॥ এগার॥
সংগীত

আজকাল বাঙলাদেশে মেয়েদের সঙ্গীত-বিদ্যা-বিশারদতায় কেউ কি কল্পনা করতে পারেন এমন দিন ছিল যখন এই বাঙলায় ভদ্রপরিবারের মেয়েদের মধ্যে সঙ্গীত-চর্চা একেবারে নিষিদ্ধ ছিল—যখন নিজের বাড়ির মেয়েদের কণ্ঠেও প্রকাশ্যে গান শোনা নিতান্ত দুর্লভ ছিল? তাইত ১১ই মাঘে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের গানের আকর্ষণে কলকাতা ভেঙ্গে পড়ত। কিন্তু সে গান ধ্রুপদী চালের গাম্ভীর্য রক্ষা করা গান—সে পেশাদারী গায়িকাদের টপা ঠংরি খেয়ালের মূর্ছনায় মূর্ছনায় চিত্তবিঘূর্ণক গান নয়। রবিমামার সঙ্গে একবার আর একজনদের বাড়ি ব্রহ্মোৎসব সভায় গান গাইতে যাওয়া আমার মনে পড়ে-সে কাশিয়াবাগানের কাছাকাছিই কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে। সেকালে খালি যোড়াসাঁকোয় ১১ই মাঘ হত বটে কিন্তু আদিসমাজী দুই-একজন ভক্ত ব্রাহ্মের বাড়ি নিয়মিত ব্রহ্মোৎসব হত। তাঁরা আদি ব্রাহ্মসমাজের ব্রাহ্ম—তার অর্থ তাঁরা সাধারণ ব্রাহ্মদের মত আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম নন -আদি ব্রাহ্মসমাজের বেদীতে যেসব আচার্যরা বসেন তাঁরাও নন—তাঁরা সমাজের উপাসনা-গৃহে বা উৎসবের সভায় অমূর্ত ব্রহ্মের আরাধক বটে; কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের পূর্ববৎ পৌত্তলিক বিধানের অনুবর্তক। থিওরিতে ও প্র্যাকটিসে তাঁরা এক নন। এইরকম একটি ব্রাহ্ম ছিলেন নবাগানের কাশীশ্বর মিত্র। আমাদের কাশিয়াবাগান বাড়ির ফটকের বাইরেই একটা মস্ত লম্বা পুকুর ছিল। তার আশপাশে গহস্থদের বাস। এ পুকুরে তাদের স্নান করা বাসনমাজাদি কাজ চলত, কিন্তু এর জল মিঠে নয় বলে খাওয়া চলত না। সেই জন্যে আমাদের বাড়ির পুকুর থেকে পাড়ার মেয়েরা খাবার ও রাঁধবার জল নিয়ে যেত। আমাদের পুকুরের নাম ছিল পাড়ায় “মিছরি পুকুর”। কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ির ঘাট ঐ পুকুরের উপর। তাঁর বড় ছেলে শ্রীনাথ মিত্রের স্ত্রীর সঙ্গে আমার মায়ের 'বকুলফুল’ পাতান হয়েছিল। সে বছর তাদের বাড়ির ব্রহ্মোৎসবে রবিমামার ও আমার দুজনেরই গান হল। রবিমামার গলা তখন কি সুমিষ্ট আর তাঁর গান গাওয়া কি ভাব দিয়েই-১১ই মাঘের অক্ষয়বাবুদের দলের গানের সঙ্গে কি তফাৎ। রবিমামা ত একদিন গেয়েই চলে গেলেন, আমার ডাক পড়তে লাগল হপ্তায় হপ্তায় তাঁদের রবিবারের অধিবেশনে। তাছাড়া মধ্যে মধ্যে তাঁদের বাড়ির ভিতরে পারিবারিক আসরেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গানের পর গান গেয়ে যাই নানা রকমের—শ্রান্ত হইনে। সেকালে যোড়া- সাঁকোয় পাতানর রেওয়াজটা খুব ছিল—আমার মায়ের অনেকগুলি পাতান সখী ছিলেন। কাশিয়াবাগানে এসে বকুলফুলের পর হলেন “মিষ্টি হাসি” ইনি বৌবাজারের এটর্নী শ্রীনাথ দাসের পুত্র ‘সময়'- সম্পাদক জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের পত্নী। এদের বাড়িতে আমার জন্যে গানের আড্ডা জমতে লাগল। অবিরাম non-stop গান-চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে। গলা ব্যথাও হত না, শরীর ক্লান্তও হত না। তখন ১০।১১ বছর বয়স আমার। এর পর ব্যারিস্টার ডবলিউ সি ব্যানার্জির পত্নীর বাড়ি মধ্যে মধ্যে সখি-সমিতির অধিবেশন হতে লাগল—তাঁর ননদরা অনেকেই থিয়সফিস্ট ছিলেন। সেখানেও আমার উপর গানের ফরমাসের শেষ নেই। সেকালে মেয়েদের মধ্যে গাইয়ের অপ্রাচুর্যতাবশতঃই আমার এত ডাক ছিল। মনে পড়ে মনোমোহন ঘোষ ব্যারিস্টারের ওখানে বঙ্গ নাটকে ও অন্যান্য বড় সাহেব-মেমকে ডিনার ও ঈভনিং পার্টি দেওয়া উপলক্ষে মিসেস ঘোষ ৪নং থিয়েটার রোড থেকে ছুটে ছুটে কাশিয়াবাগানে আসতেন মা-বাবা ও আমাকে নিমন্ত্রণ করতে। ইংরেজী কায়দা অনুসারে তখনো আমার ডিনার পার্টিতে যাবার বয়স হয়নি—১৪ বছরেরও কম বয়সী আমি। যোলর আগে কেউ বাইরে ডিনারে বসার উপযুক্ত গণ্য হয়। কিন্তু necessity has no law দিশী গান শোনাতেই হবে— সাহেব-মেমদের দেখাতে হবে আমাদের দেশের মেয়েরাও সঙ্গীতবিদ্যায়’ নিপুণ। তাই ইংরেজী গান ও বাজনার জন্যে প্রতিভাদিদি ও দিশীর জন্যে আমার প্রয়োজন ছিল। প্রতিদিদি খুব ভাল পিয়ানো বাজাতেন আর চমৎকার ইংরেজী গান গাইতেন। এমন কি প্রথম প্রথম তাঁর ইংরেজীয়ানা গলায় দিশী গান মানাত না, পরে ইংরেজী ছেড়ে হিন্দী গানেরই চর্চা আরম্ভ করলে তাতেই সুপটু হয়ে উঠলেন।

 এর চেয়েও নিকটস্থ দিনের একটি ঘটনা মনে পড়ে। আমি লাহোর থেকে সেবার কিছু দিনের জন্যে কলকাতায় এসেছি। স্যার রাজেন মুখুয্যের বাড়ি হারকোর্ট বাটলারের বর্মায় গবর্নর হয়ে যাওয়ার উপলক্ষে বিদায় ডিনার পার্টিতে আমার নিমন্ত্রণ হয়েছে। প্রায় একশ লোকের ডিনার। স্যার ও লেডি আর এনের বিশেষ ইচ্ছা সে রাত্রে আমি গান গাই। সে রাতে হঠাৎ যাবার মূহুর্তে মায়ের মোটর গাড়ি বিগড়ে গেল— ডিনারে যাত্রার সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। ইংরেজী ডিনারপার্টি দেশী ভোজের পার্টি নয় যাতে যে যখন খুশী ধীরে সুস্থে গিয়ে উপস্থিত হল। এতে একেবারে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে নিমন্ত্রণ-গৃহে উপস্থিত হওয়া চাই। বাড়ির গাড়ির আশা ছেড়ে ট্যাক্সি আনতে পাঠান হল। ট্যাক্সি আসতে দেরী হচ্ছে, আমি ছটফট করছি। সামনেই আশু চৌধুরীর বাড়ি, সব জানলায় আলো ঝকমক করছে। সেখানে লোক-সমাগম হয়েছে বুঝলুম—নিশ্চয়ই অনেক জানাশুনা লোকের গাড়ি এসেছে। চাকর পাঠান হল, আশুবাবুকে বলে একখানা বাইরে থাকা গাড়ি নিয়ে আসতে—গেরাজ থেকে তাঁর নিজের গাড়ি বের করে আনতে দেরী হবে বলে। চাকর তিভরে ঢুকতেই পারলে না, আশুবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারা ত দূরের কথা। আমি হতাশ্বাসে বসে রইলুম—স্যার ও লেডি রাজেন মুখুয্যেরা কি ভাববেন! এতদূর অভদ্রতা! ইংরেজী ডিনার টেবিলে প্রত্যেকের আসন নির্দিষ্ট থাকে, কে কার পাশে বসবে নাম লেখা থাকে—কেউ অনুপস্থিত হলে শেষ হতে সব বন্দোবস্ত উল্টেপাল্টে যায়, একটা বিশৃঙ্খলা এসে পড়ে। ট্যাক্সি এল কিছু বিলম্বে। আমি কোনক্রমে পৌঁছলুম—সবাই টেবিলে বসতে যাচ্ছেন—আমার জন্যে অপেক্ষা করে করে। যথেষ্ট লজ্জিত হলুম। রাজেন মুখুয্যে বিলম্বের কারণ শুনে বল্লেন—“আমায় একটা টেলিফোন করে দিলেন না কেন—তক্ষুনি গাড়ি পাঠাতুম।”

 ডিনারের পর আমার গান হল। ওঁদের ফরমাস ছিল—ইংরেজী রকমে হার্মোনাইজ করা কোন গান গাইবার। আমি প্রথমে “ওগো বিদেশিনি’’ পরে ‘‘সুন্দর বসন্ত বারেক ফিরাও” গাইলুম। বিদায়কালে অতীব ভদ্র স্যার হারকোর্ট আমার কাছে এসে গভীরভাবে দেহ অবনত করে bow করে আমায় সুমধুর সঙ্গীত-এর জন্য ধন্যবাদ দিলেন। এটার আবশ্যকতা ছিল না, সেইজন্যেই ভদ্রতার অত্যধিকতা।

 স্যার হারকোর্ট বাটলার গবর্নর হিসেবে কি রকম লোক ছিলেন জানিনে—কিন্তু বিলেতের এই বাটলার পরিবার অনেক পুরুষ যাবৎ শিক্ষা ও সৌজন্যে তাঁদের নিজের দেশেও প্রসিদ্ধ। এঁরই ছোট ভাই মণ্টেগু বাটলার লাহোরে ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। তাঁর আসার কিছু পূর্বে লাহোরে অনেক রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেছে, অনেক লোককে জেলে পাঠান হয়েছে। তাঁর শাসনকালেও কিছু কিছু গণ্ডগোল জারি ছিল—কিন্তু ক্রমাগত জেল ভর্তি করার পলিসি তাঁর ছিল না।

 এই সময় “হিন্দুস্থান” নামে লাহোরের সাপ্তাহিক উর্দু রাজনৈতিক পত্রিকা প্রবলপ্রতাপী ছিল। ঘটনাচক্রে আমি তার স্বত্বাধিকারিণী এবং আমার স্বামী ও আমি দুজনে তার পলিসির নিয়স্তা। অনেক খয়ের-খাঁ ‘মুলাকাতের’ দিন আমার স্বামী ও আমার নাম ডেপুটি কমিশনারের কানে তুলত। সর্দার অজিৎ সিংহের সহকর্মী সুফি অম্বাপ্রসাদ একজন বিখ্যাত উর্দু লেখক। তিনি ও তাঁর কয়েকটি সাঙ্গোপাঙ্গ জেল থেকে ছাড়ান পেলেই সেইদিনই আমি তাদের ‘হিন্দুস্থান’এর সম্পাদনা কার্যে নিযুক্ত করলুম। সেটা অতি সাহসিকতার কার্য হল। কিন্তু ডেপুটি কমিশনার মণ্টেগু বাটলার সেজন্যে উতলা হয়ে আমায় রাতারাতি জেলে পাঠালেন না। তার পরদিন আমার স্বামীকে ডেকে বল্লেন, “তোমাদের শত্রু অনেক—বিশেষত তোমার স্ত্রীর। সুফি অম্বাপ্রসাদকে ‘হিন্দুস্থানে’ রেখেছ। সাবধানে কাজ নিও, শেষ পর্যন্ত আমায় যেন এরকম একজন মহিলার বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করতে না হয়।”

 সুফি অম্বাপ্রসাদকে ডেপুটি কমিশনারের কথাটা শোনালে তিনি বল্লেন, “লোহা আমি, গায়ে মধু মেখে বসলেও আমার গা চাটলে জিবে শক্ত লোহারই পরশ লাগবে।” ওডায়ারের রাজত্বকালে সর্দার ও সুফি ভারতবর্ষ থেকে পালিয়ে মুসলমানবেশে তুর্কীতে পৌঁচেছিলেন এই গুজব। তখন ওডায়ারের হকুমে ‘হিন্দুস্থান' বন্ধ হয়েছে। শুনতে পাই ওডায়ারের সময় মণ্টেগু বাটলার পঞ্জাবের এককোণে অনাদৃত হয়ে পড়ে ছিলেন—তাঁর সিনিয়রিটির উপযুক্ত পদ তাঁকে দেওয়া হয়নি। শাসনকর্তার পরিবর্তন হলে অনেককাল পরে তিনি নাগপুরের গবর্নরের পদ পেলেন। তাঁরই ছেলে মিস্টার আর বাটলার বিলাতে Under Secretary of State ছিলেন কিছুকাল। Franchise Commission-এ ভারতবর্ষে আসেন, আমার সঙ্গে কলকাতায় দেখা হয়।

 বম্বে অঞ্চলে মেজমামার কাছে যতবার গিয়ে থেকেছি খাস বম্বেতে যাইনি, বম্বে প্রেসিডেন্সীর মহারাষ্ট্র বিভাগের কোন না কোন শহরে বা লোকালয়ে গেছি যেমন—সোলাপুর, সেতারা, পুণা, পণ্ডরপর, মহাবলেশ্বর ইত্যাদি। সেসব জায়গার বাসিন্দা মারাঠীদের সঙ্গীতকুশলতার যথেষ্ট পরিচয় পেয়েছি। মেয়েদের নয়, পুরুষদের। তাঁদের কণ্ঠে মারাঠী বা হিন্দী উঁচুদরের গান শুনতেই সময় অতিবাহিত হয়েছে। ভাল গলায় ভাল গানের গন্ধ কোথাও পেলে হয়। বিড়াল যেমন মাছের গন্ধে বিহ্বল হয়, আমিও তেমনি গানের গন্ধে উতলা হতুম, যত পারি লিখে নিতুম, শিখে নিতুম। নিজের ভাণ্ডারে না ভরলে আনন্দ পুরো হত না। সেতারায় সোহনি বলে একজন সাবজজ ছিলেন সুগায়ক। তাঁর কাছ থেকে সংগৃহীত একটি হোলির গান চমৎকার—পাঁব লগে কর যোড়ি শ্যাম মুঝে খেল ন হোরি। আর একটি গান ছিল কালী আর গোরীর ঝগড়া। এখানে আমার নিজের গানে সময় নষ্ট হওয়ার প্রশ্রয় দিতুম না, তাতে আমার সংগ্রহের সময়ে অকুলান হয়ে যাবে।

 কিন্তু খাস বম্বে শহরে যখন একবার হপ্তা দু-তিনের জন্যে গিয়ে রইলুম একটি ভাটিয়া ক্রোরপতি বন্ধুর গৃহে—সমুদ্রতীরে ‘দরিয়া মহলে’ তখন আমার নিজের গান শুনান থেকে আর বিশ্রাম পেলুম না। গৃহপতি নারাণজী দ্বারকাদাস, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গোবর্ধন দাস তেজপাল—যিনি অন্য এক প্রভূত ধনী পরিবারে দত্তক গৃহীত হওয়ায় পরিবর্তিতনামা হয়েছিলেন—তাঁদের তিন-চারটি ভগ্নী ও স্ব স্ব পত্নীসহ পুরীর জগন্নাথ দর্শনে তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে কিছুদিন কলকাতায় যাপন করেছিলেন। সেই সময় তাঁদের সুপরিচিত মিত্র এলাহাবাদের চারু মিত্র মহাশয়কে তাঁরা সংবাদ পাঠান। চারুবাবু, আমার পিতার পরম বন্ধু ছিলেন। বম্বের মেয়েদের কলিকাতা পরিদর্শনে সাথী হওয়ার ভার দিলেন তিনি আমার উপর। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে আলিপুরের চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিউজিয়ম এইসব ঘুরে ঘুরে আমার সঙ্গে তাঁদের ভাব হয়ে গেল। বোনেরা কেউ কেউ কৃষ্ণভক্ত পরিবারে বিবাহিত, কেউ কেউ শিবভক্তর ঘরে। বম্বেতে এই দুই সম্প্রদায়ে সেকালে তুমুল বিতণ্ডা চলত—রামপ্রসাদের “পাঁচেই এক, একেই পাঁচ, মন কোরো না দ্বেষাঘেষি’’র উপদেশে কেউ কান দিত না। নারাণজীর এক বড় বোন নন্দীবাঈ বৈষ্ণবের ঘরে পড়েছিলেন। আর তিনি গান গাইতেন ভারি সুন্দর, তাঁর গানের পুঁজিও অনেক ছিল, তার মধ্যে “যা যারে ভম্‌রা দূর দূর যা’’ আমার এখন মনে পড়ছে, কেননা সেটা আমিও আগেই জানতুম। এঁরা সপরিবারে আমার গানের উপর ঝুঁকে পড়লেন। যদিও বাঙলা ভাষায় গান আমার, তবু গুজরাটি ও হিন্দীর সঙ্গে কথার সাদৃশ্যে তাঁরা খুব উপভোগ করতে লাগলেন। খুব রসগ্রাহী রসিক তাঁরা। আমিও যেমন তাঁদের ফরমাস করি, তাঁরাও তেমনি আমাকে একটার পর একটা গানের ফরমাস করেন। দু-একটা গান তাঁদের কণ্ঠস্থ হয়ে গিয়েছিল—“সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে, রিনিকি রিনিকি রিনিঝিনি, মঞ্জু মঞ্জু মঞ্জীরে, রিনিঝিনি ঝিন্নিরে!” এ গানটা যে কতবার আমাকে দিয়ে গাইয়েছেন ঠিক নেই। আমার সঙ্গে তাঁদের খুব মনের মিল হয়ে গেল। নন্দীবাঈ শুধু গান না, গান রচনাও করেন। আমার প্রেমিক হয়ে পড়লেন তিনি, আমার উপর একটা গানই বেঁধে ফেল্লেন। এই পরিবারের সঙ্গে ভাব আমার আজ পর্যন্ত অটুট আছে। অনেকেরই অবস্থান্তর ঘটেছে—ক্রোরপতি থেকে প্রায় কপর্দকহীন হয়েছেন, অনেকেই ইহলোক থেকে চলে গেছেন। কিন্তু যাঁরা বাকী আছেন, অর্থবান হোন নিঃস্ব হোন—আজও বম্বে গেলে আমি তাঁদের খুঁজে পেতে বের করে দেখা করি।

 পুণায় যেবার কংগ্রেস হয়, বাবা-মহাশয়ের সঙ্গে মেজমামা-প্রমুখ আমাদের যেসব আত্মীয়রা দর্শক হয়ে যান, নারাণজী তাঁদের সকলকে নিজের অতিথি করে রাজার হালে রাখেন। আমি সেবার সদ্য মহীশূর গেছি, তাই পুণায় আসতে পারিনি। কিন্তু শুনলুম তাঁদের অতিথিসৎকার যে মাত্রায় হয়েছিল তা বর্ণনীয় নয়।

 বম্বের আর এক পরিবারে আমার গান জমেছিল খুব। সে সম্পূর্ণ বিপরীত circle-এ—মুসলমান মণ্ডলে। জস্টিস বদ্রুদ্দিন তায়েবজীর ভাইঝি-জামাই মিস্টার আকবর হায়দরী কলিকাতায় Accounts Department-এর বড় অফিসার হয়ে আসেন। ইনিই পরে হায়দ্রাবাদের প্রধান মন্ত্রী হন। তাঁর পত্নী আমিনাও স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় আসেন। আমার এক পার্শী পরম বন্ধু ছিলেন বরজোরজি পাদশা, বৃদ্ধ জমসেটজি টাটার দক্ষিণ হস্ত। ইনি হায়দরীদেরও বন্ধু। তাঁর কাছ থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে হায়দরীরা আমার উপর call করে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। অতি সরল সহজ বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওঁদের সঙ্গে আমার—এমন কি তাঁদের ছেলেমেয়ের জন্যে যে মৌলবী সঙ্গে এসেছিল, সেই ‘ওস্তাদজি’র কাছে হপ্তায় ২।৩ দিন মূল ফার্সিতে ওমর খৈয়ম পড়ার বন্দোবস্ত করে দিলেন আমার। আমার ফার্সি পড়ার সখ অনেক দিন থেকে। একবার মেজমামার সঙ্গে বম্বের Watson Hotelএ গিয়ে যখন হপ্তাখানেক থাকি, তার স্বত্বাধিকারী মেজমামার একজন মুসলমান বন্ধু হোটেলে প্রায়ই একবার করে আসতেন আমাদের তদারক করতে। তিনি একদিন একটা কার্ডে চার লাইন উর্দু কবিতা লিখে আমায় উপহার দিলেন। উর্দু পড়তে পারিনে, তিনিই পড়ে শোনালেন ও উর্দু কবিতার রসমাধুর্য বুঝিয়ে দিলেন। উর্দু লেখাটি যেন ছবির টানের মত সুন্দর, কিন্তু আমার অপাঠ্য। সেই পর্যন্ত আমার সখ গেল উর্দু পড়তে ও লিখতে শিখতে। বাড়ি ফিরে এসে কাশিয়াবাগানে উর্দু ওস্তাদ কোথা পাই? একজন মুসলমান ডাকপিয়নকে ধরে, তাকে মাসে দুটাকা বক্সিস দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে তার কাছে উর্দু অক্ষর পরিচয় আরম্ভ করলাম। উর্দু প্রথম ভাগ সেই-ই শেষ করালে। উর্দু শিশুপাঠ্য পুস্তক দেখলুম বাঙলার মত নীরস নয়, হাস্যরসে রসাল। সে বইগুলির যদি এখনও চল থাকে, কেউ আনিয়ে দেখতে পারেন। একটা পাঠের মর্ম আমার মনে পড়ে—একজন রুগী হাকিমের কাছে গিয়ে জিজ্ঞস করলে, “হাকিম সাহেব! খাওয়ার প্রশস্ত সময়টা কি বাৎলে দিন।”

 হাকিম বললেন—“গরীবের যে সময় খাওয়া জুটবে, আর ধনীর যে সময় ক্ষিদে লাগবে।”

 আর একটি—একজন কৃপণ রাধাবাঈয়ের নাচ দেবে ভেবেছে। তাতে কি কি আয়োজন করতে হবে খোঁজ করে শুনলে—তিন মণ তেলের যোগাড় সব প্রথমে দরকার। সারারাত ধরে নাচ চলবে, তাতে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হলে তিন মণ তেলের কম হবে না। শুনেই সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে বললে—“তিন মণ তেলও পড়বে না, রাধাও নাচবে না।” এইসব পাঠগুলি আমার ডাকপেয়াদা ওস্তাদটির সামনে পড়তে বাধ বাধ ঠেকত। চাকর শ্রেণীয়র কাছে ত হেসে গড়াগড়ি যেতে পারিনে, তার সামনে গুরুগম্ভীর হয়ে বানান করে করে পড়ে সে চলে গেলে হেসে বাঁচতুম।

 দাদামশায় সেকালের শিক্ষাবিধি অনুসারে ফার্সিতে অধীত-বিদ্য ছিলেন। সব কবিদের মধ্যে হাফেজ তাঁর প্রিয়তম ছিলেন। হাফেজের একখানি কাব্য-সংগ্রহ সর্বদা তাঁর হাতের কাছেই থাকত। তার থেকে আবৃত্তি করে করে নিজের এক একটা psychological phase ব্যক্ত করতেন।

 যেবার আমি ভারতীতে ‘আহিতাগ্নিকা’ কবিতা ও ঋগ্বেদের মন্ত্র অবলম্বনে ‘শুনঃশেফের বিলাপ’ লিখি দাদামশায়কে ওদুটি পড়ে শোনান হয়। তিনি শুনে খুব প্রীত হন এবং আমায় বলেন—“আমি তোমায় হাফেজের এই কটি লাইন দিচ্ছি, এতে সুর বসিয়ে আমায় গেয়ে শোনাতে পারবে?” আমি বিনম্রভাবে স্বীকৃত হলুম। এক সপ্তাহ পরে তাঁর কাছে খবর গেল—“সুর দেওয়া হয়েছে, যেদিন বলবেন শোনাতে যাব।”

 দ্বিপুদাদার উপর হুকুম জারী হল আয়োজন করতে। বড়মাসিমা প্রভৃতি বাড়ির বড়রা এসে বসলেন ঈজিচেয়ারে ঠেসা দেওয়া অর্ধশায়িত দাদামশায়ের দুপাশে। তাঁর কানে ear trumpet লাগান হল। আমি বেহালা বাজিয়ে হাফেজ গাইলাম আমার দেওয়া সুরে। দাদামশায় মজে মজে শুনতে লাগলেন। তার কিছুদিন পরে দ্বিপুদাদা এলেন আমাদের বাড়িতে কাশিয়াবাগানে। এসে বললেন—“চল আমার সঙ্গে হ্যামিল্টনের দোকানে। কর্তা হুকুম করেছেন তোর জন্যে হাজার টাকার মধ্যে একটা গয়না কিনে দিতে। তোকে এখন জানান বারণ ছিল—যেদিন দেবেন একেবারে হঠাৎ সেদিন জানবি—এই তাঁর ইচ্ছে। কিন্তু আমি ভেবে দেখলুম কি কিনতে কি কিনব শেষকালে তোর যদি না পছন্দ হয়, সুতরাং তোকে বলে দেখিয়ে তোর পছন্দ মত কেনাই ভাল। আর কাউকে বলিসনে এখন—আয়।” হাজার টাকার মধ্যে আমার পছন্দসই জিনিস হ্যামিলটনে নেই, তাই পাশের দোকানে নিয়ে গেলেন দ্বিপুদাদা। সেখানে একটা হীরে ও চুনির সেট, নেকলেস ও এক জোড়া ব্রেসলেট আমার পছন্দ মত কিনলেন। তারপর প্রকাশ্যভাবে আমার একদিন ডাক পড়ল। বাড়ির লোকের সভা লাগল। দাদামশায় নেকলেসটি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন—“তুমি সরস্বতী। তোমার উপযুক্ত না হলেও এই সামান্য ভূষণটি এনেছি তোমার জন্যে।” আমি তাঁর স্বভাবসুলভ সৌজন্যপূর্ণ কথা কয়টিতে অভিভূত হয়ে তাঁর স্নেহের দান অবনতমস্তকে গ্রহণ করলুম। হাফেজের সেই গানটির স্বরলিপি শত গানে আছে। কথাগুলি নিম্নে দিচ্ছিঃ—

দেশাবে চেহেরয়ে জাঁ মেশবদ্‌ গোবারেতনম্‌
খোশাদমেকে জাঁ চেহরা পরদা বরফগনম্‌॥
চঁণী কফস ন সজায়ে চুমনে খোসেল হানেস্তে
রবম্‌ বগোলসনে রেজোঁয়া কে মুরগে চমনম্‌॥

 ইহার সংক্ষেপার্থ এই যে, আমার মত এমন সুকণ্ঠ পাখীর উপযুক্ত এই মর্তলোক নয়, আমি সেই যুগের কাননে যাব, যেখানকার আমি। এই গান তার পরের বছর কংগ্রেস প্রেসিডেণ্ট মিস্টার সিওয়ানি সাহেব যেদিন আমাদের বাড়ি চা খেতে আসেন তাঁকে শোনান হয়েছিল। হিন্দু বাঙালী মেয়ের মুখে বিশুদ্ধ উচ্চারণে (দাদামশায়ের কাছে শেখা) ফার্সি গান শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। এই গান বম্বের মুসলমান পরিবারে আনন্দের তরঙ্গ তুলেছিল, আমাকে তাঁদের আরো নিকটতর করেছিল। কিন্তু এ গান তাঁদের মজলিসে গাওয়া অন্যতম একটি গান মাত্র। আমাদের যেমন সংস্কৃত গান শুনতে ভাল লাগে, কিন্তু তাতে পেট ভরে না—তাঁদেরও তেমনি। অন্যান্য বহু গান হিন্দী ও বাঙলা দুইই—তাঁদের ফরমাসে গেয়ে গেয়ে শেষ হত না। তাঁদের একটি প্রিয় গান ছিল যা প্রতিদিনই একবার করে গাওয়াতেন—সেটি আমার “নমো হিন্দুস্থান”। তার কোরাসে সবাই মিলে যোগও দিতেন।

 বদ্রুদ্দিন তায়েবজীর ছয় ভাই ও তিন-চার বোন, তাঁদের পুত্রকন্যা ও তাঁর নিজেরই দশবারটি সন্তান নিয়ে শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত বৃহৎ পরিবার তাঁদের। হপ্তায় একদিন করে এর বাড়ি ওর বাড়ি বড়দের একত্র ভোজনের একটি নিয়ম বেঁধেছিলেন তাঁরা যাতে পারিবারিক সংহতিটা ঠিক থাকে। তাই পালা পালা করে এ-বাড়ি ও-বাড়িতে আমারও নিমন্ত্রণ থাকত। আমি আসলে অতিথি ছিলুম হায়দরীদের, কিন্তু ‘rage’ বা আগ্রহের বস্তু হলুম সকলের—আমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি করা ফ্যাশন হয়ে পড়ল। মিসেস হায়দরীর পিসতুত বোন জঞ্জিরা দ্বীপের নবাবের বেগম হয়েছিলেন। তাঁর নাম নাজ্‌লি বেগম ও তাঁর ছোট বোন আতিয়া বিবি। নাজ্‌লি বেগমের অনুরোধ আমিনা এড়াতে পারলেন না। কিছুদিনের জন্যে আমায় জঞ্জিরায় নিয়ে যেতে দিলেন। আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর তায়েবজী পরিবারে সঙ্গীতচর্চা ভালরকম করে আরম্ভ হল। আতিয়া ওস্তাদ রেখে গান শিখতে লাগলেন ও ভারতের ক্লাসিকাল সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতার সূচনা করলেন। কংগ্রেস-বিখ্যাত আব্বাস তায়েবজী বদ্রুদ্দিন তায়েবজীর ভ্রাতুষ্পুত্রও বটে, জামাতাও বটে। তাঁর একটি কন্যার গান কংগ্রেসের অনেকেই শুনেছেন—অতি মৃদু মধুর কণ্ঠ তার। তার মুখে মীরাবাঈয়ের গান শুনে সকলে মুগ্ধ হন।

 পঞ্জাবেও আমি যাবার পর থেকে মেয়েদের সঙ্গীতচর্চা ভাল রকম করে হতে থাকল। মাদ্রাজ, মহীশূর ভিন্ন ভারতের আর কোন অংশে মেয়েদের সঙ্গীতজীবন একেবারে বিকশিত দেখিনি—সে সঙ্গীতের তুলনা উত্তর ভারতে নেই। “বন্দে মাতরম্‌”ও আমার গাবার পর থেকে ক্রমে ক্রমে ভারতে সর্বত্র মেয়েদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগল। “বন্দে মাতরম্‌”এর কথায় মনে পড়ে দিল্লী থেকে একজন বৃদ্ধ বড় ইংরেজ ব্যারিস্টার একবার লাহোরে একটা মকদ্দমায় এসেছিলেন। আমাদের বাড়ি চা-য়ে এসে সেই সময় বাঙলার অফিসারদের দ্বারা স্থানে স্থানে নিষিদ্ধ গানটি শুনতে কৌতুহল প্রকাশ করেন। আমি গাইলুম—পিয়ানো সহযোগে। তিনি শুনে বললেন-By Jove! কথা বুঝি না বুঝি তোমার গাওয়া শুনে বুঝছি কি তুমুল আলোড়ন আনতে পারে মনে। আমার স্বামীর দিকে ফিরে বললেন—“আমি যদি Bengal Government হতুম তোমার স্ত্রীর বিরদ্ধে externment order জারী করতুম, যাতে আর কখনো বাঙলায় গিয়ে বাঙালীদের মাতিয়ে তুলতে না পারে।”

 আমি ছাড়াও মাতাবার আরো অনেক লোকের জন্ম হল। বাঙলায় গায়িকার বন্যা এল। আলমোড়া পাহাড়ের উপর বিবেকানন্দ আশ্রমের অধিনেত্রী মিসেস সেভিয়র একবার বলেছিলেন—আর কিছু না, শুধু যদি জাতীয় গান গেয়ে গেয়ে ফেরো তুমি ভারতের নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে সমগ্র দেশকে মাতাতে পার। সে কথাটা আমার মনে লেগেছিল। অনেক সময় ভেবেছিলুম, একটি চারণ-দল গড়ে ঘুরে ঘুরে গেয়ে গেয়ে দেশকে জাগ্রত করব। কিন্তু তার জন্যেও আমার অপেক্ষায় দেশ বসে থাকেনি। সে কাজ আপনা-আপনি হয়ে উঠেছে।

 সঙ্গীত-ক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়ার সাময়িক প্রাথমিকতায় আমার গান ঘরে ঘরে লোকের মনে আসন পেয়েছে, তাদের আনন্দ দিয়েছে। কণ্ঠগুণের প্রাথমিকতায় নয়। আজ যদি এ কালের মেয়েদের সঙ্গে পরীক্ষায় নামতে হত কলকে পেতুম না। আমার দ্বারা যা কাজ নেবার তা দেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা নিয়ে নিয়েছেন। এখন পালা এসেছে আধুনিক মেয়েদের।