বেওয়ারিশ লাস/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

 থানার দারোগা ও চাপরাশির নিকট এই সকল কথা অবগত হইয়া ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী সেই বাক্স সর্ব্ব সমক্ষে সেই স্থানে খুলিতে কহিলেন। আদেশ প্রদান করিবামাত্র তাঁহার সেই আদেশ প্রতিপালিত হইল।

 বাক্সের ডালা খুলিবামাত্র আমরা সকলেই দেখিতে পাইলাম যে, সেই বাক্সের ভিতর চটে মোড়া ও উপরে দড়ি দিয়া উত্তমরূপে জড়াইয়া সেই মৃতদেহটী বাঁধা আছে। সেইরূপ অবস্থায় সেই চট-জড়ান মৃতদেহ সেই বাক্সের ভিতর হইতে বাহির করা হইল, এবং যে দড়ি দিয়া উহা জড়াইয়া বাঁধা ছিল, সেই দড়ি ও চট খুলিয়া দিলে, দেখিতে পাওয়া গেল, উহার ভিতর যে মৃতদেহ ছিল, তাহা একটা পুরুষের দেহ। উহার হাত পা দোমড়াইয়া যাহাতে অল্প স্থানের ভিতর স্থান হইতে পারে, সেইরূপ ভাবে বাঁধা হইয়াছিল।

 সেই মৃতদেহ দেখিয়া অনুমান হইল, যে ব্যক্তি মরিয়া গিয়াছে, তাহার বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসরের কম হইবে না। জাতিতে মুসলমান। মৃতদেহ উত্তমরূপে পরীক্ষা করা হইল; কিন্তু উহার কোন স্থানে কোনরূপ জখম বা অপর কোনরূপ আঘাতের চিহ্ণ দেখিতে পাওয়া গেল না। কেবল অনুমান হইল যে, উহার বাম গণ্ডে যেন একটু সামান্য কাল দাগ পড়িয়াছে।

 ডাক্তার সাহেব সেই স্থানেই উপস্থিত ছিলেন। তিনিও সেই মৃতদেহ উত্তমরূপে দেখিয়া কহিলেন, “যদি ইহাকে কোন স্থানে আঘাত করা হইয়া থাকে, তাহা হইলে বাম গণ্ডে ব্যতীত যে অপর কোন স্থানে আঘাত করা হইয়াছে, তাহা অনুমান করা যায় না।”

 তিনি আরও কহিলেন যে, তাঁহার বিবেচনায় সেই ব্যক্তির মৃত্যু চব্বিশ ঘণ্টার ভিতর হইয়াছে বলিয়া অনুমান হয় না। তিনি তখন এই সকল বিষয় সম্বন্ধে তাঁহার ঠিক মত প্রকাশ করিতে পারিলেন না, ও কহিলেন যে, এখন তিনি যাহা বলিতেছেন, তাহা কেবল অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া বলিতেছেন মাত্র। যে পর্য্যন্ত সেই শব ছেদন করিয়া তিনি উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া না দেখিতে পারিবেন, সেই পর্য্যন্ত তিনি তাঁহার ঠিক মত প্রকাশ করিতে সমর্থ হইবেন না।

 ডাক্তার সাহেবের এই কথা শুনিয়া, সেই মৃতদেহ যে স্থানে ছেদন করিলে, পরীক্ষা হইতে পারে, সেই স্থানে উহা তৎক্ষণাৎ পাঠাইয়া দিবার নিমিত্ত ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী সাহেব আদেশ প্রদান করিলেন।

 এই আদেশ সম্বন্ধে তাঁহার মতের সহিত আমাদিগের কাহারও মতের ঐক্য হইল না। তখন আমরা সকলে মিলিয়া তাঁহাকে কহিলাম, “এই মৃতদেহ এখনই পাঠাইয়া দিবার সম্বন্ধে আপনি যে আদেশ প্রদান করিতেছেন, তাহা এখনই প্রতিপালন করা আমাদিগের কর্ত্তব্য কর্ম্ম; কিন্তু এই মৃতদেহ যে কাহার, এ পর্য্যন্ত তাহার কিছুই নির্ণয় হয় নাই। অতএব যে পর্য্যন্ত উহা স্থিরীকৃত না হইবে, সেই পর্য্যন্ত এই হত্যার কোনরূপ উদ্ধার হইবে না, বা প্রকৃত অপরাধীও ধৃত হইবে না। এরূপ অবস্থায় আমাদিগের নিতান্ত ইচ্ছা যে, এই মৃতদেহ পরীক্ষার নিমিত্ত উহাকে কোন প্রকাশ্য স্থানে অনাবৃত ভাবে রাখিয়া দেওয়া কর্ত্তব্য। কারণ, তাহা হইলে এই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত সেই স্থানে বিলক্ষণ জনতা হইবে, ও অনেক লোকে এই মৃতদেহ দেখিতে পাইবে। এইরূপ অবস্থায় যদি কেহ এই মৃতদেহ চিনিতে পারে, তাহা হইলে আমাদিগের অভিলাষ অনেকটা পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা।”

 ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী সাহেব আমাদিগের মনের ভাব বুঝিতে পারিলেন, এবং ডাক্তার সাহেবের সহিত পরামর্শ করিয়া কহিলেন, “আচ্ছা তাহাই ঠিক। কিন্তু দিবা বারটার পর এই মৃতদেহ যেন আর রাখা না হয়। কারণ, তাহা হইলে উহা একবারে পচিয়া যাইবে। মৃতদেহ পচিয়া গেলে ডাক্তার সাহেব তাহা উত্তমরূপে পরীক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন না।”

 তিনি আরও কহিলেন, “আমি এখনই প্রত্যেক থানায় সংবাদ প্রদান করিতেছি। সেই সকল থানার এলাকায় প্রত্যেক পল্লীতে যে সকল লোক বাস করে, তাহাদিগের মধ্যে কোন না কোন লোককে আনিয়া যেন এই মৃতদেহ দেখান হয়। তাহা হইলে সেই সকল লোকের মধ্য হইতে কোন না কোন লোক এই মৃতদেহ চিনিলেও চিনিতে পারিবে।”

 এই বলিয়া ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী সাহেব, ডাক্তার সাহেব এবং করোণার সাহেবের সহিত সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

 তাঁহারা চলিয়া যাইবার পর আমরা সেই মৃতদেহটী চটের ভিতর হইতে বাহির করিয়া একটী প্রকাশ্য স্থানে অনাবৃত অবস্থায় রাখিয়া দিলাম। সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত সেই স্থান লোকে লোকারণ্য হইয়া পড়িল। কয়েকজন উচ্চ ও নিম্নপদস্থ বুদ্ধিমান্ কর্ম্মচারীকে পুলিশের পোষাক না পরাইয়া সেই ভিড়ের মধ্যে রাখিয়া দেওয়া হইল। সেই মৃতদেহ দেখিয়া কোন্ ব্যক্তি কি বলে, কেহ উহাকে চিনিতে পারিলে আপনাদিগের মধ্যে কি কথা বলাবলি করে, তাহা জানিয়া লইবার ভার তাঁহাদিগের উপরই অর্পিত হইল।

 এদিকে ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী মহাশয়ের আদেশ প্রচারিত হইবামাত্র প্রত্যেক থানার এলাকা হইতে রাশি রাশি লোক আসিয়া সেই স্থানে সমবেত হইয়া সেই মৃতদেহ দেখিতে লাগিল। কিন্তু তাহা যে কাহার দেহ, তাহা কেহ চিনিতে পারিল না, বা চিনিয়াও কেহ বলিল না। এইরূপে প্রায় দিবা এগারটা বাজিয়া গেল।

 ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী সাহেব সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার পর, যে চটে সেই মৃতদেহ মোড়া ছিল, সেই চটটী আমরা উত্তমরূপে দেখিলাম। দেখিলাম, তাহাতে এরূপ কোন কথা লেখা নাই, বা এরূপ কোন চিহ্ণ নাই যে, যাহার দ্বারা, সেই চট যে কোথা হইতে আনীত হইয়াছে, বা তাহা কাহার, তাহার কিছুমাত্র সন্ধান পাওয়া যাইতে পারে।

 যে টিনের বাক্সের ভিতর সেই মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল, সেই টিনের বাক্সটীর মধ্যে উত্তমরূপে দেখাতে, দেখিতে পাইলাম, তাহার ভিতর একটী পুরাতন ও নিতান্ত ক্ষুদ্র শিশি রহিয়াছে। সেই শিশিটী নিজের হাতে করিয়া উত্তমরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম। দেখিলাম, প্রায় পাঁচ ছয় বৎসর পূর্ব্বে সেই শিশিতে করিয়া ব্যাথগেট কোম্পানির ঔষধালয় হইতে একজন সাহেবের নিমিত্ত ঔষধ আসিয়াছিল। এরূপ শিশি প্রায় সকল গৃহেই পাওয়া যায়। বিশেষতঃ সাহেব দিগের গৃহের শিশি, বোতল প্রভৃতি তাহাদিগের খানসামা বাবুর্চিরা প্রায়ই বিক্রীওয়ালাদিগের হস্তে বিক্রয় করিয়া ফেলে। বিক্রীওয়ালারা সেই সকল শিশি-বোতল আনিয়া শিশি-বোতল-ব্যবসায়ী দোকানদারের হস্তে বিক্রয় করে। তাহাদিগের দোকান হইতে যাহাদিগের প্রয়োজন হয়, তাহারা ক্রয় করিয়া লইয়া যায়। এরূপ অবস্থায় সেই ঔষধের শিশি উপলক্ষ করিয়া অনুসন্ধান করিলে যে কোন রূপ সবিশেষ ফল লাভের সম্ভাবনা, তাহা বিবেচনা করিলাম না। যে স্থানের শিশি সেই স্থানে রাখিয়া দিয়া, অন্য কোন উপায় চিন্তা করিতে লাগিলাম। কিন্তু ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন উপায়ই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না।

 এদিকে নানা স্থান হইতে নানা লোক আসিয়া সেই মৃতদেহ দর্শন করিতে লাগিল। কেহ বা তাহার অবস্থা দেখিয়া দুঃখ প্রকাশ, কেহ বা হত্যাকারীর উদ্দেশে গালি প্রদান, প্রভৃতি যাহার মনে যাহা আসিতে লাগিল, সে তাহাই বলিতে বলিতে সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিতে লাগিল। তাহাদিগের কথার ভাবে স্পষ্টই অনুমান হইতে লাগিল যে, সেই মৃতদেহ তাহাদিগের মধ্যে কেহই চিনিয়া উঠিতে পারে নাই।

 যে স্থানে সেই মৃতদেহ রক্ষিত হইয়াছিল, আমি সেই স্থানে গমন করিয়া অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত দণ্ডায়মান রহিলাম, এবং যে সকল ব্যক্তি সেই মৃতদেহ দর্শন করিতে লাগিল, তাহাদিগের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি যে কি বলে, তাহার দিকে সবিশেষরূপ লক্ষ্য রাখিলাম।

 সেই সময় হঠাৎ একটী লোকের উপর আমার নয়ন আকৃষ্ট হইল। সেই ব্যক্তি আর একজন লোকের নিকট কি কথা বলিতেছিল। তখন উহার ভাবগতি দেখিয়া আমার বেশ অনুমান হইল যে, সেই মৃতদেহ সম্বন্ধেই সে কোন কথা বলিতেছে। আমার আরও অনুমান হইল যে, সেই মৃতব্যক্তি যেন তাহার পরিচিত।

 এই ব্যাপার দেখিয়া আমি আর কালবিলম্ব না করিয়া ধীরে ধীরে তাহার পশ্চাৎ ভাগে গিয়া দণ্ডায়মান হইলাম, ইচ্ছা যদি তাহার মুখের কোন কথা শুনিতে পাই। সেই সময় অপর ব্যক্তি কহিল, “কেমন, তুমি বেশ চিনিতে পারিতেছ?”

 উত্তরে সেই ব্যক্তি কহিল, “আমার বেশ বোধ হইতেছে, এ সে-ই ব্যক্তি।”

 এই সময় আমি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না, তাহাকে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কোন্ ব্যক্তির মৃতদেহ?”

 দর্শক। আমার বোধ হইতেছে, ইহা হকদারের মৃতদেহ।

 আমি। হকদার কে?

 দর্শক। সে ব্রাউন কোম্পানির একজন কোচমান।

 আমি। তাহার আর কে আছে, বলিতে পার?

 দর্শক। তাহার ভাই আছে।

 আমি। তাহার ভাইয়ের নাম কি?

 দর্শক। নাম আমি জানি না।

 আমি। কোথা থাকে বলিতে পার?

 দর্শক। সেও ব্রাউন কোম্পানির আফিসে কোচমানের কার্য্য করে, এবং সেই স্থানেই থাকে।

 আমি। তুমি একবার আমার সঙ্গে গিয়া তাহার ভাইকে দেখাইয়া দিতে পার?

 দর্শক। আমি যাইতে পারিতাম, কিন্তু এখন আমি আমার মনিবের কার্য্যে গমন করিতেছি। এরূপ অবস্থায় আমি কিরূপে আপনার সঙ্গে গমন করিব? আমার মনিব জানিতে পারিলে, তিনি আমাকে চাকরি হইতে জবাব দিবেন।

 আমি। তুমি আমাদিগের সহিত গমন করিয়া যদি এই কার্য্যে আমাদিগের সাহায্য কর, তাহা হইলে তােমার মনিব তােমার উপর কোনরূপেই অসন্তুষ্ট হইবেন না, প্রত্যুত সবিশেষ সন্তুষ্টই হইবেন। তদ্ব্যতীত তােমার বাক্যানুসারে যদি আমাদিগের কার্য্য উদ্ধার হয়, তাহা হইলে যাহাতে তুমি গবর্ণমেন্ট হইতে কিছু পারিতােষিক পাও, তাহার বন্দোবস্ত করিয়া দিব।

 আমার কথায় সেই ব্যক্তি পরিশেষে সম্মত হইল, এবং আমাদিগকে সঙ্গে করিয়া সেই আড়গড়ায় গিয়া উপস্থিত হইল।