দুদিন।

আরম্ভিছে শীতকাল,  পড়িছে নীহার জাল,
শীর্ণ বৃক্ষ-শাখা যত ফুল পত্ৰ হীন;
মৃতপ্রায় পৃথিবীর মুখের উপরে
বিষাদে প্রকৃতি মাতা,  শুভ্র বাষ্পজালে গাঁথা
কুঝ্‌ঝটি-বসন খানি দেছেন টানিয়া;
পশ্চিমে গিয়েছে রবি, স্তব্ধ সন্ধ্যা বেলা।
বিদেশে আইনু শ্রান্ত পথিক একেলা!

রহিনু দুদিন।
এখনাে রয়েছে শীত  বিহঙ্গ গাহে না গীত,
এখনো ঝরিছে পাতা, পড়িছে তুহিন।
বসন্তের প্রাণ-ভরা চুম্বন পরশে


সৰ্ব্ব অঙ্গ শিহরিয়া  পুলকে আকুল হিয়া
মৃত-শয্যা হতে ধরা জাগেনি হরষে।
এক দিন, দুই দিন ফুরাইল শেষে,
আবার উঠিতে হল, চলিনু বিদেশে!

একখানা ভাঙ্গা লঘু মেঘের মতন
কত গিরি হতে গিরি  বেড়াতেছি ফিরি ফিরি,
যে দিকে লইয়া যায় অদৃষ্ট পবন।
আসিলাম একবার শুভ-দৈব বলে
ফুলে ফুলে ভরা এক শ্যামল অচলে।
রহিনু দুদিন-
সাঁঝের কিরণ পিয়া-নির্ঝরের জলে গিয়া
ইন্দ্ৰ ধনু নিরমিয়া খেলিলাম কত,
ডুবে গেনু জোছনায়, আঁধার পাখার গায়
বসালেম তারা শত শত।
ফুরালাে দুদিন-
সহসা আরেক দিকে বহিল পবন,
দুদিনের খেলাধূলা ফুরাল আমার,
আবার—আরেক দিকে চলিনু আবার।


এই যে ফিরানু মুখ, চলিনু পূরবে,
আর কিরে এ জীবনে ফিরে আসা হবে?
কত মুখ দেখিয়াছি দেখিব না আর।
ঘটনা ঘটিবে কত,  বরষ বরষ শত
জীবনের পর দিয়া হয়ে যাবে পার;
হয়ত বা একদিন অতি দূর দেশে,
আসিয়াছে সন্ধ্যা হয়ে  বাতাস যেতেছে বয়ে,
একেলা নদীর ধারে রহিয়াছি বসে,
হুহু করে উঠিবেক সহসা এ হিয়া,
সহসা এ মেঘাচ্ছন্ন স্মৃতি উজলিয়া
একটি অস্ফুট রেখা  সহসা দিবে রে দেখা
একটি মুখের ছবি উঠিবে জাগিয়া,
একটি গানের ছত্র পড়িবেক মনে,
দুয়েক্‌টি সুর তার উদিবে স্মরণে,
অবশেষে একেবারে সহসা সবলে
বিস্মৃতির বাঁধ গুলি  ভাঙ্গিয়া চূর্ণিয়া ফেলি
সে দিনের কথাগুলি বন্যার মতন
একেবারে বিপ্লাবিয়া ফেলিবে এ মন।

পাষাণ মানব মনে সহিবে সকলি।


ভুলিব, যতই যাবে বর্ষ বর্ষ চলি-
কিন্তু আহা, দুদিনের তরে হেথা এনু,
একটি কোমল প্রাণ ভেঙ্গে রেখে গেনু।
তার সেই মুখ খানি-কাঁদো কাঁদো মুখ,
এলানো কুন্তল জালে ছাইয়াছে বুক,
বাষ্পময় আঁখি দুটি  অনিমিখ আছে ফুটি
আমারি মুখের পানে; অঞ্চল লুটিছে,-
থেকে থেকে উচ্ছসিয়া কাঁদিয়া উঠিছে,
সেই সে মুখানি,-আহা করুণ মুখানি,-
সুকুমার কুসুমটি—জীবন আমার-
বুক চিরে হৃদয়ের হৃদয় মাঝার
শত বর্ষ রাখি যদি দিবস রজনী
মেটে না মেটে না তবু তিয়াষ আমার;-
শত ফুল দলে গড়া সেই মুখ তার,
স্বপনেতে প্রতি নিশি  হৃদয়ে উদিবে আসি,
এলানাে আকুল কেশে, আকুল নয়নে।
সেই মুখ সঙ্গী মাের হইবে বিজনে-
নিশীথের অন্ধকার আকাশের পটে
নক্ষত্র তারার মাঝে উঠিবেক ফুটে
ধীরে ধীরে রেখা রেখা সেই মুখ তার,


নিঃশব্দে মুখের পানে চাহিয়া আমার।
চমকি উঠিব জাগি শুনি ঘুম ঘোরে,
“যাবে তবে? যাবে?” সেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে।
সাহারার অগ্নিশ্বাস  একটি পবনােচ্ছাস
বহিয়া গেলাম চলি মুহূর্তের তরে
স্নিগ্ধচ্ছায়া সুকুমার ফুল-বন পরে,-
কোমলা যুঁথীর এক পাপড়ি খসিল,
ম্রিয়মাণ বৃন্ত তার নােয়ায়ে পড়িল।
ফুরালো দুদিন-
শরতে যে শাখা হয়েছিল পত্রহীন
এ দুদিনে সে শাখা উঠেনি মুকুলিয়া!
অচল শিখর পরি  যে তুষার ছিল পড়ি
এ দুদিনে কণা তার যায়নি গলিয়া,
কিন্তু এ দুদিন মাঝে একটি পরাণে
কি বিপ্লব বাধিয়াছে কেহ নাহি জানে!
ক্ষুদ্র এ দুদিন তার শত বাহু দিয়া
চিরটি জীবন মাের রহিবে বেষ্টিয়া!
দুদিনের পদচিহ্ন চিরদিন তরে
অঙ্কিত রহিবে শত বরষের শিরে!