পূরবী/পথিক/বনস্পতি

বনস্পতি

পূর্ণতার সাধনায় বনস্পতি চাহে ঊর্দ্ধপানে;
পুঞ্জ পুঞ্জ পল্লবে পল্লবে
নিত্য তা’র সাড়া জাগে বিরাটের নিঃশব্দ আহ্বানে,
মন্ত্র জপে মর্ম্মরিত রবে।
ধ্রুবত্বের মূর্ত্তি সে যে, দৃঢ়তা শাখায় প্রশাখায়
বিপুল প্রাণের বহে ভার।
তবু তা’র শ্যামলতা কম্পমান ভীরু বেদনায়
আন্দোলিয়া উঠে বারম্বার॥

দয়া কোরাে, দয়া কোরাে, আরণ্যক এই তপস্বীরে,
ধৈর্য্য ধরাে, ওগাে দিগঙ্গনা,
ব্যর্থ করিবারে তায় অশান্ত আবেগে ফিরে ফিরে
বনের অঙ্গনে মাতিয়াে না।
এ-কী তীব্র প্রেম, এ যে শিলাবৃষ্টি নির্ম্মম দুঃসহ,—
দুরন্ত চুম্বন-বেগে তব
ছিঁড়িতে ঝরাতে চাও অন্ধ সুখে, কহ মােরে কহ,
কিশাের কোরক নব নব॥

অকস্মাৎ দস্যুতায় তা’রে রিক্ত করি’ নিতে চাও
সর্ব্বস্ব তাহার তব সাথে?
ছিন্ন করি’ লবে যাহা চিহ্ন তা’র রবে না কোথাও,
হবে তা’রে মুহূর্ত্তে হারাতে।

যে লুব্ধ ধূলির তলে লুকাতে চাহিবে তব লাভ
সে তােমারে ফাঁকি দেবে শেষে।
লুণ্ঠনের ধন লুঠি’ সর্ব্বগ্রাসী দারুণ অভাব
উঠিবে কঠিন হাসি হেসে॥

আসুক তােমার প্রেম দীপ্তিরূপে নীলাম্বর-তলে,
শান্তিরূপে এসাে দিগঙ্গনা।
উঠুক স্পন্দিত হ’য়ে শাখে শাখে পল্লবে বল্কলে
সুগম্ভীর তােমার বন্দনা।
দাও তা’রে সেই তেজ মহত্ত্বে যাহার সমাধান,
সার্থক হােক সে বনম্পতি।
বিশ্বের অঞ্জলি যেন ভরিয়া করিতে পারে দান
তপস্যার পূর্ণ পরিণতি॥

উঠুক তােমার প্রেম রূপ ধরি’ তা’র সর্ব্বমাঝে
নিত্য নব পত্রে ফলে ফুলে।
গােপনে আঁধারে তা’র যে-অনন্ত নিয়ত বিরাজে
আবরণ দাও তা’র খুলে।
তাহার গৌরবে লহ তােমারি স্পর্শের পরিচয়,
আপনার চরম বারতা।
তা’রি লাভে লাভ করা বিনা লােভে সম্পদ অক্ষয়,
তা’রি ফলে তব সফলতা॥


সান্ ইসিড্রো,

২৮ ডিসেম্বর, ১৯২৪।