বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র

এক

 ভারতবর্ষের রাষ্ট্রিক মুক্তি সাধনার সর্ব্বপ্রধান কেন্দ্রস্থল এই বাঙ্‌লাদেশ। বদিও বৃটিশরাজশক্তি সর্ব্বপ্রথম এই প্রদেশেই প্রতিষ্ঠিত হয় তথাপি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশ হইতে ভারতবর্ষের মুক্তি সাধনার জন্য এই বাঙলাদেশই কঠিনতম সংগ্রাম ও দুঃখ বরণ করিয়াছে। সমগ্র ভারতবর্ষ যখন অন্ধকারযুগের অজগর নিদ্রায় আচ্ছন্ন, মুক্তির বেগ তখন এই বাঙলাদেশকেই প্লাবিত করিয়াছিল। নবযুগের আহ্বানে সাড়া দিতে বাঙলাদেশ প্রথম হইতেই দ্বিধা করে নাই—তাই ভারতবর্ষে জাতীয়তার উন্মেষ সর্ব্বপ্রথম এই প্রদেশেই হয়। সেদিন বাঙ্‌লার দুঃখজয়ী বীর সন্তানেরা অসংখ্য বাধা বন্ধনের মুখে নির্ব্বিচারে ঝাঁপাইয়া পড়ে—তাহাদের কারাবরণ ও আত্মবলিদানেই ভারতবর্ষে মুক্তি আন্দোলনের দীপ অনির্ব্বাণ জ্বলতে থাকে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হইতেই যুগে যুগে সারা ভারত বাঙ্‌লার দিকে তাকাইয়াছে নূতন প্রেরণা ও নূতন নেতৃত্বের আশায়।

 কেবল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দুর্জ্জয় আকাঙ্ক্ষা ও অদম্য কর্ম্ম-প্রেরণা নহে, কেবল সহস্র সৈনিকের আত্মবলিদান নহে, বাঙ্‌লাদেশ ভারতবর্ষকে যাহা দিয়াছে তাহা আরও মহান ও গৌরবময়। বাঙ্‌লা ও বাঙালীর কাছে ভারতবর্ষ নবজাতীয়তার মন্ত্রে দীক্ষা লইয়াছে। বাঙালীর মননশক্তি যুগসঞ্চিত সংস্কারের জড়তা ছিন্ন করিয়া নব নবোন্মেষের পথে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে ছুটিয়াছে। ইউরােপের সংস্কৃতি সর্ব্বপ্রথম বাঙ্‌লাদেশেরই অন্তঃকরণে গভীর আলােড়ন আনে। বুদ্ধির সার্ব্বজনীনতা, দৃষ্টির ব্যাপকতা, বৃহত্তর জগত ও মানব সমাজের নবতর উন্নতি ও অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষণিকায় মানবধর্ম্মের উপলব্ধি সর্ব্বপ্রথম বাঙ্‌লাদেশেই ঘটে। মহামনীষী রাজা রামমােহন রায় ভারতের এই নবজাগরণের পথিকৃৎ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যজ্ঞেরও সর্ব্বপ্রথম পুরােহিত ভারতপথিক রামমােহন। রামমােহনের যুগ হইতে বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়া ভারতের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ক্রমশঃ প্রবল হইয়াই বিস্তারলাভ করিয়া চলিয়াছে। পাশ্চাত্তের জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাণ্ডার হইতে যুগােচিত শিক্ষা ও চিন্তাধারা আহরণ করিয়া রামমােহন ভারতবর্ষের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় নূতন পরিবর্ত্তন সাধন করেন। তাঁহার নেতৃত্বে যে ব্রাহ্ম আন্দোলন গড়িয়া উঠে তাহার ধর্ম্ম-সম্বন্ধীয় মতবাদ যাহাই হউক না কেন ভারতবাসীর আত্ম-জাগরণের সেই প্রথম স্ফুরণ, ভারতের রাজনৈতিক চেতনাবােধের উহাই সর্ব্বপ্রথম অভিব্যক্তি। ইহা আদৌ বিস্ময়কর নহে যে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রথম যুগের নেতৃবর্গের অধিকাংশই এই ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাবে বর্দ্ধিত।

 রামমােহনের পরে ‘বন্দেমাতরম্’ মন্ত্রের উদ্‌গাতা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাতির সম্মুখে স্পষ্টরূপে তুলিয়া ধরেন। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম স্রষ্টা। ভারতের জাতীয় মন্ত্র ‘বন্দেমাতরম্’ সঙ্গীত এই মহাপুরুষের অক্ষয় অবদানের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।

 তখনকার যুগের কংগ্রেসী প্রবীণ নেতাদের আবেদন নিবেদনই ছিল জাতীয় আন্দোলনের মূল নীতি। বঙ্কিমচন্দ্রের শিক্ষা ও প্রচারের ফলেই সেযুগের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারার মােড় ফিরিয়া যায়। তাঁহারা বুঝিল ভিক্ষানীতির দ্বারা দেশের মূল সমস্যার সমাধান হইতে পারে না। দারিদ্র্য, অনশন, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, অত্যাচার ও লাঞ্ছনা যে পরাধীন জাতির নিত্য সহচর দেশবাসী তাহা নিঃসন্দেহে বুঝিতে পারিল। তাহারা বুঝিল দাসত্বের কলঙ্ক মুছিয়া না ফেলা পর্য্যন্ত জাতির ভাগ্যে সুখ ভােগ ঘটিতে পারে না। এই সময় বাঙ্‌লার বুকে এক তেজস্বী পূরুষের আবির্ভাব হয়। ইনি যুগাবতার স্বামী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দ জাতিকে শিখাইলেন ত্যাগ ও সংগ্রামের সাধন মন্ত্র। শক্তি মন্ত্রের উপাসকের উদাত্ত কণ্ঠস্বর সারা ভারত প্রকম্পিত করিয়া ধ্বনিত হইল “নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ, তােরা বীর হ’, বীর হ’, বল অভীঃ অভীঃ মাভৈঃ।” যে জাতি দাসত্ব শঙ্খলের ভার আপনার স্কন্ধে প্রতিনিয়ত অনুভব করিতেছে তাহার নিকট ত্যাগ ও শক্তির এই আহ্বান বিপুল জাগরণের সূত্রপাত করিল। দেশের যুবসম্প্রদায় মাতৃভূমির মুক্তির জন্য সর্ব্বস্ব পণ করিয়া বিদেশী শাসকের অত্যাচার ও ফাঁসি কাঠকে উপেক্ষা করিয়া মরণ খেলায় মাতিয়া উঠিল। স্বামীজীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই ভারতের সর্ব্বপ্রথম রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হইল বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদের প্রতিবাদে। স্বামীজীর শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত শত সহস্র যুবক এই আন্দোলনে যােগদান করিয়া মাতৃভূমির উদ্ধার কল্পে স্বাধীনতার সংগ্রামে সর্ব্বপ্রথম রক্তদান করিল।

 পরবর্ত্তী অসহযােগ আন্দোলনে সর্ব্বত্যাগী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আহ্বানে বাঙ্‌লা মায়ের যে কয়জন সন্তান সাংসারিক সুখ-সম্ভোগ ও প্রতিপত্তির প্রলােভন ত্যাগ করিয়া তাঁহার নিকট দেশ সেবার দীক্ষা গ্রহণ করেন সুভাষচন্দ্র তাহাদের অন্যতম। যাঁহাদের সাধনা ও মনীষা বলে যুগে যুগে বাঙালীর জীবন-যাত্রা ও সংস্কৃতি অপরূপ স্বকীয়তা অর্জ্জন করিয়াছে তাঁহাদেরই সাধনার নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্য সুভাষচন্দ্রের মানসজীবন সমৃদ্ধ করিয়াছে—বাঙালীর সংস্কৃতি ও সাধনার ধারক ও বাহক সেই সব কর্ম্মবীর মনীষীদের সাধনার বরিষ্ঠ উত্তরসাধকরূপে সুভাষচন্দ্র তাঁহার জীবনে কর্ম্মপ্রতিভা ও মননশক্তির সার্থক সমন্বয় সাধন করিয়াছেন।