তার ঘরের প্রাঙ্গণেই । সংসারে মুখের স্থানই সব চেয়ে সংকীর্ণ, কোথাও তাহাকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে রাখিবার অবকাশ নাই । হৃদয়ের ভার লইয়া আশা রাজলক্ষ্মীর ঘরে প্রবেশ করিল এবং অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে কহিল, “মাসিম, তুমি সমস্ত রাত বসিয়া আছ — যাও, শুতে যাও।” অন্নপূর্ণ আশার মুখের দিকে একবার ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিলেন। তাহার পরে শুইতে না গিয়া আশাকে নিজের ঘরে লইয়া গেলেন। কহিলেন, “চুনি, যদি মুখী হইতে চাস, তবে সব কথা মনে রাখিল নে। অন্তকে দোষী করিয়া যেটুকু মুখ, দোষ মনে রাখিবার দুঃখ তাহার চেয়ে ঢের বেশি ।” আশা কহিল, “মাসিম, আমি মনে কিছু পুষিয়া রাখিতে চাই না, আমি ভুলিতেই চাই, কিন্তু ভুলিতে দেয় না যে ” অন্নপূর্ণ। বাছা, তুই ঠিক বলিয়াছিল— উপদেশ দেওয়া সহজ, উপায় বলিয়া দেওয়াই শক্ত। তবু আমি তোকে একটা উপায় বলিয়া দিতেছি । যেন ভুলিয়াছিল এই ভাবটি অন্তত বাহিরে প্রাণপণে রক্ষা করিতে হইবে— আগে বাহিরে ভুলিতে আরম্ভ করিস, তাহা হইলে ভিতরেও ভুলিবি। এ কথা মনে রাখিস চুনি, তুই যদি না ভুলিস তবে অন্যকেও স্মরণ করাইয়া রাখিবি ! তুই নিজের ইচ্ছায় না পারিস, আমি তোকে আজ্ঞা করিতেছি, তুই বিনোদিনীর সঙ্গে এমন ব্যবহার কর, যেন সে কখনো তোর কোনো অনিষ্ট করে নাই এবং তাহার দ্বারা তোর অনিষ্টের কোনো আশঙ্কা নাই । আশা নম্ৰমুখে কহিল, “কী করিতে হইবে, বলে ।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “বিনোদিনী এখন বিহারীর জন্যে চা তৈরি করিতেছে। তুই দুধ-চিনি-পেয়ালা সমস্ত লইয়া যা— দুইজনে মিলিয়া কাজ কর।” আশা,আদেশপালনের জন্য উঠিল । অন্নপূর্ণ কহিলেন, “এটা সহজ— কিন্তু আমার আর-একটি কথা আছে, সেটা আরো শক্ত— সেইটে তোকে পালন করিতেই হইবে । মাঝে মাঝে মহেন্দ্রের সঙ্গে বিনোদিনীর দেখা হইবেই, তখন তোর মনে কী হইবে তাহা আমি জানি– সে সময় তুই গোপন কটাক্ষেও মহেঞ্জের ভাব কিংবা বিনোদিনীর ভাব দেখিবার চেষ্টামাত্রও করিস নে । বুক ফাটিয়া গেলেও, তোকে অবিচলিত থাকিতে হইবে। মহেন্দ্র ইহা জানিবে যে, তুই সন্দেহ করিস না, শোক করিয় না, তোর মনে ভয় নাই, চিস্তা নাই— জোড় ভাঙিবার পূর্বে যেমন ছিল RV9\9 চোখের বালি জোড় লাগিয়া আবার ঠিক তেমনি হইয়াছে— ভাঙনের দাগটুকুও মিলাইয়া গেছে। মহেক্স কি আর-কেহ তোর মুখ দেখিয়া নিজেকে অপরাধী বলিয়া মনে করিবে না। চুনি, ইহা আমার অনুরোধ বা উপদেশ নহে, ইহা তোর মাসিমার আদেশ । আমি যখন কাশী চলিয়া যাইব, আমার এই কথাটি একদিনের জন্তও জুলিস নে ৷” আশা চায়ের পেয়ালা প্রভৃতি লইয়া বিনোদিনীর কাছে উপস্থিত হইল, কহিল, “জল কি গরম হইয়াছে ? আমি চায়ের দুধ আনিয়াছি।” বিনোদিনী আশ্চর্ষ হইয়া আশার মুখের দিকে চাহিল। কহিল, “বিহারীঠাকুরপো বারান্দায় বসিয়া আছেন, চা তুমি তাহার কাছে পাঠাইয়া দাও, আমি ততক্ষণ পিলিমার জন্য মুখ ধুইবার বন্দোবস্ত করিয়া রাখি। তিনি বোধ হয় এখনই উঠিবেন।” ( বিনোদিনী চা লইয়া বিহারীর কাছে গেল না - বিহারী ভালোবাসা স্বীকার করিয়া তাহাকে যে অধিকার দিয়াছে, সেই অধিকার স্বেচ্ছামতে খাটাইতে তাহার সংকোচ বোধ হইতে লাগিল । অধিকার লাভের যে মর্যাদা আছে সেই মর্যাদা রক্ষা করিতে হইলে অধিকার প্রয়োগকে সংযত করিতে হয়। যতটা পাওয়া যায় ততটা লইয়া টানাটানি করা কাঙালকেই শোভা পায়— ভোগকে খর্ব করিলেই সম্পদের যথার্থ গৌরব । )এখন বিহারী তাহাকে নিজে না ডাকিলে, কোনো-একটা উপলক্ষ করিয়া বিনোদিনী তাহার কাছে আর যাইতে পারে না। বলিতে-বলিতেই মহেন্দ্র আসিয়া উপস্থিত হইল। আশার বুকের ভিতরটা যদিও ধড়াল করিয়া উঠিল, তবু সে আপনাকে সংবরণ করিয়া লইয়া স্বাভাবিক স্বরে মহেন্দ্রকে কহিল, “তুমি এত ভোরে উঠিলে যে ? পাছে আলো লাগিয়া তোমার ঘুম ভাঙে, তাই আমি জানলা-দরজা সব বন্ধ করিয়া আসিয়াছি।” বিনোদিনীর সন্মুখেই আশাকে এইরূপ সহজভাবে কথা কহিতে শুনিয়া মহেঞ্জের বুকের একটা পাথর যেন নামিয়া গেল। সে আনন্দিতচিত্তে কহিল, “মা কেমন আছেন তাই দেখিতে আসিয়াছি— মা কি এখনো ঘুমাইতেছেন।” আশা কহিল, “ই, তিনি ঘুমাইতেছেন, এখন তুমি যাইয়ে না। বিহারীঠাকুরপো বলিয়াছেন, তিনি আজ অনেকটা ভালো আছেন । অনেক দিন পরে কাল তিনি সমস্ত রাত ভালো করিয়া ঘুমাইয়াছেন।” মহেন্দ্র নিশ্চিন্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কাকীমা কোথায় ।” আশা তাহার ঘর দেখাইয়া দিল । চোখের বালি ২৩৭ আশার এই দৃঢ়তা ও সংযম দেখিয়া বিনোদিনীও আশ্চর্ষ হইয়া গেল । মহেন্দ্র ডাকিল, “কাকীমা।” 幽 অন্নপূর্ণ যদিও ভোরে স্বান করিয়া লইয়া এখন পূজায় বলিবেন স্থির করিয়াছিলেন, তবুও তিনি কহিলেন, “আয় মহিন, আয় ।” মহেন্দ্র তাহাকে প্রণাম করিয়া কহিল, “কাকীম, আমি পাপিষ্ঠ, তোমাদের কাছে আসিতে আমার লজ্জা করে ।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “ছি ছি, ও কথা বলিস নে মহিন— ছেলে ধুলা লইয়াও মার কোলে আসিয়া বসে।” মহেন্দ্র। কিন্তু আমার এ ধুলা কিছুতেই মুছিবে না কাকীমা। অন্নপূর্ণ। দুই-একবার ঝাড়িলেই ঝরিয়া যাইবে । মহিন, ভালোই হইয়াছে। নিজেকে ভালো বলিয়া তোর অহংকার ছিল, নিজের পরে বিশ্বাস তোর বড়ো বেশি ছিল, পাপের ঝড়ে তোর সেই গর্বটুকুই ভাঙিয়া দিয়াছে, আর কোনো অনিষ্ট করে নাই । মহেন্দ্র । কাকীমা, এবার তোমাকে আর ছাড়িয়া দিব না, তুমি গিয়াই আমার এই দুৰ্গতি হইয়াছে । অন্নপূর্ণ। আমি থাকিয় যে দুৰ্গতি ঠেকাইয়া রাখিতাম সে দুৰ্গতি একবার ঘটিয়া যাওয়াই ভালো । এখন আর তোর আমাকে কোনো দরকার হইবে না । দরজার কাছে আবার ডাক পড়িল, “কাকিম, আহিকে বসিয়াছ নাকি ৷” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “না, তুই আয় ।” বিহারী ঘরে প্রবেশ করিল। এত সকালে মহেক্সকে জাগ্রত দেখিয়া কহিল, *মহিনদা, আজ তোমার জীবনে এই বোধ হয় প্রথম স্থধোদয় দেখিলে ।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “হা বিহারী, আজ আমার জীবনে প্রথম সূর্যোদয় । বিহারীর বোধ হয় কাকৗমার সঙ্গে কোনো পরামর্শ আছে— আমি যাই ।” বিহারী হাসিয়া কহিল, “তোমাকেও না-হয় ক্যাবিনেটের মিনিস্টার করিয়া লওয়া গেল । তোমার কাছে আমি তো কখনো কিছু গোপন করি নাই— যদি আপত্তি না কর, আজও গোপন করিব না ।” মহেন্দ্র । আমি আপত্তি করিব ! তবে আর দাবি করিতে পারি না বটে । তুমি যদি আমার কাছে কিছু গোপন না কর, তবে আমিও আমার প্রতি আবার শ্রদ্ধা করিতে পারিব । আজকাল মহেক্সের সম্মুখে সকল কথা অসংকোচে বলা কঠিন। বিহারীর মুখে ૨૭ના চোখের বালি বাধিয়া জালিল, তৰু সে জোর করিয়া বলিল, “বিনোদিনীকে বিবাহ করিব এমন একটা কথা উঠিয়াছিল, কাকীমার সঙ্গে সেই সম্বন্ধে আমি কথাবার্তা শেষ করিতে আসিয়াছি।” মহেন্দ্র একান্ত সংকুচিত হইয়া উঠিল। অন্নপূর্ণ চকিত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “এ আবার কী কথা বিহারী।” মহেন্দ্র প্রবল শক্তি প্রয়োগ করিয়া সংকোচ দূর করিল। কহিল, “বিহারী, এ বিবাহের কোনো প্রয়োজন নাই ।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “এ বিবাহের প্রস্তাবে কি বিনোদিনীর কোনো যোগ আছে।” বিহারী কহিল, “কিছুমাত্র না।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “সে কি ইহাতে রাজি হইবে।” মহেন্দ্র বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী কেন রাজি হইবে না কাকীমা। আমি জানি, সে একমনে বিহারীকে ভক্তি করে— এমন আশ্রয় সে কি ইচ্ছা করিয়া ছাড়িয়া দিতে পারে।” বিহারী কহিল, “মহিনদা, আমি বিনোদিনীকে বিবাহের প্রস্তাব করিয়াছি— সে লজ্জার সঙ্গে তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছে।” শুনিয়া মহেন্দ্র চুপ করিয়া রহিল। @ 8 ভালোয়-মন্দয় দুই-তিন দিন রাজলক্ষ্মীর কাটিয়া গেল। একদিন প্রাতে র্তাহার মুখ বেশ প্রসন্ন ও বেদন সমস্ত হ্রাস হইল। সেই দিন তিনি মহেন্দ্রকে ডাকিয়া কহিলেন, “আর আমার বেশিক্ষণ সময় নাই— কিন্তু আমি বড়ো মুখে মরিলাম মহিন, আমার কোনো দুঃখ নাই। তুই যখন ছোটাে ছিলি তখন তোকে লইয় আমার যে আনন্দ ছিল, আজ সেই আনন্দে আমার বুক ভরিয়া উঠিয়াছে— তুই আমার কোলের ছেলে, আমার বুকের ধন— তোর সমস্ত বালাই লইয়া আমি চলিয়া যাইতেছি, এই আমার বড়ো মুখ ।” বলিয়া রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রের মুখে গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন। মহেন্দ্রের রোদন বাধা না মানিয়া উচ্ছ্বসিত হইতে লাগিল । রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “কাদিস নে মহিন । লক্ষ্মী ঘরে রহিল । বউমাকে আমার চাবিটা দিস। সমস্তই আমি গুছাইয়া রাখিয়াছি, তোদের ঘরকন্নার লি নানা তা হল না।(মানেট বা মালি লি নাম