আমি তখন এম, এ ক্লাসের জন্যে এরিয়োপ্যাজিটিকার নোট লিখছি, মিলিয়ে দেখবার জন্যে বই পড়তে হচ্ছিল, ইন্টরন্যাশনল্‌ মেলিফ্লুয়স অ্যাব্রাক্যাড্যাব্রা,আর পাত কেটে পরিশিষ্ট দেখছিলুম থ্রী হন্ড্রেড্‌ ইয়র্স্‌ অফ ইণ্ডোইণ্ডিটর্মিনেশন্ বইখানার। লাইব্রেরি থেকে আনাতে দিয়েছি অনোম্যাটোপিইয়া অফ্‌টিন্টিন্যান্যুলেশন্। এমন সময় হুড়মুড় করে এসে ঢুকল আমাদের সে।

 আমি বললুম, হয়েছে কী, স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়েছে না কি।

 ও বললে, নিশ্চয় দিত, যদি সে থাক্‌ত। কিন্তু কী কাণ্ড বাধিয়েছ বলো দেখি।

 কেন কী হোলো।

 আমাকে নিয়ে এ পর্য্যন্ত বিস্তর আজগবি গল্প বানিয়েছ। ভাগ্যে আমার নামটা দাওনি, নইলে ভদ্রসমাজে মুখ দেখানো দায় হোত। দেখলুম, পুপুদিদির মজা লাগছে তাই সহ্য করেছি সব। কিন্তু এবার যে উল্টো হোলো।

 কেন কী হোলো বলোই না।

 তবে শোননা। পুপুদিদি কাল গিয়েছিল সিনেমায়। মোটরে উঠতে যাচ্ছে, আমি পিছন থেকে এসে বললুম, দিদিমণি, তোমার গাড়িতে আমাকে তুলে নিয়ে যাও। তারপরে কী আর বলব দাদা, একেবারে হিষ্টিরিয়া।

 কী রকম।

 হাতে চোখ ঢেকে চেঁচিয়ে উঠে দিদি বললে, যাও যাও, গাঁজাখোরের গা চুরি করে আমার গাড়িতে উঠতে পাবে না। চারদিক থেকে লোক এল ছুটে, আমাকে পুলিসে ধরে নিয়ে যায় আর কী। জীবনে অনেক নিন্দে শুনেছি কিন্তু এ রকম ওরিজিন্যাল নিন্দে শুনিনি কখনো। গাঁজাখোরের গা চুরি করা। আমার অতি বড়ো প্রাণের বন্ধুও এমন নিন্দে আমার নামে রটায়নি। বাড়ি ফিরে এসে সমস্ত ব্যাপারটা শোনা গেল। এ তোমারি কীর্ত্তি।

 আমারি তো বটে। কী করি বলল। তোমাকে নিয়ে আর কাঁহাতক গল্প বানাই। বয়স হয়ে গেছে, কলমটাকে যেন বাতে ধরল, পুপুদিদির ফরমাসমতে অসম্ভব গল্প বলার হাল্‌কা চাল আর নেই কলমের। তাই এই শেষ গল্পটাতে তোমাকে একেবারে খতম ক’রে দিয়েছি।

 খতম হোতে রাজি নই দাদা। দোহাই তোমার, পুপুদিদির ভয় ভাঙিয়ে দাও। বুঝিয়ে বলল ওটা গল্প।

 বলেছিলুম, কিন্তু ভয় ভাঙতে চায় না। নাড়ীতে জড়িয়ে গেছে। উপায় না দেখে স্বয়ং সেই পাতু গেঁজেলকে আনলুম তার সামনে, উল্টো হোলো ফল। পাতুর গা-খানা প’রে যে তুমিই ঘুরে বেড়াচ্চ তারি প্রমাণ প্রত্যক্ষ হয়ে গেল।

 তাহলে দাদা, গল্পটাকে উলটিয়ে দাও, ধনুষ্টঙ্কারে মরুক পাতু। গাঁজাখোরের গা-খানাকে নিমতলার ঘাটে পুড়িয়ে ফেলো। ঘটা ক’রে তার শ্রাদ্ধ করব, পুপুদিদিকে করব তাতে নেমন্তন্ন; খরচ যত পড়ে দেব নিজের পকেট থেকে। আমি হলুম দিদির গল্পের বহুরূপী, হঠাৎ এত বড়ো পদ থেকে আমাকে অপদস্থ করলে বাঁচব না।

 আচ্ছা গল্পের উল্টোরথে তোমাকে পুপুদিদির ঘরে আবার ফিরিয়ে আনব।

  * * * * *  

 পরদিন সন্ধ্যার সময় সে এল, আমি শুরু করলুম গল্পটা।  বললুম, পাতুর স্ত্রী স্বামীর স্বত্ব পাবার জন্যে তোমার নামে আদালতে নালিশ করেছে।

 এইটুকু শুনেই সে বলে উঠল, এ চলবে না দাদা। পাতুর স্ত্রীকে তুমি চক্ষে দেখোনি তো। মকদ্দমায় ঐ মহিলাটি যদি জেতে তাহোলে যে আসামী পক্ষ আফিম খেয়ে মরবে।

 ভয় কী, কথা দিচ্চি, হার হোক, জিত হোক, টিঁকিয়ে রাখব তোমাকে।

 আচ্ছা ব’লে যাও।

 হাত জোড় ক’রে তুমি হাকিমকে বললে, হজুর ধর্ম্মাবতার সাতপুরুষে আমি ওর স্বামী নই।

 উকিল চোখ রাঙিয়ে বললে, স্বামী নও তার মানে কী।

 তুমি বললে, তার মানে, এ পর্য্যন্ত আমি ওকে বিয়ে করিনি, দ্বিতীয় আর কোনো মানে আপাতত কিছুতেই ভেবে পাচ্চিনে।

 রামসদয় মোক্তার খুব একটা ধমক দিয়ে বললে, আলবৎ তুমি ওর স্বামী, মিথ্যে কথা বোলো না।

 তুমি জজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললে, জীবনে বিস্তর মিথ্যে বলেছি, কিন্তু ঐ বুড়িকে সজ্ঞানে স্বইচ্ছায় বিয়ে করেছি, এত বড়ো দিগ্‌গজ মিথ্যে বানিয়ে বলবার তাকৎ আমার নেই। মনে করতে বুক কেঁপে ওঠে।

 তখন ওরা সাক্ষী তলব করলে পঁয়ত্রিশজন গঁজাখোরকে। একে একে তারা গাঁজাটেপা আঙুল তোমার মুখে বুলিয়ে বলে গেল, চেহারাটা একেবারে হুবহু পাতুর; এমন কি, বা কপালের অবিটা পর্য্যন্ত। তবে কি না—

 মোক্তার তেরিয়া হয়ে উঠে বললে,—তবে কিনা আবার কিসের।

 ওরা বললে,—সেই রকমের পাতুই বটে কিন্তু সেই পাতুই, হলপ ক’রে

সে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (page 98 crop).jpg

—পৃঃ ৭৭
 

এমন কথা বলি কী ক’রে। ঠাক্‌রুণকে তো জানি, বন্ধু কম দুঃখ পায়নি, অনেক ঝাঁটা ক্ষয়ে গেছে ওর পিঠে। তার দাম বাঁচালে গাজার খরচে টানাটানি পড়ত না। তাই বলছি হজুর, আদালতে হলপ ক’রে ভদ্রলোকের সর্ব্বনাশ করতে পারব না।

 মোক্তার চোখ রাঙিয়ে বললে, তাহোলে এ লোকটা কে বলো। দ্বিতীয় পাতু বানাবার শক্তি ভগবানেরও নেই।

 গেঁজেলের সর্দ্দার বললে, ঠিক বলেছ বাবা, এরকম ছিষ্টি দৈবাৎ হয়। ভগবান নাকে খৎ দিয়েছেন এমন কাজ আর করবেন না। তবু তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্চি যে একটা কোনো সয়তান ভগবানের পাল্টা জবাব দিয়েছে। একেবারে ওস্তাদের হাতের নকল, পাকা জালিয়াতের কাজ। পাতুর দেহখানা শুকিয়ে শুকিয়ে ওর নাক চিম্‌সিয়ে বেঁকে গিয়েছিল, সেই বঙ্কিমচন্দুরে নাকটি পর্য্যন্ত যেন কেটে ওর মুখের মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছে। ওর হাতের চামড়া নকল করতে বোধ করি হাজার চামচিকের ডানা খরচ করতে হয়েছে।

 তুমি দেখলে মকদ্দমা আর টেঁকে না, সাহেবকে বললে, এক হপ্তা সময় দিন, খাঁটি পাতুপক্ষীরাজকে হাজির ক’রে দেব এই আদালতে। তখনি ছুটলে তেলেনিপাড়ার দিঘির ঘাটে। কপাল ভালো, ঠিক তক্ষুনি তোমার দেহটা উঠছে ভেসে। পাতুর দেহ ডাঙায় চিৎ ক’রে ফেলে পুরোনো খোলটা জুড়ে বসলে। মস্ত একটা হাঁপ ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ডাক দিলে —ওরে পাতু।

 তখনি ওর দেহটা উঠল খাড়া হয়ে। পাতু বললে, ভায়া সঙ্গে সঙ্গেই ছিলুম। মনটা অস্থির ছিল গাঁজার মৌতাতে। ইচ্ছে করত আত্মহত্যে করি, কিন্তু সে রাস্তাও তুমি জুড়ে বসেছিলে। বেঁচে যখন ছিলুম তখন বেঁচে থাকবার সখ ছিল যোলো আনা, যেমনি মরেছি অমনি আর যে কোনো মতেই কোনো কালেই মরতে পারব না এই দুঃখ অসহ্য হয়ে উঠল। সামান্য একটা দড়ি নিয়ে গলায় ফাঁস লাগাব এটুকু যোগ্যতাও রইল না।

 তুমি বললে, যা হবার তা তো হলো, এখন চলো আদালতে। জজ সাহেবকে ব’লে তোমার গাঁজার বরাদ্দ করে দেব।

 গেলে আদালতে। জজ সাহেব পাতুকে ধমক দিয়ে বললে, এ বুড়ি তোমার স্ত্রী কি না সত্যি ক’রে বলো।

 পাতু বললে, হজুর, সত্যি করে বলতে মন যায় না। কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলে মিথ্যে ব’লে পাপ করব কেন। নিশ্চয় জানি যে, পাপের সঙ্গে সঙ্গে উনিই পিছন পিছন ছুটবেন। উনিই আমার প্রথম পক্ষের পরিবার।

 সাহেব জিগেস করলেন, আরো আছে না কি।

 পাতু বললে, না থাকলে মান রক্ষা হয় না যে, কুলীনের ছেলে। নৈকষ্যকুলীন।

 * * * * * 

 রবিবার দিনে পুপুদিদি পড়েছে গল্পটা। আমাকে জিগেস করলে-আচ্ছা দাদামশায়, তুমি যে লিখেছ এক রাশ ইংরেজি বই নিয়ে কোন্‌ কলেজের জন্যে বই লিখছ। তোমার আবার কলেজ কোথায়, তা ছাড়া কখনো তো দেখিনি ঐ রকমের বই খুলতে। তুমি তো লেখো কেবল ছড়া।

 স্পষ্ট জবাব না দিয়ে একটুখানি হাসলুম।

 আচ্ছা দাদামশায়; তুমি কি সংস্কৃত জানো।

 দেখো পুপুদিদি এরকম প্রশ্নগুলো বড়ো রূঢ়। মুখের সামনে জিগেস করতে নেই।