লোকরহস্য (১৯৩৯)/ইংরাজস্তোত্র

ইংরাজস্তোত্র

(মহাভারত হইতে অনুবাদিত)

 হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।১॥

 তুমি নানাগুণে বিভূষিত, সুন্দর কান্তিবিশিষ্ট, বহুল সম্পদ্‌যুক্ত; অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।২॥

 তুমি হর্ত্তা—শত্রুদলের; তুমি কর্ত্তা—আইনাদির; তুমি বিধাতা—চাকরি প্রভৃতির। অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।৩॥

 তুমি সমরে দিব্যাস্ত্রধারী, শিকারে বল্লমধারী, বিচারাগারে অর্দ্ধ ইঞ্চি পরিমিত ব্যাসবিশিষ্ট বেত্রধারী, আহারে কাঁটা চাম্‌চে ধারী; অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।৪॥

 তুমি একরূপে রাজপুরী মধ্যে অধিষ্ঠান করিয়া রাজ্য কর; আর একরূপে পণ্যবীথিকা মধ্যে বাণিজ্য কর; আর একরূপে কাছাড়ে চার চাস কর; অতএব হে ত্রিমূর্ত্তে! আমি তোমাকে প্রণাম করি।৫॥

 তোমার সত্ত্বগুণ তোমার প্রণীত গ্রন্থাদিতে প্রকাশ; তোমার রজোগুণ তোমার কৃত যুদ্ধাদিতে প্রকাশ; তোমার তমোগুণ তোমার প্রণীত ভারতবর্ষীয় সম্বাদপত্রাদিতে প্রকাশ। —অতএব হে ত্রিগুণাত্মক! আমি তোমাকে প্রণাম করি।৬॥

 তুমি আছ, এই জন্যই তুমি সৎ! তোমার শত্রুরা রণক্ষেত্রে চিৎ; এবং তুমি উমেদারবর্গের আনন্দ; অতএব হে সচ্চিদানন্দ। তোমাকে আমি প্রণাম করি।৭॥

 তুমি ব্রহ্মা—কেন না, তুমি প্রজাপতি; তুমি বিষ্ণু—কেন না, কমলা তোমার প্রতিই কৃপা করেন; এবং তুমি মহেশ্বর—কেন না, তোমার গৃহিণী গৌরী। অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।৮॥

 তুমি ইন্দ্র, কামান তোমার বজ্র; তুমি চন্দ্র, ইন্‌কম টেক্‌স তোমার কলঙ্ক; তুমি বায়ু, রেইলওয়ে তোমার গমন; তুমি বরুণ, সমুদ্র তোমার রাজ্য; অতএব হে ইংরাজ। আমি তোমাকে প্রণাম করি।৯॥

 তুমিই দিবাকর, তোমার আলোকে আমাদের অজ্ঞানান্ধকার দূর হইতেছে; তুমিই অগ্নি—কেন না, সব খাও; তুমিই যম, বিশেষ আমলাবর্গের।১০॥

 তুমি বেদ, আর ঋক্‌যজুবাদি মানি না; তুমি স্মৃতি—মম্বাদি ভুলিয়া গিয়াছি; তুমি দর্শন—ন্যায়, মীমাংসা প্রভৃতি তোমারই হাত। অতএব হে ইংরাজ! তোমাকে প্রণাম করি।১১॥

 হে শ্বেতকান্ত! তোমার অমল ধবল দ্বিরদ-রদশুভ্র মহাশ্মশ্রুশোভিত মুখমণ্ডল দেখিয়া আমার বাসনা হইয়াছে, আমি তোমার স্তব করিব; অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।১২॥

 তোমার হরিতকপিশ পিঙ্গললোহিত কৃষ্ণশুভ্রাদি নানা বর্ণশোভিত, অতিযত্নরঞ্জিত, ভল্লুকমেদমার্জ্জিত কুন্তলাবলি দেখিয়া আমার বাসনা হইয়াছে, আমি তোমার স্তব করিব; অতএব হে ইংরাজ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৩॥

 তুমি কলিকালে গৌরাঙ্গাবতার, তাহার সন্দেহ নাই। হ্যাট তোমার সেই গোপবেশের চূড়া; পেণ্টুলন সেই ধড়া—আর হুইপ্ সেই মোহন মুরলী—অতএব হে গোপীবল্লভ! আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৪॥

 হে বরদ! আমাকে বর দাও। আমি শাম্‌লা মাতায় বাঁধিয়া তোমার পিছু পিছু বেড়াইব—তুমি আমাকে চাকরি দাও। আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৫॥

 হে শুভঙ্কর! আমার শুভ কর। আমি তোমার খোষামোদ করিব, তোমার প্রিয় কথা কহিব, তোমার মনরাখা কাজ করিব—আমায় বড় কর, আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৬॥

 হে মানদ! আমায় টাইটল দাও, খেতাব দাও, খেলাত দাও;—আমাকে তোমার প্রসাদ দাও—আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৭॥

 হে ভক্তবৎসল! আমি তোমার পাত্রাবশেষ ভোজন করিতে ইচ্ছা করি—তোমার করস্পর্শে লোকমণ্ডলে মহামানাস্পদ হইতে বাসনা করি,—তোমার স্বহস্তলিখিত দুই একখানা পত্র বাক্সমধ্যে রাখিবার স্পর্দ্ধা করি—অতএব হে ইংরাজ! তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও; আমি তোমাকে প্রণাম করি। ১৮॥

 হে অন্তর্যামিন্। আমি যাহা কিছু করি, তোমাকে ভুলাইবার জন্য। তুমি দাতা বলিবে বলিয়া আমি দান করি; তুমি পরোপকারী বলিবে বলিয়া পরোপকার করি; তুমি বিদ্বান্ বলিবে বলিয়া আমি লেখা পড়া করি। অতএব হে ইংরাজ! তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও। আমি তোমাকে প্রণাম করি।১৯॥

 আমি তোমার ইচ্ছামতে ডিস্পেন্সরি করিব; তোমার প্রীত্যর্থ স্কুল করিব; তোমার আজ্ঞামত চাঁদা দিব; তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও, আমি তোমাকে প্রণাম করি।২০॥

 হে সৌম্য! যাহা তোমার অভিমত, তাহাই আমি করিব। আমি বুট পাণ্টলুন পরিব, নাকে চস্‌মা দিব, কাঁটা চাম্‌চে ধরিব, টেবিলে খাইব— তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও। আমি তোমাকে প্রণাম করি।২১॥

 হে মিষ্টভাষিন্! আমি মাতৃভাষা ত্যাগ করিয়া তোমার ভাষা কহিব; পৈতৃক ধর্ম্ম ছাড়িয়া ব্রাহ্মধর্ম্মাবলম্বন করিব; বাবু নাম ঘুচাইয়া মিষ্টর লেখাইব; তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও। আমি তোমাকে প্রণাম করি।২২॥

 হে সুভোজক। আমি ভাত ছাড়িয়াছি, পাঁউরুটি খাই; নিষিদ্ধ মাংস নহিলে আমার ভোজন হয় না; কুক্কুট আমার জলপান। অতএব হে ইংরাজ। আমাকে চরণে রাখিও, আমি তোমাকে প্রণাম করি।২৩॥

 আমি বিধবার বিবাহ দিব; কুলীনের জাতি মারিব, জাতিভেদ উঠাইয়া দিব কেন না, তাহা হইলে তুমি আমার সুখ্যাতি করিবে। অতএব হে ইংরাজ। তুমি আমার প্রতি প্রসল্প হও।২৪॥

 হে সর্ব্বদ! আমাকে ধন দাও, মান দাও, যশঃ দাও;— আমার সর্ব্ববাসনা সিদ্ধ কয়। আমাকে বড় চাকরি দাও, রাজা কর, রায়বাহাদুর কর, কৌন্সিলের মেম্বর কর, আমি তোমাকে প্রণাম করি।২৫॥

 যদি তাহা না দাও, তবে আমাকে ডিনরে আট্‌হোমে নিমন্ত্রণ কর; বড় বড় কমিটির মেম্বর কর, সেনেটের মেম্বর কর, জুষ্টিস কর, অনরারী মাজিষ্ট্রেট্ কর, আমি তোমাকে প্রণাম করি।২৬॥

 আমার স্পীচ্ শুন, আমার এশে পড়, আমায় বাহবা দাও,—আমি তাহা হইলে সমগ্র হিন্দুসমাজের নিন্দাও গ্রাহ্য করিব না। আমি তোমাকেই প্রণাম করি।২৭॥

 হে ভগবন্। আমি অকিঞ্চন! আমি তোমার দ্বারে দাঁড়াইয়া থাকি, তুমি আমাকে মনে রাখিও। আমি তোমাকে ডালি পাঠাইব, তুমি আমাকে মনে রাখিও। হে ইংরাজ! আমি তোমাকে কোটি কোটি প্রণাম করি।২৮॥