৪০

শান্তিনিকেতন

 তুমি এত দেরিতে কেন আমার চিঠি পেয়েছো, ঠিক বুঝ্‌তে পার্‌লুম না। আজ তোমার চিঠি পেতে দেরি হ’লো দেখে ভাব্‌লুম হয় তো অমৃতসর কংগ্রেসে তোমাকে ডেলিগেট ক’রেচে কিম্বা হাওয়া-জাহাজে কাপ্তেন রসের সঙ্গে তুমি অষ্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েচো। কিম্বা হিমালয়ের পর্ব্বত-শৃঙ্গে কোনো পওহারী বাবার শিষ্য হ’য়ে মাটির নীচে বসে একমনে নিজের নাকের ডগা নিরীক্ষণ ক’র্‌চো কিম্বা লয়েড্ জর্জ্জের প্রাইভেট্ সেক্রেটারীর সর্দ্দি হ’য়েছে খবর পেয়েই তুমি সেই পদের জন্য দরখাস্ত ক’র্‌তে ইংলণ্ডে চ’লে গিয়েচো। আমি পার্লামেণ্টে লয়েড্ জর্জ্জকে টেলিগ্রাফ ক’র্‌তে যাচ্চি ঠিক এমন সময়ে তোমার চিঠি পেলুম। প’ড়ে দেখি, তুমি ঝর্‌ণার ধারে কোথায় বেড়াতে গিয়ে আর একটু হ’লেই কুয়োর মধ্যে প’ড়ে গিয়েছিলে। আশ্চর্য্য—দেখো, কাল সন্ধ্যাবেলায় আমারো প্রায় সেই রকম দুর্ঘটনা ঘটেছিলো। তখন রাত্তির ন-টা। মুখ ধুয়ে বিছানায় শুতে যাচ্চি, এমন সময় কী বলো দেখি? কুয়ো? সেই রকমই বটে। এক কপি নৌকাডুবি ব’লে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এক গল্পের বই,— হঠাৎ তারি মধ্যে একবার হুঁচট্ খেয়ে প’ড়ে গেলুম। একেবারে শেষ পাতা পর্য্যন্ত তলিয়ে গেলুম। এত বড়ে বিপদ ঘটবার কারণ হ’চ্চে, বিলাত থেকে একজন ইংরেজ ঐ বইটা তর্জ্জমা করার অনুমতি নিয়েছিলেন। আবার সেদিন আর-একজন ইংরেজ ঐটে তর্জ্জমা ক’র্‌তে চেয়ে আমাকে চিঠি লিখেচেন। তাতেই আমার দেখ্‌বার ইচ্ছা হ’লো, ওটার মধ্যে কী আছে। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা রাত ন-টার সময় হঠাৎ উদয় হওয়া কোনো শুভগ্রহের প্রভাবে নয়। কারণ এই কুয়োটা থেকে উদ্ধার হ’তে রাত তিনটা বেজে গেল। তা’র মানে আমার পরমায়ু থেকে একটা রাতের বারো আনার ঘুম গেল অনন্তকালের মতো হারিয়ে। আজ সকালবেলা আমার মুখ-চোখ দেখে সি, আই, ডি পুলিশ সন্দেহ ক’র্‌চে কাল রাত্রে আমি কোথায় সিঁধ কাট্‌তে গিয়েছিলুম।

 ঐ-যে ডাক-হরকরা আস্‌চে। একরাশ চিঠি দিয়ে গেল। তোমার বাবার হাতের লেখা এক লেফাফা দেখ্‌তে পাচ্চি, তা’র মধ্যে তোমাদের আধুনিক ইতিহাস কিছু পাওয়া যাবে। ওদিকে আবার কাল রাত্রে এক ইংরেজ অতিথি এসেচেন—আজ সমস্ত দিন তিনি বিদ্যালয় পর্য্যবেক্ষণ ক’র্‌বেন, সেই সঙ্গে আমাকেও পর্য্যবেক্ষণ ক’র্‌বেন ব’লে বোধ হচ্চে। যখন ক’র্‌বেন তখন হয় তো ঢুল্‌বো—আর তিনি তাঁর নোটবুকে লিখে নিয়ে যাবেন-যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমস্ত দিন ধ’রে কেবল ঢোলেন। এম্‌নি ক’রেই জীবন-চরিত লেখা হয়। সাহেব যখন আমার জীবন-চরিতে এই কথা লিখ্‌বেন তখন তুমি খুব জোরের সঙ্গে প্রতিবাদ ক’রো,—ব’লো, আমার অনেক দোষ থাক্‌তে পারে, দিনে ঢোলা অভ্যাস একেবারেই নেই। যাই হোক্, তুমি লয়েড্ জর্জ্জের প্রাইভেট সেক্রেটারীর পদ গ্রহণ করোনি, এইটাতে আমার মন অনেকটা আশ্বস্ত হ’য়েচে। ইতি ২৮শে পৌষ, ১৩২৬।