১৯

শান্তিনিকেতন

 তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা ক’রেচো, “রবিদাদা” না ব’লে আমাকে আর একটা কোনো নামে সম্ভাষণ ক’র্‌তে পারো কিনা? মহাভারতের সময়ে মানুষের একএকজনের দশ-বিশটা ক’রে নাম থাক্‌তো, যার যেটা পছন্দ বেছে নিতে পার্‌তো। কিম্বা যে-ছন্দে যেটা মেলাবার সুবিধে, লাগিয়ে দিতো। অর্জ্জুনের কত নাম-যে ছিল, তা অর্জ্জুনকে রোজ বোধ হয় নাম্‌তা মুখস্থ করার মতো মুখস্থ ক’র্‌তে হ’তো। আমার-যে আকাশের মিতাটি আছেন, তাঁরও নামের অভাব নেই। যদি তাঁর দুটো-একটা নাম ধার ক’রে নিতে চাও, তা হ’লে বোধ হয় তাঁর বিশেষ কিছু লোকসান হবে না। কিন্তু যখন নামকরণ ক’র্‌বে, তখন আমার সম্মতি নিলে ভালো হয়। প্রথম যখন আমার নামকরণ হয়, তখন কেউ আমার সম্মতি নেয়নি, তবু দেখ্‌তে পাচ্চি নামটা মন্দ হয়নি,— কিন্তু হঠাৎ যদি তোমার মার্ত্তণ্ড নামটাই পছন্দ হয়, তা হ’লে কিন্তু আমি আপত্তি ক’র্‌বো। ‘ভানু’ নামটা যদিচ খুব সুশ্রাব্য নয়, তবু ওটা আমি একবার নিজেই গ্রহণ ক’রেছিলুম। আর এক হ’তে পারে, যদি “কবিদাদা” বলো। নামটা ঠিক সঙ্গত হোক্ বা না হোক্, ওটা আমার নিজের কাজের সঙ্গে মেলে—

এক-যে ছিল রবি,
সে গুণের মধ্যে কবি।

 কিন্তু একটা কথা তোমাকে ব’লে রাখি, “প্রিয় কবিদাদা” ব’ল্লে চ’ল্‌বে না। প্রথম কারণ হ’চ্চে এই— যে, তোমার প্রিয় কবি-যে কে, তা আমি ঠিক জানিনে। খুব সম্ভব যে-লোকটা সেই আশ্চর্য্য হিন্দী দোঁহা লিখেছিলো সেই হবে। তা’র সঙ্গে ছ-অক্ষরের অনুপ্রাসে আমি-যে কোনোদিন পাল্লা দিতে পার্‌বো, এমন শক্তি বা আশা আমার নেই। দ্বিতীয় কারণ হ’চ্চে এই-যে, ইংরেজিতে ‘প্রিয়’ বলে না এমন মানুষই নেই—সে অমানুষ হ’লেও তাকে বলে,—এমন কি সে যদি দোঁহা না লিখ্‌তে পারে তবুও। আমার মত হ’চ্চে এই-যে, রাস্তা-ঘাটের সবাইকেই যদি ‘প্রিয়’ ব’ল্‌তে হবে এমন নিয়ম থাকে, তবে দুই-এক জায়গায় সে-নিয়মটা বাদ দেওয়া দরকার। অতএব আমাকে যদি শুধু “রবিদাদা” বলো, তা হ’লে আমি বারণ ক’র্‌বো না। এমন কি, যদি তোমার মার্ত্তণ্ড নামটাই পছন্দ হয়, তা হ’লে “প্রিয় মার্ত্তণ্ড দাদা” লিখো না। তা হ’লে বরঞ্চ লিখো, “মার্ত্তণ্ডদাদা, প্রচণ্ড প্রতাপেষু।” যদি কোনোদিন তোমার সঙ্গে রাগারাগি করি, তা হ’লে ঐ নামে ডাক্‌লেই হবে।

 আমাদের আশ্রমের আকাশে শারদোৎসব আরম্ভ হ’য়েচে— শিউলিবন সাড়া দিয়েচে, মালতীলতার পাতায় পাতায় শুভ্রফুলের অসংখ্য অনুপ্রাস, কিন্তু রাত্রে চাঁদের আলোয় আকাশ-জোড়া একখানি মাত্র শুভ্রতা। আমাদের লাল রাস্তার দুই ধারে কাশের গুচ্ছ সার বেঁধে দাঁড়িয়ে বাতাসে মাথা নত ক’রে ক’রে পথিকদের শারদ-সঙ্গীত শুনিয়ে দিচ্চে। সমস্ত সবুজ মাঠে, সমস্ত শিশির-সিক্ত বাতাসে উৎসবের আনন্দ-হিল্লোল ব’য়ে যাচ্চে। অন্তরে বাইরে ছুটি, ছুটি, ছুটি—এই রব উঠেচে। ছুটিরও আর কেবল দুই সপ্তাহ বাকি আছে। আমাদের যখন ছুটি আরম্ভ, তখন তোমাদের শৈলপ্রবাস বোধ হয় সাঙ্গ হবে। পার্ব্বতী যখন হিমালয়ে তাঁর পিতৃভবনে যাবেন, তখন তোমরা তাঁকে অভ্যর্থনা করবার জন্যে সেখানে থাক্‌বে না। কিন্তু হিমালয়ের খবর আমরা রাখিনে, কৈলাসের তো নয়ই; আমরা তো এই স্পষ্ট দেখতে পাচ্চি, স্বর্ণকিরণচ্ছটায় শারদা আমাদেরই ঘর উজ্জ্বল ক’রে দাঁড়িয়েচেন। গোটাকতক মেঘ দিগন্তের কোণে মাঝে মাঝে জটলা করে; কিন্তু তাদের নন্দী-ভৃঙ্গীর মতো কালো চেহারা নয়, তা’রাও শ্বেতকিরণের মালা প’রেচে, শ্বেত চন্দনের ছাপ লাগিয়েচে—ললাটে ভ্রূকুটির লেশ নেই। ইতি, ৬ই আশ্বিন, ১৩২৫।