পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/৮

শ্রীশ্রীদুর্গা সহায়
রাঁচি
রবিবার

পরম পূজনীয়া
শ্রীমতী মাতাঠাকুরাণী
শ্রীচরণেষু—
মা,

 আপনার পত্র অনেকদিন হইল পাইয়াছি—তাহার উত্তরও লিখিয়াছিলাম কিন্তু পরে যখন পড়িয়া দেখি যে আবেশের ঘোরে অনেক বাজে কথা লিখিয়াছি—তখন আর পাঠাইবার ইচ্ছা হইল না—তাই ছিঁড়িয়া ফেলিলাম। আমার এক অভ্যাস পত্র লিখিতে বসিলে সংযম রাখি না—তাহাতে হৃদয় ঢালিয়া দিই। বিষয়কথাপূর্ণ পত্র আমার লিখিতে বা পড়িতে ভাল লাগে না—তাই আমার এইরূপ অভ্যাস—আমি চাই ভাবপূর্ণ পত্র। আমার পত্র লিখিবার ইচ্ছা না হইলে লিখি না আর যখন ইচ্ছা হয় তখন উপরি ২ অনেক পত্র লিখি!

 শারীরিক সুস্থতা জানান আমি অনেক সময়ে আবশ্যক মনে করি না—ভগবানের উপর বিশ্বাস করিয়া থাকিলে কোনও চিন্তা, উদ্বেগ বা ভয় আসে না। তার যদিও কাহারও অমঙ্গল ঘটে তাহাতেই বা আমরা কি করিতে পারি। আমাদের এমন কোনো শক্তি নাই যে ইচ্ছামত কাহাকেও আরোগ্য করিতে পারিব। তবে আর মিছে ভাবনা কেন? আমরা যাঁহার ক্রোড়ে আছি তিনিই ত আমাদের রক্ষয়িত্রী— যখন ত্রিলোকধারিণী বিশ্বজননী স্বয়ং আমাদের রক্ষয়িত্রী তখন এত চিন্তা এত ভয় কেন? অবিশ্বাসই দুঃখের এক সর্ব্বপ্রকার বিপদের কারণ কিন্তু মানুষ তাহা বুঝিতে চাহে না—এবং মনে করে যে ইচ্ছা করিলে কাহাকে ভাল করিয়া দিতে পারে, হায় রে মূর্খতা!

 মেসো মহাশয় ৮।৯ দিন হইল কলিকাতায় গিয়াছেন এবং সেখানে ভাল আছেন। তিনি খুব ডাব ভালবাসেন এবং বর্ত্তমান অবস্থায় ডাব তাঁহার খুব উপকারী। কিছু কলিকাতায় ভাল ডাব আনাইয়া তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিতে পারেন তাহা হইলে তিনি বড় উপকৃত হন, তিনি এ বিষয়ে আপনাকে লিখিতে বলিয়াছেন।

 এখানকার মঙ্গল জানিবেন। আপনারা সকলে ভাল আছেন শুনিয়া সুখী হইলাম। মেজদাদা কবে ফিরিবেন?

 বোধহয় মে মাসের মাঝামাঝি আমাদের পরীক্ষার খবর বাহির হইবে। কতদূর সত্য জানি না—তবে শুনিয়াছি ইতিমধ্যে অনেকে নম্বর পর্য্যন্ত জানিতে পারিয়াছে!

 সেজ দিদিরা কি আসিবেন?

 আমি এই অমূল্য ক্ষণস্থায়ী মানুষ জীবনের এত সময় নষ্ট করিয়া ফেলিলাম, তজ্জন্য মনে দিনরাত ভয়ানক কষ্ট হয়। সময়ে সময়ে অসহ্য বোধ হয়।

 যদি মানুষ জন্ম লাভ করিয়া মানুষজীবনের উদ্দেশ্য না সফল করিতে পারিলাম—যদি গন্তব্যস্থানে পঁহুছিতে না পারিলাম তবে আর কি হইল? যেমন সকল নদীর গন্তব্যস্থান সমুদ্র সেইরূপ সমস্ত জীবনের গন্তব্যস্থান—ঈশ্বর, যদি মানুষ ঈশ্বর লাভ না করিতে পারে তবে মানুষজন্ম বৃথা—আর পূজা, জপ, ধ্যান সবই বৃথা—সব কেবল ভণ্ডামী। এখন আর বাজে কথায় পর্য্যন্ত সময় নষ্ট করিতে ইচ্ছা হয় না—ইচ্ছা হয় কেবল একটা ঘরে বন্ধ হয়ে থাকি আর সমস্ত দিন সমস্ত রাত ধ্যান চিন্তা এবং পাঠে অতিবাহিত করি। দিন দিন যে আমরা যমমন্দিরের নিকটবর্ত্তী হইতেছি, কবে আর আমরা সাধনা করিব আর কবেই বা তাঁহাকে পাইয়া তাঁহার ক্রোড়ে শান্তিসুখ ও বিশ্রাম করিব। সে আনন্দময়কে না পাইলে কিছুতেই আনন্দ নাই। লোকে যে কি করিয়া টাকা, ধন-সম্পত্তি, বিষয় প্রভৃতি লইয়া সন্তুষ্ট থাকে তাহাও আমার নিকট সময়ে ২ এক বিষম সমস্যা বলিয়া বোধ হয়। যিনি আনন্দের নিধি তাঁহাকে বাদ দিলে যে আর কিছুতেই আনন্দ থাকে না। যিনি আনন্দের আকরস্বরূপ তাঁহাকে ধরা চাই—তবে ত আনন্দ পাইব।

 যদি চৈতন্য না হয়— যদি ভগবদ্দর্শন না হয়—তবে সমস্ত জীবনটাই বৃথা গেল। পূজা, জপ, ধ্যান, উপাসনা প্রভৃতি আমরা যাহা করি—তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য—ভগবদ্দর্শন বা ঈশ্বরলাভ। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হইলে সব বৃথা। যে একবার সেই অমৃতের খনি পাইয়াছে—সে আর সংসার-গরল পান করিতে যায় না।

 তিনি আমাদের সংসার খেলনার দ্বারা ভুলাইয়া রাখিয়াছেন এবং আমাদিগকে মায়াবদ্ধ জীব করিয়া ফেলিয়াছেন। মা সংসারের কাজে ব্যস্ত—ছেলে খেলনা লইয়া খেলিতেছে, যতক্ষণ পর্য্যন্ত ছেলে খেলনা দূরে ফেলিয়া “মা মা” বলিয়া ব্যাকুলভাবে না ডাকে ততক্ষণ মা ছেলের কাছে আসে না। না মনে করে— ছেলে ত খেলিতেছে আমি আর কেন যাইব। কিন্তু যখন ছেলের ক্রন্দনধ্বনি মা’র কানে বাজে তখন মা আর থাকিতে না পারিয়া দৌড়িয়া আসে। আমাদের বিশ্বজননী আমাদের লইয়া ঠিক সেইরূপ খেলিতেছেন। ভগবানে ষোল আনা মন না দিলে তাঁহাকে পাওয়া যায় না—যদি ভগবানের চরণে দুই চার আনা মন দিলে তাঁহাকে পাওয়া যাইত তবে বিষয়মধু-পানমত্ত লোকেরা ভগবানকে পায় না কেন? তাঁহাকে না পাইলে সব বৃথা—সব বৃথা—মানুষ জীবন এক বিড়ম্বনা—এক অসহ্য ভার।

 আপনি কি বলেন?

 তাঁকে না পেলে কি লইয়া দিন কাটাইব—কি লইয়া চিন্তা করিব—কাহার সহিত আলাপ করিব এবং কোথা হইতে আনন্দ পাইব। যিনি সব বস্তুরই আকরস্বরূপ তাঁহাকে ধরা চাই—তাঁহার দর্শন লাভ করা চাই।

 তাঁহাকে পাইতে হইলে সাধনা চাই—ব্যাকুলভাবে ডাকা চাই—গভীর ধ্যান চাই—তাহা হইলে খুব শীঘ্র এমন কি ২।৩ বৎসরের ভিতর তাঁহাকে পাওয়া যাইতে পারে। কেবল চেষ্টা করা চাই—পারি না পারি সে ইচ্ছা তাঁহার। কাজ আমার হাতে—কিন্তু ফলদাতা তিনি—ফল পাই না পাই—সে ইচ্ছা তাঁহার—তবে আমাদের কাজ করা চাই—চেষ্টা করা চাই। যে একবার তাঁহাকে পাইয়াছে—তাহাকে আর কাজও করিতে হয় না—সাধনাও করিতে হয় না বা চেষ্টাও করিতে হয় না। আশা করি আপনারা সকলে ভাল আছেন। আপনি আমার প্রণাম জানিবেন। ইতি—

আপনারই সেবক 
সুভাষ