মৃতের কথোপকথন/শান্তি, সূর্য্যমুখী, কপালকুণ্ডলা

১০

শান্তি, সূর্য্যমুখী, কপালকুণ্ডলা

শান্তি

 মর্ত্তের লীলা অনেককাল ছেড়ে এসেছি, বোন, পৃথিবীর টান স্মৃতির অনেক তলে ডুবে গিয়েছে। তবে এ জাগরণ কেন? আবার কি দিন এল? আবার কি কাজের ডাক পড়েছে? তপস্যার সিদ্ধি তবে হলো? জীবনের কর্ম্মে জীবনের সঙ্গিনী হয়ে ধর্ম্মক্ষেত্রে আবার শক্তিমূর্ত্তি ধারণ করতে হবে?

সূর্য্যমুখী

 তা জানি না, বোন। আমার কর্ম্ম কি আছে তাও জানি না, আমার শক্তি কোথায় সে খোঁজও লই নি। তবে জীবনে মরণে আমি যাঁর পদপ্রান্তে, জন্মে জন্মে আমি তাঁরই অনুসরণ করে চল্‌বো। মর্ত্তে হোক, স্বর্গে হোক আর নরকেই হোক আমি সর্ববত্র সর্ববদাই স্বামীর ছায়া। এই ত নারীর ধর্ম্ম, এই ত নারীর কর্ম্ম। এর বেশী নারীর আর কি আশা আকাঙ্ক্ষা সুখ সৌভাগ্য থাকতে পারে? স্বামী কোথায় কি অবস্থায় আছেন তা জানতে আমার কৌতূহল নাই! জামার এক কাজ তাঁর সেবা, আমার সকল তৃপ্তি তাঁর চরণে আমার ভালবাসাটুকু ঢেলে দিয়ে।

শান্তি

 ঠিক কথা, বোন। স্বামীর সেবা করবে, ভালবাসা দিয়ে তাঁকে পরিপূর্ণ রাখবে— এই ত নারীর আদর্শ। কিন্তু আমি বলি, আদর্শ নারী সেই যে জানে স্বামীর সেবা কিসে হয় তাঁর পরিপূর্ণতা কোথায়? শরীরের সেবা অধম দান, হৃদয়ের ভালবাসা মধ্যম দান, কিন্তু উত্তম দান অন্তরাত্মার তপোবল। জান না কি, বোন্, নারীর আর এক নাম শক্তি কেন? জীবনের ব্রতে আমরা সাথী, উত্তর-সাধিকা। পুরুষকে যদি আমরা শক্তি না দিতে পারি, তবে তার যে শক্তিটুকু আছে তাও অপহরণ করবো। শিবের শিবত্ব প্রতিষ্ঠিত কোথায়? গৌরীর তপস্যার উপর।

সূর্য্যমুখীী

 দেবতার কথা জানি না, কিন্তু আমরা মানুষ। মানুষের মধ্যে নারীর স্থান চিরদিনই গৃহে। নারী গৃহলক্ষ্মী। বাহিবে কর্ম্মের যে যুদ্ধক্ষেত্র আয়াস-প্রয়াসের যে কোলাহল তা পুরুষেরই জন্যে। পুরুষের এ বাহিরের জীবনক্ষেত্রে নারীকেও কেন আপন-হারা হ’য়ে ঝাঁপ দিতে হবে? পুরুষের চাই একটা আশ্রয় স্থান, জীবনের চাই একটা অন্তরমুখী মৃতের কথোপকথন নীড়, নারীর কাজ সেইটিকে গড়ে তোলা, সেইটুকুকে শান্তিতে স্বস্তিতে ঐশ্বর্যে সুন্দর সুনিবিড় করে গুছিয়ে তোলা। পুরুষ যে ছুটতে চায় কেবলই বাহিরের দিকে, কেবলই আপনাকে ছড়িয়ে উচ্ছৃঙ্খল করে উধাও হয়ে,—নারীর কাজ সেইটিকে প্রেম-প্রীতির বন্ধনে, হৃদয়ের রসে সংযত করে, আত্মস্থ করে ধরে রাখা। নারীর শক্তি পুরুষের বাইরে-ছোটায় সাহায্য ক'রে নয়, নারীর শক্তি পুরুষকে অন্তরের দিকে টেনে আনায়। নারী পুরুষের অর্দ্ধাঙ্গিনী—পুরুষের অন্তরের যে অর্দ্ধ, সেইখানেই নারীর সব অধিকার সব কর্তব্য।

শান্তি

 নারী পুরুষের অর্দ্ধাঙ্গিনী, সত্য কথা, সূর্য্যমুখী। কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য, নারী পুরুষের সহধর্ম্মিনী। গৃহে নারী পুরুষের গৃহলক্ষ্মী, কিন্তু জীবনের কর্ম্মে নারী পুরুষের বীরজায়া, সহকর্মী। এই খানেই ত নারীর মহত্ত্ব। পুরুষকে আমাদের আনন্দ যেমন দিতে হবে, শক্তিও তেমনি দিতে হবে। কাজের ক্ষেত্রেও পুরুষকে একলা ছেড়ে দেব কেন? সেখানেও তার সাথে থাকব, দেহ মন প্রাণ দিয়ে সর্ববদা ঘিরে রাখব। স্বামীর কর্ম্মের, ব্রতের ভার যদি গ্রহণ না করলেম, তবে তাঁর জীবনের অৰ্দ্ধেকটাই কি হারালেম না?

সূর্য্যমুখী

 কিন্তু জ্ঞান নাকি নারীর আসল নারীত্ব হচ্ছে মাতৃত্ব। এই মাতৃত্বের যে মহাব্রত, তাই নারীর একমাত্র ব্রত। এখানে যেমন পুরুষের অধিকার নেই, সেই রকম পুরুষের যে বাহিরের জীবনের কর্ম্ম সেখানেও নারীর হজ্ব অনাবশ্যক। পুরুষের ক্ষেত্রে নারী যদি হস্তক্ষেপ করতে যায় তবে তার মৃতের কথোপকথন আপনার ধর্ম্মের সমূহ ক্ষতি হবেই। গৃহে সন্তানকে ভবিষ্যৎ মানুষকে গড়ে তোলাই নারীর ধর্ম্ম, কর্ম্ম, জীবনের সার্থকতা।

শাস্তি

 সন্তানের উপর কর্তব্য মাতারও আছে, পিতারও আছে। পুরুষ ও নারীর সম্বন্ধের গুটি একটা দিকের কথা মাত্র—কিন্তু সে কথা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

কপালকুণ্ডলা

 তোমাদের দুজনারই কথা আমার কাছে অবোধ্য। পুরুষ ও নারী নিয়ে তোমাদের যে বিতর্ক তার মূল সূত্রটাই আমি ধরতে পারছি নে। পুরুষ ও নারীকে একসঙ্গে বেঁধে দিতে তোমরা এত ব্যস্ত কেন? পুরুষ এক জীব, নারী এক জীব, তাদের স্বামী স্ত্রী হয়ে, অৰ্দ্ধাঙ্গ অৰ্দ্ধাঙ্গিনী হয়ে, মিলতে মিশতে হবে— কেন? কি উদ্দেশ্যে? কোন প্রয়োজনে?

শান্তি

 কপালকুণ্ডলা! তুমি বনের প্রাণী, সমাজের খবর রাখ না। মানুষকে থাকতে হয় সমাজ বেঁধে। আর সমাজের প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে পুরুষ ও নারীর মিলন রহস্যে। বিধাতা যে দিন মানুষকে গড়েছেন, সেই দিনই সমাজের উৎপত্তি হয়েছে, সেই দিনইতারা যুগলে যুগলে মিলে, কেন্দ্রে কেন্দ্রে গৃহ রচনা ক’রে মানুষত্বের সাধনা করেছে।

সূর্য্যমুখী

 যে নারী সংসারে ধরা দেয় নাই, পৃথিবীতে বৃথা তার জন্ম। নিজেকেও সে জানল না পেল না, পরকেও সে জানল না, পেল না। বিধাতার সৃষ্টি যে কোন আনন্দে বিধৃত তার খোঁজ পেল না।

পুরুষ নারীর, স্বামী স্ত্রীর রহস্য বোঝাবার জিনিষ নয়, বোন।

কপালকুণ্ডলা

 তোমাদের সমাজ তোমাদের সংসার কি এতই সুন্দর এতই মনোরম? কিন্তু আমার যে অভিজ্ঞতা দু'চার দিনের জন্য জুটেছিল, তা এখনও একটা দুঃস্বপ্নের মত আমার মাথায় চেপে আছে। সমাজ! সংসার! সে ত দারুণ কারাগার। দাম্পত্যবন্ধন! সে ত বন্ধন মাত্র। মুক্তি, স্বাধীনতা, যদৃচ্ছা-গতি-এর চেয়ে স্বস্তির স্বাস্থ্যের নানন্দের আর কি হ’তে পারে? উঃ! ভালবাসার অত্যাচারের মত আর অত্যাচার আছে? পুরুষের সাথে মিলিয়ে জীবন, কি অসম্ভব দাবীদাওয়ার জীবন—সে জীবন কি সাধে আমায় ত্যাগ করতে হয়েছে?

শান্তি

 হাঁ, এই দাবী-দাওয়া নিয়েই জীবন। দুর্ভাগা তোমার, সে জীবন তোমার ফুটে উঠতে পেলে না। এই দাবীদাওয়া, এই ভালবাসার অত্যাচারেই মানুষের বিশেষত্ব, মানুষ জীবনের সার্থকতা। দুই’এর আদান-প্রদানের ভিতর দিয়েই, মানুষের তান্তরাত্মা কেবল যে পরম আনন্দের অধিকারী হয় তা নয়, একটা পূর্ণতর বৃহত্তর সমৃদ্ধিই লাভ করে।

কপালকুণ্ডলা

 তোমরা যাকে বল্ছ মানুষের বিশেষত্ব, জীবনের সার্থকতা, আমি তাকে বলি সংস্কার। মানুষ ত আর এক ভঙ্গীতেও জীবনের সার্থকতা পেতে পারে— তার সমাজকে গড়ে নিতে পারে। মানুষ মানুষ—— পুরুষও মানুষ, নারীও মানুষ। ত্বং কুমারঃ উত বা কুমারী—জান ঋষিদের কথা? মানুষের প্রত্যেকেরই আপন আপন পথ, আপন আপন কর্ম্ম, আপন আপন ধর্ম্ম। নিজের মুক্ত অন্তরাত্মার প্রেরণায় চলেই, নিজের স্বচ্ছন্দ আনন্দের ঐশ্বর্যকে ফুটিয়ে চলেই প্রত্যেক জীবের যথার্থ সার্থকতা। অপরের সাথে নিজেকে বেঁধে দিয়ে, নিজত্ব মানুষ হারাতে যাবে কেন? আমার মনে হয়, এই রকম করেছে বলেই মানুষের জীবন সমাজ উন্নত হয়ে উঠতে পারছে না, তা হয়ে পড়েছে এমন দীনহীন এমন বিশৃঙ্খল। তোমাদের সমাজে থেকে মানুষ তার আত্মার স্বাধীনতা হারিয়েছে, তাই দেখি যুগে যুগে দেশে যে সব মহাপ্রাণ সে বলিদানে সম্মতি দিতে পারে নাই, তাঁরা সন্ন্যাসী সন্ন্যাসিনী হয়ে বেরিয়ে গেছেন।

সূর্য্যমুখী

 মানুষের কর্ত্তব্য করার ধৈর্য ও সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। যুগে যুগে দেশে দেশে সমস্ত মানবজাতির মধ্যে যে জিনিষটা অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে এসে জীবনকে রসায়িত মুঞ্জরিত করে তুলেছে সেইটে বটে মিথ্যা সংস্কার আর তোমার মত দু চার জন যারা সে ধারার অমৃতরস পান করবার সুবিধা পায় নি তারাই হল সত্যনিষ্ঠ। সংসারকে যারা এ রকমে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করেছে, তারা অহঙ্কারী আত্মসর্ববস্ব বলেই এরকম করেছে—কিন্তু পরিশেষে তারা নিজেরাই ফাঁকিতে পড়েছে।

শান্তি

 আমি অতদূর যাই নে। তাঁরা যা করেছেন সেটি হচ্ছে সমাজের বাইরের আদর্শ। কিন্তু সে বাইরে যাওয়ার রাস্তাও এই সমাজের ভিতর দিয়েই। ব্যক্তিগত ভাবে যদিও আমি মনে করি নে যে, সে বাইরে যাওয়ার একান্ত প্রয়োজন আছে—তবুও আমি বলি ও দুটিতে কোন বিরোধ নেই—দুইই হচ্ছে একই রাস্তার জের।

কপালকুণ্ডলা

 বাঁধন আমি কোন কালেই চাই না। মানুষ নিজের আনন্দে নিজের মহিমায় নিজে দাঁড়িয়ে উঠুক। নিজের অন্তরাত্মা, নিজের ভিতরে ভগবান, তার চেয়ে বড় কিছু নেই। আমি চাই মুক্তি, স্বাধীনতা, নারীর জীবাত্মারও স্বাতন্ত্র্য।

সূর্য্যমুখী

 মানুষের অন্তরাত্মা মানুষের অন্তরাত্মার সাথে জড়িয়ে তবে এক, নতুবা তা খণ্ড। দুটি খণ্ড জীব যখন হৃদয়ের বিনিময়ে এক হতে পেরেছে, তখনই তারা স্বেচ্ছাচারী না হোক প্রকৃতই মুক্ত হয়েছে। নারী সেই পথ দেখিয়ে চলেছে—আত্মদানে, ভালবাসায়, প্রেমেই নারীর মুক্তি ও পূর্ণানন্দ।

শান্তি

 নারী শক্তি—নারী তপঃশক্তি। কপালকুণ্ডলা! তুমি বোধ হয় নারীকে জ্ঞানের পথ দেখিয়ে দিচ্ছ, সূর্য্যমুখী। তুমি দেখিয়ে দিচ্ছ প্রেমের পথ কিন্তু আমি সশর উপরে শক্তিরই মাহাত্ম্য দেখছি নারীর নারীত্বে।