শেষের কবিতা/লাবণ্য-তর্ক

শেষের কবিতা


যোগমায়া বললেন, ‘মা লাবণ্য, তুমি ঠিক বুঝেছ?’
‘ঠিক বুঝেছি মা’।
‘অমিত ভারি চঞ্চল, সে কথা মানি। সেইজন্যেই ওকে এত স্নেহ করি। দেখো-না, ও কেমনতরো এলোমেলো। হাত থেকে সবই যেন পড়ে পড়ে যায়’। লাবণ্য একটু হেসে বললে, ‘ওঁকে সবই যদি ধরে রাখতেই হত, হাত থেকে সবই যদি খসে খসে না পড়ত, তা হলেই ওঁর ঘটত বিপদ। ওঁর নিয়ম হচ্ছে, হয় উনি পেয়েও পাবেন না, নয় উনি পেয়েই হারাবেন। যেটা পাবেন সেটা যে আবার রাখতে হবে, এটা ওঁর ধাতের সঙ্গে মেলে না’।
‘সত্যি করে বলি বাছা, ওর ছেলেমানুষি আমার ভারি ভালো লাগে’।
‘সেটা হল মায়ের ধর্ম। ছেলেমানুষি দায় যত-কিছু সব মায়ের, আর ছেলের দিকে যত-কিছু সব খেলা। কিন’ আমাকে কেন বলছি, দায় নিতে যে পারে না তার উপরে দায় চাপাতে’?
‘দেখছ-না লাবণ্য, ওর অমন দুরন- মন আজকাল অনেকখানি যেন ঠান্ডা হয়ে গেছে। দেখে আমার বড়ো মায়া করে। যাও বল, ও তোমাকে ভালোবাসে’।
‘তা বাসেন।’
‘তবে আর ভাবনা কিসের?’
‘কর্তামা, ওঁর যেটা স্বভাব তার উপর আমি একটুও অত্যাচার করতে চাই নে’।
‘আমি তো এই জানি লাবণ্য, ভালোবাসা খানিকটা অত্যাচার চায়, অত্যাচার করেও।’
‘কর্তামা, সে অত্যাচারের ক্ষেত্র আছে; কিন’ স্বভাবের উপর পীড়ন সয় না। সাহিত্যে ভালোবাসার বই যতই পড়লেম ততই এই কথাটা বার বার মনে হয়েছে, ভালোবাসার ট্রাজেডি ঘটে সেইখানেই যেখানে পরস্পরকে স্বতন্ত্র জেনে সন’ষ্ট থাকতে পারে নি- নিজের ইচ্ছেকে অন্যের ইচ্ছে করবার জন্যে যেখানে জুলুম-যেখানে মনে করি, আপন মনের মতো করে বদলিয়ে অন্যকে সৃষ্টি করব’।
‘তা মা, দুজনকে নিয়ে সংসার পাততে গেলে পরস্পর খানিকটা সৃষ্টি না করে নিলে চলেই না। ভালোবাসা যেখানে আছে সেখানে সেই সৃষ্টি সহজ; যেখানে নেই সেখানে হাতুড়ি পিটাতে গিয়ে তুমি যাকে ট্র্যাজেডি বল তাই ঘটে’।
‘সংসার পাতবার জন্যেই যে মানুষ তৈরি তার কথা ছেড়ে দাও। সে তো মাটির মানুষ, সংসারের প্রতিদিনের চাপেই তার গড়ন-পিটোন আপনিই ঘটতে থাকে। কিন’ যে মানুষ মাটির মানুষ একেবারেই নয় সে আপনার স্বাতন্ত্র্য কিছুতেই ছাড়তে পারে না। যে মেয়ে তা না বোঝ সে যতই দাবি করে ততই হয় বঞ্চিত, যে পুরুষ তা না বোঝে সে যতই টানা-হেঁচড়া করে ততই আসল মানুষটাকে হারায়। আমার বিশ্বাস, অধিকাংশ স’লেই আমরা যাকে পাওয়া বলি সে আর কিছু নয়, হাতকড়া হাতকে যেরকম পায় সেই আর-কি।’
‘তুমি কী করতে চাও লাবণ্য?’
‘বিয়ে করে দুঃখ দিতে চাই নে। বিয়ে সকলের জন্যে নয়। জান কর্তামা, খুঁতখুঁতে মন যাদের তারা মানুষকে খানিক খানিক বাদ দিয়ে দিয়ে বেছে বেছে নেয়। কিন’ বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে স্ত্রী-পুরুষ যে বড়ো বেশি কাছাকাছি এসে পড়ে, মাঝে ফাঁক থাকে না; তখন একেবারে গোটা মানুষকে নিয়েই কারবার করতে হয় নিতান- নিকটে থেকে। কোন একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকে না।’
‘লাবণ্য, তুমি নিজেকে জান না। তোমাকে নিতে গেলে কিছুই বাদ দিয়ে নেবার দরকার হবে না।’
‘কিন’ উনি তো আমাকে চান না। যে আমি সাধারণ মানুষ, ঘরের মেয়ে, তাকে উনি দেখতে পেয়েছেন বলে মনেই করি নে। আমি যেই ওঁর মনকে স্পর্শ করেছি অমনি ওঁর মন অবিরাম ও অজস্র কথা কয়ে উঠেছে। সেই কথা দিয়ে উনি কেবলই আমাকে গড়ে তুলেছেন। ওঁর মান যদি ক্লান- হয়, কথা যদি ফুরোয়, তবে সেই নিঃশব্দের ভিতরে ধরা পড়বে এই নিতান- সাধারন মেয়ে, যে মেয়ে ওঁর নিজের সৃষ্টি নয়। বিয়ে করলে মানুষকে মেনে নিতে হয়, তখন আর গড়ে নেবার ফাঁক পাওয়া যায় না।’
‘ তোমার মনে হয়, অমিত তোমার মতো মেয়েকেও সম্পুর্ণ মেনে নিতে পারবে না?’
‘ স্বভাব যদি বদলায় তবে পারবেন। কিন’ বদলাবেই বা কেন? আমি তো তা চাই নে।’
‘ তুমি কী চাও?’
‘ যতদিন পারি না হয় ওঁর কথার সঙ্গে, ওঁর মনের খেলার সঙ্গে মিশিয়ে স্বপ্ন হয়েই থাকব। আর, স্বপ্নই বা তাকে বলব কেন? সে আমার একটা বিশেষ জন্ম, একটা বিশেষ রূপ, একটা বিশেষ জগতে সে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। না হয় সে গুটি থেকে বের হয়ে আসা-দু চার দিনের একটা রঙিন প্রজাপতিই হল, তাতে দোষ কী? জগতে প্রজাপতি আর কিছুর চেয়ে যে কম সত্য তা তো নয়। নাহয় সে সূর্যোদয়ের আলোতে দেখা দিল আর সূর্যাসে-র আলোতে মরেই গেল, তাতেই বা কী? কেবল এইটুকুই দেখা চাই যে, সেটুকু সময় যেন ব্যর্থ হয়ে না যায়।’
‘ সে যেন বুঝলুম, তুমি অমিতের কাছে নাহয় ক্ষনকালের মায়া রূপেই থাকবে। আর নিজে? তুমিও কি বিয়ে করতে চাও না? তোমার কাছে অমিতও কি মায়া?’
লাবণ্য চুপ করে বসে রইল, কোনো জবাব করলে না।
যোগমায়া বলেলেন, ‘তুমি যখন তর্ক কর তখন বুঝতে পারি তুমি অনেক-বই-পড়া মেয়ে। তোমার মতো করে ভাবতেও পারি নে, কথা কইতেও পারি নে; শুধু তাই নয়, হয়তো কাজের বেলাতেও এত শক্ত হতে পারি নে। কিন’ তর্কের ফাঁকের মধ্যে দিয়েও যে তোমাকে দেখেছি মা। সেদিন রাত তখন বারোটা হবে-দেখলুম, তোমার ঘরে আলো জ্বলছে। ঘরে গিয়ে দেখি, তোমার টেবিলের উপর নুয়ে পড়ে দুই হাতের মধ্যে মুখ রেখে তুমি কাঁদছ। এ তো ফিলজফি-পড়া মেয়ে নয়। একবার ভাবলুম, সান-না দিয়ে আসি; তার পরে ভাবলুম, সব মেয়েকেই কাঁদবার দিনে কেঁদে নিতে হবে, চাপা দিতে যাওয়া কিছু নয়। এ কথা খুবই জানি, তুমি সৃষ্টি করতে চাও না, ভালোবাসতে চাও। মন প্রাণ দিয়ে সেবা না করতে পারলে তুমি বাঁচবে কী করে। তাই তো বলি, ওকে কাছে না পেলে তোমার চলবে না। ‘ বিয়ে করব না’ বলে হঠাঃ পণ করে বোসো না। একবার তোমার মনে একটা জেদ চাপলে আর তোমাকে সোজা করা যায় না, তাই ভয় করি।’
লাবণ্য কিছু বললে না, নতমুখে কোলের উপর শাড়ির আঁচলটা চেপে চেপে অনাবশ্যক ভাঁজ করতে লাগল।
যোগমায়া বললেন,‘তোমাকে দেখে আমার অনেকবার মনে হয়েছে, অনেক পড়ে, অনেক ভেবে তোমাদের মন বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে; তোমার ভিতরে ভিতরে যে-সব ভাব গড়ে তুলছ আমাদের সংসারটা তার উপযুক্ত নয়। আমাদের সময়ে মনের যে-সব আলো অদৃশ্য ছিল, তোমরা আজ যেন সেগুলোকেও ছাড়ান দিতে চাও না। তারা দেহের মোটা আবরণটাকে ভেদ করে দেহটাকে যেন অগোচর করে দিচ্ছে। আমাদের আমলে মনের মোটা মোটা ভাবগুলো নিয়ে সংসারে সুখদুঃখ যথেষ্ট ছিল, সমস্যা কিছু কম ছিল না। আজ তোমরা এতই বাড়িয়ে তুলছ, কিছুই আর সহজ রাখলে না।’
লাবণ্য একটুখানি হাসলে। এই সেদিন অমিত অদৃশ্য আলোর কথা যোগমায়াকে বোঝাচ্ছিল, তার থেকে এই যুক্তি তাঁর মাথায় এসেছে-এও তো সুক্ষ্ম; যোগমায়ার মা ঠাকরুন এ কথা এমন করে বুঝতেন না। বললে, ‘কর্তামা, কালের গতিকে মানুষের মন যতই স্পষ্ট করে সব কথা বুঝতে পারবে ততই শক্ত করে তার ধাক্কা সইতেও পারবে। অন্ধকারের ভয়, অন্ধকারের দুঃখ অসহ্য, কেননা সেটা অস্পষ্ট।
যোগমায়া বললেন, ‘আজ আমার বোধ হচ্ছে, কোনো কালে তোমাদের দুজনের দেখা না হলেই ভালো হত।’
‘ না না, তা বোলো না। যা হয়েছে এ ছাড়া আর-কিছু যে হতে পারত, এ আমি মনেও করতে পারি-নে-এক সময়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আমি নিতান-ই শুকনো-কেবল বই পড়ব আর পাস করব, এমনি করেই আমার জীবন কাটাবে। আজ হাঠাৎ দেখলুম, আমিও ভালোবাসতে পারি। আমার জীবনে এমন অসম্ভব যে সম্ভব হল, এই আমার ঢের হয়েছে। মনে হয় এত দিন ছায়া ছিলুম, এখন সত্য হয়েছি। এর চেয়ে আর কী চাই! আমাকে বিয়ে করতে বোলো না কর্তামা।’
ব’লে চৌকি থেকে মেঝেতে নেমে যোগমায়ার কোলে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল।