জেবুন্নিসা বেগম/পঞ্চম পরিচ্ছেদ


জেবুন্নিসা বেগমের কারাবাস

 হিন্দুদিগের উপর অন্যায় রূপে নির্দ্ধারিত যে জিজীয়া কর উদারমনা শাহানশাহ মহাবলী মহম্মদ জলালুদ্দীন অক্‌বর্‌ রহিত করিয়া যান, ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাহা আবার গ্রহণপূর্ব্বক দেবমন্দিরাদি বিধ্বস্ত করিতে এবং হিন্দুদের উপর নানা বিষয়ে উৎপীড়ন করিতে লাগিলে রাজপুতগণ ইহা সহ্য করিতে পারিলেন না। তাঁহারা উক্ত বাদশাহের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়া ঐ সব অত্যাচারের প্রতিশোধ লইতে উদ্যত হইলেন।

 এইরূপে রাজপুতানায় বিদ্রোহানল দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলে তাহা নিবাইবার উদ্দেশ্যে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাঁহার পুত্ত্র শাহজাদা অক্‌বরকে রাজপুতানায় প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌঁছিয়া বিদ্রোহ দমনের পরিবর্ত্তে রাজ্যলোভে বিদ্রোহী রাজপুতগণের সহিত মিলিয়া আপন পিতারই বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইলেন। অনুদার ঔরঙ্গজেব বাদশাহ যেমন স্বীয় পুত্ত্রগণকে বিশ্বাস বা স্নেহ করিতেন না, তাঁহারাও তেমনই পিতৃভক্ত বা পিতৃবৎসল ছিলেন না।

 শাহজাদা অক্‌বর জেবুন্নিসা বেগমের সহোদর ছিলেন। তাঁহার রাজপুতানায় অবস্থান কালে ভাই ও ভগিনীর মধ্যে চিঠি পত্র চলিত। কূটনীতি-বিশারদ ঔরঙ্গজেব বাদশাহের গুপ্তচরের অভাব ছিল না—তাহারা ঐ সব চিঠি পত্র হস্তগত করিয়া উক্ত বাদশাহের নিকট প্রদান করে। সেই সব পত্রে সাধারণ কথা ও কুশল মঙ্গলবার্ত্তা ব্যতীত কোন দোষণীয় বিষয় উল্লেখ থাকিত না। কিন্তু পরশ্রীকাতর কয়েকজন ব্যক্তি জেবুন্নিসা বেগমকে তাঁহার পিতার বিষদৃষ্টিতে নিক্ষেপ করিবার জন্য তাঁহার বিরুদ্ধে নানা কথা বলিয়া ঔরঙ্গজেবের মনে সন্দেহ জন্মাইয়া দেয়।

 স্বভাবতঃই ঔরঙ্গজেব সন্দিগ্ধ প্রকৃতির লোক ছিলেন। অন্যকে বিশ্বাস করা দূরে থাক যে নিজ সন্তানকে পর্য্যন্ত বিশ্বাস করে না, কন্যা হইলেও হেন ব্যক্তির কাছে কি আর জেবুন্নিসা বেগমের নিস্তার আছে। ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাহার দুহিতার উপর সন্দিহান হইয়া তাঁহাকে “সলিমগড়” বা “নূরগর” দুর্গে নজরবন্দী করিয়া রাখেন। এবং বার্ষিক বৃত্তিস্বরূপ তিনি যে চারি লক্ষ টাকা পাইতেন তাহাও বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়।

 উক্ত দুর্গ যমুনার মধ্যবর্ত্তী এক দ্বীপে শেরশাহের পুত্ত্র সলিমান্‌ বা সেলীম শাহ নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন জানা যায়—পূর্ব্বে উহা নূরুদ্দীন জাহাঙ্গীর বাদশাহের নির্ম্মিত একটী সেতুর দ্বারা দিল্লীর সহিত সংযুক্ত ছিল। মুগল শাসনকালে রাজবন্দিগণকে আবদ্ধ রাখিবার জন্য সচরাচর ঐ দুর্গ ব্যবহৃত হইত। তাহাতেই ঔরঙ্গজেব তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শাহজাদা দারা শিকোকে হত্যা করান।

 জেবুন্নিসা বেগম সলীমগড়ে নজরবন্দী থাকার সময় রুহ্‌উল্লা খাঁর মাতা হমীদা বানু বেগমের মৃত্যু হইলে তিনি তথা হইতেই মৃত বেগমের “তাজীয়ত” অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশ ক্রিয়াতে যোগ দান করিয়াছিলেন। সেই বৎসরেই ঔরঙ্গজেব বাদশাহের পুত্ত্র শাহ্‌জাদা কাম্‌বখসের বিবাহ হয়। জেবুন্নিসা বেগমের বিশেষ অনুরোধে সেই বিবাহ-উৎসব তাঁহার সেখানেই সম্পাদিত হইয়াছিল।

 সলীমগড় দুর্গে অবরুদ্ধ থাকিবার কালে জেবুন্নিসা বেগম বিদ্যালোচনায় দিন যাপন করিতেন। সে সময়ে তিনি স্বীয় অদৃষ্টকে লক্ষ্য করিয়া যে কবিতা রচনা করিয়াছিলেন তাহ নিম্নে প্রদত্ত হইল ।

”دردا که زقید ستم آزاد نه گشتم
يک لحط زغم ھائی جہان شاد نه گشتم
گرچه پا زنجیر مخفی زد ته دیوارِ غم
شکراللہ کز جفائی هم گناں آسودہ ام
دلِ من اسیر مخفي به بلائی هجر تا کے
که بجز ھوائی وصلت گناه دگر ندارم
مخفي اُمید رهائی تا بروز حشر نیست
خاکِ غربت هر که را در مہد دامنگیر شد
تا مرا زنجیر کار پائی دل دیوانه شد
دوست شد دشمن مرا هر آشنا بیگانہ شد“

 

“দর্দা—কিজ-কয়েদ সিতম্‌ আজাদ নগ্‌শতম্‌
এক লহজা জেগমহায়ে জহাঁ শাদ নগ্‌শতম্‌।

গরচে পাবঞ্জির “মখ্‌ফী” জদ্‌ তা হে দিওয়ার-এ-গম্‌
শুকুর আল্লা কজ্‌ জফা-এ-হমগুনাঁ আসুদা অম্‌
দিল-এ-মন্‌ আসির “মখ্‌ফী” বাবলাই হিজর তাকে
কি বজুজ হৌয়াই ওসলত্‌ গুনাহ্‌দিগর নদারম।
“মখ্‌ফী” উমেদ্‌ রেহাই তাবরোজ হশ্র নেস্ত
খাক-এ গুর্বত হরকে রদির মহদ দামনিগর শুদ্‌
তা মরা জঞ্জির দরপায়ে দিল দিওয়ানা শুদ্‌,
দোস্ত শুদ্‌ দুশমন্‌ মরা হর আশ্‌না বেগানা শুদ।

ভাবার্থ:—

হায় ব্যথা—উৎপীড়নের কারাবাস হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিতেছি না।
এক মুহূর্ত্তের জন্যও আমি ভব যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ পাইলাম না।
যদিও পায়ে বেড়ী আছে ও দুঃখরূপ প্রাচীরের অন্তরালে রহিয়াছি,
ধন্য ভগবান্‌—সকলের অত্যাচার হইতে অব্যাহতি পাইয়া আরামেই আছি।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আমার মন কতদিন পর্য্যন্ত বন্দী থাকিবে?

কেবল মিলনের ইচ্ছা ব্যতীত অন্য কোন পাপ মনে রাখি না।
দারিদ্র্যের ধূলা যাহাকে শৈশব হইতে স্পর্শ করিয়াছে;
তাহার মহাপ্রলয়ের পূর্ব্বে মুক্তির আশা নাই।
যখন হইতে পায়ে বেড়ী পরিয়াছি সেই দিন হইতেই মন উন্মাদগ্রস্ত হইয়াছে।
যাহারা আমার বন্ধু ছিল তাহারাও শত্রু হইয়াছে এবং
প্রিয়জনও এখন আমার অপরিচিত হইয়া গিয়াছে।

 জেবুন্নিসা বেগম এই প্রকার সুখে ও দুঃখে বৎসরাধিক কাল সলীম্‌গড় দুর্গে অবরুদ্ধ থাকিবার পর অবশেষে মুক্তিলাভ করেন।