পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/১০৬

১০৬

শ্রীঅনাথবন্ধু দত্তকে লিখিত

মান্দালয় জেল
ডিসেম্বর, ১৯২৬

সবিনয় নিবেদন,

 আপনার ৯ই নভেম্বরের পত্র যথাসময়ে পেয়েছি। উত্তর দিতে বিলম্ব হল ব’লে মনে কিছু করবেন না। নিজের ইচ্ছা অনুসরণ ক’রলে হয়তো পত্র দিতুম না, কারণ রাজবন্দীর সহিত সম্বন্ধ রাখা বাঞ্ছনীয় নহে, তবে আপনি বোধহয় উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করছেন এবং উত্তর পেয়ে সুখী হবেন—এই মনে ক’’রে উত্তর দিতে বসেছি।

 আপনারা যে সমবেতভাবে আমার কথা স্মরণ করে আমার স্বাস্থ্য ও মুক্তির কামনা করেছেন এবং হৃদয়ের সম্ভাষণ আমাকে জানিয়েছেন, তার জন্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানবেন। এর চেয়ে বড় পারিতোষিক কোন স্বদেশসেবী কামনা করতে পারে না। তাই আপনার পত্র পেয়ে এবং খবরের কাগজে আপনাদের সভার বিবরণ পাঠ করে আমি যে আনন্দ পেয়েছি তা বলা বাহুল্য। তবে আমি বুঝি যে, এই আনন্দ পাওয়াটা খুব উচ্চ স্তরের মনের নিদর্শন নয়। কি করি। স্বদেশসেবী হবার স্পর্দ্ধা রাখলেও আমি মানুষ। ভালবাসা প্রীতি ও করুণার নিদর্শন পেলে কে না সুখী হয়? পাওয়ার আকাঙক্ষাটি জয় অথবা অতিক্রম করতে পারলেই ভাল হয়। উচ্চস্তরের কর্ম্মীর পক্ষে সকল প্রকার প্রতিদানের আকাঙক্ষা জয় করা উচিত, কিন্তু সেটা এখনও আমার কাছে আদর্শ মাত্র। বুকে হাত দিয়ে বলতে গেলে আমাকে বলতে হয় যে, Alexander Selkirk-এর ভাষায় আমার সময় সময় মনে হয়—

“My friends do they now and then
Send a wish or a thought after me...”

 আজ ঠিক চৌদ্দমাস আমি জেলে। এর মধ্যে এগার মাস কাটলো সুদূর ব্রহ্মদেশে। সময়ে সময়ে মনে হয় যে, দীর্ঘ চৌদ্দমাস দেখতে দেখতে গেল; কিন্তু অন্য সময়ে মনে হয় যেন কত যুগ ধ’রে এখানে রয়েছি। এ যেন আমার ঘর-বাড়ী, কারাগারের বাহিরের কথা যেন স্বপ্নের মত প্রহেলিকার মত বোধ হয়; যেন ইহজগতে একমাত্র সত্য হচ্ছে লৌহের গারদ ও প্রস্তরের প্রাচীর। বাস্তবিক এ একটা নূতন বিচিত্র রাজ্য। আমার সময়ে সময়ে মনে হয়, যে জেলখানা দেখে নাই সে জগতের কিছুই দেখে নাই। তার কাছে জগতের অনেক সত্য প্রত্যক্ষীভূত হয় নাই। আমি নিজের মনকে বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে, এই রকম চিন্তা ঈর্ষা-প্রসূত নয়। আমি প্রকৃতপক্ষে জেলখানায় এসে অনেক শিখেছি; অনেক সত্য যাহা এক সময় ছায়ার মত ছিল, এখন আমার নিকট সুস্পষ্ট হয়েছে, অনেক নূতন অনুভূতিও আমার জীবনকে সবল ও গভীর ক’রে তুলেছে। যদি ভগবান কোনও দিন সুযোগ দেন ও মুখে ভাষা দেন—তবে সে সব কথা দেশবাসীকে জানাবার আকাঙক্ষা ও স্পর্দ্ধা আছে।

 জেলে আছি—তাতে দুঃখ নাই। মায়ের জন্যে দুঃখভোগ করা সে ত’ গৌরবের কথা! Suffering-এর মধ্যে আনন্দ আছে, একথা বিশ্বাস করুন। তা না হলে লোক পাগল হয়ে যেত, তা না হলে কষ্টের মধ্যে লোক হৃদয়ের আনন্দে ভরপূর হয়ে হাসে কি করে? যে বস্তুটা বাহির থেকে suffering ব’লে বোধ হয়—তার ভিতর থেকে দেখলে আনন্দ বলেই বোধ হয়। অবশ্য বৎসরের মধ্যে ৩৬৫ দিন এবং দিনের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা এ ভাব আমার থাকে না, কারণ— এখনও শৃঙ্খলের দাগ গায়ের উপর রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই যে, এই অনুভূতি অল্পাধিক ভাবে যার নাই সে না পারে Suffering-এর দ্বারা জীবনকে পরিপুষ্ট করতে না পারে Suffering-এর মধ্যে প্রকৃতিস্থ থাক্‌তে।

 আমার শুধু দুঃখ এই যে, চৌদ্দমাস কাল অনেকটা হেলায় কাটিয়েছি। হয়তো বাঙ্গলার জেলে থাকলে এই সময়ের মধ্যে সাধনার পথে অনেকটা এগুতে পারতুম। কিন্তু তা হ’বার নয়! এখন আমার প্রার্থনা শুধু এই, “তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।” যখন খালাসের কল্পনা করি তখন আনন্দ যত হয়, তার চেয়ে বেশী হয় ভয়। ভয় হয় পাছে প্রস্তুত হতে না হতে কর্ত্তব্যের আহ্বান এসে পৌঁছায়। তখন মনে হয়, প্রস্তুত না হওয়া পর্য্যন্ত যেন খালাসের কথা না উঠে। আজ আমি অন্তরে বাহিরে প্রস্তুত নই, তাই কর্ত্তব্যের আহ্বান এসে পৌঁছায় নাই। যেদিন প্রস্তুত হব সেদিন এক মুহুর্ত্তের জন্যও আমাকে কেহ আট্‌কে রাখতে পারবেনা। এসব ভাবের কথা; এর মধ্য objective truth আছে কিনা জানি না। জেলখানায় থাকতে থাকতে subjective truth এবং objective truth এক হয়ে যায়। ভাব ও স্মৃতি যেন সত্যে পরিণত হয়ে পড়ে। আমার অবস্থা অনেকট তাই। আপাততঃ ভাবই আমার কাছে বাস্তব সত্য; কারণ একত্ববাধের মধ্যেই শান্তি।

 আপনি লিখেছেন, “দেশের ও কালের ব্যাবধান আপনাকে বাঙ্গলা দেশের নিকট আরও প্রিয় করিয়া তুলিয়াছে।” কিন্তু দেশের ও কালের ব্যবধান সোনার বাঙ্গলাকে আমার কাছে কত সুন্দর, কত সত্য করে তুলেছে ত আমি বলতে পারি না। ৺দেশবন্ধু তাঁর বাঙ্গলার গীতি কবিতায় বলেছেন, “বাঙ্গলার জল, বাঙ্গলার মাটির মধ্যে একটা চিরন্তন সত্য নিহিত আছে।” এ উক্তির সত্যতা কি এমন ভাবে বুঝতে পারতুম, যদি এখানে এক বৎসর না থাকতুম? “বাঙ্গলার ঢেউ-খেলানো শ্যামল শস্যক্ষেত্র, মধু গন্ধ-বহ মুকুলিত আম্রকানন, মন্দিরে মন্দিরে ধূপ-ধুনা জ্বালা সন্ধ্যার আরতি, গ্রামে গ্রামে ছবির মত কুটির প্রাঙ্গণ”—এসব দৃশ্য কল্পনার মধ্য দিয়াও কত সুন্দর!

 প্রাতে অথবা অপরাহ্ণে খণ্ড খণ্ড শুভ্র মেঘ যখন চোখের সামনে ভাসতে ভাসতে চলে যায়, তখন ক্ষণেকের জন্য মনে হয় মেঘদূতের বিরহী যক্ষের মত তাদের মারফৎ অন্তরের কথা কয়েকটা বঙ্গ-জননীর চরণ প্রান্তে পাঠিয়ে দিই। অন্ততঃ ব’লে পাঠাই, বৈষ্ণবের ভাষায়—

“তোমারই লাগিয়া কলঙ্কের বোঝা,
বহিতে আমার সুখ।”

 সন্ধ্যার নিবিড় ছায়ার আক্রমণে দিবাকর যখন মান্দালয় দুর্গের উচ্চ প্রাচীরের অন্তরালে অদৃশ্য হয়, অস্তগমনোন্মুখ দিনমণির কিরণজালে যখন পশ্চিমাংশ সুরঞ্জিত হয়ে উঠে এবং সেই রক্তিম বাগে অসংখ্য মেঘখণ্ড রূপান্তর লাভ ক’রে দিবালোক সৃষ্টি করে— তখন মনে পড়ে সেই বাঙ্গলার আকাশ, বাঙ্গলার সূর্য্যাস্তের দৃশ্য। এই কাল্পনিক দৃশ্যের মধ্যে যে এত সৌন্দর্য্য রয়েছে তা কে পূর্ব্বে জানত!

 প্রভাতের বিচিত্র বর্ণচ্ছটা যখন দিঙমণ্ডল আলোকিত ক’রে এসে নিদ্রালস নয়নের পর্দ্দায় আঘাত ক’রে বলে, “অন্ধ জাগো”—তখনও মনে পড়ে আর একটি সূর্য্যোদয়ের কথা, যে সূর্য্যোদয়ের মধ্যে বাঙ্গলার কবি, বাঙ্গলার সাধক বঙ্গ-জননীর দর্শন পেয়েছিল।

 থাক্— আমি বোধ হয় Pedantic হয়ে পড়েছি। তবে এটা Pedantry নয়—বাচালতা। ভাবের আদান-প্রদান বহুদিন বন্ধ থাকলে যা হয়—তারই একটা দৃষ্টান্ত। Engine যেমন মধ্যে মধ্যে তার খানিকটা Steam ছেড়ে দিয়ে আত্মরক্ষা করে—আমার অবস্থাও তদ্রূপ।

 সেবক সমিতির কাজ ভাল চলছে শুনে সুখী হলুম। Lansdowne branch-এর সহিত কোনরূপ মনোমালিন্য ঘটা উচিত নয়! আশা করি, তাঁরা কাজকর্ম্ম ভাল করছেন। দক্ষিণ কলিকাতা সেবাশ্রমের orphange-এর জন্য যদি কিছু করতে পারেন তবে বড় ভাল হয়। এটার তেমন উন্নতি হচ্ছে না বোধ হয়— অথচ কাজটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

 আপনাকে চিনতে আমার কষ্ট বা অসুবিধা হয় নাই। আশা করি আপনাদের সকলের কুশল। আমার প্রতি সম্ভাষণ, ও আলিঙ্গন গ্রহণ করবেন। ইতি—