সন্ধ্যা সঙ্গীত/দুঃখ আবাহন

দুঃখ আবাহন।

আয় দুঃখ, আয় তুই,
তাের তরে পেতেছি আসন!
হৃদয়ের প্রতি শিরা টানি টানি উপাড়িয়া
বিচ্ছিন্ন শিরার মুখে তৃষিত অধর দিয়া
বিন্দু বিন্দু রক্ত তুই করিস্ শোষন;


জননীর স্নেহে তােরে করিব পােষণ!
হৃদয়ে আয়রে তুই হৃদয়ের ধন!

যখনি হইবি শ্রান্ত বুকেতে রাখিস্ মাথা !
সে বিছানা সুকোমল শিরায় শিরায় গাঁথা!
সুখেতে ঘুমাস্ তুই
হৃদয়ের নীড়ে;
অতি গুরুভার তুই-
দুয়েকটি শিরা তাহে যাবে বুঝি ছিঁড়ে,
যাক্ ছিঁড়ে!
জননীর স্নেহে তােরে করিব বহন,
দুর্ব্বল বুকের পরে করিব ধারণ,
একেলা বসিয়া ঘরে  অবিরল এক স্বরে
গাব তাের কানে কানে ঘুম পাড়াবার গান!
মুদিয়া আসিবে তাের শ্রান্ত দুনয়ান!
প্রাণের ভিতর হতে উঠিয়া নিশ্বাস
শ্রান্ত কপালেতে তাের করিবে বাতাস,
তুই সুখেতে ঘুমাস্!

আয় দুঃখ আয় তুই!
ব্যাকুল এ হিয়া!


দুই হাতে মুখ চাপি
হৃদয়ের ভূমি পরে
পড়্ আছাড়িয়া।
সমস্ত হৃদয় ব্যাপি
একবার উচ্চস্বরে
অনাথ শিশুর মত ওঠরে কাঁদিয়া!
প্রাণের মৰ্ম্মের কাছে
একটি যে ভাঙ্গা বাদ্য আছে,
দুই হাতে তুলে নেরে
সবলে বাজায়ে দেরে,
নিতান্ত উন্মাদ সম
ঝন্ ঝন্‌ ঝন্‌ ঝন্!
ভাঙ্গেত ভাঙ্গিবে বাদ্য,
ছেঁড়েত ছিঁড়িবে তন্ত্রী,
নেরে তবে তুলে নেরে,
সবলে বাজায়ে দেরে,
নিতান্ত উন্মাদ সম
ঝন্ ঝন্‌ ঝন্ ঝন্!
দারুণ আহত হয়ে দারুণ শব্দের ঘায়
যত আছে প্রতিধ্বনি


বিষম প্রমাদ গণি
একেবারে সমস্বরে
কাঁদিয়া উঠিবে যন্ত্রণায়,
দুঃখ, তুই, আয় তুই আয়!

নিতান্ত একেলা এ হৃদয়!
কেহ নাই যারে ডেকে দুটি কথা কয়!
আর কিছু নয়,
কাছে আয় একবার,  তুলে ধর্ মুখ তার,
মুখে তার আঁখি দুটি রাখ!
এক দৃষ্টে চেয়ে শুধু থাক্!
আর কিছু নয়-
নিরালয় এ হৃদয়
শুধু এক সহচর চায়!
তুই দুঃখ, তুই কাছে আয়!
কহিতে না চাস্ যদি
ব'সে থাক্‌ নিরবধি
হৃদয়ের পাশে দিন রাতি,
যখনি খেলাতে চাস্,  হৃদয়ের কাছে যাস্
হৃদয় আমার চায় খেলাবার সাথী।-


যখনি খেলাতে চাস  প্রাণের প্রান্তরে যাস,
সেথায় ভস্মের স্তূপ আছে ;
মিলি তােরা দুই ভাই,  ফুঁ দিয়ে উড়াস্ ছাই,
সতত থাকিস্ কাছে কাছে।
সহসা দেখিতে যদি পাস্
দগ্ধ-শেষ অস্থি রাশ রাশ,
তাই দিয়ে খেলেনা গড়িস্,
তাই নিয়ে হাসিস্ কাঁদিস্!
প্রাণের যেথায়
অলক্ষ্যেতে শােণিতের ফল্গু ব'হে যায়,
যাস্‌রে সেথায়,
খুঁড়িস্‌ বালুকা-রাশি অস্থি খণ্ড দিয়া
শােণিত উঠিবে উথলিয়া!
লয়ে সে শােণিত ধারা মিশায়ে ভস্মের স্তূপে
গড়িস ভস্মের ঘর,
গড়িস ভস্মের নর,
গড়িস্‌ খেলানা নানারূপে!
তাই নিয়ে ভাঙ্গিস গড়িস,
তাই নিয়ে খেলানা করিস,
অস্থি, আর ভস্ম, আর  হৃদয় শােণিত ধার,


তাই নিয়ে খেলানা গড়িস,
দুই ভায়ে সতত খেলিস!

দুঃখ, তুই আয় মাের কাছে!
তুই ছাড়া কে আমার আছে!
প্রমােদে হয়েছি আমি শ্রান্ত অতিশয়,
পারিনে হাসিতে আর কঙ্কালের হাসি,
মাংসহীন অস্থিদন্ত ময়!
শুধু হাসি, শুধু হাসি, আর কিছু নয়!

বেশ ছিনু, বেশ ছিনু আগে,
যৌবনের কুঞ্জবন  দহি দহি অনুক্ষণ
শুকায়ে আসিয়াছিল জ্বলন্ত নিদাঘে,
মাঝেতে বহিল কেন বসন্তের বায়
শুষ্ক কুঞ্জবনে?
রাশি রাশি শুষ্ক পাতা শুষ্ক শাখা যত
মাতি উঠি বসন্ত পবনে
ঝর ঝর ঝর ঝরে ভাঙ্গা কণ্ঠ স্বরে
উচ্ছাসিল প্রমােদের গান,
সহসা স্বপন টুটে'  প্রতিধ্বনি এল ছুটে
প্রাণের চৌদিক হতে, দেখিবারে, শুধাইতে


“শুষ্ক কুঞ্জ-বনান্তরে
কত—কত দিন পরে
কে এলরে কে এলরে কে ধরিল তান!”
পাতায় পাতায় মিলি
শাখায় শাখায় মিলি
ধরিয়াছে গান!
সে কি ভাল লাগে?
শুকান' পাতার স্বর শুকান’ শাখার গান
সে কি ভাল লাগে?
তাই এ হৃদয় ভিক্ষা মাগে
বরষা হওগাে উপনীত।
ঝর ঝর অবিরল  ঝরিয়া পড়ুক জল
শুনি ব’সে অশ্রুর সঙ্গীত।
আয় দুঃখ, হৃদয়ের ধন,
এই হেথা পেতেছি আসন!
প্রাণের মৰ্ম্মের কাছে
এখনাে যা’ রক্ত আছে
তাই তুই করিস্ শোষণ!