পওহারী বাবা/তৃতীয় অধ্যায়


তৃতীয় অধ্যায়।

 মহাযোগী অবধূতগুরু দত্তাত্রেয়ের পবিত্র নিবাসভূমি বলিয়া গিরনার হিন্দুদিগের মধ্যে বিখ্যাত; আর কিম্বদন্তী আছে যে, এই পর্ব্বতের চুড়ায় সৌভাগ্যবান্‌ ব্যক্তিগণ এখনও বড় বড় সিদ্ধ যোগীর সাক্ষাৎ পাইয়া থাকেন।

 তার পর আমরা দেখিতে পাই, এই যুবক ব্রহ্মচারী বারাণসীর নিকটে গঙ্গাতীরে জনৈক যোগসাধক সন্ন্যাসীর শিষ্যরূপে বাস বরেন—এই সন্ন্যাসীটী নদীর উচ্চ তটভূমির উপর খনিত একটী গর্ত্তে বাস করিতেন। আমাদের প্রবন্ধের বিষয়ীভূত মহাত্মা যে পরজীবনে গাজিপুরের নিকট গঙ্গাতীরে এক ভূখণ্ড খনন করিয়া তন্মধ্যে এক গভীর বিবর প্রস্তুত করিয়া বাস করিতেন, তাহা যে ইঁহার নিকটেই শিখিয়াছিলেন, এটী বেশ বুঝিতে পারা যায়।

 যোগীরা যোগাভ্যাসের সুবিধার জন্য সর্ব্বদাই গুহায় অথবা যেখানকার আবহাওয়ার কোনরূপ পরিবর্ত্তন নাই এবং যেখানে কোন শব্দ মনকে বিচলিত করিতে না পারে, এমন স্থানে, বাস করিবার উপদেশ দিয়া গিয়াছেন।

 আমরা আরও জানিতে পারি যে, তিনি প্রায় এই সময়েই বারাণসীতে জনৈক সন্ন্যাসীর নিকট অদ্বৈতবাদ শিক্ষা করিতেছিলেন।

 অনেক বর্ষ ভ্রমণ, অধ্যয়ন ও সাধনার পর এই ব্রহ্মচারী যুবক, যে স্থানে বাল্যকালে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন, তথায় ফিরিয়া আসিলেন। সম্ভবতঃ তাহার পিতৃব্য যদি জীবিত থাকিতেন, তবে এই বালকের মুখমণ্ডলে সেই জ্যোতিঃ দেখিতে পাইতেন, যাহা প্রাচীনকালে জনৈক শ্রেষ্ঠতর ঋষি তাঁহার শিষ্যের মুখ দেখিয়া বলিয়া উঠিয়াছিলেন, ‘ব্রহ্মবিদিব সোম্য ভাসি’[১]—হে সৌম্য, আজ তোমার মুখ যে ব্রহ্মজ্যোতিতে দীপ্তি পাইতেছে, দেখিতেছি। কিন্তু যাঁহারা তাঁহাকে গৃহপ্রত্যাবর্ত্তনে স্বাগত অভ্যর্থনা করিলেন, তাঁহারা তাঁহার বাল্যকালের সঙ্গীমাত্র—তাঁহাদের অনেকেই সংসারে প্রবেশ করিয়াছিলেন—সংসার চিরদিনের জন্য তাঁহাদিগকে বাঁধিয়াছিল —যে সংসারে চিন্তাশীলতা অল্প, কিন্তু কর্ম্ম অনন্ত।

 তথাপি তাঁহারা তাঁহাদের পঠদ্দশার বন্ধু ও ক্রীড়াসঙ্গীর (যাহার ভাব বুঝিতে তাঁহারা অভ্যস্ত ছিলেন) সমুদয় চরিত্র ও ব্যবহারে এক পরিবর্ত্তন—রহস্যময় পরিবর্ত্তন লক্ষ্য করিলেন—ঐ পরিবর্ত্তন দেখিয়া তাঁহাদের হৃদয়ে ভয়বিস্ময়ের উদ্রেক হইল। কিন্তু উহাতে তাঁহাদের হৃদয়ে তাঁহার মতন হইবার ইচ্ছা, অথবা তাঁহার ন্যায় তত্ত্বান্বেষণ-স্পৃহ জাগরিত হইল না। তাঁহারা দেখিলেন, এ এক অদ্ভুত মানব—এই যন্ত্রণা ও জড়বাদপূর্ণ সংসারের বাহিরে একেবারে চলিয়া গিয়াছে—এই পর্য্যন্ত। তাঁহারা স্বভাবতঃই তাঁহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইলেন, আর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন না।

 ইতিমধ্যে এই মহাত্মার বিশেষত্বসমূহ দিন দিন অধিকতর পরিস্ফুট হইতে লাগিল। বারাণসীর সন্নিকটবাসী তাঁহার গুরুর মত, তিনিও ভূমিতে একটী গর্ত্ত খনন করিয়া তন্মধ্যে যাইতে লাগিলেন এবং অনেক ঘণ্টা ধরিয়া বাস করিতে লাগিলেন। তার পর তিনি আহার সম্বন্ধে অতি ভয়ানক কঠোর সংযম আরম্ভ করিলেন। সারাদিন তিনি নিজের ছোট আশ্রমটীতে কার্য্য করিতেন, তদীয় পরম প্রেমাস্পদ প্রভু রামচন্দ্রের পূজা করিতেন, উত্তম খাদ্য রন্ধন করিয়া (কথিত আছে, তিনি রন্ধনবিদ্যায় অসাধারণ পটু ছিলেন) ঠাকুরকে ভোগ দিতেন, তার পর সেই প্রসাদ বন্ধুবান্ধবগণ ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিতেন এবং অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত তাহাদের সেবা করিতেন। তাহারা সকলে যখন শয়ন করিত, তখন এই যুবক গোপনে সন্তরণ দ্বারা গঙ্গা পার হইয়া উহার অপর তীরে যাইতেন। তথায় সারা রাত সাধনভজনে কাটাইয়া ঊষার পূর্ব্বেই ফিরিয়া আসিয়া বন্ধুবর্গকে জাগাইতেন এবং পুনর্ব্বার সেই নিত্য কার্য্য আরম্ভ করিতেন, আমরা যাহাকে ভারতে ‘অপরের সেবা বা পূজা’ বলিয়া থাকি।

 ইতিমধ্যে তাঁহার নিজের খাওয়াও কমিয়া আসিতে লাগিল, অবশেষে, আমরা শুনিয়াছি, উহা প্রত্যহ এক মুঠা তেঁত নিম পাতা বা কয়েকটা লঙ্কা মাত্রে দাঁড়াইল। তারপর তিনি গঙ্গার অপর পারের জঙ্গলে যে প্রত্যহ রাত্রে সাধনের জন্য যাইতেন, তাহা ক্রমশঃ কমিয়া যাইতে লাগিল এবং তিনি তাঁহার প্রস্তুত গুহাতে বেশী বেশী বাস করিতে লাগিলেন। আমরা শুনিয়াছি, সেই গুহায় তিনি দিনের পর দিন ও মাসের পর মাস ধ্যানমগ্ন হইয়া থাকিতেন, তার পর বাহির হইতেন। এই দীর্ঘকাল তিনি কি খাইয়া থাকিতেন, তাহ কেহই জানে না, তজ্জন্য লোকে তাহাকে পও-আহারী অর্থাৎ বায়ুভক্ষণকারী বাবা বলিতে আরম্ভ করিল।

 তিনি তাঁহার জীবনে কখন এই স্থান ত্যাগ করেন নাই। একবার তিনি এত অধিকদিন ধরিয়া ঐ গুহার মধ্যে ছিলেন যে, লোকে তাঁহাকে মৃত বলিয়া স্থির করিয়াছিল। কিন্তু অনেক দিন পরে আবার বাবা বাহির হইয়া বহুসংখ্যক সাধুকে এক ভাণ্ডারা দিলেন।

 যখন তিনি ধ্যানে মগ্ন না থাকিতেন, তখন তিনি তাঁহার গুহার মুখের উপরিভাগে অবস্থিত একটী গৃহে বাস করিতেন, আর এই সময়ে যাহারা তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিত, তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতেন। তাঁহার যশঃ সৌরভ চতুর্দ্দিকে বিস্তৃত হইতে লাগিল আর গাজিপুরের অহিফেনবিভাগের রায় গগনচন্দ্র বাহাদুর—যিনি স্বাভাবিক মহত্ত্ব ও ধর্ম্মপ্রবণতার জন্য সকলেরই প্রিয় হইয়াছেন—আমাদিগকে এই মহাত্মার সহিত আলাপ করাইয়া দেন।

 ভারতের আরও অনেক মহাত্মার ন্যায়, এই জীবনেও কিছু বিশেষরূপ বহির্জ্জগতের ক্রিয়াশীলতা ছিল না। সেই ভারতীয় আদর্শ যে, বাক্যের দ্বারা নয়, জীবনের দ্বারা শিক্ষা দিতে হইবে আর যাহারা সত্য ধারণ করিবার উপযুক্ত হইয়াছে, তাহাদেরই জীবনে সত্য প্রতিফলিত হয়,—ইঁহার জীবন তাহারই আর একটী উদাহরণ। এইরূপ ধরণের লোকেরা যাহা তাঁহারা জানেন, তাহা প্রচার করিতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক, কারণ, তাহাদের দৃঢ় ধারণা এই যে, বাক্যের দ্বারা নহে, ভিতরের সাধনা দ্বারাই সত্যলাভ হয়। ধর্ম্ম তাঁহদের নিকট সামাজিক কর্ত্তব্যের প্ররোচক শক্তিবিশেষ নহে, উহা সত্যের দৃঢ় অনুসন্ধান এবং এই জীবনেই উহার সাক্ষাৎকারস্বরূপ।

 তাঁহারা কালের এক মুহূর্ত্ত হইতে অপর মূহূর্ত্তের অধিকতর কিছু শক্তি আছে, একথা অস্বীকার করেন। অতএব অনন্তকালের প্রতি মুহূর্ত্তই অন্যান্য মুহূর্ত্তের সহিত সমান বলিয়া তাঁহারা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা না করিয়া এখানেই এবং এখনই ধর্ম্মের সত্যসমূহ সাক্ষাৎ দর্শন করার উপর জোর দিয়া থাকেন।

 বর্ত্তমান লেখক এক সময়ে এই মহাত্মাকে জগতের উপকার করিবার জন্য গুহা হইতে বাহিরে না আসিবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। প্রথমতঃ, তিনি তাঁহার স্বাভাবিক বিনয় ও পরিহাস-রসিকতা সহকারে নিম্নলিখিত দৃঢ় উত্তর প্রদান করেন:—

 “কোন দুষ্ট লোক কোন অন্যায় কার্য্য করিতেছিল, এমন সময়ে এক ব্যক্তি তাহাকে ধরিয়া ফেলে এবং শাস্তিস্বরূপে তাহার নাক কাটিয়া দেয়। নিজের নাককাটা রূপ জগৎকে কিরূপে দেখাইবে, ইহা ভাবিয়া সে অতিশয় লজ্জিত হইল ও নিজের প্রতি নিজে অতিশয় বিরক্ত হইয়া এক জঙ্গলে পলাইয়া গেল। তথায় সে একটী ব্যাঘ্রচর্ম্ম বিছাইয়া বসিয়া থাকিত আর এদিক্‌ ওদিকে কেহ আসিতেছে মনে হইলে অমনি গভীর ধ্যানের ভাণ করিত। এইরূপ ব্যবহারে লোকে সরিয়া যাওয়া দূরে থাকুক, দলে দলে লোকে এই অদ্ভুত সাধুকে দেখিতে এবং পূজা করিতে আসিতে লাগিল। তখন সে দেখিল, এইরূপ অরণ্যবাসে আবার তাহার সহজে জীবিকানির্ব্বাহের উপায় হইল। এইরূপে বর্ষের পর বর্ষ চলিয়া গেল। অবশেষে সেই স্থানের লোকে এই মৌনব্রতধারী ধ্যানপরায়ণ সাধুর নিকট হইতে কিছু উপদেশ শুনিবার জন্য ব্যস্ত হইল, বিশেষতঃ জনৈক যুবক সন্ন্যাসাশ্রমে দীক্ষিত হইবার জন্য বিশেষ উৎসুক হইল। শেষে এরূপ অবস্থা দাঁড়াইল যে, আর বিলম্ব করিলে সাধুর প্রতিষ্ঠা একেবারে লোপ হয়। তখন সে একদিন মৌনব্রত ভঙ্গ করিয়া ঐ উৎসাহী যুবককে বলিল, ‘আগামী কল্য একখানি ধারাল ক্ষুর লইয়া এখানে আসিও।’ যুবকটী তাহার জীবনের এই প্রধান আকাঙ্ক্ষা অতি শীঘ্রই পূর্ণ হইবে এই আশায় পরম আনন্দিত হইয়া পরদিন অতি প্রত্যুষে ক্ষুর লইয়া উপস্থিত হইল। নাককাটা সাধু তাহাকে বনের এক অতি নিভৃত স্থানে লইয়া গেল, তার পর ক্ষুরখানি হাতে লইয়া উহা খুলিল এবং এক আঘাতে তাহার নাক কাটিয়া দিয়া গম্ভীরবচনে বলিল, ‘হে যুবক। আমি এইরূপে এই আশ্রমে দীক্ষিত হইয়াছি। সেই দীক্ষাই আমি তোমাকে দিলাম। এখন তুমিও সুবিধা পাইলেই অপরকে নিরালস্য হইয়া এই দীক্ষা দিতে থাক।’ যুবকটী লজ্জায় তাহার এই অদ্ভুত দীক্ষার রহস্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিতে পারিল না এবং সে সাধ্যানুসারে তাহার গুরুর আদেশ প্রতিপালন করিতে লাগিল। এইরূপে এক নাককাটা সাধু সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হইয়া সমগ্র দেশ ছাইয়া ফেলিল। তুমি কি আমাকেও এইরূপ আর একটী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা দেখিতে চাও?”

 ইহার অনেক পরে যখন তিনি অপেক্ষাকৃত গম্ভীরভাবে ছিলেন, ঐ বিষয়ে আর একবার প্রশ্ন করাতে তিনি উত্তর দিয়াছিলেন, “তুমি কি মনে কর, স্থূলদেহ দ্বারাই কেবল অপরের উপকার সম্ভব? একটী মন শরীরের সাহায্যনিরপেক্ষ হইয়া অপর মনসমুহকে সাহায্য করিতে পারে, ইহা কি সম্ভব বিবেচনা কর না?”

 অপর কোন সময়ে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি এত বড় একজন যোগী, তথাপি তিনি প্রথম শিক্ষার্থীদের জন্য উপদিষ্ট, শ্রীরঘুনাথজীর মূর্ত্তিপূজা, হোমাদি কর্ম্ম করেন কেন? তাহাতে এই উত্তর হইল, “সকলেই নিজের কল্যাণের জন্যই কর্ম্ম করে, একথা তুমি ধরিয়া লইতেছ কেন? একজন কি অপরের জন্য কর্ম্ম করিতে পারে না?”

 তার পর সকলেই সেই চোরের কথা শুনিয়ছেন—সে তাঁহার আশ্রমে চুরি করিতে আসিয়াছিল, সাধুকে দেখিয়াই সে ভীত হইয়া চুরি করা জিনিষের পোঁটলা ফেলিয়া পলাইল। সাধু সেই পোঁঁটলা লইয়া চোরের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অনেক দূর জোরে দৌড়িয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন; শেষে তাহার পদপ্রান্তে সেই পোঁটলা ফেলিয়া দিয়া করযোড়ে সজলনয়নে তাঁহার নিজকৃত ব্যাঘাতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করিতে লাগিলেন ও অতি কাতরভাবে সেইগুলি লইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, “এগুলি আমার নহে, তোমার।”

 আমরা বিশ্বস্তসূত্রে আরও শুনিয়াছি, একবার তাঁহাকে গোখরো সাপে দংশন করে এবং যদিও কয়েক ঘণ্টার জন্য সকলে তাঁহাকে মৃত বলিয়াই স্থির করিয়াছিল, কিন্তু শেষে তিনি পুনরায় বঁচিয়া উঠেন আর তাঁহার বন্ধুবর্গ তাঁহাকে ও সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি বলেন, “ঐ গোখরো সাপটী আমার প্রিয়তমের নিকট হইতে দূতস্বরূপে আসিয়াছিল (পাহন দেওতা আয়া)।

 আর আমরা ইহা অনায়াসেই বিশ্বাস করিতে পারি, কারণ, আমরা জানি, তাঁহার স্বভাব কিরূপ প্রগাঢ় নম্রতা, বিনয় ও প্রেমে ভূষিত ছিল। সর্ব্বপ্রকার পীড়া তাঁহার নিকট সেই ‘প্রেমাস্পদের নিকট হইতে দূতস্বরূপ’ (পাহন দেওতা) ছিল আর যদিও তিনি ঐ সকল হইতে তীব্র পীড়া পাইতেন, তথাপি অপর লোকে পর্য্যন্ত ঐ পীড়াগুলিকে অন্যনামে অভিহিত করিবে, ইহা তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না।

 এই অনাড়ম্বর প্রেম ও কোমলতা চতুর্দ্দিক্‌স্থ লোকের মধ্যে বিস্তৃত হইতে লাগিল আর যাঁহারা ইহার চারিদিকের পল্লীগুলিতে ভ্রমণ করিয়াছেন, তাঁহারাই এই অদ্ভুত ব্যক্তির নীরব শক্তিবিস্তারের সাক্ষ্য দিতে পারেন।

 শেষাশেষি তিনি আর লোকজনের সঙ্গে দেখা করিতেন না। যখন মৃত্তিকানিম্নবর্ত্তী গুহা হইতে উঠিয়া আসিতেন, তখন লোকজনের সঙ্গে কথা কহিতেন বটে, কিন্তু মধ্যে দ্বার রুদ্ধ থাকিত। তিনি যে গুহা হইতে উঠিয়াছেন, তাহা হোমের ধূম দেখিয়া অথবা পূজার আয়োজনের শব্দে বুঝা যাইত।

 তাহার একটী বিশেষত্ব এই ছিল যে, তিনি কোন সময়ে যে কার্য্য করিতেন, তাহা যতই তুচ্ছ হউক, তাহাতেই সম্পূর্ণ মগ্ন হইয়া যাইতেন। শ্রীরামচন্দ্রজীর পূজায় তিনি যেরূপ যত্ন ও মনোযোগ দিতেন, একটী তাম্রকুণ্ড মাজিতেও ঠিক তাহাই করিতেন। তিনি যে আমাদিগকে কর্ম্মরহস্য সম্বন্ধে একবার বলিয়াছিলেন, “যন সাধন তন সিদ্ধি” অর্থাৎ “সিদ্ধির উপায়কেও এমন ভাবে আদরযত্ন করিতে হইবে, যেন উহাই সিদ্ধিস্বরূপ,’ তিনি নিজেই তাহার উৎকৃষ্টতম দৃষ্টান্তস্বরূপ ছিলে।

 তাঁহার বিনয়ও কোনরূপ কষ্ট যন্ত্রণা বা আত্মগ্লানিময় ছিল না। একবার তিনি আমাদিগের নিকট অতি সুন্দরভাবে নিম্নলিখিত ভাবটী ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন—“হে রাজন্‌, সেই প্রভু ভগবান্‌ অকিঞ্চনের ধন—হাঁ, তিনি তাহাদেরই, যাহারা কোন বস্তুকে এমন কি, নিজের আত্মাকে পর্য্যন্ত আমার বলিয়া অধিকার করিবার ইচ্ছা ত্যাগ করিয়াছে”—এই ভাবের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করিয়াই তাঁহার স্বভাবতঃই এই বিনয় আসিয়ছিল।

 তিনি সাক্ষাৎভাবে উপদেশ দিতে পারিতেন না, কারণ, তাহা হইলেই নিজে আচার্য্যের পদ লওয়া হইল এবং নিজেকে অপরাপেক্ষা উচ্চতর আসনে বসান হইল। কিন্তু একবার তাঁহার হৃদয়-প্রস্রবণ খুলিয়া গেলে তাহা হইতে অনন্ত জ্ঞানবারি উছলিতে থাকিত, তথাপি উত্তরগুলি সব সাক্ষাৎভাবে না হইয়া পরোক্ষভাবে হইত।

 তাঁহার আকার দীর্ঘ ও মাংসল ছিল, তিনি একচক্ষু ছিলেন এবং তাঁহার প্রকৃত বয়সাপেক্ষা তাঁহাকে অল্পবয়স্ক দেখাইত। তাঁহার তুল্য মধুর স্বর আমরা আর কাহারও শুনি নাই। তাঁহার জীবনের শেষ দশ বৎসর বা ততোধিক কাল তিনি সম্পূর্ণরূপে লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থিত ছিলেন। তাঁহার গৃহদ্বারের পশ্চাতে গোটাকতক আলু ও একটু মাখম রাখিয়া দেওয়া হইত, কখন কখন, যখন তিনি সমাধিতে না থাকিতেন, তখন রাত্রে উহা লইতেন। গুহার মধ্যে থাকিলে ইহাও তাঁহার প্রয়োজন হইত না।

 এইরূপে যোগশাস্ত্রের সত্যতার প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ এবং পবিত্রতা, বিনয় ও প্রেমের জীবন্ত দৃষ্টান্তস্বরূপ এই নীরব জীবন অতিবাহিত হইতে লাগিল।

 আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ধূম দেখিলেই তিনি সমাধি হইতে উঠিয়াছেন বুঝা যাইত। একদিন উহাতে পোড়া মাংসের গন্ধ পাওয়া যাইতে লাগিল। চতুর্দ্দিকস্থ লোকে কিছু স্থির করিতে পারিল না। শেষে গন্ধ অসহ্য হইয়া উঠিল আর পুঞ্জীকৃত হইয়া ধূম উঠিতেছে দেখা গেল। শেষে তাহারা দ্বার ভাঙ্গিয়া ফেলিল—দেখিল, সেই মহাযোগী আপনাকে তাঁহার হোমাগ্নিতে শেষ আহুতিস্বরূপ দিয়াছেন। অল্পক্ষণের মধ্যে তাঁহার দেহ ভস্মাবশিষ্ট হইল।

 আমাদিগকে এখানে কালিদাসের সেই বাক্য স্মরণ করিতে হইবে,—

অলোকসামান্যমচিন্ত্যহেতুকং।
নিন্দন্তি মন্দাশ্চরিতং মহাত্মনাং॥

—কুমারসম্ভব।
 

 মন্দবুদ্ধি ব্যক্তিগণ মহাত্মাগণের কার্য্যের নিন্দা করিয়া থাকেন, কারণ, সেই কার্য্যগুলি অসাধারণ এবং উহাদের কারণও লোকে ভাবিয়া স্থির করিতে পারে না।

 তথাপি আমরা তাঁহাকে জানিতাম বলিয়া আমরা তাঁহার এই কার্য্যের কারণ সম্বন্ধে একটী আনুমানিক সিদ্ধান্ত বলিতে সাহসী হইতেছি। আমাদের বোধ হয়, মহাত্মা বুঝিয়াছিলেন, তাঁহার শেষ সময় আসিয়ছে, তখন তিনি, এমন কি, মৃত্যুর পরেও যাহাতে কাহাকেও কষ্ট দিতে না হয়, তজ্জন্য সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে ও সুস্থ মনে আর্য্যোচিত এই শেষ আহুতি দিলেন।

 বর্তমান লেখক এই পরলোকগত মহাত্মার নিকট গভীরভাবে ঋণী—তজ্জন্য তদীয় প্রেমাম্পদ ও তৎসেবিত, শ্রেষ্ঠতম আচার্য্যদিগের মধ্যে অন্যতম এই মহাত্মার উদ্দেশে, তাঁহার অযোগ্য হইলেও পূর্ব্বলিখিত কয়েক পংক্তি তৎকর্ত্তৃক উৎসর্গীকৃত হইল।

 

সমাপ্ত।

  1. ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌