পারসীক গল্প/সতীত্ব নাশের প্রমাণ

সতীত্ব নাশের প্রমাণ।


 একটী দরিদ্র স্ত্রীলোকের অনেক দিবস হইতে একটী পুরুষের সহিত মনোবিবাদ ছিল। সে সেই পুরুষকে জব্দ করিবার নিমিত্ত অনেক সময় অনেক রূপ চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু কখনও কোন রূপে কৃতকার্য্য হইতে পারে নাই।

 কোন দুষ্ট লোকের পরামর্শ-মত এক দিবস সেই স্ত্রীলোকটী কাজি সাহেবের নিকট গমন করিয়া সেই পুরুষের নামে এইরূপ ভাবে এক নালিশ করিল যে, এক দিবস সন্ধ্যার সময় যখন সে একাকী রাস্তা দিয়া গমন করিতেছিল, সেই সময় সেই পুরুষটী কোথা হইতে দৌড়িয়া আসিয়া রাস্তার মধ্যে তাহাকে ধরিয়াছে ও জোর করিয়া তাহার ধর্ম্মনষ্ট করিয়াছে।

 স্ত্রীলোকের প্রমুখাৎ এই কথা শুনিবামাত্র কাজি সাহেব লোক পাঠাইয়া তখনই সেই পুরুষটীকে ধরিয়া আনিলেন। ভীতান্তঃকরণে কাঁপিতে কাঁপিতে সে আসিয়া কাজি সাহেবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল।

 কাজি। তুমি জোর করিয়া এই স্ত্রীলোকের ধর্ম্মনষ্ট করিয়াছ কেন?

 পুরুষ। দোহাই ধর্ম্মাবতার! এরূপ কর্ম্ম আমি কখনই করি নাই। আমার সহিত পূর্ব্ব হইতে ইহার মনোবিবাদ আছে, তাই এ মিথ্যা করিয়া এই নালিশ করিয়াছে।

 কাজি। স্ত্রীলোক কখন মিথ্যা কথা কহে না, তুমিই মিথ্যা কথা কহিতেছ। আমার বিশ্বাস যে, তুমি উহার ধর্ম্মনষ্ট করিয়াছ। আমি তোমাকে দশ টাকা জরিমানা করিলাম, সেই টাকা এই স্ত্রীলোকটী পাইবে।

 কাজি সাহেবের আদেশ শুনিয়া, সে আর কোন কথা কহিতে পারিল না। সেও নিতান্ত দরিদ্র ছিল, তথাপি বহুকষ্টে দশ টাকা সংগ্রহ করিয়া কাজি সাহেবের হস্তে প্রদান করিল। কাজি সাহেব সেই টাকা দশটী সেই স্ত্রীলোকটীর হস্তে প্রদান করিয়া কহিলেন, “যাও, এই টাকা লইয়া তুমি আপন গৃহে প্রস্থান কর।”

 টাকা কয়েকটী হস্তে লইয়া স্ত্রীলোকটী বিশেষ রূপ আনন্দিত হইল, ও কাজি সাহেবকে সেলাম করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল।

 সেই স্ত্রীলোকটী কিয়দ্দূর চলিয়া গেলে পর, সেই পুরুষকে কাজি সাহেব পুনরায় ডাকাইলেন ও কহিলেন, “যে অপরাধে আমি তোমার অর্থদণ্ড করিয়াছি, এখন বোধ হইতেছে, সে দোষে তুমি দোষী নহ। তুমি ওই স্ত্রীলোকের নিকট হইতে তোমার টাকা ফিরাইয়া লও।”

 পুরুষ। ধর্মাবতার! আমি কিরূপে টাকা ফিরাইয়া লইব? ও যদি সহজে না দেয়, তাহা হইলে আমি কি করিব?

 কাজি। ও যদি সহজে সেই টাকা তোমাকে প্রদান না করে, তাহা হইলে উহার নিকট হইতে জোর করিয়া তুমি সেই টাকা কাড়িয়া লইবে ও পরিশেষে উহাকে ধরিয়া আমার নিকট আনয়ন করিবে।

 কাজি সাহেবের আদেশ পাইবামাত্র সে দ্রুতবেগে সেই স্ত্রীলোকের উদ্দেশে চলিল। কিয়ৎক্ষণ পরে সেই স্ত্রীলোককে সঙ্গে করিয়া পুনরায় কাজি সাহেবের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল।

 তখন সেই পুরুষটীকে দেখিয়া কাজি সাহেব কহিলেন, “কেমন তুমি তোমার টাকা পাইয়াছ?”

 পুরুষ। না।

 কাজি। কেন?

 পুরুষ। দিতেছে না।

 কাজি। না দিলে জোর করিয়া কাড়িয়া লইতে আসি আদেশ দিয়াছি।

 পুরুষ। স্ত্রীলোকের হস্ত হইতে জোর করিয়া আমি কিরূপে টাকা কাড়িয়া লইতে পারি?

 কাজি। কাড়িয়া লইতে পার নাই, কিন্তু কাড়িয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছিলে?  পুরুষ। চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু কাড়িয়া লইতে সমর্থ হই নাই।

 কাজি। (সেই স্ত্রীলোকের প্রতি) কেমন তোমার হস্ত হইতে টাকা কয়েকটী কাড়িয়া লইতে এই ব্যক্তি চেষ্টা করিয়াছিল?

 স্ত্রী। হাঁ করিয়াছিল।

 কাজি। চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু লইতে পারে নাই?

 স্ত্রী। আপনি আমাকে যাহা দিয়াছেন, তাহা সহজে আমি ছাড়িব কেন? এই নিমিত্ত আমি আপনার নিকট পুনরায় আসিয়াছি।

 কাজি। আমার প্রদত্ত পদার্থ যখন তুমি উহাকে সহজে প্রদান করিতে চাহ না, তখন ঈশ্বর-প্রদত্ত অমূল্য দ্রব্য তুমি অনায়াসেই যে উহাকে প্রদান করিয়াছ, তাহা আমার বোধ হয় না। যে ব্যক্তি আমার আদেশ পাইয়াও, তোমার নিকট হইতে জোর করিয়া টাকা কয়েকটা কাড়িয়া লইতে সমর্থ হইল না, সেই ব্যক্তি সহজেই তোমার নিকট হইতে তোমার সতীত্ব যে অনায়াসেই কাড়িয়া লইতে পারিবে, তাহা কিছুতেই সম্ভবপর নহে। তুমি আমার নিকট মিথ্যা নালিশ উপস্থিত করিয়াছ। আমি তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছি, এরূপ মিথ্যা নালিশ পুনরায় আর যেন শুনিতে না পাই।

 এই বলিয়া কাজি সাহেব টাকা কয়টী সেই স্ত্রীলোকের নিকট হইতে ফিরাইয়া লইয়া সেই পুরুষের হস্তে প্রদান করিলেন। উভয়েই সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল।

 এই ঘটনার কিছু দিবস পরেই সেই স্ত্রীলোকটী তাহার কোন বিশ্বস্ত লোকের নিকট গল্প করিয়াছিল যে, মিথ্যা নালিশ করিয়া কোন রূপে কাজি সাহেবের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার উপায় নাই। সে যে মিথ্যা নালিশ করিয়াছিল, কাজি সাহেব তাহা ঠিক বুঝিতে পারিয়াছিলেন।

 এই ঘটনার পর সেই স্ত্রীলোকটী কাজি সাহেবের নিকট গমন করিয়া পার কখনও নালিশ করে নাই।