পওহারী বাবা/দ্বিতীয় অধ্যায়


দ্বিতীয় অধ্যায়।

 বর্ত্তমান প্রবন্ধে যাহার চরিত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হইবে, তিনি একজন অদ্ভুত বিনয়ী ও উজ্জ্বল আত্মতত্ত্বদ্রষ্টা ছিলেন।

 পওহারী বাবা (শেষজীবনে ইনি এই নামে অভিহিত হইতেন) বারাণসী জেলার গুজী নামক স্থানের নিকটবর্ত্তী এক গ্রামে ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অতি বাল্যকালেই গাজিপুরে তাঁহার পিতৃব্যের নিকট বাস ও তাঁহার নিকট শিক্ষা করিবার জন্য আসিলেন।

 বর্ত্তমানকালে হিন্দু সাধুরা—সন্ন্যাসী, যোগী, বৈরাগী ও পন্থী প্রধানতঃ এই চার সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইয়া থাকেন। সন্ন্যাসীরা শঙ্করাচার্য্যের মতাবলম্বী অদ্বৈতবাদী। যোগীরা যদিও অদ্বৈতবাদী, তথাপি তাঁহারা বিভিন্ন যোগপ্রণালীর সাধন করিয়া থাকেন বলিয়া তাঁহাদিগকে স্বতন্ত্র শ্রেণীরূপে পরিগণিত করা হয়। বৈরাগীরা রামানুজ ও অন্যান্য দ্বৈতবাদী আচার্য্যগণের অনুবর্ত্তী। রাজত্বের সময় যে সকল সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহাদিগকে পন্থী বলে—ইঁহাদের মধ্যে অদ্বৈত ও দ্বৈত উভয় প্রকার মতাবলম্বীই দেখিতে পাওয়া যায়। পওহারী বাবার পিতৃব্য রামানুজ বা শ্রী সম্প্রদায়ভুক্ত একজন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী ছিলেন—অর্থাৎ তিনি আজীবন অবিবাহিত জীবন যাপন করিবেন, এই ব্রত লইয়াছিলেন। গাজিপুরের দুই মাইল উত্তরে গঙ্গাতীরে তাঁহার একখণ্ড জমি ছিল, তিনি সেই খানেই বাস করিয়াছিলেন। তাঁহার অনেকগুলি ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল বলিয়া তিনি পওহারী বাবাকে নিজের বাটীতে রাখিয়াছিলেন, আর তাঁহাকেই তাঁহার বিষয় ও পদের উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়াছিলেন।

 পওহারী বাবার এই সময়কার জীবনের ঘটনা বিশেষ কিছু জানা যায় না। যে সকল বিশেষত্বের জন্য ভবিষ্যৎ জীবনে তিনি এরূপ সুপরিচিত হইয়াছিলেন, সে সকলের কোন লক্ষণ তখন তাঁহাতে প্রকাশ হইয়াছিল বলিয়াও বোধ হয় না। এই টুকুই লোকের স্মরণ আছে যে, তিনি ব্যাকরণ, ন্যায় এবং নিজ সম্প্রদায়ের ধর্ম্মগ্রন্থসমূহ অতিশয় মনোযোগের সহিত অধ্যয়ন করিতেন—এদিকে খুব চট্‌পটে ও আমুদে ছিলেন। সময়ে সময়ে এই আমোদের মাত্রা এত বাড়িয়া উঠিত যে, তাঁহার সহপাঠী ছাত্রগণকে তাঁহার এই রঙ্গপ্রিয়তার ফলে বিলক্ষণ ভুগিতে হইত।

 এইরূপে প্রাচীন ধরণের ভারতীয় ছাত্রজীবনের দৈনন্দিন কার্য্যের ভিতর দিয়া ভাবী মহাত্মার বাল্যজীবন কাটিতে লাগিল; আর তাঁহার অধ্যয়নে অসাধারণ অনুরাগ ও ভাষাশিক্ষায় অপূর্ব্ব পটুতা ব্যতীত সেই সরল, সদানন্দময়, ক্রীড়াশীল ছাত্রজীবনে এরূপ কিছু পরিচয় পাওয়া যায় নাই, যাহাতে তাঁহার ভবিষ্যৎ জীবনের সেই প্রবল গাম্ভীর্য্য সূচিত করিবে—যাহার চুড়ান্ত পরিণাম এক অত্যদ্ভুত ও ভয়ানক আত্মাহুতি—যখন সকলের নিকটই উহা কেবল অতীতের এক কিম্বদন্তীস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

 এই সময়ে এমন এক ঘটনা ঘটিল, যাহতে এই অধ্যয়নশীল যুবক সম্ভবতঃ এই প্রথম জীবনের গভীর মর্ম্ম প্রাণে প্রাণে বুঝিল; এতদিন তাহার যে দৃষ্টি পুস্তক-নিবন্ধ ছিল, তখন তাহা উঠাইয়া সে নিজ মনোজগৎ তন্ন তন্ন ভাবে পর্য্যবেক্ষণ করিতে লাগিল; ধর্ম্মের মধ্যে পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া যথার্থ সত্য কিছু আছে কি না, তাহা জানিবার জন্য তাহার প্রাণ ব্যাকুল হইল—তাহার পিতৃব্যের দেহত্যাগ হইল। যে এক মুখের দিকে চাহিয়া সে জীবন ধারণ করিত, যাঁহার উপর এই যুবক-হৃদয়ের সমুদয় ভালবাসা নিবন্ধ ছিল, তিনি চলিয়া গেলেন; তখন সেই উদ্দাম যুবক হৃদয়ের অন্তস্তলে শোকাহত হইয়া ঐ শূন্যস্থান পূরণ করিবার জন্য এমন বস্তুর অন্বেষণে দৃঢ়সঙ্কল্প হইল, যাহার কখন পরিণাম নাই।

 ভারতে সকল বিষয়ের জন্যই আমাদের গুরুর প্রয়োজন হয়। আমরা হিন্দুরা বিশ্বাস করি, পুস্তক কেবল তত্ত্ববিশেষের ভাসা ভাসা বর্ণনা মাত্র। সকল শিল্পের, সকল বিদ্যার, সর্ব্বোপরি ধর্ম্মের জীবন্ত রহস্য-সমূহ গুরু হইতে শিষ্যে সঞ্চারিত হওয়া চাই।

 স্মরণাতীত কাল হইতে ভারতে দৃঢ় অনুরাগী ব্যক্তিগণ অন্তর্জ্জীবনের রহস্য নির্ব্বিঘ্নে আলোচনার জন্য সর্ব্বদাই লোকালয় পরিত্যাগ করিয়া অতি নিভৃত স্থানসমূহে গিয়া বাস করিয়াছেন, আর এখনও এমন একটী বন, পর্ব্বত বা পবিত্রস্থান নাই, কিম্বদন্তী যাহাকে কোন মহাত্মার বাসস্থান বলিয়া উহার অঙ্গে পবিত্রতার মহিমা মাখাইয়া না দেয়।

 তার পর এই উক্তিটীও সৰ্ব্বজনপ্রসিদ্ধ যে,

“রমতা সাধু, বহতা পানি।
যহ কভি না মৈল লখানি॥”

 অর্থাৎ যে জল প্রবাহিত হয়, তাহা যেমন বিশুদ্ধ থাকে, তদ্রূপ যে সাধু ভ্ৰমণ করিয়া বেড়ান, তিনিও তদ্রুপ পবিত্র থাকেন।

 ভারতে যাঁহারা ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়া ধর্ম্মজীবন গ্রহণ করেন, তাঁহারা সাধারণতঃ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিচরণ করিয়া বিভিন্ন তীর্থ ও দেবমন্দির দর্শন করিয়াই অধিকাংশ জীবন কাটাইয়া থাকেন—কোন জিনিষ যেমন সর্ব্বদা নাড়াচাড়া করিলে তাহাতে মরিচা ধরে না, তাঁহারা বলেন, এইরূপ ভ্রমণে তাঁহাদের মধ্যেও তদ্রূপ মলিনতা প্রবেশ করিবে না। ইহাতে আর এক উপকার হয় এই যে, তাঁহারা প্রত্যেক ব্যক্তির দ্বারে ধর্ম্ম বহন করিয়া লইয়া যান। যাঁহারা সংসার ত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহদের সকলের পক্ষেই ভারতের চারি কোণে অবস্থিত চারিটী প্রধান স্থান (চার ধাম—উত্তরে বদরী কেদার, পূর্ব্বে পুরী, দক্ষিণে সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও পশ্চিমে দ্বারকা) দর্শন করা একরূপ অবশ্য কর্ত্তব্য বলিয়াই বিবেচিত হয়।

 পূর্ব্বোক্ত সমুদয় বিষয়গুলিই আমাদের যুবক ব্রহ্মচারীর ভারতভ্রমণের পক্ষে প্রবল প্ররোচক কারণ হইয়া থাকিতে পারে, কিন্তু আমরা নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি, জ্ঞানতৃষ্ণাই তাঁহার ভ্রমণের সর্ব্বপ্রধান কারণ। আমরা তাঁহার ভ্রমণ সম্বন্ধে খুব অল্পই জানি, তবে তাঁহার সম্প্রদায়ের অধিকাংশ গ্রন্থ যে ভাষায় লিখিত, সেই দ্রাবিড় ভাষাসমূহে তাঁহার জ্ঞান দেখিয়া এবং শ্রীচৈতন্যসম্প্রদায়ভুক্ত বৈষ্ণবগণের প্রাচীন বাঙ্গালা ভাষার সম্পূর্ণ পরিচয় দেখিয়া আমরা অনুমান করি, দাক্ষিণাত্যে ও বাঙ্গালা দেশে তাঁহার স্থিতি বড় অল্প দিন হয় নাই।

 কিন্তু তাঁহার একটী স্থানে গমনের সম্বন্ধে তাঁহার যৌবনকালের বন্ধুগণ বিশেষরূপ জোর দিয়া বলিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন, কাঠিয়াওয়াড়ে গিরনার পর্ব্বতের শীর্ষদেশে তিনি প্রথমে যোগসাধনার রহস্যে দীক্ষিত হন।

 এই পর্ব্বতই বৌদ্ধদের চক্ষে অতি পবিত্র ছিল। এই পর্ব্বতের পাদদেশে সেই সুবৃহৎ শিলা বিদ্যমান, যাহার উপর সম্রাট্‌কুলের মধ্যে ধার্ম্মিকচূড়ামণি ধর্ম্মশোকের সর্বপ্রথমে আবিষ্কৃত অনুশাসন খোদিত আছে। উহার নিম্নদেশে শত শত শতাব্দীর বিস্মৃতির অন্ধকারগর্ভে লীন হইয়া অরণ্যাবৃত বৃহৎকায় স্তূপরাজি ছিল—ঐ গুলিকে অনেকদিন ধরিয়াই গিরনার পর্ব্বতশ্রেণীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শৈলমালা বলিয়া লোকে মনে করিত। এখনও উহাকে সেই ধর্ম্মসম্প্রদায় বড় কম পবিত্র মনে করে না—বৌদ্ধধর্ম্ম এক্ষণে যাহার পুনঃসংশোধিত সংস্করণ বলিয়া বিবেচিত হয়—আর আশ্চর্য্যের বিষয়, যাহা তাহার জগজ্জয়ী উত্তরাধিকারী আধুনিক হিন্দুধর্ম্মে মিশিয়া যাইবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত সাহসপূর্ব্বক স্থাপত্যক্ষেত্রে বিজয়লাভ করিবার চেষ্টা করে নাই।