পরদিন সকালবেলায় প্রাতরাশে আমার নির্দেশমত পুপেদিদি নিয়ে এল পাথরের পাত্রে ছোলাভিজে এবং গুড় । বর্তমান যুগে পুরাকালীন গৌড়ীয় খাদ্যবিধির রেনেসাঁস - প্রবর্তনে লেগেছি। দিদিমণি জিগেস করলে , চা হবে কি ।

আমি বললুম , না , খেজুর - রস ।

দিদি বললে , আজ তোমার মুখখানা অমন দেখছি কেন । কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছ না কি।

আমি বললুম , স্বপ্নের ছায়া তো মনের উপর দিয়ে যাওয়া - আসা করছেই — স্বপ্নও মিলিয়ে যায় , ছায়ারও চিহ্ন থাকে না । আজ তোমার ছেলেমানুষির একটা কথা বারবার মনে পড়ছে , ইচ্ছে করছে বলি ।

বলো - না ।

সেদিন লেখা বন্ধ করে বারান্দায় বসে ছিলুম । তুমি ছিলে , সুকুমারও ছিল । সন্ধে হয়ে এল , রাস্তার বাতি জ্বালিয়ে গেল , আমি বসে বসে সত্যযুগের কথা বানিয়ে বানিয়ে বলছিলুম।

বানিয়ে বলছিলে ! তার মানে ওটাকে অসত্যযুগ করে তুলছিলে।

ওকে অসত্য বলে না । যে রশ্মি বেগ্‌‍নির সীমা পেরিয়ে গেছে তাকে দেখা যায় না বলেই সে মিথ্যে নয় , সেও আলো । ইতিহাসের সেই বেগ্‌নি পেরোনো আলোতেই মানুষের সত্যযুগের সৃষ্টি । তাকে প্রাগৈতিহাসিক বলব না , সে আলট্রা - ঐতিহাসিক।

আর তোমার ব্যাখ্যা করতে হবে না । কী বলছিলে বলো ।

আমি তোমাদের বলছিলুম , সত্যযুগে মানুষ বই পড়ে শিখত না , খবর শুনে জানত না , তাদের জানা ছিল হয়ে - উঠে জানা।

কী মানে হল বুঝতে পারছি নে ।

একটু মন দিয়ে শোনো বলি । বোধ হয় তোমার বিশ্বাস তুমি আমাকে জান ?

দৃঢ় বিশ্বাস ।

জান কিন্তু সে জানায় সাড়ে - পনেরো আনাই বাদ পড়ে গেছে । ইচ্ছে করলেই তুমি যদি ভিতরে ভিতরে আমি হয়ে যেতে পারতে তা হলেই তোমার জানাটা সম্পূর্ণ সত্য হত ।

তা হলে তুমি বলতে চাও আমরা কিছুই জানি নে ?

জানিই নে তো । সবাই মিলে ধরে নিয়েছি যে জানি , সেই আপোসে ধরে নেওয়ার উপরেই আমাদের কারবার ।

কারবার তো ভালোই চলছে ।

চলছে , কিন্তু এ সত্যযুগের চলা নয় । সেই কথাই তোমাদের বলছিলুম — সত্যযুগে মানুষ দেখার জানা জানত না , ছোঁওয়ার জানা জানত না , জানত একেবারে হওয়ার জানা ।

মেয়েদের মন প্রত্যক্ষকে আঁকড়ে থাকে ; ভেবেছিলেম আমার কথাটা অত্যন্ত অবাস্তব ঠেকবে পুপুর কাছে , ভালোই লাগবে না । দেখলুম একটু ঔৎসুক্য হয়েছে । বললে , বেশ মজা ।

একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেই বললে , আচ্ছা , দাদামশায় , আজকাল তো সায়ান্সে অনেক বুজ্‌রুগি করছে ; মরা মানুষের গান শোনাচ্ছে , দূরের মানুষের চেহারা দেখাচ্ছে , আবার শুনছি সীসেকে সোনা করছে — তেমনি একদিন হয়তো এমন একটা বিদ্যুতের খেলা খেলাবে যে ইচ্ছে করলে একজন আর-একজনের মধ্যে মিলে যেতে পারবে ।

অসম্ভব নয় । কিন্তু , তুমি তা হলে কী করবে । কিছুই লুকোতে পারবে না ।

সর্বনাশ ! সব মানুষেরই যে লুকোবার আছে অনেক ।

লুকোনো আছে বলেই লুকোবার আছে । যদি কারও কিছুই লুকোনো না থাকত তা হলে দেখা - বিন্‌‍তি খেলার মতো সবার সব জেনেই লোকব্যবহার হত ।

কিন্তু , লজ্জার কথা যে অনেক আছে ।

লজ্জার কথা সকলেরই প্রকাশ হলে লজ্জার ধার চলে যেত ।

আচ্ছা , আমার কথা কী বলতে যাচ্ছিলে তুমি ।

সেদিন আমি তোমাকে জিগেস করছিলুম , তুমি যদি সত্যযুগে জন্মাতে তবে আপনাকে কী হয়ে দেখতে তোমার ইচ্ছে হত । তুমি ফস্‌ করে বলে ফেললে , কাবুলি বেড়াল ।

পুপে মস্ত ক্ষাপা হয়ে বলে উঠল , কখ্‌খনো না । তুমি বানিয়ে বলছ ।

আমার সত্যযুগটা আমার বানানো হতে পারে কিন্তু তোমার মুখের কথাটা তোমারই । ওটা ফস্‌ করে আমি - হেন বাচালও বানাতে পারতুম না ।

এর থেকে তুমি কি মনে করেছিলে আমি খুব বোকা ।

এই মনে করেছিলুম যে , কাবুলি বেড়ালের উপর অত্যন্ত লোভ করেছিলে অথচ কাবুলি বেড়াল পাবার পথ তোমার ছিল না , তোমার বাবা বেড়াল জন্তুটাকে দেখতে পারতেন না । আমার মতে সত্যযুগে বেড়াল কিনতেও হত না , পেতেও হত না , ইচ্ছে করলেই বেড়াল হতে পারা যেত ।

মানষ ছিলুম , বেড়াল হলুম — এত কী সুবিধেটা হল । তার চেয়ে যে বেড়াল কেনাও ভালো , না কিনতে পারলে না পাওয়া ভালো ।

ঐ দেখো , সত্যযুগের মহিমাটা মনে ধারণা করতে পারছ না । সত্যযুগের পুপে আপনার সীমানা বাড়িয়ে দিত বেড়ালের মধ্যে । সীমানা লোপ করত না । তুমি তুমিও থাকতে , বেড়ালও হতে । তোমার এ - সব কথার কোনো মানে নেই ।

সত্যযুগের ভাষায় মানে আছে । সেদিন তো তোমাদের অধ্যাপক প্রমথবাবুর কাছে শুনেছিলে , আলোকের অণুপরমাণু বৃষ্টির মতো কণাবর্ষণও বটে আবার নদীর মতো তরঙ্গধারাও বটে । আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে বুঝি , হয় এটা নয় ওটা ; কিন্তু বিজ্ঞানের বুদ্ধিতে একই কালে দুটোকেই মেনে নেয় । তেমনি একই কালে তুমি পুপুও বটে , বেড়ালও বটে — এটা সত্যযুগের কথা ।

দাদামশায় , যতই তোমার বয়স এগিয়ে চলছে ততই তোমার কথাগুলো অবোধ্য হয়ে উঠছে , তোমার কবিতারই মতো ।

অবশেষে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যাব তারই পূর্বলক্ষণ ।

সেদিনকার কথাটা কি ঐ কাবুলি বেড়ালের পরে আর এগোল না ।

এগিয়েছিল । সুকুমার এক কোণে বসে ছিল , সে স্বপ্নে কথা বলার মতো বলে উঠল , আমার ইচ্ছে করে শালগাছ হয়ে দেখতে ।

সুকুমারকে উপহসিত করবার সুযোগ পেলে তুমি খুশি হতে । ও শালগাছ হতে চায় শুনে তুমি তো হেসে অস্থির । ও চমকে উঠল লজ্জায় । কাজেই ও বেচারির পক্ষ নিয়ে আমি বললেম — দক্ষিণের হাওয়া দিল কোথা থেকে , গাছটার ডাল ছেয়ে গেল ফুলে , ওর মজ্জার ভিতর দিয়ে কী মায়ামন্ত্রের অদৃশ্য প্রবাহ বয়ে যায় যাতে ঐ রূপের গন্ধের ভোজবাজি চলতে থাকে । ভিতরের থেকে সেই আবেগটা জানতে ইচ্ছা করে বৈকি ! গাছ না হতে পারলে বসন্তে গাছের সেই অপরিমিত রোমাঞ্চ অনুভব করব কী করে ।

আমার কথা শুনে সুকুমার উৎসাহিত হয়ে উঠল ; বললে , আমার শোবার ঘরের জানলা থেকে যে শালগাছটা দেখা যায় , বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার মাথাটা আমি দেখতে পাই ; মনে হয় , ও স্বপ্ন দেখছে ।

শালগাছ স্বপ্ন দেখছে শুনে বোধ হয় বলতে যাচ্ছিলে , কী বোকার মতো কথা । বাধা দিয়ে বলে উঠলুম , শালগাছের সমস্ত জীবনটাই স্বপ্ন । ও স্বপ্নে চলে এসেছে বীজের থেকে অঙ্কুরে , অঙ্কুর থেকে গাছে । পাতাগুলোই তো ওর স্বপ্নে - কওয়া কথা ।

সুকুমারকে বললুম , সেদিন যখন সকালবেলায় ঘন মেঘ করে বৃষ্টি হচ্ছিল আমি দেখলুম , তুমি উত্তরের বারান্দায় রেলিঙ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলে । কী ভাবছিলে বলো দেখি ।

সুকুমার বললে , জানি নে তো কী ভাবছিলুম ।

আমি বললুম , সেই না - জানা ভাবনায় ভ'রে গিয়েছিল তোমার সমস্ত মন মেঘেভরা আকাশের মতো । সেইরকম গাছগুলো যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে , ওদের মধ্যে যেন একটা না - জানা ভাব আছে । সেই ভাবনাই বর্ষার মেঘের ছায়ায় নিবিড় হয় , শীতের সকালের রৌদ্রে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে । সেই না - জানা ভাবনার ভাষায় কচি পাতায় ওদের ডালে ডালে বকুনি জাগে , গান ওঠে ফুলের মঞ্জুরিতে ।

আজও মনে পড়ে সুকুমারের চোখ দুটো কিরকম এতখানি হয়ে উঠল । সে বললে , আমি যদি গাছ হতে পারতুম তা হলে সেই বকুনি সির‌্সির্ করে আমার সমস্ত গা বেয়ে উঠত আকাশের মেঘের দিকে ।

তুমি দেখলে সুকুমার আসরটা দখল করে নিচ্ছে । ওকে নেপথ্যে সরিয়ে তুমি এলে সামনে । কথা পাড়লে , আচ্ছা , দাদামশায় , এখন যদি সত্যযুগ আসে তুমি কী হতে চাও ।

তোমার বিশ্বাস ছিল , আমি ম্যাস্‌টোডন কিম্বা মেগাথেরিয়ম হতে চাইব — কেননা , জীব - ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়ের প্রাণীদের সম্বন্ধে তোমার সঙ্গে এর কিছুদিন আগেই আলোচনা করেছি । তখন তরুণ পৃথিবীর হাড় ছিল কাঁচা , পাকা রকম করে জমাট হয়ে ওঠে নি তার মহাদেশ , গাছপালাগুলোর চেহারা ছিল বিশ্বকর্তার প্রথম তুলির টানের । সেইদিনকার আদিম অরণ্যে সেইদিনকার অনিশ্চিত শীতগ্রীষ্মের অধিকারে এই - সব ভীমকায় জন্তুগুলোর জীবযাত্রা চলছে কিরকম করে তা স্পষ্টরূপে কল্পনা করতে পারছে না আজকের দিনের মানুষ , এই কথাটা তোমার শোনা ছিল আমার মুখে । পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম অভিযানের সেই মহাকাব্য - যুগটাকে স্পষ্ট করে জানবার ব্যাকুলতা তুমি আমার কথা থেকে বুঝতে পেরেছিলে । তাই আমি যদি হঠাত বলে উঠতুম ‘সেকালের রোঁয়াওয়ালা চার - দাঁত - ওয়ালা হাতি হওয়া আমার ইচ্ছে' তা হলে তুমি খুশি হতে । তোমার কাবুলি বেড়াল হওয়ার থেকে এই ইচ্ছে বেশি দূরে পড়ত না , আমাকে তোমার দলে পেতে । হয়তো আমার মুখে ঐ ইচ্ছেটাই ব্যক্ত হত । কিন্তু , সুকুমারের কথাটা আমার মনকে টেনে নিয়েছিল অন্য দিকে ।

পুপে বলে উঠল , জানি , জানি , সুকুমারদার সঙ্গেই তোমার মনের মিল ছিল বেশি ।

আমি বললুম , তার একমাত্র কারণ , ও ছিল ছেলে , আমিও ছেলে হয়েই জন্মেছিলুম একদিন । ওর ভাবনার ছাঁচ ছিল আমারই শিশু ভাবনার ছাঁচে । তুমি সেদিন তোমার খেলার হাঁড়িকুঁড়ি নিয়ে ভাবী গৃহস্থালির যে স্বপ্নলোক বানিয়ে তুলে খুশি হতে সেটা দেখতে পেতুম একটু তফাত থেকে । তুমি তোমার খেলার খোকাকে কোলে করে যখন নাচাতে , তার স্নেহের রসটা ষোলো - আনা পাবার সাধ্য আমার ছিল না ।

পুপু বললে , আচ্ছা , সে কথা থাক্‌ , সেদিন তুমি কী হতে ইচ্ছে করেছিলে বলো ।

আমি হতে চেয়েছিলুম একখানা দৃশ্য অনেকখানি জায়গা জুড়ে । সকালবেলার প্রথম প্রহর , মাঘের শেষে হাওয়া হয়েছে উতলা , পুরোনো অশথগাছটা চঞ্চল হয়ে উঠেছে ছেলেমানুষের মতো , নদীর জলে উঠেছে কলরব , উঁচুনিচু ডাঙায় ঝাপ্‌সা দেখাচ্ছে দলবাঁধা গাছ । সমস্তটার পিছনে খোলা আকাশ ; সেই আকাশে একটা সুদূরতা , মনে হচ্ছে যেন অনেক দূরের ও - পার থেকে একটা ঘণ্টার ধ্বনি ক্ষীণতম হয়ে গেছে বাতাসে , যেন রোদ‍্দুরে মিশিয়ে দিয়েছে তার কথাটাকে : বেলা যায়।

তোমার মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল , একখানা গাছ হওয়ার চেয়ে নদী বন আকাশ নিয়ে একখানা সমগ্র ভূদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কল্পনা তোমার কাছে অনেক বেশি সৃষ্টিছাড়া বোধ হল।

সুকুমার বললে , গাছপালা নদী সবটার উপরে তুমি ছড়িয়ে মিলিয়ে গেছ মনে করতে আমার ভারি মজা লাগছে । আচ্ছা , সত্যযুগ কি কোনোদিন আসবে ।

যতদিন না আসে ততদিন ছবি আছে , কবিতা আছে । আপনাকে ভুলে গিয়ে আর - কিছু হয়ে যাবার ঐ একটা বড়ো রাস্তা ।

সুকুমার বললে , তুমি যেটা বললে ওটা কি ছবিতে এঁকেছ।

হাঁ , এঁকেছি ।

আমিও একটা আঁকব ।

সুকুমারের স্পর্দ্ধার কথা শুনে তুমি বলে উঠলে , পারবে না কি তুমি আঁকতে।

আমি বললুম , ঠিক পারবে । আঁকা হয়ে গেলে ভাই , তোমারটা আমি নেব , আমারটা তোমাকে দেব।

সেদিন এই পর্যন্ত হল আমাদের আলাপ।

এইবার আমাদের সেদিনকার আসরের শেষ কথাটা বলে নিই । তুমি চলে গেলে তোমার পায়রাকে ধান খাওয়াতে। সুকুমার তখনো বসে বসে কী ভাবতে লাগল। আমি তাকে বললুম , তুমি কী ভাবছ বলব ?

সুকুমার বললে , বলো দেখি।

তুমি ভেবে দেখছ, আরো কী হয়ে যেতে পারলে ভালো হয় — হয়তো প্রথম - মেঘকরা আষাঢ়ের বৃষ্টি - ভেজা আকাশ, হয়তো পুজোর ছুটিতে ঘরমুখো পাল - তোলা পান্সিনৌকোখানি। এই উপলক্ষে আমি তোমাকে আমার জীবনের একটা কথা বলি। তুমি জান ধীরুকে আমি কত ভালোবাসতুম। হঠাৎ টেলিগ্রামে খবর পেলুম তার টাইফয়েড, সেই বিকেলেই চলে গেলুম মুন্সিগঞ্জে তাদের বাড়িতে। সাত দিন , সাত রাত কাটল। সেদিন ছিল অত্যন্ত গরম, রৌদ্র প্রখর। দূরে একটা কুকুর করুণ সুরে আর্তনাদ করে উঠছি ; শুনে মন খারাপ হয়ে যায়। বিকেলে রোদ পড়ে আসছে, পশ্চিম দিক থেকে ডুমুরগাছের ছায়া পড়েছে বারান্দার উপরে । পাড়ার গয়লানি এসে জিগেস করলে , তোমাদের খোকাবাবু কেমন আছে গা । আমি বললুম , মাথার কষ্ট , গা - জ্বালা আজ কমেছে। যারা সেবা করছিল তারা আজ কেউ কেউ ছুটি নেবার অবকাশ পেলে। দুজন ডাক্তার রুগি দেখে বেরিয়ে এসে ফিস্‌ ফিস্‌ করে কী পরামর্শ করলে ; বুঝলেম , আশার লক্ষণ নয়। চুপ করে বসে রইলুম ; মনে হল, কী হবে শুনে। সায়াহ্নের ছায়া ঘনিয়ে এল। দেখা গেল সামনের মহানিমগাছের মাথার উপরে সন্ধ্যাতারা দেখা দিয়েছে। দূরের রাস্তায় পাট - বোঝাই গোরুর গাড়ির শব্দ আর শোনা যায় না। সমস্ত আকাশটা যেন ঝিম্‌‍ঝিম্ করছে। কী জানি কেন মনে মনে বলছি, পশ্চিম - আকাশ থেকে ঐ আসছে রাত্রিরূপিণী শান্তি , স্নিগ্ধ , কালো স্তব্ধ। প্রতিদিনই তো আসে কিন্তু আজ এল বিশেষ একটি মূর্তি নিয়ে, স্পর্শ নিয়ে। চোখ বুজে সেই ধীরে - চলে - আসা রাত্রির আবির্ভাব আমার সমস্ত অঙ্গকে মনকে যেন আবৃত করে দিলে। মনে মনে বললুম , ওগো শান্তি , ওগো রাত্রি, তুমি আমার দিদি, আমার অনাদি কালের দিদি। দিন - অবসানের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে টেনে নাও তোমার বুকের কাছে আমার ধীরুভাইকে ; তার সকল জ্বালা যাক জুড়িয়ে একেবারে — দুই পহর পেরিয়ে গেল; একটা কান্নার ধ্বনি উঠল রোগীর শিয়রের কাছ থেকে; নিস্তব্ধ রাস্তা বেয়ে গেল চলে ডাক্তারের গাড়ি তার ঘরে ফিরে। সেদিন আমার সমস্ত - মন - ভরা একটি রাত্রির রূপ দেখেছি; আমি তাতে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলু , পৃথিবী যেমন তার স্বাতন্ত্র্য মিলিয়ে দেয় নিশীথের ধ্যানাবরণে।

কী জানি সুকুমারের কী মনে হল ; সে অধীর হয়ে বলে উঠল, আমাকে কিন্তু তোমার ঐ দিদি অন্ধকারের ভিতর দিয়ে অমন চুপিচুপি নিয়ে যাবে না । পুজোর ছুটির দিনে যেদিন সকালে দশটা বাজবে , কাউকে ইস্কুলে যেতে হবে না , ছেলেরা সবাই যেদিন গেছে রথতলার মাঠে ব্যাট্‌বল খেলতে , সেইদিন আমি খেলার মতো করেই হঠাৎ মিলিয়ে যাব আকাশে ছুটির দিনের রোদ্‌দুরে।

শুনে আমি চুপ করে রইলুম ; কিছু বললুম না।

পুপেদিদি বললে , কাল থেকে সুকুমারদার কথা তুমি প্রায়ই বলছ । তার মধ্যে আমার উপরে একটুখানি খোঁচা থাকে । তুমি কি মনে কর তোমার ভালোবাসার অংশ নিয়ে সুকুমারদার সঙ্গে আমার ছেলেবেলাকার যে ঝগড়া ছিল সেটা এখনও আছে।

হয়তো একটুখানি আছে বা । সেইটেকে একেবারে ক্ষইয়ে দেব বলেই বারবার তার কথা তুলি । আরো একটুখানি কারণ আছে।

কী কারণ বলোই - না ।

কিছুদিন আগে সুকুমারের বাবা ডাক্তার নিতাই এসেছিলেন আমার কাছে বিদায় নিতে।

কেন , বিদায় নিতে কেন ।

তোমাকে বলব মনে করেছিলুম , বলা হয় নি । আজ বলি । নিতাই চাইলে সুকুমার আইন পড়ে , সুকুমার চাইলে সে ছবি আঁকা শেখে নন্দলালবাবুর কাছে । নিতাই বললে , ছবি আঁকা বিদ্যেয় আঙুল চলে , পেট চলে না ।

সুকুমার বললে , আমার ছবির খিদে যত পেটের খিদে তত বেশি নয় ।

নিতাই কিছু কড়া করে বললে , সে কথাটা তোমার প্রমাণ করে দেবার দরকার হয় নি , পেট সহজেই চলে যাচ্ছে ।

কথাটা বিশ্রী লাগল তার মনে , কিন্তু হেসে বললে , কথাটা সত্যি — এর প্রমাণ দেওয়া উচিত ।

বাবা ভাবলে , এইবার ছেলে আইন পড়তে বসবে । সুকুমারের বরিশালের মাতামহ খেপা গোছের মানুষ ; সুকুমারের স্বভাবটা তাঁরই ছাঁচের , চেহারারও সাদৃশ্য আছে । দুজনের 'পরে দুজনের ভালোবাসা পরম বন্ধুর মতো । পরামর্শ হল দুজনে মিলে ; সুকুমার টাকা পেল কিছু , কখন চলে গেল বিলেতে কেউ জানে না । বাবাকে চিঠি লিখে গেল , আপনি চান না আমি ছবি আঁকা শিখি , শিখব না । আপনি চান অর্থকরী বিদ্যা আয়ত্ত করব , তাই করতে চললুম । যখন সমাপ্ত হবে প্রমাণ করতে আসব , আশীর্বাদ করবেন ।

কোন্‌ বিদ্যে শিখতে গেল কাউকে বলে নি । একটা ডায়ারি পাওয়া গেল তার ডেস্কে । তার থেকে বোঝা গেল , সে য়ুরোপে গেছে উড়ো জাহাজের মাঝিগিরি শিখতে । তার শেষ দিকটা কপি করে এনেছি । ও লিখছে —

মনে আছে , একদিন আমার ছত্রপতি পক্ষীরাজে চড়ে পুপুদিদিকে চন্দ্রলোক থেকে উদ্ধার করতে যাত্রা করেছিলুম আমাদের ছাদের এক ধার থেকে আর - এক ধারে । এবার চলেছি কলের পক্ষীরাজকে বাগ মানাতে । য়ুরোপে চন্দ্রলোকে যাবার আয়োজন চলেছে । যদি সুবিধা পাই যাত্রীর দলে আমিও নাম লেখাব । আপাতত পৃথিবীর আকাশ - প্রদক্ষিণে হাত পাকিয়ে নিতে চাই । একদিন আমি তার দাদামশায়ের দেখাদেখি যে ছবি এঁকেছিলুম , দেখে পুপুদিদি হেসেছিল । সেইদিন থেকে দশ বছর ধরে ছবি আঁকা অভ্যাস করেছি , কাউকে দেখাই নি । এখনকার আঁকা দুখানা ছবি রেখে গেলুম পুপের দাদামশায়ের জন্যে । একটা ছবি জল - স্থল - আকাশের একতান সংগত নিয়ে , আর - একটা আমার বরিশালের দাদামশায়ের । পুপের দাদামশায় ছবি দুটো দেখিয়ে পুপেদিদির সেদিনকার হাসি যদি ফিরিয়ে নিতে পারেন তো ভালোই , নইলে যেন ছিঁড়ে ফেলেন । আমার এবারকার যাত্রায় চন্দ্রলোকের মাঝপথেই পক্ষীরাজের পাখা ভাঙা অসম্ভব নয় । যদি ভাঙে তবে এক নিমেষে সত্যলোকে পৌঁছব , সূর্য - প্রদক্ষিণের পথে একেবারে মিলে যাব পৃথিবীর সঙ্গে । যদি বেঁচে থাকি আকাশের খেয়া - পারাপারে যদি নৈপুণ্য ঘটে , তা হলে একদিন পুপুদিদিকে নিয়ে শূন্যপথে পাড়ি দিয়ে আসব , মনে এই ইচ্ছে রইল । সত্যযুগে বোধ হয় ইচ্ছে আর ঘটনা একই ছিল । চেষ্টা করব ধ্যানযোগে ইচ্ছেকেই ঘটনা বলে ধরে নিতে । ছেলেবেলা থেকে অকারণে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাই আমার অভ্যাস । ঐ আকাশটা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ যুগের কোটি কোটি ইচ্ছে দিয়ে পূর্ণ । এই বিলীয়মান ইচ্ছেগুলো বিশ্বসৃষ্টির কোন্‌ কাজে লাগে কী জানি । বেড়াক উড়ে আমার দীর্ঘনিশ্বাসে উৎসারিত ইচ্ছেগুলো সেই আকাশেই যে আকাশে আজ আমি উড়তে চলেছি ।

পুপুদিদি ব্যাকুল হয়ে উঠে জিগেস করলে , সুকুমারদার এখনকার খবর কী ।

আমি বললুম , সেইটেই পাওয়া যাচ্ছে না বলেই তার বাবা বিলেতে সন্ধান করতে চলেছেন ।

বিবর্ণ হয়ে গেল দিদির মুখ । আস্তে আস্তে উঠে ঘরে দরজা বন্ধ করে দিলে ।

আমি জানি , সুকুমারের আঁকা সেই ছেলেমানুষি পুপুদিদি আপন ডেস্কে লুকিয়ে রেখেছে ।

আমি চশমাটি মুছে ফেলে চলে গেলুম সুকুমারের বাড়ির ছাদে । সেই ভাঙা ছাতাটা সেখানে নেই , নেই সেই আতসবাজির আধপোড়া কাঠি ।