সন্ধেবেলায় বসে আছি দক্ষিণ দিকের চাতালে । সামনে কতকগুলো পুরোনো কালের প্রবীণ শিরীষগাছ আকাশের তারা আড়াল করে জোনাকির আলো দিয়ে যেন একশোটা চোখ টিপে ইশারা করছে ।

পুপেদি'কে বললেম , বুদ্ধি তোমার অত্যন্ত পেকে উঠছে , তাই মনে করছি আজ তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেব , একদিন তুমি ছেলেমানুষ ছিলে ।

দিদি হেসে উঠে বললে , ঐখানে তোমার জিত । তুমিও এক কালে ছেলেমানুষ ছিলে , সে কথা স্মরণ করিয়ে দেবার উপায় আমার হাতে নেই ।

আমি নিশ্বাস ফেলে বললুম , বোধ হয় আজকের দিনে কারও হাতেই নেই । আমিও শিশু ছিলুম , তার একমাত্র সাক্ষী আছে ঐ আকাশের তারা । আমার কথা ছেড়ে দাও , আমি তোমার একদিনকার ছেলেমানুষির কথা বলব । তোমার ভালো লাগবে কি না জানি নে , আমার মিষ্টি লাগবে ।

আচ্ছা , বলে যাও ।

বোধ হচ্ছে , ফাল্গুন মাস পড়েছে । তার আগেই ক'দিন ধরে রামায়ণের গল্প শুনেছিলে সেই চিক্‌‍চিকে - টাক - ওয়ালা কিশোরী চট্টোর কাছে । আমি সকাল বেলায় চা খেতে খবরের কাগজ পড়ছি , তুমি এতখানি চোখ করে এসে উপস্থিত । আমি বললেম , হয়েছে কী ।

হাঁপাতে হাঁপাতে বললে , আমাকে হরণ করে নিয়েছে ।

কী সর্বনাশ । কে এমন কাজ করলে ।

এ প্রশ্নের উত্তরটা তখনো, তোমার মাথায় তৈরি হয় নি । বলতে পারতে রাবণ , কিন্তু কথাটা সত্য হত না বলে তোমার সংকোচ ছিল । কেননা , আগের সন্ধেবেলাতেই রাবণ যুদ্ধে মারা গিয়েছে , তার একটা মুণ্ডুও বাকি ছিল না । উপায় না দেখে একটু থম্‌‍কে গিয়ে তুমি বললে , সে আমাকে বলতে বারণ করেছে ।

তবেই তো বিপদ বাধালে । তোমাকে এখন উদ্ধার করা যায় কী করে । কোন‍্ দিক দিয়ে নিয়ে গেল ।

সে একটা নতুন দেশ ।

খান্দেশ নয় তো ?

না ।

বুন্দেলখণ্ড নয় ?

না ।

কী রকমের দেশ ।

নদী আছে , পাহাড় আছে , বড়ো বড়ো গাছ আছে । খানিকটা আলো , খানিকটা অন্ধকার ।

সে তো অনেক দেশেই আছে । রাক্ষস গোছের কিছু দেখতে পেয়েছিলে ? জিব - বের - করা কাঁটাওয়ালা ?

হাঁ হাঁ , সে একবার জিব মেলেই কোথায় মিলিয়ে গেল ।

বড়ো তো ফাঁকি দিলে , নইলে ধরতুম তার ঝুঁটি । যাই হোক , একটা কিছুতে করে তো তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল। রথে ?

না ।

ঘোড়ায় ?

না ।

হাতিতে ?

ফস করে বলে ফেললে , খরগোশে । ঐ জন্তুটার কথা খুব মনে জাগছে ; জন্মদিনে পেয়েছিলে একজোড়া বাবার কাছ থেকে।

আমি বললেম , তবেই তো চোর কে তা জানা গেল ।

টিপিটিপি হেসে তুমি বললে , কে বলো তো ।

এ নিঃসন্দেহে চাঁদামামার কাজ ।

কী করে জানলে ।

তারও যে অনেক কালের বাতিক খরগোশ পোষা ।

কোথায় পেয়েছিল খরগোশ ।

তোমার বাবা দেয় নি ।

তবে কে দিয়েছিল ।

ও চুরি করেছিল ব্রহ্মার চিড়িয়াখানায় ঢুকে ।

ছিঃ ।

ছিঃই তো । তাই ওর গায়ে কলঙ্ক লেগেছে , দাগা দিয়েছেন ব্রহ্মা ।

বেশ হয়েছে ।

কিন্তু শিক্ষা হল কই । আবার তো তোমাকে চুরি করলে । বোধ হয় তোমার হাত দিয়ে ওর খরগোশকে ফুলকপির পাতা খাওয়াবে।

খুশি হলে শুনে । আমার বুদ্ধির পরখ করবার জন্যে বললে , আচ্ছা , বলো দেখি , খরগোশ কী করে আমাকে পিঠে করে নিলে।

নিশ্চয় তুমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলে ।

ঘুমলে কি মানুষ হাল্কা হয়ে যায় ।

হয় বৈকি । তুমি ঘুমিয়ে কখনো ওড় নি ?

হাঁ , উড়েছি তো ।

তবে আর শক্তটা কী । খরগোশ তো সহজ , ইচ্ছে করলে কোলা ব্যাঙের পিঠে চড়িয়ে তোমাকে মাঠময় ব্যাঙ - দৌড় করিয়ে বেড়াতে পারত।

ব্যাঙ । ছি ছি ছি ! শুনলেও গা কেমন করে ।

না , ভয় নেই — ব্যাঙের উৎপাত নেই চাঁদের দেশে । একটা কথা জিগেস করি , পথের ব্যাঙ্গমাদাদার সঙ্গে তোমার দেখা হয় নি কি।

হাঁ , হয়েছিল বই কি ।

কিরকম ।

ঝাউগাছের উপর থেকে নীচে এসে খাড়া হয়ে দাঁড়ালো । বললে , পুপেদিদিকে কে চুরি করে নিয়ে যায়। শুনে খরগোশ এমন দৌড় দৌড়ল যে ব্যাঙ্গমাদাদা পারল না তাকে ধরতে । — আচ্ছা , তার পরে ?

কার পরে ।

খরগোশ তো নিয়ে গেল , তার পরে কী হল বলো - না।

আমি কী বলব । তোমাকেই তো বলতে হবে ।

বাঃ , আমি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলুম , কেমন করে জানব ।

সেই তো মুশকিল হয়েছে । ঠিকানাই পাচ্ছি নে কোথায় তোমাকে নিয়ে গেল । উদ্ধার করতে যাই কোন্‌ রাস্তায় । একটা কথা জিগেস করি , যখন রাস্তা দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছিল , ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছিলে কি।

হাঁ হাঁ , পাচ্ছিলুম ঢঙ ঢঙ ঢঙ ।

তা হলে রাস্তাটা সোজা গেছে ঘণ্টাকর্ণদের পাড়া দিয়ে ।

ঘণ্টাকর্ণ ! তারা কিরকম ।

তাদের দুটো কান দুটো ঘণ্টা । আর , দুটো লেজে দুটো হাতুড়ি । লেজের ঝাপটা দিয়ে একবার এ কানে বাজায় ঢঙ , একবার ও কানে বাজায় ঢঙ। দু জাতের ঘণ্টাকর্ণ আছে , একটা আছে হিংস্র , কাঁসরের মতো খন্‌খন্‌ আওয়াজ দেয় ; আর একটার গম‍্গম‍্ গম্ভীর শব্দ ।

তুমি কখনো তার শব্দ শুনতে পাও , দাদামশায় ?

পাই বৈকি । এই কাল রাত্তিরেই বই পড়তে পড়তে হঠাৎ শুনলেম ঘণ্টাকর্ণ চলেছেন ঘোর অন্ধকারের ভিতর দিয়ে। বারোটা বাজালেন যখন তখন আর থাকতে পারলুম না। তাড়াতাড়ি বই ফেলে দিয়ে চমকে উঠে দৌড় দিলুম বিছানায় , বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে চোখ বুজে রইলুম পড়ে।

খরগোশের সঙ্গে ঘণ্টাকর্ণের ভাব আছে ?

খুব ভাব । খরগোশটা তারই আওয়াজের দিকে কান পেতে চলতে থাকে সপ্তর্ষিপাড়ার ছায়াপথ দিয়ে।

তার পরে ?

তার পরে যখন একটা বাজে , দুটো বাজে , তিনটে বাজে , চারটে বাজে , পাঁচটা বাজে , তখন রাস্তা শেষ হয়ে যায়।

তার পরে ?

তার পরে পৌঁছয় তন্দ্রা - তেপান্তরের ও পারে আলোর দেশে । আর দেখা যায় না।

আমি কি পৌঁচেছি সেই দেশে ।

নিশ্চয় পৌঁচেছ ।

এখন তা হলে আমি খরগোশের পিঠে নেই ?

থাকলে যে তার পিঠ ভেঙে যেত ।

ওঃ , ভুলে গেছি , এখন যে আমি ভারী হয়েছি । তার পরে ?

তার পরে তোমাকে উদ্ধার করা চাই তো ।

নিশ্চয় চাই । কেমন করে করবে ।

সেই কথাটাই তো ভাবছি । রাজপুত্তুরের শরণ নিতে হল দেখছি ।

কোথায় পাবে ।

ঐ - যে তোমাদের সুকুমার ।

শুনে এক মুহূর্তে তোমার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল । একটু কঠিন সুরেই বললে , তুমি তাকে খুব ভালোবাস । তোমার কাছে সে পড়া বলে নিতে আসে । তাই তো সে আমাকে অঙ্কে এগিয়ে যায়।

এগিয়ে যাবার অন্য স্বাভাবিক কারণও আছে । সে কথাটার আলোচনা করলুম না । বললুম , তা , তাকে ভালোবাসি আর না বাসি , সেই আছে এক রাজপুত্তুর।

কেমন করে জানলে ।

আমার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তবে সে ঐ পদটা পাকা করে নিয়েছে ।

তুমি বেশ একটু ভুরু কুঁচকে বললে , তোমারই সঙ্গে ওর যত বোঝাপড়া !

কী করি বলো , কোনোমতে ও মানতে চায় না — ওর চেয়ে আমি বয়সে খুব বেশি বড়ো ।

ওকে তুমি বল রাজপুত্তুর ! ওকে আমি জটায়ুপাখি বলেও মনে করি নে । ভারি তো !

একটু শান্ত হও , এখন ঘোর বিপদে পড়া গেছে ! তুমি কোথায় তার তো ঠিকানাই নেই । তা এবারকার মতো কাজ উদ্ধার করে দিক , আমরা নিশ্বেস ফেলে বাঁচি। এর পরে ওকে সেতুবন্ধনের কাঠবিড়ালি বানিয়ে দেব।

উদ্ধার করতে ও রাজি হবে কেন । ওর একজামিনের পড়া আছে ।

রাজি হবার বারো - আনা আশা আছে । এই পরশু শনিবারে ওদের ওখানে গিয়েছিলুম । বেলা তিনটে । সেই রোদ্‌দুরে মাকে ফাঁকি দিয়ে ও দেখি ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির ছাদে । আমি বললুম , ব্যাপার কী ।

ঝাঁকানি দিয়ে মাথাটা উপরে তুলে বললে , আমি রাজপুত্তুর।

তলোয়ার কোথায় ।

দেয়ালির রাত্রে ওদের ছাদে আধপোড়া তুবড়িবাজির একটা কাঠি পড়েছিল , কোমরে সেইটেকে ফিতে দিয়ে বেঁধেছে ! আমাকে দেখিয়ে দিলে।

আমি বললুম , তলোয়ার বটে । কিন্তু , ঘোড়া চাই তো ?

বললে , আস্তাবলে আছে ।

বলে ছাদের কোণ থেকে ওর জ্যাঠামশায়ের বহুকেলে বেহায়া একটা ছেঁড়া ছাতা টেনে নিয়ে এল । দুই পায়ের মধ্যে তাকে চেপে ধরে হ্যাট্‌হ্যাট্‌ আওয়াজ করতে করতে ছাদময় একবার দৌড় করিয়ে আনলে । আমি বললুম , ঘোড়া বটে !

এর পক্ষীরাজের চেহারা দেখতে চাও ?

চাই বৈকি ।

ছাতাটা ফস্‌ করে খুলে দিলে । ছাতার পেটের মধ্যে ঘোড়ার খাবার দানা ছিল , সেগুলো ছড়িয়ে পড়ল ছাদে ।

আমি বললুম , আশ্চর্য ! কী আশ্চর্য ! এ জন্মে পক্ষীরাজ দেখব , কোনোদিন এমন আশাই করি নি ।

এইবার আমি উড়ছি , দাদা । চোখ বুজে থাকো , তা হলে বুঝতে পারবে , আমি ঐ মেঘের কাছে গিয়ে ঠেকেছি । একেবারে অন্ধকার !

চোখ বোজবার দরকার করে না আমার । স্পষ্টই জানতে পারছি , তুমি খুব উড়ছ , পক্ষীরাজের ডানা মেঘের মধ্যে হারিয়ে গেছে।

আচ্ছা , দাদামশায় , আমার ঘোড়াটার একটা নাম দিয়ে দাও তো ।

আমি বললুম , ছত্রপতি ।

নামটা পছন্দ হল । রাজপুত্তুর ছাতার পিঠ চাপ্‌ড়িয়ে বললে , ছত্রপতি !

নিজেই ঘোড়ার হয়ে তার জবাব দিলে , আজ্ঞে !

আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে , তুমি ভাবছ , আমি বললুম । আজ্ঞে , তা নয় , ঘোড়া বললে।

সে কথাও কি আমাকে বলতে হবে । আমি কি এত কালা।

রাজপুত্তুর বললে , ছত্রপতি , আর ভালো লাগছে না চুপচাপ পড়ে থাকতে।

তারই মুখ থেকে উত্তর পাওয়া গেল , কী হুকুম বলো ।

তেপান্তরের মাঠ পেরোনো চাই ।

রাজি আছি ।

আমি তো আর থাকতে পারি নে , কাজ আছে ; রসে ভঙ্গ দিয়ে বলতে হল , রাজপুত্তুর , কিন্তু তোমার মাস্টার যে বসে আছে । দেখে এলুম , তার মেজাজটা চটা ।

শুনে রাজপুত্রের মনটা ছট্‌ফট্‌ করে উঠল । ছাতাটাকে থাব্‌ড়া মেরে বললে , এখ্‌খনি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পার না কি।

বেচারা ঘোড়ার হয়ে আমাকেই বলতে হল , রাত্তির না হলে ও তো উড়তে পারে না । দিনের বেলায় ও ন্যাকামি করে ছাতা সাজে ; তুমি ঘুমোলেই ও ডানা মেলবে । এখনকার মতো পড়তে যাও , নইলে বিপদ বাধবে।

সুকুমার মাস্টারের কাছে পড়তে গেল । যাবার সময় আমাকে বললে , কিন্তু সব কথা এখনো শেষ হয় নি।

আমি বললুম , কথা কি কখনোই শেষ হতে পারে । শেষ হলে মজা কিসের ।

পাঁচটায় সময় পড়া শেষ হয়ে যাবে । দাদু , তখন তুমি এসো ।

আমি বললুম , থর্ড্‌ নম্বর রীডরের পরে মুখ বদলাবার জন্যে পয়লা নম্বরের গল্প চাই । নিশ্চয় আসব।