পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/১১৯

বর্মার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব্ প্রিজন্‌স্‌কে লিখিত

১১৯
তারিখ—ইনসিন ১১ই এপ্রিল ১৯২৭

বর্মার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন্‌স্‌ সমীপেষু—

বিষয়—বাঙ্গলা সরকারের প্রস্তাব

 গভর্ণমেণ্ট আমার নিকট যে প্রস্তাব করিয়া পাঠাইয়াছেন, বিশেষতঃ আমার সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যদের প্রতি যে আস্থা প্রকাশ করা হইয়াছে এবং আমার অতীত বা ভবিষ্যৎ কার্য্যকাহিনীর স্বীকারােক্তি বিষয়ে সমস্ত সর্ত্ত তুলিয়া লইয়া তাঁহারা আমার মনােভাবের প্রতি যেরূপ সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়াছেন সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবু আমাকে দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করিতে হইতেছে যে, প্রস্তাবে এমন কতকগুলি সর্ত্ত আছে যাহা আপত্তিকর; তজ্জন্য উহা আমার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।

 ২। প্রথম হইতেই আমি যে কথা বলিয়া আসিতেছি তাহা হইল গভর্ণমেণ্ট আমাকে বিনা বিচারে অন্যায়ভাবে আটক করিয়া রাখিয়াছেন, এবং ইহার মধ্যে কোনও যুক্তি নাই। ভারতবর্ষের লোক বরাবরই বেঙ্গল অর্ডিনান্স ১৯২৪ ও উহার পরিণতি বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল অ্যামেণ্ডমেণ্ট এ্যাক্ট ১৯২৫-কে বেআইনী আইন বলিয়া মনে করিয়াছে, যাহা এ দেশের লোকের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে খর্ব্ব করার জন্যই প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। কোনও সভ্য রাষ্ট্রেই এ ধরনের আইন ২৪ ঘণ্টার বেশী টিঁকিতে পারে না। বঙ্গীয় আইন সভার সদস্যরূপে আমি নির্ব্বাচিত হওয়ার পর অবিচারের মাত্রা আরও বাড়িয়া চলিয়াছে, আমার কারাবাসই তাহার প্রমাণ। পৃথিবীর সর্ব্বত্র আইন সভার সদস্যগণ যে অধিকার ভোগ করিয়া থাকেন—যাহা প্রাচীন এবং তর্কাতীত—উহা হইতে আমাকে বঞ্চিত রাখা হইয়াছে। এভাবে লোককে বিনা বিচারে ও যুক্তিতে অনির্দ্দিষ্ট কাল আটক করিয়া রাখিয়া গভর্ণমেণ্ট ফৌজদারী আইনের মূল নীতিটাকেই অগ্রাহ্য করিয়াছেন। তাছাড়া বঙ্গীয় আইন সভা বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল অ্যামেণ্ডমেণ্ট এ্যাক্ট-কে স্বীকার করিয়া লয় নাই; তৎসত্ত্বেও উহাকে সুপারিশের দ্বারা কার্য্যকরী করিয়া গভর্ণমেণ্ট প্রমাণ করিয়া দিয়াছেন ভারতবর্ষের আইন-সভাগুলি কত অন্তঃসারশূন্য। তাঁহারা আইন সভার অধিকারসমূহ (যথা—গ্রেপ্তার, আটক ও উৎপীড়ন হইতে অব্যাহতি) হরণ করায় উহা প্রশাসকমণ্ডলীর অধীন হইয়া পড়িয়াছে; ফলে শাসনযন্ত্রের এই দুইটি বিভাগের মধ্যে যে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকা উচিত উহা না হইয়া বরং বিপরীত একটা সম্পর্কই গড়িয়া উঠিয়াছে। অতএব যে অন্যায় গভর্ণমেণ্ট করিয়াছেন এবং এখনও করিয়া চলিয়াছেন উহার প্রতিবাদেই আমার মুক্তি দাবী করিতেছি।

 ৩। আমি আগাগোড়াই বলিয়া আসিতেছি আমাকে বাধ্য হইয়া যে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইতেছে, আর্থিক অসাচ্ছল্যের দরুন যাহা ভোগ করা ছাড়া কোনও উপায় নাই, সেজন্য গভর্ণমেণ্টেরই উচিত ক্ষতিপূরণ করা। ন্যায়নীতি, সুবিচারের আদর্শ ইত্যাদি সর্ব্ববিধ নৈতিক বোধ বিসর্জ্জন না দিলে কাহারও পক্ষে এ দাবী উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এসব কথা বিচার করিলে গভর্ণমেণ্ট যে প্রস্তাব করিয়াছেন উহার অপর্য্যাপ্ততা স্পষ্টতঃই চোখে পড়ে।

 ৪। গভর্ণমেণ্ট অথবা আমি এতটা স্বল্পবুদ্ধি নই যে মনে করা যাইতে পারে সুইস স্যানাটোরিয়ামে আমার চিকিৎসা সম্বন্ধে ডাক্তার সুনীলচন্দ্র বসুর মতামতকে কার্য্যকরী করাই এ প্রস্তাবের একমাত্র উদ্দেশ্য। চিকিৎসক হিসাবে তাঁহার অভিমত মূল্যবান সন্দেহ নাই; কিন্তু আমার পক্ষে উহা গ্রহণ করা তখনই সম্ভব যখন আমাকে স্বাধীনভাবে আপন ইচ্ছানুযায়ী কর্ত্তব্য নির্দ্ধারণ করিতে দেওয়া হইবে।

 ৫। নির্য্যাতিত রাজনৈতিক কর্ম্মী হিসাবে কর্ত্তব্য এবং দেশের কাজে আমার ভূমিকা, ইহার সহিত সম্মানের প্রশ্নটাও জড়িত আছে—এসব কথা চিন্তা করিয়াই গভর্ণমেণ্ট প্রস্তাবে যে সকল সর্ত্ত উল্লেখ করিয়াছেন উহা গ্রহণ করিতে পারিতেছি না। তাছাড়া প্রায় আড়াই বৎসর যখন আমার জেলেই কাটিয়া গিয়াছে তখন এ সম্বন্ধে আর আলোচনার কোনও প্রশ্নও উঠে না। এখন যদি আমি উহা মানিয়া লই তাহার অর্থ দাঁড়াইবে গভর্ণমেণ্টের আচরণের বৈধতা স্বীকার করিয়া লওয়া, নীতিগতভাবে যাহা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমরা শাসনতান্ত্রিক অধিকারের জন্যই সংগ্রাম করিতেছি; জাতির সম্মান রক্ষার দায়িত্বও আমাদের উপরই ন্যস্ত। সুতরাং উহা আমরা কোনও ক্রমেই অস্বীকার করিতে পারি না। আমার জীবন আমার নিকট যত প্রিয় তদপেক্ষা বেশী প্রিয় সম্মান রক্ষার প্রশ্ন। এবং আমি আমার জীবনের বিনিময়ে ঐ পবিত্র ও অলঙ্ঘ্য অধিকারসমূহ ত্যাগ করিতে পারি না, যাহা ভবিষ্যৎ ভারতের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তিস্বরূপ হইবে। অবশ্য আমার এ মনোভাবের অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আমাকে যে আরও অনেক লাঞ্ছনার সম্মুখীন হইতে হইবে তাহা আমি জানি। কিন্তু ইহাও আমার অজ্ঞাত নয় যে, পরাধীন দেশের মানুষ হিসাবে এ দুর্ভাগ্য আমি উত্তরাধিকার সূত্রেই লাভ করিয়াছি।

 ৬। আমি দুঃখিত যে, মন্ত্রিমণ্ডলীর যে সকল সদস্য মনে করেন তাঁহারা এ প্রস্তাব উত্থাপনের দ্বারা আমার প্রতি উদারতা প্রদর্শন করিয়াছেন, আমি তাঁহাদের সঙ্গে একমত নই। কিন্তু মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে বলিয়াই নিঃসন্দেহে বলিতে পারি তাঁহারাও তাঁহাদের একান্ত গোপন মুহূর্ত্তে আমার এ সিদ্ধান্তকে শুধু সমর্থনই করিবেন না হয়তো বা প্রশংসাও করিবেন।

 ৭। সর্ব্বশেষে পুনরায় আমি গভর্ণমেণ্টের এই মুক্তির প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ জানাইতেছি; কিন্তু উহা যাহাতে আমার পক্ষে গ্রহণযোগ্য হয় সেজন্য সর্ত্তগুলি প্রত্যাহার করিয়া লইতে অনুরোধ করি। ইতি—

আপনার একান্ত অনুগত
এস, সি, বোস

(ইংরাজী হইতে অনূদিত)