শিশির।

শিশির কাঁদিয়া শুধু বলে,
“কেন মাের হেন ক্ষুদ্র প্রাণ?
শিশুটির কল্পনার মত
জনমি অমনি অবসান?
ঘুম-ভাঙা উষা মেয়েটির
একটি সুখের অশ্রু হায়,
হাসি তার ফুরাতে ফুরাতে
এ অশ্রুটি শুকাইয়া যায়!
ফুলটির আঁখি ফুটাইয়া,
মলয়ের প্রাণ জুড়াইয়া,
কাননের শ্যামল কপােলে
অশ্রুময় হাসি বিকাশিয়া,-
প্রভাত না ছুটিতে ছুটিতে,
মালতী না ফুটিকে ফুটিতে,
এই হাসি-বিন্দুটির প্রাণ
কোথায় যে যায় মিলাইয়া!


বিশাল এ জগতের মাঝ,
আর কিছু নাই মাের কাজ?
প্রভাতের জগতের পানে
হেরি শুধু অবাক্ নয়ানে,
হাসিটি ফুটিয়া উঠে মুখে,
ডুবে যাই প্রভাতের সুখে,
দুই দণ্ড হাসিতে ভাসিয়া
হাসির কোলেতে ম’রে যাই।
আর কিছু- কিছু কায নাই?

টুকটুকে মুখখানি নিয়ে
গােলাপ হাসিছে মুচকিয়ে,
বকুল প্রাণের সুধা দিয়ে
বায়ুরে মাতাল করি তুলে;
প্রজাপতি ভাবিয়া না পায়
কাহারে তাহার প্রাণ চায়,
তুলিয়া অলস পাখা দুটি
ভ্রমিতেছে ফুল হতে ফুলে।
সেই হাসি-রাশির মাঝারে
আমি কেন থাকিতে না পাই?


যেমনি নয়ন মেলি, হায়,
সুখের নিমেষটির প্রায়,
অতৃপ্ত হাসিটি মুখে ল’য়ে
অমনি কেন গাে ম’রে যাই ?
শুয়ে শুয়ে অশােক পাতায়
মুমূর্ষ শিশির বলে “হায়!
কোন সুখ ফুরায়নি যার
তার কেন জীবন ফুরায়!”

“আমি কেন হইনি শিশির?
কহে কবি নিশ্বাস ফেলিয়া।
“প্রভাতেই যেতেম শুকায়ে
প্রভাতেই নয়ন মেলিয়া!
হে বিধাতা, শিশিরের মত
গড়েছ আমার এই প্রাণ,
শিশিরের মরণটি কেন
আমারে করনি তবে দান?
আমি, দেব, প্রভাতের কবি,
ভালবাসি প্রভাতের রবি,
ভালবাসি প্রভাতের ফুল,


ভালবাসি প্রভাতের বায়!
ওই দেখ, মধ্যাহ্ন আইল,
চারিদিকে ফুল শুকাইল,
জনমেছি যাহাদের সাথে
তাহারা সবাই চ’লে যায়!
হাসি হয়ে জনম লভিনু
অশ্রু হয়ে বেঁচে আছি হায়!
শিশিরে অমর করি যদি
গড়িতে বাসনা ছিল, বিধি,
অমর করনি কেন ফুল?
উষা কেন চ’লে যায় তবে?
উষায় যে লভিল জনম,
উষা গেলে সে কেন রহিবে?
যে দিকেই ফিরাই নয়ন,
দুঃখ শােক মরণ কেবল!
ওহে প্রভু, করুণা আগার,
এ শােকের জগত-মাঝার,
তুমি কি ফেলেছ মােরে, কবি,
তােমার একটি অশ্রু জল?
বহিতে পারি না সখা, আর,

মৃত্যুময় জীবন আমার,
তােমার সে তপন-কিরণে
এ শিশির মিলাইতে চায়।”
তাই কবি কহিল কাঁদিয়া
“শিশির হ’তেম যদি হায়!”