টুনটুনির বই/হাতির ভিতরে শিয়াল




হাতির ভিতরে শিয়াল

রাজার যে হাতিটা তাঁর আর সকল হাতির চেয়ে ভালো আর বড় আর দেখতে সুন্দর, সেইটে তাঁর ‘পাটহস্তী’। সেই হাতিতে চড়ে রাজামশাই চলা-ফেরা করেন, আর তাকে খুব ভালোবাসেন।

 একদিন রাজার পাটহস্তী মরে গেল। রাজা অনেকক্ষণ ভারী দুঃখ করলেন, শেষে বললেন, ‘ওটাকে ফেলে দিয়ে এস।’

 তখন সেই হাতির পায় বড়-বড় দড়ি বেঁধে পাঁচশো লোক টেনে তাকে মাঠে ফলে দিয়ে এল।

 সেই মাঠের কাছে এক শিয়াল থাকত। সে অনেক দিন পেট ভরে খেতে পায়নি। মাঠে মরা হাতি দেখতে পেয়ে, সে খুব খুশী হয়ে এসে, তাকে খেতে আরম্ভ করল । তার এতই খিদে পেয়েছিল যে, খেতে-খেতে সে হাতির পেটের ভিতরে ঢুকে গেল, তবুও তার খাওয়া শেষ হল না। এমনি করে দুদিন চলে গেল, তখনও সে হাতির পেটের ভিতরে বসে কেবল খাচ্ছেই। ততদিন রোদ লেগে চামড়া শুকিয়ে, হাতির পেটের ফুটে ছোট হয়ে গেছে, আর শিয়ালও অনেক খেয়ে মোটা হয়ে গেছে। তখন তো তার ঘি-টি সব ফেলে তারা পালাতে লাগল। [ পৃঃ ১১৩ ভারী মুশকিল হল। সে অনেক চেষ্টা করেও হাতির পেটের ভিতর থেকে বেরুতে পারল না। এখন উপায় কি হবে?

 এমন সময় তিনজন চাষী সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের দেখতে পেয়েই শিয়ালের মাথায় এক ফন্দি যোগাল। সে হাতির পেটের ভিতর থেকে তাদের ডেকে বললে, ‘ওহে ভাই সকল, তোমরা রাজার কাছে একটা খবর দিতে পারবে? আমার পেটে যদি পঞ্চাশ কলসী ঘি মাখানো হয়, তবে আমি উঠে দাঁড়াব।

 চাষীরা তাতে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘শোন-শোন, হাতি কি বলছে! চল আমরা রাজামশাইকে খবর দিইগে।’ তারা তখুনি রাজার কাছে ছুটে গিয়ে বললে, ‘রাজামশাই, আপনার সেই মরা হাতি বলছে যে তার পেটে পঞ্চাশ কলসী ঘি মাখালে সে আবার উঠে দাঁড়াবে। শীগগির পঞ্চাশ কলসী ঘি পাঠিয়ে দিন।’

 এ কথায় রাজামশাই যে কি খুশী হলেন, কি আর বলব! তিনি বললেন, ‘আমার হাতি যদি বাঁচে পঞ্চাশ কলসী ঘি আর কত বড় একটা কথা! হাজার কলসী ঘি নিয়ে তার পেটে মাখাও। তখুনি হাজার মুটে হাজার কলসী ঘি নিয়ে মাঠে উপস্থিত করল। দুহাজার লোক মিলে সেই ঘি হাতির পেটে মাখাতে লাগল। সাতদিন খালি ‘আনো ঘি’, ‘ঢাল ঘি’ ছাড়া সেখানে আর কোনো কথাই শোনা গেল না।

 সাতদিনের পরে শিয়াল দেখলে যে, হাতির চামড়াও ঢের নরম হয়েছে, পেটের ফুটোও ঢের বড় হয়েছে, এখন সে ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে আসতে পারে; তখন সে সকলকে ডেকে বললে, ‘ভাই সকল, এইবার অামি উঠব। তোমরা একটু সরে দাঁড়াও নইলে যদি আমি মাথা ঘুরে তোমাদের উপরে পড়ে-টড়ে যাই!’

 তখন ভারী একটা গোলমাল হল! যে যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই ধাক্কা মেরে বলছে, ‘আরে বেটা, শীগগির সর! হাতি উঠছে, ঘাড়ে পড়বে।’

 একথা শুনে কি কেউ আর সেখানে দাঁড়ায়? ঘি-টি সব ফেলে তারা পালাতে লাগল, একবার চেয়েও দেখল না, হাতি উঠেছে কি পড়েই আছে। তা দেখে শিয়াল ভাবলে, ‘এই বেলা পালাই।’ তখন সে তাড়াতাড়ি হাতির পেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে দে ছুট।