পারসীক গল্প/বৃক্ষের সাক্ষ্য

বৃক্ষের সাক্ষ্য।


 একজন যুবক তাঁহার গ্রামের জনৈক বৃদ্ধের নিকট একশত খানি মোহর জমা রাখিয়া দেশ পর্য্যটনে বহির্গত হইয়া যান। কিছু দিবস পরে দেশ পর্য্যটন করিয়া যখন যুবক প্রত্যাগমন করিলেন, সেই সময় তিনি বৃদ্ধের নিকট গমন করিয়া তাঁহার গচ্ছিত অর্থের পুনঃ-প্রাপ্তির প্রার্থনা করেন। যুবকের কথা শুনিয়া বৃদ্ধ কহিল, “সে কি মহাশয়! আপনি আমার নিকট করে মোহর জমা করিয়া রাখিয়া গিয়াছিলেন? আার মোহরই বা আপনি কোথায় পাইবেন? আপনি সবিশেষ সাবধানের সহিত কথাবার্ত্তা কহিবেন। আমি আপনার গচ্ছিত টাকা প্রদান করিতেছি না, এরূপ মিথ্যা কথা রটনা করিয়া আমার নামে জনসমাজে বদনাম করিবেন না।”

 বৃদ্ধের কথায় যুবক একবারে হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন, ও তাহার ব্যবহার দেখিয়া মনে মনে তাহাকে সহস্র গালি প্রদান করিতে করিতে কাজির নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন। কাজি সাহেব যুবকের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন। আরও জানিতে পারিলেন,—তিনি যে বৃদ্ধের নিকট মোহর গচ্ছিত করিয়া রাখিয়াছেন, তাহার কোনরূপ প্রমাণ করিবার ক্ষমতা সেই যুবকের নাই। তথাপি তিনি বৃদ্ধকে ডাকাইয়া আনিলেন, এবং যুবকের সম্মুখে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই ব্যক্তির গচ্ছিত অর্থ প্রত্যর্পণ করিতেছ না কেন?”

 উত্তরে বৃদ্ধ কহিল, “দোহাই হুজুর! এ ব্যক্তি মিথ্যা কথা কহিতেছে। কখনও এ আমার নিকট একটামাত্র পয়সাও জমা রাখে নাই।”

 কাজি। (যুবক-প্রতি) তুমি যে বৃদ্ধের নিকট টাকা জমা রাখিয়াছিলে বলিতেছ, তাহার প্রমাণ কি? জমা রাখিবার সময় সেই স্থানে কোন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল?

 যুবক। এই বৃদ্ধই আমার প্রমাণ। বৃদ্ধই শপথ করিয়া বলুন যে, আমি উহার নিকট অর্থ গচ্ছিত করিয়া রাখিয়াছি, কি না। এই বৃদ্ধ ব্যতীত আমার আর কোন প্রমাণ নাই। যে সময় আমি ইহাকে অর্থ প্রদান করি, সেই সময় সেই স্থানে অপর কোন লোক উপস্থিত ছিল না।

 কাজি। কোন্ স্থানে বসিয়া তুমি ইহাকে অর্থ প্রদান করিয়াছিলে?

 যুবক। একটী অশ্বত্থ বৃক্ষের নিম্নে বসিরা আমি উহাকে অর্থ প্রদান করিয়াছিলাম।

 কাজি। তোমার মত মুর্খ লোক ত আমি জগতে দেখি নাই! এতদূর প্রমাণ থাকিতে তুমি কিরূপে কহিলে যে, যে সময় তুমি বৃদ্ধের হস্তে অর্থ প্রদান করিয়াছিলে, সেই সময় কেহ দেখে নাই? অত বড় একটা অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে বসিয়া যখন সেই অর্থ প্রদান করা হয়, তখন সেই বৃক্ষ নিশ্চয়ই উহা দেখিয়াছে। তুমি এখনই তাহার নিকট গমন কর, এবং তাহাকে কহ যে, এই মোকদ্দমায় সাক্ষ্য দিবার নিমিত্ত আমি তাহাকে ডাকিতেছি।

 যুবক। বৃক্ষের একস্থান হইতে অপর স্থানে যাইবার ত ক্ষমতা নাই, বা সে কথা কহিতেও পারে না। এরূপ অবস্থায় সেই বৃক্ষ কিরূপেই বা এই স্থানে আসিবে ও কিরূপেই বা সে সাক্ষ্য দিতে সমর্থ হইবে?

 কাজি। রাজাজ্ঞা সে শুনিতে বাধ্য। আমার কথা বলিলে সে নিশ্চয়ই আমার নিকট আগমন করিবে, এবং যাহা অবগত আছে, তাহা আমার নিকট বলিয়া পুনরায় আপন স্থানে প্রস্থান করিবে। তুমি এক কর্ম্ম কর। আমি ডাকিতেছি— তোমার এই কথায় বৃক্ষ যদি বিশ্বাস না করে, তাহা হইলে সে না আসিলেও আসিতে পারে। তুমি আমার এই নামাঙ্কিত মোহর লইয়া যাও, তাহাকে দেখাইয়া জামার আজ্ঞা তাহার নিকট প্রকাশ কর। তাহা হইলে সে নিশ্চয়ই আমার নিকট আগমন করিবে।

 এই বলিয়া কাজি সাহেব তাঁহার নামাঙ্কিত মোহর সেই যুবকের হস্তে প্রদান করিলেন। যুবকও কাজির কথার আর কোনরূপ প্রতিবাদ করিতে সাহসী না হইয়া, কাজির বুদ্ধিকে গালি প্রদান করিতে করিতে সেই নামাঙ্কিত মোহর হস্তে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলেন।

 কাজি অন্য কার্য্যে মনোনিবেশ করিলেন। বৃদ্ধ সেই স্থানে বসিয়া রহিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে কাজি সাহেব সেই বৃদ্ধের দিকে তাকাইয়া কহিলেন, “এতক্ষণ যুবক সেই গাছের নিকট উপস্থিত হইতে পারিয়াছে কি?” উত্তরে বৃদ্ধ কহিল, “না মহাশয়! এখন পর্য্যন্ত সে সেই বৃক্ষের নিকট উপস্থিত হইতে পারে নাই।” এই কথা শুনিয়া কাজি সাহের পুনরায় আপন কার্য্যে মনোযোগ দিলেন।

 প্রায় এক ঘণ্টা পরে যুবক নিতান্ত দুঃখিত অন্তঃকরণে প্রত্যাগমন করিয়া কাজির নামাঙ্কিত মোহর তাঁহার সম্মুখে স্থাপিত করিয়া কহিল, “আমি সেই বৃক্ষকে আপনার এই মোহর দেখাইয়া আপনার আদেশ তাহাকে বার বার জ্ঞাপন করিলাম; কিন্তু কিছুতেই সে আমার কথা শুনিল না, বা কোনরূপ উত্তরও প্রদান করিল না। এ পর্য্যন্ত আমি আর কখনও শুনি নাই যে, বৃক্ষ কথা কহিতে পারে, বা স্থানান্তরে গমন করিতে পারে।”

 কাজি। কে তোমাকে কহিল যে, বৃক্ষ আমার আদেশ প্রতিপালন করে নাই। আমার নিকট আসিয়া সাক্ষ্য প্রদান করিয়া সে চলিয়া গিয়াছে। সে আমাকে বলিয়া গিয়াছে, তোমার কথা প্রকৃত; তুমি বৃদ্ধের নিকট প্রকৃতই অর্থ গচ্ছিত করিয়া রাখিয়া দিয়াছ।

 বৃদ্ধ। দোহাই ধর্মাবতার! আমি এখানে আসিয়া পর্য্যন্ত এই স্থানেই বসিয়া আছি। বৃক্ষ এই স্থানে ত আইসে নাই, বা কোনরূপ সাক্ষ্যও প্রদান করে নাই। যদি বৃক্ষ এই স্থানে আগমন করিত, তাহা হইলে আমি অত বড় বৃক্ষটীকে আর দেখিতে পাইতাম না?

 কাজি। বৃদ্ধ! তুমি যাহা বলিতেছ, তাহা প্রকৃত। বৃক্ষ এই স্থানে আগমন করে নাই। কিন্তু তুমি মনে করিয়া দেখ দেখি, ইতিপূর্ব্বে যখন আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম “এতক্ষণ যুবক সেই বৃক্ষের নিকট উপস্থিত হইতে পারিয়াছে কি?” তখন তুমি অবলীলাক্রমে উত্তর করিয়াছিলে, বা প্রকৃত কথা হঠাৎ তোমার মুখ দিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছিল যে, “না মহাশয়! এখন পর্য্যন্ত সে সেই বৃক্ষের নিকট উপস্থিত হইতে পারে নাই।” তোমার কথাতেই বেশ বুঝিতে পারা যাইতেছে যে, যে বৃক্ষের নিয়ে বসিয়া অর্থ দেওয়া হইয়াছিল, সেই বৃক্ষ কোথায়, তাহা তুমি বেশ অবগত আছ। আর যখন তাহা জান, তখন এ অর্থও যে তুমি গ্রহণ করিয়াছ, তদ্বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। সেই বৃক্ষ কোথায়, তাহা যদি তুমি না জানিতে, বা সেই অর্থ যদি তুমি গ্রহণ না করিতে, তাহা হইলে আমার কথার উত্তরে তুমি নিশ্চয় বলিতে যে, কোন্ বৃক্ষ, তাহা আমি বলিতে পারি না। এখন আমার বেশ প্রতীতি হইতেছে যে, এই যুবক যাহা বলিতেছে, তাহা প্রকৃত; এবং তুমি যাহা কহিতেছ, তাহা সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা। গচ্ছিত অর্থ তুমি এখনই এই যুবককে প্রদান কর।

 কাজি সাহেবের বিচার-অনুযায়ী বৃদ্ধ একশত মোহর সেই যুবকের হস্তে প্রদান করিয়া অব্যাহতি পাইল। পরিশেষে সকলের নিকট মুক্তকণ্ঠে তাহাকে স্বীকার করিতে হইল যে, সে লোভের বশবর্ত্তী হইয়া প্রথমে মিথ্যা কথা কহিয়াছিল; কিন্তু পরে যখন দেখিল যে, কাজি সাহেব প্রকৃত বিচার করিয়াছেন, তখন আর কোন কথা কহিতে সাহসী হইল না।

 এইরূপ ঘটনায় যুবক আপন অর্থ গ্রহণ করিয়া কাজি সাহেবকে ধন্যবাদ প্রদান পূর্বক আপন স্থানে প্রস্থান করিল।