পূরবী/পথিক/বীণা-হারা

বীণা-হারা

যবে এসে নাড়া দিলে দ্বার
চমকি উঠিনু লাজে,
খুঁজে দেখি গৃহ মাঝে
বীণা ফেলে এসেছি আমার,
ওগাে বীণ্-কার।
সেদিন মেঘের ভারে
নদীর পশ্চিম পারে
ঘন হ’লাে দিগন্তের ভুরু,
বৃষ্টির নাচনে মাতা,
বনে মর্ম্মরিল পাতা,
দেয়া গরজিল গুরু গুরু।
ভরা হ’লো আয়ােজন,
ভাবিনু ভরিবে মন
বক্ষে জেগে উঠিবে মল্লার,
হায় লাগিল না সুর
কোথায় সে বহুদূর
বীণা ফেলে এসেছি আমার॥

কণ্ঠে নিয়ে এলে পুষ্পহার।
পুরস্কার পাবাে আশে
খুঁজে দেখি চারি পাশে
বীণা ফেলে এসেছি আমার,
ওগাে বীণ্-কার।
প্রবাসে বনের ছায়ে
সহসা আমার গায়ে
ফাল্গুনের ছোঁওয়া লাগে একি?
এ-পারের যত পাখী
সবাই কহিল ডাকি’
ও-পারের গান গাও দেখি।
ভাবিলাম মাের ছন্দে
মিলাবাে ফুলের গন্ধে
আনন্দের বসন্ত বাহার।
খুঁজিয়া দেখিনু বুকে,
কহিলাম নত মুখে,
“বীণা ফেলে এসেছি আমার॥”


এলাে বুঝি মিলনের বার
আকাশ ভরিল ওই;
শুধাইলে, “সুর কই?”

বীণা ফেলে এসেছি আমার
ওগাে বীণ্-কার।
অস্ত-রবি গােধূলিতে
ব’লে গেলাে পূরবীতে
আর তাে অধিক নাই দেরি।
রাঙা আলােকের জবা
সাজিয়ে তুলেছে সভা,
সিংহদ্বারে বাজিয়াছে ভেরি।
সুদূর আকাশতলে
ধ্রুবতারা ডেকে বলে,
“তারে তারে লাগাও ঝঙ্কার।”
কানাড়াতে সাহানাতে
জাগিতে হবে যে রাতে,—
বীণা ফেলে এসেছি আমার॥


এলে নিয়ে শিখা বেদনার।
গানে যে বরিবাে তা’রে,—
চাহিলাম চারিধারে,—
বীণা ফেলে এসেছি আমার,
ওগাে বীণ্-কার।

কাজ হ’য়ে গেছে সারা,
নিশীথে উঠেছে তারা,
মিলে গেছে বাটে আর মাঠে।
দীপহীন বাঁধা তরী
সারা দীর্ঘ রাত ধরি’
দুলিয়া দুলিয়া ওঠে মাঠে।
যে শিখা গিয়েছে নিবে
অগ্নি দিয়ে জ্বেলে দিবে
সে আলােতে হ’তে হবে পার।
শুনেছি গানের তালে
সুবাতাস লাগে পালে ;
বীণা ফেলে এসেছি আমার॥


সান্ ইসিড্রো,
২৭ ডিসেম্বর, ১৯২৪।