(পৃ. ২৪-২৮)
◄  
  ►

 দেবী যুক্তকরে দাঁড়াইয়া আছেন, তাঁহার সম্মুখে শুভ্র স্থির রজতগিরিসঙ্কাশ দেবমূর্ত্তি। যেন কৈলাসোর্দ্ধে লগ্ন একখানি শুভ্র মেঘ। যেন মরুৎহিল্লোলবিক্ষুব্ধ হিমগিরি শিরোদেশে মরুতাদিভূতের অনায়ত্ত স্তব্ধ রজত গিরিসঙ্কাশ দেববিগ্রহ। করজোড়ে সতী দাঁড়াইয়া আছেন। গিরি পার্শ্বে সূর্য্যাস্তের প্রভাচন্দনে অনুরঞ্জিত হইয়া সন্ধ্যা দেবী যেমন দাঁড়াইয়া থাকেন, অথবা সমুন্নত শুভ্র মেঘপংক্তির পার্শ্বে সূর্য্যোদয়ের সিন্দুর ললাটে পরিয়া উষা যেরূপ দাঁড়াইয়া থাকে, যোগিবরের নিকট সতী তেমনি দাঁড়াইয়া আছেন। করশোভন রুদ্রাক্ষ-বলদ্বয় যুক্তকরের পার্শ্বে যুক্ত হইয়া আছে। নিবিড় কেশরাজির চাপল্য নাই! তাহারা স্থিরকৃষ্ণ ধূম্রপটল কিম্বা কৃষ্ণ ভ্রমরপংক্তির ন্যায় চন্দ্রবদনের পার্শ্বে স্থির হইয়া আছে। যেন স্থির চিত্রের লেখা। যুক্তকরে তপস্বিনী তপস্বিবরের নিকট কি প্রার্থনা করিতেছেন?

 মহাদেব দেবীর আগমনপ্রভাব বুঝিলেন। ব্রহ্মানন্দ টুটিয়া গেল। কোন ব্যাকুল প্রার্থনার আবেশে তাহার দৃষ্টি নিম্নদিকে আবদ্ধ হইল। মনোময়ী বাক্য উচ্চারণ না করিয়া মৌনভাবে তাহার প্রার্থনা শিবকে বুঝাইয়া দিলেন।

 শিবের ধ্যানভঙ্গ হইল। তিনি দেখিলেন, পদ্মনালের ন্যায় কোমলকান্তি সতী যুক্ত করে দাঁড়াইয়া আছেন। তিনি সতীকে আদর করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেবীর কি অভিলাষ তাঁহাকে পূর্ণ করিতে হইবে?” দেবী বলিলেন, “ভর্ত্তৃদেব, নারদ আমাকে বলিয়া গেলেন, আমার পিতৃগৃহসম্বন্ধে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি নিষিদ্ধ। আমার আর কোন কথা শুনিবায় প্রতীক্ষা না করিয়া তিনি বীণা বাজাইতে বাজাইতে চলিয়া গেলেন। আমার প্রাণ বড় ব্যাকুল হইয়াছে, আমি নারদের কথার ভাব বুঝিতে পারি নাই।”

 শিব বলিলেন, “আমি তাঁহাকে মানা করিয়াছিলাম। কিন্তু তুমি এতটা জানিয়াছ যে, এখন আর গোপন করা চলে না। তোমার পিতা দক্ষ বাজপেয় ও বার্হস্পত্য যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিতেছেন। শুনিলাম, আমাদিগকে বাদ দিয়া বিশ্বশুদ্ধ সকলকে নিমন্ত্রণ করা হইয়াছে। আমি নারদকে এই সংবাদ দিতে বারণ করিয়াছিলাম।” দক্ষ যে শিবের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন, শিব তাহা সতীকে বলিতে কুণ্ঠিত হইলেন।

 সতী করজোড়ে দাঁড়াইয়া রহিলেন। তপস্বিনীর ত্রিনয়নে অশ্রু দেখা দিল। শিব বলিলেন, “তুমি কি পিতৃগৃহে যাইতে অভিলাষী হইয়াছ? বিনা আহ্বানে তথায় যাওয়া কি উচিত?”

 সতী উত্তর করিতে পারিলেন না, তথাপি যেন মনোভাব ব্যক্ত করিতে ইচ্ছুক। ব্রীড়াবনত পুষ্পলতার ন্যায় তিনি মহাদেবের পাদপদ্ম লক্ষ্য করিয়া নোয়াইয়া পড়িলেন। যেন সেই চরণকমলে তাঁহার কোন বিনীত নিবেদন আছে।

 শিব বলিলেন, “তুমি পিতৃগৃহে যাইতে চাহিতেছ, কিন্তু বিনা নিমন্ত্রণে আমি কি করিয়া বলিব ‘তুমি যাও’।”

 সতী বলিতে চাহিলেন, “নিমন্ত্রণ আবার কি? তাঁহার বিরহিণী জননী যে তাঁহার পথের দিকে দুইটি চক্ষু ফেলিয়া রাখিয়াছেন, সে নিমন্ত্রণ তিনি প্রাণের প্রাণে অনুভব করিতেছেন। তিনি দক্ষের আদরিণী কন্যা, পিতা কি মুহূর্ত্তেও কৈলাসপুরীর দিকে তাকাইয়া সতীর কথা চিন্তা করিবেন না? সতীকে হস্তে ধারণ করিয়া যে তিনি সর্ব্ব শুভকার্য্যে মন্ত্রোচ্চারণ করিতেন, আজ কি সতীকে তিনি ভুলিয়া যাইবেন? কন্যাকে আবার নিমন্ত্রণ কে করিয়া থাকে? নিজের মাতৃ পিতৃ অঙ্কে যাইবেন, কোন কন্যা তজ্জন্য নিমন্ত্রণের প্রতীক্ষা করিয়া থাকে? দক্ষপুরীর আম্রবনে সতীর স্বহস্ত রোপিত বৃক্ষগুলি এই উৎসবের সময় সতীকে হারাইয়া শাখাগ্র হেলনপূর্ব্বক তাঁহাকে খুঁজিতেছে। বাল্যসখীগণ ও ভগিনীগণ সতীর জন্য ব্যাকুল হইয়া আছে, সকলের আকর্ষণ তিনি মনে মনে অনুভব করিতেছেন। পিতৃগৃহে যাইতে তিনি আর কোন্‌ নিমন্ত্রণের প্রতীক্ষা করিবেন?”

 সতী করযোড়ে মহাদেবের পাদপদ্মে নিশ্চল দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন, তিনি একটি কথাও বলেন নাই! যিনি কোন কথাই বলেন না, তাঁহার মনোভাব যেরূপ সুস্পষ্ট বোঝা যায়, অন্য কাহারও সেরূপ নহে!

 শিব কি করিবেন! তিনি দেবীর ইচ্ছা পূর্ণ করিতে সাহসী হইলেন না। এই সূত্রে কি অনর্থ ঘটবে তিনি তাহা আশঙ্কা করিয়া বিচলিত হইলেন। চন্দ্রচূড়ের চন্দ্রবদনে শঙ্কার ছায়া পড়িল। নন্দিকেশ্বর সকলই জানিতেন। তিনি বলিলেন, “মা তোমার এবার পিত্রালয়ে যাইয়া কাজ নাই।”

 বিমনা হইয়া সতী চলিয়া গেলেন—নিপুণভাবে গৃহকর্ম্ম শেষ করিয়া দেবী কৈলাসপুরীর রম্য বনান্ত-ভূমিতে যাইয়া সন্ধ্যাকালে দাঁড়াইলেন। দেবী দেখিলেন—আকাশানুরঞ্জিত করিয়া সারি সারি রথ চলিতেছে। কোনটি মাণিক্য-খচিত, কোনটি মরাল-বাহন,—বুঝিলেন, ইহারা তাঁহার পিতৃগৃহের যাত্রী।

 সহসা সমুজ্জ্বল একখানি রথ সম্মুখে ভাসিয়া গেল। তাহা প্রদীপ্ত মণিময়। তন্মধ্যে রক্তপটাম্বরধারিণী মরকতহার-লম্বিত-কণ্ঠ-দেশা স্বাহাকে দেখিয়া তিনি চিনিতে পারিলেন। তৎপার্শ্বে কলহংসসদৃশ পাণ্ডুর চন্দ্রের বিমানে রোহিণী ও ভগিণীবর্গকে তিনি আভাসে দেখিতে পাইলেন।

 এবার দেবীর হৃদয় যেন শোকে বিদীর্ণ হইল। জননীর মুখখানি দেখিবার জন্য দেবীর হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিল। সেই উৎকণ্ঠায় মহাদেব স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি দেবীর সন্মুখে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তাঁহার আনন্দময়ী তপস্বিনী নিরানন্দ, তদীয় বিম্বাধরের হাসি বিশুষ্ক, মলিন-নেত্র অশ্রুপূর্ণ।

 শিব বলিলেন, “দেবি, তুমি নিশ্চয়ই যাইবে?” সতী বলিলেন, “প্রভুর ইচ্ছা হইলে আমি যাইতে এখনই প্রস্তুত হইব।”

 শিব পুনরায় বলিলেন, “দেবি, আমি তোমাকে ছাড়িয়া দিতে ইচ্ছা করি না। কিন্তু তুমি নিরানন্দ হইলে কৈলাসপুরীর তপস্যা বৃথা হইয়া যায়। ঐ দেখ জবা-কুসুম শাখা-মলিন হইয়া গিয়াছে। বিল্বদল শুষ্কপ্রায়। পক্ষিগণ কাকলী বন্ধ করিয়াছে। তোমার ইচ্ছায় বাধা দেওয়ার শক্তি আমার নাই। নন্দী সিংহকে সাজাইয়া আন। দেবী পিতৃগৃহে যাইবেন। তুমি ইঁহার সঙ্গে থাকিও, তুমি থাকিতে ইহার অনিষ্ট ঘটবে না, আমি এই ভরসায় পাঠাইতেছি।”

 দেবী এই কথা বুঝিতে পারিলেন না। নন্দী মহাদেবের আদেশে সিংহকে সাজাইয়া লইয়া আসিল। কিন্তু তাহার মুখ ভ্রকুটীকুটিল, যেন ঘোর অনিচ্ছায় কোন মৃত্যুতুল্য কঠিন আজ্ঞা সে বহন করিতেছে। দেবী নন্দীর এই ভাব দেখিয়া প্রীত হইলেন না। তাহারও হৃদয় যেন কোন অনিশ্চিত আশঙ্কায় কম্পিত হইতে লাগিল।