১৭

শান্তিনিকেতন

 গেল বুধবার সকালে আমি মন্দিরে কী ব’লেছিলুম, শুন্‌বে? আমি ব’লেছিলুম, মানুষের ছোটো আর বড়ো— দুই-ই আছে। সেই ছোটো মানুষটি জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে কয়দিনের জন্যে আপনার একটি ছোটো সংসার পেতেচে—সেইখানে তা’র যত খেলার পুতুল সাজানো —সেইখানে তা’র প্রতিদিনের আহরণ জমা হ’চ্চে আর ক্ষয় হ’চ্চে। কিন্তু মানুষের ভিতরকার বড়োটি জন্ম-মৃত্যুর বেড়া ডিঙিয়ে চিরদিনের পথে চ’লেচে, এই চল্‌বার পথে তা’র কত সুখ-দুঃখ, কত লাভ-ক্ষতি ঝ’রে প’ড়ে মিলিয়ে যাচ্চে। পৃথিবীর দুটি আবর্ত্তন আছে,—একটি আহ্নিক, একটি বার্ষিক। একটি আবর্ত্তনে সে আপনাকেই ঘুর্‌চে, আর একটিতে সে নিজের চিরপথের কেন্দ্রস্থিত আলোকের উৎসকে প্রদক্ষিণ ক’র্‌চে। নিজেকে ঘোরবার সময় সূর্য্যের দিকে পিঠ ফেরাতেই দেখ্‌তে পায়-যে, তা’র নিজের কোনো আলো নেই, তা’র নিজের দিকে অন্ধতা, ভয়, জড়তা,— কিন্তু নিজের সেই অন্ধকারটুকুকে না জান্‌লে সূর্য্যের সঙ্গে তা’র সম্বন্ধের পূর্ণ পরিচয় সে পেতো না। আমরাও আমাদের ছোটো আবর্ত্তনে নিজেকে ঘুরি; এ ঘোরাতেই জান্‌তে পারি, আমার দিকে অন্ধকার, বিভীষিকা, মোহ, আমার দিকে ক্ষুদ্রতা; কিন্তু সেই জানার সঙ্গে সঙ্গেই যখন সেই অমৃতের উৎসকে জানি, তখন অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোকে, মৃত্যু থেকে অমৃতে আমরা যেতে থাকি। এইজন্যে আপনাকে আর তাঁকে দুইকেই একসঙ্গে জান্‌তে থাকলে তবেই আমরা আমাদের বন্ধনকে নিয়ত অতিক্রম ক’র্‌তে ক’র্‌তে, মুক্তির স্বাদ পেতে পেতে, অমৃতের পাথেয় সংগ্রহ ক’র্‌তে ক’র্‌তে চিরদিনের পথে চ’ল্‌তে পারি। আমাদের ক্ষুদ্র-প্রতিদিন আমাদের বৃহৎ-চিরদিনকে প্রণাম ক’র্‌তে ক’র্‌তে চ’ল্‌তে থাক্‌বে, আমাদের ক্ষুদ্র-প্রতিদিন তা’র সমস্ত আহরণগুলিকে বৃহৎ-চিরদিনের চরণে সমর্পণ ক’র্‌তে ক’র্‌তে চ’ল্‌বে। কিন্তু ক্ষুদ্র প্রতিদিন যদি এমন কথা ব’লে বসে-যে, আমি যা পাই, যা আনি, সব আমি নিজে জমাবো, তা হ’লেই বিপদ বাধে,—কেন না, তা’র জমাবার জায়গা কোথায়? তা’র মধ্যে এত ধরে কোথায়? তা’র এমন অক্ষয় পাত্র আছে কোন্‌খানে? পৃথিবী যেমন তা’র সোনায়-ভরা সকালটিকে এবং সোনায়-ভরা সন্ধ্যাটিকে নিজে জমিয়ে রেখে দেয় না, পূজার স্বর্ণকমলের মতো আপন সূর্য্য-প্রদক্ষিণের পথে প্রত্যহ প্রণাম ক’রে উৎসর্গ ক’র্‌তে ক’র্‌তে চলেচে, আমাদেরও তেম্‌নি এই ক্ষুদ্র জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখ ভালোবাসাকে চিরদিনের চল্‌বার পথে চিরদিনের দেবতাকে উৎসর্গ ক’র্‌তে ক’র্‌তে যেতে হবে— তা হ’লেই ছোটো-আমির সঙ্গে বড়ো-আমির মিল হবে, তা’ হ’লেই আমাদের ক্ষুদ্র জীবন সার্থক হবে; আপনার দিকে সমস্ত টান্‌তে গেলেই সে-টান টেকে না, সেই বিদ্রোহে ছোটো-আমিকে একদিন পরাস্ত হ’তেই হয়। এইজন্য ছোটো-আমি জোড়হাতে প্রার্থনা ক’র্‌চে নমস্তেঽস্তু,— বড়োকে আমার নমস্কাব সত্য হোক্, নিজের ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্তি পাই। ইতি ২৯শে ভাদ্র, ১৩২৫।