বাংলা শব্দতত্ত্ব/বাংলা বহুবচন ১



বাংলা বহুবচন

  সংস্কৃত ভাষার সাত বিভক্তি প্রাকৃতে অনেকটা ক্ষিপ্ত হইয়া আসিয়াছে। প্রাকৃতে চতুর্থ বিভক্তি নাই বলিলেই হয় এবং যষ্ঠীর দ্বারাই প্রথমা ব্যতীত অন্য সকল বিভক্তির কার্য সারিয়া লওয়া যাইতে পারে।

  আধুনিক ভারতবর্ষীয় আর্যভাষাগুলিতে প্রাকৃতের এই নিয়মের প্রভাব দেখা যায়।[১]

  সংস্কৃত ষষ্ঠীর স্য বিভক্তির স্থানে প্রাকৃতে শ্ শ হ হো হে হি বিভক্তি পাওয়া যায়। আধুনিক ভাষাগুলিতে এই বিভক্তির অনুসরণ করা যাক।

চহবানহ পাস —চাঁদ : চহবানের নিকট।
সংসারহি পারা —কবীর : সংসারের পার।
মুনিহিঁঁ দিখাঈ —তুলসীদাস: মুনিকে দেখাইলেন।
যুবরাজপদ রামহি দেহ —তুলসীদাস : যুবরাজপদ রামকে দেও।
কহৌ সম খান্‌ততারহ —চাঁঁদ : তিনি খান্‌ততারহ কহিলেন।
তত্তারহ উপরহ —চাঁঁদ : তাতারের উপরে।
আদিহিতে সব কথা সুনাঈ —তুলসীদাস : আদি হইতে তিনি সকল কথা শুনাইলেন।

  উক্ত উদাহরণ হইতে দেখা যাইতেছে ষষ্ঠী বিভক্তির চিহ্ন প্রায় সকল বিভক্তির কাজ সারিতেছে।

  বাংলায় কী হয় দেখা যাক। বাংলায় যে-সকল বিভক্তিতে ‘এ’ যোগ হয় তাহার ইতিহাস প্রাকৃত হি-র মধ্যে পাওয়া যায়। সংস্কৃত— গৃহস্য, অপভ্রংশ প্রাকৃত— ঘরহে, বাংল— ঘরে। সংস্কৃত— তাম্রকস্য, অপভ্রংশ প্রাকৃত— তম্বঅহে, বাংলায়— তাঁঁবায় (তাঁঁবাএ)।

  পরবর্তী হি যে অপভ্রংশে একার হইয়া যায় বাংলায় তাহার অন্য প্রমাণ আছে। বারবার শব্দটিকে জোর দিবার সময় আমরা ‘বারে বারে’ বলি; সংস্কৃত নিশ্চয়ার্থকসূচক হি-যোগে ইহা নিষ্পন্ন; বারহি বারহ— বারই বারই— বারে বারে। একেবারে শব্দটিরও ওইরূপ ব্যুৎপত্তি। প্রাচীন বাংলায় কর্মকারকে ‘এ’ বিভক্তিযোগ ছিল, তাহা বাংলা কাব্যপ্রয়োগ দেখিলেই বুঝা যায়:

   লাজ কেন কর বধূজনে: কবিকঙ্কণ

  করণ কারকেও ‘এ’ বিভক্তি চলে। যথা,

   পূজিলেন ভূষণে চন্দনে।

    ধনে ধান্যে পরিপূর্ণ।

    তিলকে ললাট শশাভিত।

  বাংলায় সম্প্রদান কর্মের অনুরূপ। যথা,

    দীনে কর দান।

    গুরুজনে করো নতি।

  অধিকরণের তো কথাই নাই।

  যাহা হউক, সম্বন্ধের চিহ্ন লইয়া প্রায় সকল কারকের কাজ চলিয়া গেল কিন্তু স্বয়ং সম্বন্ধের বেলা কিছু গোল দেখা যায়।

  বাংলায় সম্বন্ধে ‘র’ আসিল কোথা হইতে। পাঠকগণ বাংলা প্রাচীনকাব্যে দেখিয়া থাকিবেন, তাহার যাহার প্রভৃতি শব্দের স্থলে তাকর যাকর প্রভৃতি প্রয়োগ কোথাও দেখা যায়। এই কর শব্দের ক লোপ পাইয়া র অবশিষ্ট রহিয়াছে, এমন অনুমান সহজেই মনে উদয় হয়।

  পশ্চিমি হিন্দির অধিকাংশ শাখায় ষষ্ঠীতে কো কা কে প্রভৃতি বিভক্তি যোগ হয়; যথা, ঘোড়েকা ঘোড়েকো ঘোড়েকৌ ঘোড়াকো।

  বাংলার সহিত যাহাদের সাদৃশ্য আছে নিয়ে বিবৃত হইল; মৈথিলী— ঘোড়কর ঘোড়াকের; মাগধী—ঘোড়াকের ঘোড়ৱাকর; মাড়োয়ারি— ঘোড়ানো; বাংল— ঘোড়ার।

  এই তালিকা আলোচনা করিলে প্রতীতি হয় কর শব্দ কোনো ভাষা সমগ্র রাখিয়াছে, এবং কোনো ভাষায় উহার ক অংশ এবং কোনো ভাষায় উহার র অংশ রক্ষিত হইয়াছে।

  প্রাকৃতে অনেক স্থলে ষষ্ঠী বিভক্তির পর এক অনাবশ্যক কেরক শব্দের যোগ দেখা যায়; যথা, কস্স কেরকং এদং পবহণং— কাহার এই গাড়ি, তুহ্মহং কেরউং ধন— তোমার ধন, জসুকেরে হুংকারউয়েঁঁ মুহহুং পড়ংতি তনাই— যাহার হুংকারে মুখ হইতে তৃণ পড়িয়া যায়। ইহার সহিত চাঁঁদ কবির: ভীমহকরি সেন—ভীমের সৈন্য, তুলসীদাসের: জীবহ্বকের কলেসা—জীবগণের ক্লেশ, তুলনা করিলে উভয়ের সাদৃশ্য সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিবে না।

  এই কেরক শব্দের সংস্কৃত—কৃতক, কৃত। তস্যকৃত শব্দের অর্থ তাঁঁহার দ্বারা কৃত। এই কৃতবাচক সম্বন্ধ ক্ৰমে সর্বপ্রকার সম্বন্ধেই ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা পূর্বোক্ত উদাহরণেই প্রমাণ হইবে।

  এইস্থলে বাংলা ষষ্ঠীর বহুবচন দের দিগের শব্দের উৎপত্তি আলোচনা করা যাইতে পারে। দীনেশবাবু যে মত প্রকাশ করিয়াছেন তাহা বিশেষ শ্রদ্ধার সহিত আলোচ্য। এ স্থলে উদ্‌ধৃত করি:

  বহুবচন বুঝাইতে পূর্বে শব্দের সঙ্গে খুব সকল প্রভৃতি সংযুক্ত হইত; যথা,

তুমি সব জন্ম জন্ম বান্ধব আমার।
কষ্ণের কৃপায় শাস্ত্র স্ফুরুক সবার।-চৈ ভা

  ক্রমে আদি সংযোগে বহুবচনের পদ সৃষ্টি হইতে লাগিল; যথা নরোত্তম বিলাসে,

শ্রীচৈতন্যদাস আদি যথা উত্তরিলা।
শ্রীনৃসিংহ কবিরাজে তথা নিয়ােজিলা॥
শ্রীপতি শ্রীনিধি পণ্ডিতাদি বাসাঘরে।
করিলেন নিযুক্ত প্রবাস আচার্যেরে॥
আকাই হাটের কৃষ্ণদাসাদি বাসায়।
হইলা নিযুক্ত বল্লভীকান্ত তায়॥

  এইরূপে, রামাদি জীবাদি হইতে ষষ্ঠী র সংঘোগে— রামদের জীবদের হইয়াছে স্পষ্টই দেখা যায়।

  আদি শব্দের উত্তরে স্বার্থে ক যুক্ত হইয়া বৃক্ষাদিক জীবাদিক শব্দের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ফলত উদাহরণেও তাহাই পাওয়া যায়; যথা নরোত্তমবিলাসে,

রামচাদিক যৈছে গেলা বৃন্দাবনে।
কবিতার খ্যাতি তার হইল যেমনে।

 এই ক-এর গ-এ পরিণতিও সহজেই প্রতিপন্ন হইতে পারে। সুতরাং বৃক্ষাদিগ (বৃক্ষদিগ), জীবাদিগ (জীবদিগ) শব্দ পাওয়া যাইতেছে। এখন ষষ্ঠীর র সংযোগে দিগের এবং কর্মের ও সম্প্রদানের চিহ্নে পরিণত কে-র সংযোগে দিগকে পদ উৎপন্ন হইয়াছে নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে।

  সম্পূর্ণ নিঃসংশয়ের কথা নহে। কারণ, দীনেশবাবু কেবল অকারী পদের দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। ইকার-উকারান্ত পদের সহিত আদি শব্দের যোগ তিনি প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ হইতে সংগ্রহ করিতে পারেন কি না সন্দেহ। এবং রামাদিগ হইতে রামদিগ হওয়া যত সহজ, কপ্যাদিগ হইতে কপিদিগ এবং ধেন্বাদিগ হইতে ধেনুদিগ হওয়া তত সহজ নহে।

  হিন্দিভাষার সহিত তুলনা করিয়া দেখা আবশ্যক। সাধু হিন্দি—ঘোড়োঁঁকা, কনৌজি—ঘোড়নকো, ব্রজভাষা—ঘোড়ৌঁঁকো অথবা ঘোড়নিকৌ, মাড়োয়ারি—ঘোড়াঁঁরো, মেৱারি—ঘোড়াঁঁকো, গঢ়ৱালি—ঘোড়োঁঁকো, অৱধি—ঘোড়ৱন-কর, রিৱাই—ঘ্বাঁঁড়নকর, ভোজপুরি—ঘোড়নকি, মাগধী—ঘোড়নকের, মৈথিলী—ঘোড়নিক ঘোড়নিকর।

  উদ্‌ধৃত দৃষ্টান্তগুলিতে দেখা যাইতেছে, কা কো কের কর প্রভৃতি ষষ্ঠী বিভক্তি চিহ্নের বহুবচন নাই। বহুবচনের চিহ্ন মূল শব্দের সহিত সানুনাসিক-রূপে যুক্ত।

  অপভ্রংশ প্রাকৃতে ষষ্ঠীর বহুবচনে হং হুং হিং বিভক্তি হয়। সংস্কৃত নারাণাং কৃতকঃ শব্দ অপভ্রংশ প্রাকৃতে নরহং কেরও এবং হিন্দিতে নরোঁঁকো হয়। সংস্কৃত ষষ্ঠী বহুবচনের আনাং হিন্দিতে বিচিত্র সানুনাসিকে পরিণত হইয়াছে।

  বাংলায় এ-নিয়মের ব্যত্যয় হইবার কারণ পাওয়া যায় না। আমাদের মতে সম্পূর্ণ ব্যত্যয় হয় নাই। নিম্নে তাহার আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া গেল। হিন্দিতে কর্তৃকারকে একবচন বহুবচনের ভেদচিহ্ন লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বিশেষ রূপে বহুবচন বুঝাইতে হইলে লোগ্‌গণ প্রভৃতি শব্দ অনুযোজন করা হয়।

  প্রাচীন বাংলারও এই দশা ছিল, পুরাতন কাব্যে তাহার প্রমাণ আছে; দেখা গিয়াছে, সব সকল প্রভৃতি শব্দের অনুযোজনদ্বারা বহুবচন নিপন্ন হইত।

  কিন্তু হিন্দিতে দ্বিতীয়া তৃতীয়া প্রভৃতি বিভক্তির চিহ্ন যোগের সময় শব্দের একবচন ও বহুবচন রূপ লক্ষিত হয়; যথা, ঘোড়েকো— একটি ঘোড়াকে, ঘোড়োঁঁকো— অনেক ঘোড়াকে। ঘোড়ে একবচনরূপ এবং ঘোড়োঁঁ বহুবচনরূপ।

  পূর্বে একস্থলে উল্লেখ করিয়াছি যে, প্রাকৃত একবচন যষ্ঠী বিভক্তিচিহ্ন হে হি স্থলে বাংলায় একার দেখা যায়; যথা অপভ্রংশ প্রাকৃত—ঘরহে, বাংলায় ঘরে।

  হিন্দিতেও এইরূপ ঘটে। ঘোড়ে শব্দ তাহার দৃষ্টান্ত।

  প্রাকৃতের প্রথা অসারে প্রথমে গৌড়ীয় ভাষায় বিভক্তির মধ্যে যষ্ঠী বিভক্তিচিহ্নই একমাত্র অবশিষ্ট ছিল; অবশেষে পরিস্ফুটনের জন্য সেই ষষ্ঠী বিভক্তির সহিত সংলগ্ন করিয়া ভিন্ন ভিন্ন কারকজ্ঞাপক শব্দযোজনা প্রবর্তিত হইল।

  বাংলায় এই নিয়মের লক্ষ একেবারে নাই তাহা নহে। ‘হাতর’ না বলিয়া বাংলায় হাতের বলে, ‘ভাইর’ না বলিয়া ভাইয়ের বলে, ‘মুখতে’ না বলিয়া মুখেতে এবং বিকল্পে পাতে এবং পায়েতে বলা হইয়া থাকে।

  প্রথমে, হাতে ভাইয়ে মুখে পায়ে রূপ করিয়া তাহাতে র তে প্রভৃতি বিশেষ বিভক্তি যোগ হইয়াছে। পূর্বেই বলা হইয়াছে এই একার প্রাকৃত একবচন ষষ্ঠীবাচক হি হে-র অপভ্রংশ।

  আমাদের বিশ্বাস বহুবচনেও বাংলা এক সময়ে হিন্দি অনুযায়ী ছিল এবং সংস্কৃত ষষ্ঠী বহুবচনের আনাং বিভক্তি যেখানে হিন্দিতে সংক্ষিপ্ত সানুনাসিকে পরিবর্তিত হইয়াছে, বাংলায় তাহার দ আকার ধারণ করিয়াছে এবং কৃতশব্দের অপভ্রংশ কের তাহার সহিত বাহুল্য প্রয়োগরূপে যুক্ত হইয়াছে।

  তুলসীদাসে আছে, জীবহ্লকের কলেসা, এই জীবহ্লকের শব্দের রূপান্তর ‘জীবদিগের’ হওয়া কিছুই অসম্ভব নহে।

  ন হইতে দ হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত সকলেই অবগত আছেন, বানর হইতে বান্দর ও বাঁঁদর।

  কর্মকারকে জীবহ্লকে হইতে জীবদিগে শব্দের উদ্‌ভব হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের নূতন সৃষ্ট বাংলায় আমরা কর্মকারকে দিগকে লিখিয়া থাকি, কিন্তু কথিত ভাষায় মনোযোগ দিলে কর্মকারকে দিগে শব্দের প্রয়োগ অনেক স্থলেই শুনা যায়।

  বোধ হয় সকলেই লক্ষ করিয়া থাকিবেন, সাধারণ লোকদের মধ্যে— আমাগের তোমাগের শব্দ প্রচলিত আছে। এরূপ প্রয়োগ বাংলার কোনো বিশেষ প্রদেশে বদ্ধ কি না বলিতে পারি না, কিন্তু নিম্নশ্রেণীর লোকদের মুখে বারবার শুনা গিয়াছে, ইহা নিশ্চয়। আমাগের তোমাগের শব্দের মধ্যস্থলে আসিবার প্রয়োজন হয় নাই: কারণ, ম সানুনাসিক বর্ণ হওয়াতে পার্শ্ববর্তী সাহসিককে সহজে আত্মসাৎ করিয়া লইয়াছে। যাগের তাগের শব্দ ব্যবহার করিতে শুনা যায় নাই।

 এই মতের বিরুদ্ধে সন্দেহের একটি কারণ বর্তমান আছে। আমরা সাধারণত, নিজদের লোকদের গাছদের না বলিয়া, নিজেদের লোকেদের গাছেদের বলিয়া থাকি। জীবহ্নকের—জীবহ্নের—জীবন্দের-জীবদের, এরূপ রূপান্তরপর্যায়ে উক্ত একারের স্থান কোথাও দেখি না।

 মেওয়ারি কাব্যে ষষ্ঠী বিভক্তির একটি প্রাচীন রূপ দেখা যায় হংদো। কাশ্মীরিতে ষষ্ঠী বিভক্তির বহুবচন হিংদ। জনহিংদ বলিতে লোকদিগের বুঝায়। বীমস সাহেবের মতে এই হংদো ভূ ধাতুর ভবন্ত হইতে উৎপন্ন। যেমন ক্বত একপ্রকারের সম্বন্ধ তেমনই ভূত আর-এক প্রকারের সম্বন্ধ।

 যদি ধরিয়া লওয়া যায়, জন হিন্দকের জনহিঁন্দের শব্দের একপর্যায়গত শব্দ জনদিগের জনেদের, তাহা হইলে নিয়মে বাধে না। ঘরহিঁ স্থলে যদি ‘ঘরে’ হয় তবে জনহিঁ স্থলে ‘জনে’ হওয়া অসংগত নহে। বাংলার প্রতিবেশী আসামি ভাষায় হঁত শব্দ বহুবচনবাচক। মানুহহঁত অর্থে মানুষগণ বুঝায়। হঁত এবং হংদ শব্দের সাদৃশ্য আছে। কিন্তু হংদ সম্বন্ধবাচক বহুবচন, হঁত বহুবচন কিন্তু সম্বন্ধবাচক নহে।

 পরন্তু সম্বন্ধ ও বহুবচনের মধ্যে নৈকট্য আছে। একের সহিত সম্বন্ধীয়গণই বহু। বাংলায় রামের শব্দ সম্বন্ধসূচক, রামেরা বহুবচনসূচক; রামেরা বলিতে রামের গণ, অর্থাৎ রাম-সম্বন্ধীয়গণ বুঝায়। নরা গজা প্রভৃতি শব্দে প্রাচীন বাংলায় বহুবচনে আকার প্রয়োগ দেখা যায়, রামের শব্দকে সেইরূপ আকারযোগে বহুবচন করিয়া লওয়া হইয়াছে এইরূপ আমাদের বিশ্বাস।

 নেপালি ভাষায় ইহার পোষক প্রমাণ পাওয়া যায়। আমরা যে-স্থলে দেবেরা বলি তাহারা দেবহেরু বলে। হে এবং রু উভয় শব্দই সম্বন্ধবাচক এবং সম্বন্ধের বিভক্তি দিয়াই বহুবচনরূপ নিম্পন্ন হইয়াছে।

 আসামি ভাষায় ইহতর শব্দের অর্থ ইহাদের তঁহতর তোমাদের। ইহঁত-কের ইহাদিগের তঁহত-কের তোমাদিগের, কানে বিসদৃশ বলিয়া ঠেকে না। কর্মকারকেও আসামি ইহঁতক বাংলা ইহাদিগের সহিত সাদৃশ্যবান।

 এই হঁত শব্দ রাজপুত হংদো শব্দের ন্যায় ভবন্ত বা সন্ত শব্দানুসারী, তাহা মনে করিবার একটা কারণ আছে। আসামিতে হঁওতা শব্দের অর্থ হওয়া।

 এ স্থলে এ-কথাও স্মরণ রাখা যাইতে পারে যে, পশ্চিমি হিন্দির মধ্যে রাজপুত ভাষাতেই সাধারণপ্রচলিত সম্বন্ধকারক বাংলার অনুরূপ; ঘোড়ার শব্দের মাড়োয়ারি ও মেৱারি ঘোড়ারো, বহুবচনে ঘোড়ারো।

 পাঞ্জাবি ভাষায় ষষ্ঠী বিভক্তি চিহ্ন দা, স্ত্রীলিঙ্গে দী। ঘোড়াদা—ঘোড়ার, যন্ত্রদীবাণী—যন্ত্রের বাণী। প্রাচীন পাঞ্জাবিতে ছিল ডা। আমাদের দিগের শব্দের দ-কে এই পাঞ্জাবি দ-এর সহিত এক করিয়া দেখা যাইতে পারে। ঘোড়াদা-কের—ঘোড়াদিগের।

 বীম্‌স্ সাহেবের মতে পাঞ্জাবি এই দা শব্দ সংস্কৃত তন শব্দের অপভ্রংশ। তন শব্দের যোগে সংস্কৃত পুরাতন সনাতন প্রভৃতি শব্দের সৃষ্টি। প্রাকৃতেও ষষ্ঠী বিভক্তির পরে কের এবং তণ উভয়ের ব্যবহার আছে; হেমচন্দ্রে আছে, সম্বন্ধিনঃ কেরতণৌ। মেৱারি তণো তণুঁ এবং বহুবচনে তণাঁ ব্যবহার হইয়া থাকে। তণাঁ-র উত্তর কের শব্দ যোগ করিলে ‘তণাকের’ রূপে দিগের শব্দের মিল পাওয়া যায়।

 প্রাচীনকাব্যে অধিকাংশ স্থলে সব শব্দ যোগ করিয়া বহুবচন নিম্পন্ন হইত। এখনো বাংলায় সব শব্দের যোগ চলিত আছে। কাব্যে তাহার দৃষ্টান্ত:

পাখিসব করে রব রাতি পোহাইল।

 কিন্তু কথিত ভাষায় উক্তপ্রকার কাব্যপ্রয়োগের সহিত নিয়মের প্রভেদ দেখা যায়। কাব্যে আমাসব, তোমাসব, পাখিসব প্রভৃতি কথায় দেখা যাইতেছে সব শব্দই বহুবচনের একমাত্র চিহ্ন, কিন্তু কথিত ভাষায় অন্য বহুবচনবিভক্তির পরে উহা বাহুল্যরূপে ব্যবহৃত হয়— আমরা সব, তোমরা সব, পাখিরা সব; যেন, আমরা তোমরা পাখিরা ‘সব’ শব্দের বিশেষণ।

 ইহা হইতে আমাদের পূর্বের কথা প্রমাণ হয়, রা বিভক্তি বহুবচনবাচক বটে কিন্তু উহা মূলে সম্বন্ধবাচক। 'পাখিরা সব’ অর্থ পাখিসম্বন্ধীয় সমষ্টি।

 ইহা হইতে আর-একটা দেখা যায়, বিভক্তির বাহুল্যপ্রয়োগ আমাদের ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ নহে। লোকেদের শব্দকে বিশ্লেষণ করিলে দেখিতে পাই, প্রথমত লোকে শব্দের এ প্রাচীন যষ্ঠীবাচক, তাহার পর দা শব্দ অপেক্ষাকৃত আধুনিক ষষ্ঠ বিভক্তি, তাহার পর কের শব্দ সম্বন্ধবাচক বাহুল্যপ্রয়োগ। মৈথিলী ভাষায় সব শব্দ যোগে বহুবচন নিম্পন্ন হয়। কিন্তু তাহার প্রয়োগ আমাদের প্রাচীন কাব্যের ন্যায়। নেনাসভ অর্থে বালকেরা সব, নেনিসভ— বালিকারা সব; কিন্তু এ-সম্বন্ধে মৈথিলীর সহিত বাংলার তুলনা হয় না। কারণ, মৈথিলীতে অন্য কোনো প্রকার বহুবচনবাচক বিভক্তি নাই। বাংলায় রা বিভক্তিযোগে বহুবচন সমস্ত গৌড়ীয় ভাষা হইতে স্বতন্ত্র, কেবল নেপালি হেরু বিভক্তির সহিত তাহার সাদৃশ্য আছে।

 কিন্তু রা বিভক্তিযোগে বহুবচন কেবল সচেতন পদার্থ সম্বন্ধেই খাটে। আমরা বাংলায় ফলের পাতারা বলি না। এই কারণেই ফলেরা সব, পাতারা সব, এমন প্রয়োগ সম্ভবপর নহে।

 মৈথিলী ভাষায় ফলসভ কথাসভ, এরূপ ব্যবহারের বাধা নাই। বাংলায় আমরা এরূপ স্থলে ফলগুলা সব, পাতাগুলা সব, বলিয়া থাকি।

 সচেতন পদাৰ্থ বুঝাইতে লোকগুলা সব, বানরগুলা সব বলিতেও দোষ নাই।

 অতএব দেখা যাইতেছে গুলা যোগে বাংলায় সচেতন অচেতন সর্বপ্রকার বহুবচনই সিদ্ধ হয়। এক্ষণে এই গুলা শব্দের উৎপত্তি অনুসন্ধান করা আবশ্যক।

 নেপালি বহুবচনবিভক্তি হেরু শব্দের উৎপত্তি প্রাকৃত ভাষার কেরউ হইতে। অন্ধহং কেরউ—আমাদিগের। কেরউ—কেরু—হেরু।

 বাংলা রা যেমন সম্বন্ধবাচক হইতে বহুবচনবাচকে পরিণত হইয়াছে, নেপালি হেরু শব্দেরও সেই গতি।

 নেপালিতে কেরু শব্দের কে হে হইয়াছে, বাংলায় তাহা গে হইয়াছে, দিগের শব্দে তাহার প্রমাণ আছে।

 কেরু হইতে গেরু, গেরু হইতে গেলু, গেলু হইতে গুলু, গুলু হইতে গুলো ও গুলা হওয়া অসম্ভব নহে। এরূপ স্বরবর্ণবিপর্যয়ের উদাহরণ অনেক আছে; বিন্ধু হইতে বুঁদ তাহার একটি, মুত্রিকা হইতে মাদুলি অন্যপ্রকারের (এই বুঁদ শব্দ হইতে বিন্দু আকার মিষ্টান্ন বোঁধে শব্দের উদ্ভব)।

 ঘোড়াকেরু নেপালিতে হুইল ঘোড়াহেরু, বাংলায় হইল ঘোড়াগুলো।

 গুলি ও গুলিন শব্দ গুলা-র স্ত্রীলিঙ্গ। ক্ষুদ্র জিনিস বুঝাইতে একসময়ে বঙ্গভাষায় স্ত্রীলিঙ্গ ব্যবহার হইত তাহার অনেক দৃষ্টান্ত আছে; যথা, বড় বড়ি,গোলা গুলি, খোঁটা খুঁটি, দড়া দডি, ঘড়া ঘটি,ছোরা ছুরি, জাঁতা জাঁতি, আংটা আংটি, শিকল শিকলি ইত্যাদি।

 প্রাচীনকাব্যে দেখা যায়, সব অপেক্ষা গণ শব্দের প্রচলন অনেক বেশি। মুকুন্দরামের কবিকঙ্কণচণ্ডী দেখিলে তাহার প্রমাণ হইবে; অন্য বাংলা প্রাচীনকাব্য এক্ষণে লেখকের হস্তে বর্তমান নাই, এইজন্য তুলনা করিবার সুযোেগ হইল না।

  এই গণ শব্দ হইতে গুলা হওয়াও অসম্ভব নহে। কারণ, গণ শব্দের অপভ্রংশ প্রাকৃত গণু। জানি না ধ্বনিবিকারের নিয়মে গণু হইতে গলু ও গুলো হওয়া সুসাধ্য কি না।

  কিন্তু কেরু হইতেই যে গুলো হইয়াছে লেখকের বিশ্বাসের ঝোঁকটা সেই দিকে। তাহার কারণ আছে। প্রথমত রা বিভক্তির সহিত তাহার যোগ পাওয়া যায়, দ্বিতীয়ত নেপালি হেরু শব্দের সহিত তাহার সাদৃশ্য আছে, তৃতীয়ত যাহার যুক্তিপরম্পরা অপেক্ষাকৃত দুরূহ এবং যাহা প্রথম শ্রুতিমাত্রই প্রত্যয় আকর্ষণ করে না উদ্‌ভাবকের কল্পনা তাহার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়।

  এইখানে বলা আবশ্যক, উড়িয়া ও আসামির সহিত যদিচ বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ নৈকট্য আছে তথাপি বহুবচন সম্বন্ধে বাংলার সহিত তাহার মিল পাওয়া যায় না।

  উড়িয়া ভাষায় মানে শব্দ যোগে বহুবচন হয়। ঘর একবচন, ঘরমানে বহুবচন। বীম্‌স্ বলেন এই মানে শব্দ পরিমাণ হইতে উদ্ভূত; হ্যর্ন্‌লে বলেন মানব হইতে। প্রাচ্য হিন্দিতে মনুষ্যগণকে মনই বলে, মানে শব্দ তাহারই অনুরূপ।

  হিন্দিতে কর্তৃকারক বহুবচন লোগ্ (লোক) শব্দযোেগে সিদ্ধ হয়; ঘোড়ালোগ— ঘোড়াসকল। বাংলাতেও শ্রেণীবাচক বহুবচনে লোক শব্দ ব্যবহৃত হয়; যথা, পণ্ডিতলোক মূর্খলোক গরিবলোক ইত্যাদি।

  আসামি ভাষায় বিলাক হঁত এবং বোর শব্দযোগে বহুবচন নিষ্পন্ন হয়। তন্মধ্যে হঁত শব্দ সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে। বিলাক এবং বোর শব্দের উৎপত্তি নির্ণয় সুকঠিন।

  যাহাই হউক বিস্ময়ের বিষয় এই যে, কর্তৃকারক এবং সম্বন্ধের বহুবচনে বাংলা প্রায় সমুদয় গৌড়ীয় ভাষা হইতে স্বতন্ত্র। কেবল রাজপুতানি এবং নেপালি হিন্দির সহিত তাহার কঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে। কিন্তু মনোযোগপূর্বক অনুধাবন করিলে অন্যান্য গৌড়ীয় ভাষার সহিত বাংলার এই-সকল বহুবচন রূপের যোগ পাওয়া যায়, এই প্রবন্ধে তাহারই অনুশীলন করা গেল।

  সম্বন্ধের একবচনেও অপর গৌড়ীয় ভাষার সহিত বাংলার প্রভেদ আছে তাহা পূর্বে বলা হইয়াছে, কেবল মাড়োয়ারি ও মেৱারি য়ো বিভক্তি বাংলার র বিভক্তির সহিত সাদৃশ্যবান। এ-কথাও বলা আবশ্যক উড়িয়া ও আসামি ভাষার সহিতও এ-সম্বন্ধে বাংলার প্রভেদ নাই। অপরাপর গৌড়ীয় ভাষায় কা প্রভৃতি যোগে ষষ্ঠী বিভক্তি হয়।

  কিন্তু একটি বিষয় বিশেষরূপ লক্ষ করিবার আছে।

  উত্তম পুরুষ এবং মধ্যম পুরুষ সর্বনাম শব্দে কী একবচনে কী বহুবচনে প্রায় কোথাও ষষ্ঠীতে ককারের প্রয়োগ নাই, প্রায় সর্বত্রই রকার ব্যবহৃত হইয়াছে; যথা, সাধুহিন্দি—একবচনে মেরা, বহুবচনে হমারা। কনৌজি—মেরো, হমারো। ব্রজভাষা—মেরৌ, হমারৌ। মাড়োয়ারি—মারো, হ্মারো। মেৱারি—হ্মারো, হ্নাঁঁৱরাঁঁরো। অৱধি—মোর, হমার। রিৱাই—ম্‌ৱার, হম্‌হার।

  মধ্যম পুরুষেও—তেরা তুম্‌হরা তোর তুমার, ত্‌ৱার তুম্‌হার প্রভৃতি প্রচলিত।

  কোনো কোনো ভাষায় বহুবচনে কিঞ্চিৎ প্রভেদ দেখা যায়; যথা, নেপালি—হামেরুকো, ভোজপুরি—হমরণকে, মাগধী—হমরণীকে, মৈথিল— হমরাসভকে।

  অন্য গৌড়ীয় ভাষায় কেবল সর্বনামের ষষ্ঠী বিভক্তিতে যে রকার বর্তমান, বাংলায় তাহা সর্বনাম ও বিশেষ্যে সর্বত্রই বর্তমান। ইহা হইতে অনুমান করি, ককার অপেক্ষা রকার যষ্ঠী বিভক্তির প্রাচীনতর রূপ।

  এখানে আর-একটি লক্ষ করিবার বিষয় আছে। একবচনে যেখানে তেরা বহুবচনে সেখানে তুম্‌হরা, একবচনে ম্‌ৱার বহুবচনে হম্‌হার। নেপালি ভাষায় কর্তৃকারক বহুবচনে হেরু বিভক্তি পাওয়া যায়; এই হেরু হার এবং হরা সাদৃশ্যবান।

  কিন্তু নেপালিতে হেরু নাকি কর্তৃকারক বহুবচনে ব্যবহার হয়, এইজন্য সম্বন্ধে রকারের পরে পুনশ্চ কার-যোগ সম্ভব হয় নাই, কো শব্দযোগে ষষ্ঠী করিতে হইয়াছে। অথচ নেপালি একবচনে মেরো হইয়া থাকে।

  মৈথিলী ষষ্ঠীর বহুবচনে হমরাসভকে সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ বক্তব্য আছে।

  পূর্বে বলিয়াছি বাংলায় কর্তৃকারক বহুবচনে সব শব্দের পূর্বে বহুবচনবাচক না বিভক্তি বলে, যথা ছেলেরা সব; কি মৈথিলীতে শুষ্ক নেনাসভ বলিতেই বালকেরা সব বুঝায়। পূর্বে একথাও বলিয়াছি এ-সন্বন্ধে মৈথিলীর সহিত বাংলার তুলনা হয় না, কারণ, মৈথিলীতে বাংলার ন্যায় কতৃকারক বহুবচনের কোনো বিশেষ বিভক্তি নাই।

  কিন্তু দেখা যাইতেছে সর্বনাম উত্তম ও মধ্যম পুরুষে মৈথিলী কর্তৃকারক বহুবচনে হম্‌রাসভ তোহরাসভ ব্যবহার হয়, এবং অন্যান্য কারকেও হম্‌রাসভকে তোহরাসভকে প্রভৃতি প্রচলিত।

  মৈথিলী সর্বনামশব্দে যে ব্যবহার, বাংলায় সর্বনাম ও বিশেয়ে সর্বত্রই সেই ব্যবহার।

  ইহা হইতে দুই প্রকার অনুমান সংগত হয়। হয়, এই হমরা এককালে বাংলা ও মৈথিলী উভয় ভাষায় বহুবচনরূপ ছিল, নয় এককালে যাহা কেবল সম্বন্ধের বিভক্তি ছিল বাংলায় তাহা ঈষৎ রূপান্তরিত হইয়া কর্তৃকারক বহুবচন ও মৈথিলী ভাষায় তাহা কেবল সর্বনাম শব্দের যষ্ঠী বিভক্তিতে দাঁঁড়াইয়াছে।

  বলা বাহুল্য আমাদের এই আলোচনাগুলি সংশয়পরিশূন্য নহে। পাঠকগণ ইহাকে অনুসন্ধানের সোপানস্বরূপে গণ্য করিলে আমরা চরিতার্থ হইব।

  দীনেশবাবুর বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, হ্যর্নলে সাহেবের গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ, কেলগ সাহেবের হিন্দিব্যাকরণ, গ্রিয়র্সন সাহেবের মৈথিলী ব্যাকরণ, এবং ডাক্তার ব্রাউনের আসামি ব্যাকরণ অবলম্বনে এই প্রবন্ধ লিখিত হইল।

  জ্যৈষ্ঠ ১৩০৫

  1. প্রাকৃতের পরবর্তী সমুদয় সংস্কৃতমূলক ভারতীয় ভাষার উল্লেখস্থলে হ্যর্ন্‌লে ‘গৌড়ীয় ভাষা’ নাম ব্যবহার করিয়াছেন; আমরাও তাঁঁহার অনুসরণ করিব।