আনন্দী বাঈ/পঞ্চম অধ্যায়



পঞ্চম অধ্যায়।

ফিলাডেলফিয়ায় কিছুদিন অবস্থানের পর গোপাল রাওয়ের বিচ্ছেদ আনন্দী বাঈর পক্ষে অতীব কষ্টকর বোধ হইতে লাগিল। একারণে তিনি স্বামীকে আমেরিকায় আহ্বান করিয়া পত্র লিখিলেন। সেই পত্রের একাংশ এইরূপ,—“আপনার নিকট হইতে বিযুক্ত হইয়া আজ ঠিক এক বৎসর, দুই মাস, কুড়ি দিন হইল। এখন আপনার বিচ্ছেদ আমার কষ্টকর বোধ হইতেছে। আমি যথাসাধ্য প্রন্থালোচনায় চিত্ত সন্নিবেশিত করিয়া সে কষ্ট ভুলিবার চেষ্টা করি। * * * যে প্রকারে পারেন, আপনি এখানে আসিবার চেষ্টা করিবেন। কারণ, অধিক দিন আপনার নিকট হইতে দূরে থাকা আমার পক্ষে ক্রমেই কঠিন হইয়া উঠিতেছে। আপনার কাছে পয়সা কড়ির অভাব থাকিলে আমি আমার অলঙ্কারগুলি পাঠাইয়া দিতে পারি। তাহা বিক্রয় করিলে ভাড়ার টাকার যোগাড় হইবে। যদি বলেন, আমিই এখানে সেগুলি বিক্রয় করিয়া আপনাকে টাকা পাঠাইয়া দিতে পারি।” দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আনন্দী বাঈর এইরূপ পত্র পাইবার পরেও গোপাল রাও সামান্য কারণে তাহার প্রতি বিরক্ত হইয়া তাহাকে “গর্ব্বিতা”, “বিশ্বাসঘাতিনী” প্রভৃতি দুর্ব্বাক্যে ব্যথিত করিয়াছিলেন।

 গোপাল রাও-ও আমেরিকা যাইবার জন্য উৎসুক হইয়াছিলেন। আনন্দী বাঈর ভারতবর্ষ পরিত্যাগের পর, নানা কারণে স্বদেশের ও স্বসমাজের প্রতি নিতান্ত বীতশ্রদ্ধ হওয়ায় তিনি আমেরিকায় গিয়া স্থায়িরূপে বাস করিবার সংকল্প করেন। আনন্দী বাঈ তাঁহার মনোভাব অবগত হইয়া তাঁহাকে যে পত্র লিখিলেন, তাহার কিয়দংশ এস্থলে উদ্ধারের যোগ্য।

 “ইদানীং আপনার ভাবান্তর দেখিয়া আমি দুঃখিত হইয়াছি। আপনি লিখিয়াছেন, ‘হিন্দুদিগের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মিয়াছে।’ হিন্দুজাতির সম্বন্ধে আপনার এরূপ মতান্তর হইল কেন? ভাল মন্দ সকল দেশে ও সকল সমাজেই থাকে। * * * ‘হিন্দু’ বলিয়া আমি বিশেষ গর্ব্বানুভব করি। * * * আমি স্বদেশ পরিত্যাগের পক্ষপাতিনী নহি। এখানে যদিও আমায় সকলেই স্নেহ করে, এমন কি, ধোপাও অল্প পয়সায় আমার কাপড় কাচিয়া দেয়, কোনও বিষয়ে আমার কষ্ট নাই, তথাপি আমার দ্বারা যদি কোনও দেশের কিছু উপকার হইবার সম্ভাবনা থাকে, তাহা হইলে, যাহাতে তাহা ভারতবর্ষেরই হয়, ইহাই আমার একান্ত কামনা। ভারতবর্ষে স্ত্রীলোকদিগের চিকিৎসা-বিদ্যা শিক্ষার জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া যদি ঈশ্বরের অভিপ্রেত না হয়, তাহা হইলে অন্ততঃ স্বাস্থ্যরক্ষার নিয়মাদি বিষয়েও যাহাতে তাঁহাদিগের অভিজ্ঞতা জন্মে, সে বিষয়ে সময় ও শক্তি-ব্যয় করা আমি স্বীয় কর্ত্তব্য বলিয়া স্থির করিয়াছি। এ বিষয়ে কেহ আমার প্রতি কূলাচরণ করিলেও আমি কর্ত্তব্য-পথ-চ্যুত হইব না। * * * পৃথিবীর কোনও দেশকে আমি ঘৃণা করি না। কিন্তু ভারতবর্ষের অভাব যেমন অধিক, এবং সেখানকার রমণীকুলের রীতিনীতি ও স্বভাবাদির বিষয়ে আমার যেরূপ অভিজ্ঞতা আছে, তাহাতে অপর সকল দেশ অপেক্ষা ভারতবর্ষেরই দাবি আমার উপর অধিক আছে বলিয়া আমার মনে হয়। আমার দ্বারা সেখানকার মঙ্গলই অধিকতর সাধিত হইতে পারে। * * * আপনি যদি আমেরিকায় স্থায়িভাবে বাস করিবার সংকল্প পরিত্যাগ না করেন, তাহা হইলে বিপরীত ঘটিবে। আমি স্বদেশে ফিরিয়া যাইব, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। আপনি আমাকে ছাড়িয়া একাকী আমেরিকা-বাসে কি সুখ পাইবেন, জানি না। (অথবা আমি কি পাগল! আমার অভাবে আপনার সুখে কেন অন্তরায় ঘটিবে?) একবার আমেরিকায় আসিয়া যদি আর স্বদেশে ফিরিয়া না যাইবারই আপনার সংকল্প থাকে, তাহা হইলে আপনার এখানে আসিয়া কাজ নাই। আমি কোন রূপে কষ্টে সৃষ্টে চারি বৎসর অতিবাহিত করিব। আমার ধৈর্য্যের আদৌ লাঘব হয় নাই। আমার জন্য আপনার কোন চিন্তার কারণ নাই।

 “আচ্ছা জিজ্ঞাসা করি, এদেশে স্থায়িরূপে বসতি করিয়া আপনি স্বদেশবাসীকে কি শিক্ষা দিবেন? স্বার্থপরতাই নহে কি? আপনি ত স্বার্থপরতাকে ঘৃণা করেন; আমিও তাহাই করি। * * * সাধারণের অনুকরণ-যোগ্য আচরণ করিবার উপযুক্ত ক্ষেত্র ভারতবর্ষ,—আমেরিকা নহে।”

 আর একখানি পত্রে তিনি লিখিয়াছেন, “আচার ব্যবহারে হিন্দু থাকিয়া আমাদিগকে সংস্কার ও উন্নতি করিতে হইবে”—আপনার পত্রে এই বাক্যটি পাঠ করিয়া বড়ই আনন্দিত হইলাম। এই নীতি অতি উৎকৃষ্ট ও প্রশংসনীয়। * * * আমাদের কলেজে একটি রমণী ঘোর নাস্তিক ছিল; অনেক মিশনরি বহু উপদেশেও তাহাকে আস্তিক করিতে পারেন নাই। সে জন্য অনেকে তাহাকে ভয় করিত, কিন্তু আমার সহিত তিন দিন ধর্ম্ম বিষয়ে তর্কবিতর্ক করিয়া সে এক্ষণে ঈশ্বরে সম্পূর্ণ বিশ্বাসসম্পন্না হইয়াছে। * ** হিন্দু রমণী অপেক্ষা এ দেশীয় রমণীগণ অধিক পরিমাণে স্ত্রীরোগে আক্রান্ত হইয়া থাকে। আমরা (হিন্দু রমণীরা) যতই অশিক্ষিতা ও অসভ্যা হই, ধর্ম্ম, সহিষ্ণুতা ও নীতি বিষয়ে এদেশের রমণীগণের অপেক্ষা অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ। পৃথিবীর সকল রাজ্যের লোকেরই হিন্দু রমণীর এ গুণের অনুকরণ করা উচিত। * * আমি খৃষ্টান হইব বলিয়া আপনার ভয় হইতেছে। কিন্তু আনন্দী বাঈ রমা বাঈ নহে, রমা বাঈও আনন্দী বাঈ নহে। বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কার্য্য করা অপেক্ষা আমি মৃত্যু শ্রেয়স্কর বলিয়া বিবেচনা করি। রমা বাঈ আমার অপেক্ষা বিংশতি গুণ পণ্ডিতা, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমার প্রতিজ্ঞা যে, “ভাঙ্গিব, তবু মচকাইব না।” আমি খৃষ্টান হইব, একথা লিখিয়া আর আমায় অনর্থক কষ্ট দিবেন না।

 ইলবার্ট বিল পাস হইয়াছে শুনিয়া আমার মনে আহ্লাদ ধরিতেছে না। এজন্য ঈশ্বরের কত ধন্যবাদ করিব! হিন্দুদিগের প্রকৃত হিতৈষী ইলবার্ট সাহেবের এ উপকার ভুলিবার নহে।”

 আনন্দী বাঈর পত্র পাঠ করিয়া গোপাল রাও আমেরিকায় ঘর বাড়ী করিয়া বসতি করিবার সংকল্প বিসর্জ্জন দিলেন। কিন্তু সে সময়ে সহধর্ম্মিণীর সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য তাঁহার আর আমেরিকায় যাওয়া ঘটিলনা। অর্থাভাবই তাহার প্রধান কারণ। আমেরিকা-যাত্রার পাথেয়-সংগ্রহের জন্য আনন্দী বাঈ গোপাল রাওকে ভারতবর্ষ হইতে কতিপয় পণ্যদ্রব্য লইয়া যাইতে লিখিয়াছিলেন। আমেরিকার সহিত বাণিজ্য-সম্বন্ধ স্থাপিত করিতে পারিলে তাহা কিরূপ লাভজনক হইতে পারে এবং সে বিষয়ে হিন্দুসমাজের পথিপ্রদর্শক হইতে পারিলে দেশের কিরূপ মহদুপকার সাধিত হইবার সম্ভাবনা, তদ্বিষয়ে কয়েকটি পত্রে তিনি বহুল আলোচনা করিয়াছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে গোপাল রাও তাঁহার কতিপয় ব্যবসায়ী বন্ধুর পরামর্শ-প্রার্থী হওয়ায় এ বিষয়ে তাঁহারা মূলধন দিয়া তাঁহাকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হইলেন না। তখন আনন্দী বাঈ লিখিলেন-“আমাকে অতঃপর মাসে ৫০৲ টাকা মাত্র পাঠাইবেন। মণি অর্ডার করিবার ব্যয় সহ পঞ্চাশ টাকার বেশী আপনি আর আমার জন্য খরচ করিবেন না। তাহাতেই আমি এখানে কোনরূপে চালাইব। আমার কষ্ট হইবে ভাবিয়া ৫০৲ টাকার বেশী এক পাই আর পাঠাইবেন না। এইরূপে যাহা উদ্বৃত্ত হইবে, তাহা ব্যাঙ্কে ফেলিয়া রাখিবেন। তাহা হইলে কিছু দিনে আপনার আমেরিকায় আসিবার ব্যয় সংগৃহীত হইবে। * * * আমার জন্য পাদুকাবস্ত্রাদি পাঠাইবারও আর এখন প্রয়োজন নাই। তবে নিতান্তই যদি আমার জন্য কিছু পাঠাইবার আপনার ইচ্ছা থাকে, তবে সুবিধা হইলে একটি ‘পিন’ দেশীয় স্বর্ণকারের দ্বারা প্রস্তুত করাইয়া পাঠাইয়া দিবেন। ইংরাজের দোকান হইতে উহা কিনিবেন না। ইংরাজ শিল্পীর নির্ম্মিত দ্রব্যাদিব্যবহারে আমার আদৌ গৌরব বোধ হয় না।”

 আনন্দী বাঈর স্বদেশনিষ্ঠা, চিত্তের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণসন্দর্শনে আমেরিকার এপিস্কোপেলিয়ান-সম্প্রদায়-ভুক্ত এক পাদরি তাঁহার শিষ্যদিগকে বলিয়াছিলেন যে, “মিসেস্‌ জোশী যেদিন আমেরিকায় প্রথম পদার্পণ করেন, সেদিন যেমন ছিলেন, অদ্যাপি অবিকল সেইরূপই আছেন। তাঁহার আচার-ব্যবহারে অণুমাত্র পরিবর্ত্তন ঘটে নাই। কিন্তু তিনি যদি এইরূপ অবিকৃত অবস্থায় স্বদেশে ফিরিয়া যাইতে পারেন, তাহা হইলে, তাহা আমাদিগের ও খৃষ্টধর্ম্মের পক্ষে ঘোরতর লজ্জার বিষয় হইবে!”

 আমেরিকায় সংবাদপত্রের রিপোর্টারেরা আনন্দী বাঈকে নিতান্ত ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। তিনি কোনও স্থানে গমন করিলেই তাঁহারা তাঁহার অনুসরণ করিতেন। অনেকেই তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া নানা বিষয়ে প্রশ্ন করিতেন। কিন্তু আনন্দী বাঈর যশোলিপ্সা বলবতী না থাকায় তিনি সংক্ষেপে কথোপকথন-পূর্ব্বক তাহাদিগকে বিদায় করিতেন। সময়ে সময়ে এই রিপোর্টারেরা তাঁহার সম্বন্ধে এরূপ অদ্ভুত বিবরণ প্রকাশ করিতেন যে তাহা পাঠ করিয়া হাস্যসংবরণ করা দুষ্কর হইয়া উঠে। সারাটোগা নামক স্থানের এক সংবাদ পত্রে একবার তাঁহার সম্বন্ধে এইরূপ সংবাদ প্রকাশিত হয়—“একটি হিন্দুমহিলা উৎস দেখিবার জন্য এদেশে আসিয়াছেন; তিনি প্রত্যেক ঝরণায় এত অধিক জলপান করিয়াছেন যে, তাহার অসুখ হইয়াছে এবং ডাক্তারেরা তাঁহাকে ঔষধ দিতে দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছেন।” আর দুই একখানি পত্রেও তাঁহার সম্বন্ধে এইরূপ অজ্ঞতাপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছিল। তথাপি অধিকাংশ সংবাদ-পত্রই তাঁহার প্রশংসায় তৎপর থাকিত। একদা গোপাল রাও আনন্দী বাঈর চিঠিপত্র ও তৎসম্বন্ধে মার্কিন সম্পাদকগণের অভিমতসমূহ একত্র করিয়া প্রকাশ করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, কিন্তু যশোবাসনাপরিশূন্যা আনন্দী বাঈ তাহাতে বিশেষরূপে বাধা-দান করায় তাঁহাকে সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে হয়।

 প্রতি বৎসর গ্রীষ্মাবকাশের সময় আনন্দী বাঈ তাঁহার মাসীর নিকট রোশেল নিউজারসি গ্রামে গমন করিতেন। কখনও কখনও দুই এক জন সঙ্গিনীর নিতান্ত অনুরোধে তিনি তাহাদিগেরও বাসস্থানে যাইতেন। এতদুপলক্ষে ওয়াশিংটন্‌, বোষ্টন্‌ প্রভৃতি কতিপয় নগর তাঁহার দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁহার দীর্ঘ প্রবাসকালের মধ্যে তিনি সঙ্গীদিগের নির্ব্বন্ধাতিশয়প্রযুক্ত একবারমাত্র থিয়েটার ও সার্কাস দেখিতে গিয়াছিলেন। আমেরিকায় তাঁহার বিলাসিতা বা কৌতুকদর্শনেচ্ছা কখনই প্রকটিত হয় নাই। তিনি জ্ঞানার্থিনী হইয়া যেরূপ তপস্বিনীর ন্যায় নিরাড়ম্বরভাবে আমেরিকায় গমন করিয়াছিলেন, তেমনই সেখানে গিয়া একদিনের জন্যও স্বীয় চিত্তসংযম হারান নাই। তিনিও একখানি পত্রে লিখিয়াছেন,—“ভারতবাসীর জন্য কিছু করা কর্ত্তব্য বলিয়া যদি আমার মনে না হইত, তাহা হইলে আমি এত দূরদেশে কখনই আসিতাম না। * * ভারতে ফিরিয়া গিয়া হিন্দু মহিলাদিগের জন্য একটি ডাক্তারি কলেজ স্থাপনই আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হইয়াছে।” এই লক্ষ্য হইতে তিনি একমুহূর্ত্তের জন্যও বিচ্যুত হন নাই। কিন্তু ভগবানের বিধান অন্যরূপ ছিল।

 আনন্দী বাঈর কর্ত্তব্য-জ্ঞান কিরূপ ছিল, তাহা তাহার নিম্নোদ্ধৃত পত্রাংশ হইতে স্পষ্টভাবে বুঝিতে পারা যায়,—“এই জগতে যে সকল কার্য্য কর্ত্তব্যের অনুরোধে অনুষ্ঠিত না হয়, সেই সকল কার্য্য হইতেই দুঃখের উৎপত্তি হইয়া থাকে। ব্যবসায় ও অবস্থা অনুসারে আমাদিগের প্রত্যেকেরই কতকগুলি করিয়া কর্ত্তব্য আছে। স্বর্গে যদি কেবল বিপুল সম্পত্তি, উত্তমোত্তম খাদ্য দ্রব্য ও উৎকৃষ্ট বস্ত্রাদি থাকে, অথচ কর্ত্তব্য কিছুই না থাকে, তাহা হইলে সে স্বর্গে আমার প্রয়োজন নাই। সেরূপ স্বর্গ আমি বাঞ্ছনীয় বলিয়া মনে করি না। কারণ কর্ত্তব্য-সম্পাদন-জাত সুখ ভিন্ন অন্য সকল সুখই ক্ষণিক।” (১৮৮৬ খৃষ্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি তারিখে শ্রীমতী কার্পেণ্টারকে লিখিত পত্র হইতে গৃহীত।)

 ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে বসন্তকালে আনন্দী বাঈ মরিসন হাঁসপাতাল নামক এক উন্মাদাগার দেখিতে গিয়া বড়ই বিপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় এক উন্মাদিনী সহসা তাঁহাকে আক্রমণ করে। তাহার কর্কশ স্বর ও উগ্রমূর্ত্তি সকলেরই চিত্তে ভীতি উৎপাদন করিত। পাগলিনীর নিকটেই একটা টেবিলের উপর কতিপয় সুতীক্ষ্ণ অস্ত্র পড়িয়াছিল। উন্মাদাগারের একটি পরিচারিকা দূর হইতে এই ব্যাপার সদর্শন করিয়া ভীতচিত্তে আনন্দী বাঈকে তথা হইতে পলায়ন করিতে সঙ্কেত করিল। কিন্তু নির্ভীক-হৃদয় আনন্দী বাঈ এই ব্যাপারে কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তিনি পলায়নের চেষ্টা করিলে পাগলিনী নিশ্চয়ই তাঁহাকে ভয়ঙ্কর বেগে আক্রমণ করিত। কিন্তু অসাধারণ ধৈর্য্য-গুণে আনন্দী বাঈ সে যাত্রা সেই ঘোর বিপদ হইতে রক্ষা পাইলেন। তিনি ধীরভাবে অথচ কৌশলক্রমে আপনাকে তাঁহার কবলমুক্ত করিতেছিলেন, এমন সময়ে সেই পাগলিনীর তত্ত্বাবধায়িকা পশ্চাদ্ভাগ হইতে আসিয়া তাহাকে ধরিয়া লইয়া গেল।

 এদিকে গোপাল রাওয়ের মনে বহুদিন হইতে পৃথিবী পরিভ্রমণের ইচ্ছা ছিল। আনন্দী বাঈর বিরহেও তিনি আমেরিকা গমনের জন্য ব্যগ্র হইয়াছিলেন। পরিশেষে ১৮৮৪ সালের মধ্যভাগে তিনি ছয় মাসের ছুটি (ফার্লো) লইয়া আমেরিকা অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। ইহার কিছু দিন পূর্বে কলিকাতার পোষ্টমাষ্টার জেনারেল আনন্দী বাঈকে প্রেরণের জন্য তাঁহাকে ১৪০৲ টাকা সাহায্য দান করিয়াছিলেন। তাহাতে কিছুদিন পর্যন্ত আনন্দী বাঈর ব্যয়-নির্ব্বাহ হইবে ভাবিয়া গোপাল রাও পৃথিবী পরিভ্রমণ আরম্ভ করিলেন। এই প্রবাসব্যাপারে ভারতবর্ষের এক কপর্দ্দকও ব্যয় করা হইবে না, তিনি যাত্রাকালে এইরূপ স্থির করিয়াছিলেন। কাজেই তাঁহাকে গৈরিক-বসন সন্ন্যাসীর বেশে নানা স্থানে বক্তৃতার দ্বারা অর্থ সংগ্রহ করিতে হইয়াছিল।

 গোপাল রাও প্রথমতঃ ব্রহ্মদেশ, পরে শ্যাম, চীন ও জাপান প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করিয়া আমেরিকায় উপস্থিত হন। চীনে অবস্থান কালে তিনি একবার বিষম পীড়িত হইয়াছিলেন। নানা ঔষধসেবনে বিরক্ত হইয়া তিনি উপকারলাভের আশায় একদিন শর্করাযোগে এক বাটি কেরোসিন তৈল পান করিয়া ফেলিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, এই দুঃসাহসিক কার্য্যের ফল তাঁহাকে সে যাত্রা ভয়ানকরূপেই ভুগিতে হয়। সে যাহা হউক, তিনি আরোগ্যলাভের পর নানা স্থানে বক্তৃতা দ্বারা তত্তদ্দেশবাসিগণের আচার ব্যবহারের নিন্দা ও ভারতীয় রীতিনীতির শ্রেষ্ঠত্ব-প্রতিপাদিনী বক্তৃতা করিতে করিতে আমেরিকায় উপস্থিত হইলেন।

 আনন্দী বাঈ স্বামীর আগমনবার্ত্তা শ্রবণে অতীব উৎফুল্লা হইলেন। কিরূপে তিনি স্বামীর অভ্যর্থনা করিবেন, তদ্বিষয়ে বহু প্রকারের প্রস্তাব উপস্থিত করিয়া তিনি গোপাল রাওয়ের অভিপ্রায় জানিবার জন্য তাহাকে পত্র লিখিলেন। তিনি তত্রত্য কলেজে তাঁহার জন্য একটি সংস্কৃত শিক্ষকের পদও স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু বিচিত্র-প্রকৃতি গোপাল রাওয়ের তাহা ভাল লাগিল না। তিনি আনন্দী বাঈর পত্রোল্লিখিত অভ্যর্থনা-বিষয়ক প্রস্তাবের বিপরীত অর্থ গ্রহণ করিয়া তাহাকে একটী পত্রে অতি কঠোরভাবে তিরস্কার করিলেন। আনন্দী বাঈ ইহাতে কুপিতা হইয়া তাঁহাকে যে অভিমানপূর্ণ পত্র লিখিলেন, গোপাল রাও আর তাহার উত্তর-দান করিলেন না। অতঃপর তিনি আমেরিকার নানা স্থানে বক্তৃতা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। দীনা আনন্দী বাঈ তাঁহার দর্শনলাভের জন্য যতই ব্যগ্রতাপ্রকাশ করিতে লাগিলেন, গোপাল রাও ততই সে বিষয়ে অমনোযোগিতা দেখাইতে লাগিলেন। এমন কি, তিনি একবার তাঁহাকে জানাইলেন যে, আনন্দী বাঈর পরীক্ষা শেষ না হইলে তিনি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন না।

 একদিন আনন্দী বাঈ শ্রীমতী কার্পেণ্টারের কন্যা অ্যামির সহিত কোনও বান্ধবীর গৃহ হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখেন, গোপাল রাও তাহার প্রকোষ্ঠে একটা টেবিলের সম্মুখে পুস্তকপাঠে নিমগ্ন রহিয়াছেন বলা অনাবশ্যক যে, গোপাল রাও আগমনের পূর্ব্বে কাহাকেও কোনও সংবাদ প্রেরণ করেন নাই। আনন্দী বাঈ গৃহে প্রত্যাগত হইলেও কেহ তাহাকে তাঁহার স্বামীর আগমন-বার্ত্তা জ্ঞাপন করে নাই। এরূপ অবস্থায় দীর্ঘ-বিরহ ও আশাতীত প্রতীক্ষার পর হঠাৎ স্বামি-সন্দর্শন-লাভ করিয়া তাঁহার মনে কিরূপ আনন্দের সঞ্চার হইয়াছিল, তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়।

 বহুদিনের প্রবাসজনিত কষ্টে গোপাল রাওয়ের স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইয়াছিল। আনন্দী বাঈয়ের যত্নে তিনি শীঘ্রই স্বাস্থ্য লাভ করিলেন। অতঃপর উভয়ের একত্র বাসে পরমসুখে চারি মাস কাল যাপিত হইল। তখন গোপাল রাও আর ভারতবর্ষে প্রত্যাবৃত্ত না হইয়া স্ত্রীর শিক্ষা সাঙ্গ না হওয়া পর্য্যন্ত আমেরিকাতেই বাস করিবার সঙ্কল্প করিলেন। পাশ্চাত্য দেশসমূহে বক্তৃতা দ্বারা যথেষ্ট অর্থলাভ হইয়া থাকে। গোপাল রাওয়ের বক্তৃতা করিবার শক্তি ছিল। এই কারণে তিনি সেই ব্যবসায় অবলম্বনই শ্রেয়স্কর বিবেচনা করিলেন। আনন্দী বাঈ বলিলেন—“দুষ্ট প্রকৃতি মিশনরিরা অন্য দেশের বিষয়ে নানা প্রকার অলীক কথার রটনা করিতে ভালবাসে। এরূপ অবস্থায় আপনি যদি ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বক্তৃতা করিয়া এদেশবাসীর ভ্রান্ত ধারণা সমূহ দূর করিবার যত্ন করেন, তাহা হইলে বড় ভাল হয়।” গোপাল রাও এ প্রস্তাবে স্বীকৃত হইলেন। একেই তিনি একটু পরচ্ছিদ্রান্বেষী ছিলেন, তাহাতে আবার স্ত্রীর অনুরোধে ও স্বদেশভক্তিতে প্রণোদিত হইয়া যখন তিনি বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন, তখন উহা এক শ্রেণীর শ্রোতৃবর্গের বিশেষ চিত্তাকর্ষণ করিল। এইরূপে তিনি নগরে নগরে বক্তৃতা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। আনন্দী বাঈ স্বীয় পাঠাভ্যাসে মনোনিবেশ করিলেন।

 শীত প্রধান আমেরিকায় প্রায় তুহিনপাতে পথঘাট সমাচ্ছন্ন হইয়া যায়। পিচ্ছল তুষারময় পথে গমনাগমন করিতে গিয়া অনেক বালক বালিকা ও যুবতী স্খলিত-পদ হইয়া সাধারণের উপহাসভাজন হইয়া থাকেন। আনন্দী বাঈ তিন বৎসর আমেরিকায় ছিলেন। কিন্তু এই সুদীর্ঘ কালের মধ্যে একবার মাত্র হিমানীপিচ্ছল পথে তাঁহার পদস্খলন হইয়াছিল। এই দুর্ঘটনায় তাঁহার হাতে যে কাঁচের চুড়ি ছিল, সেগুলি সব ভাঙ্গিয়া যায়। আনন্দী বাঈ নূতন চুড়ি না পাওয়া পর্যন্ত অন্ন-জল গ্রহণ করেন নাই। গোপাল রাও সে সময়ে আমেরিকাতেই ছিলেন। তিনি এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই স্বীয় প্রিয়তমাকে নূতন সোণার চুড়ি তৈয়ার করাইয়া দিলেন। এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া আনন্দী বাঈ শ্রীমতী কার্পেণ্টারকে লিখিয়াছিলেন, “আমি সোণার চুড়ি পাইয়াছি। প্রত্যেক আছাড় খাওয়ার জন্য যদি এতটা করিয়া সোণা পাওয়া যায়, তাহা হইলে এরূপ আছাড় খাওয়াকে কে ‘দুর্ঘটনা’ বলিবে? তথাপি আমি এই ব্যাপারকে দুর্ঘটনা বলিয়াই মনে করি। কারণ এরূপ দুর্ঘটনা না ঘটিলে ঐ মূল্যেই একখানি প্রয়োজনীয় অস্ত্র বা উপযুক্ত পুস্তক ক্রয় করিতে পারা যাইত।”

 গোপাল রাও অর্থোপার্জ্জনের জন্য বক্তৃতা-বৃত্তি অবলম্বন করিলে আনন্দী বাঈ পাঠাভ্যাসে পুনর্ব্বার যত্নশীল হইলেন। পরীক্ষার দিন যত নিকটবর্ত্তী হইতে লাগিল, ততই কঠোর পরিশ্রম-সহকারে তিনি শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ আয়ত্ত করিতে লাগিলেন। ইহাতে তাঁহার স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইল। ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁহার আর একবার ডিপ্‌থিরীয়া রোগের সূচনা হইল। সৌভাগ্যক্রমে সেবার তিনি উহার ভীষণ আক্রমণ হইতে সহজেই অব্যাহতি পাইলেন। কিন্তু তিনি আর পূর্ব্ব স্বাস্থ্য লাভ করিতে পারিলেন না। ইহার পূর্ব্বে বড় দিনের ছুটীতে রোশেলে অবস্থিতির সময়ে তিনি ইংরাজী ভাষায় “হিন্দু ধাত্রী-বিদ্যা” বিষয়ে ৫০ পৃষ্ঠাব্যাপী এক প্রবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন। একশত পৃষ্ঠায় উহা সম্পূর্ণ করিবার তাহার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সময়াভাবে উহা তিনি সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই।

 যথাকালে আনন্দী বাঈ পরীক্ষায় উত্তীর্ণা হইলেন। ১৮৮৬ সালের ১১ই মার্চ ফিলাডেলফিয়া কলেজের অধ্যক্ষ, অধ্যাপকগণ ও তত্রত্য বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সম্মিলিত হইয়া মহাসমারোহের সহিত তাঁহাকে যে এম, ডি, উপাধির সনদ প্রদান করিলেন, তা এই,—



To All and Every One Who will Read

these Presents

GREETING.


Let it be known that we, the President and

Professors of the

MEDICAL COLLEGE OF PENNSYLVANIA

founded for the purpose of instructing women

in the art of Medicine

BY THIS PARCHMENT CERTIFY THAT

Anandibai Joshee of the East Indies

has devoted herself amongst us to all those studies which

rightly and legitimately pertain to the

DECREE OF DOCTOR OF MEDICINE

and we have made and constituted her after being approved by Examination held before the Professors a DOCTOR in the art of healing and we have given and granted to her all the RIGHTS, IMMUNITIES, and PRIVILEGES pertaining to that degree both here and elsewhere.

 In further confirmation of which let this diploma attested with our Common Seal and subscribed with our Signatures be a witness.

 Given in the Hall of the College of Philadelphia on the 11th March 1886.

RACHEL L. BODLEY M. D., Prof. of Chemistry and Toxicology.

CLARA MARSHALL M.D., Prof. of Materia Medica and Gen'l. Therapeutics.

FRANCES EMILY WHITE M. D., Prof. of Physiology and Hygiene.

ANNA BROOMALL M.D., Prof. of Obstetrics.

JAMES B. WALKER M.D., Ph. D., Prof. of Practice of Medicine.

HANNAH T. CROASDALE M. D., Prof. of Legnorcology and Dis. child.

WILLIAM H. PARISH M. D. Prof. of Anatomy.

T. LORRIS PEROT, President.

C. N. PEIRCE, Secretary.

ENOCH LEWIS, Treasurer.
 আমেরিকায় বহু সংখ্যক চিকিৎসা বিদ্যালয় আছে; তন্মধ্যে ফিলাডেলফিয়ার কলেজটি সর্ব্বোৎকৃষ্ট বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই কলেজ হইতে উপাধিলাভ করিবার জন্য রুশিয়া, জার্ম্মানী, ফ্রান্স, এমন কি ইংলণ্ডের রমণীগণও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়া থাকেন। অধঃপতিত ভারতের হিন্দু মহিলা আনন্দী বাঈ এই সর্ব্বোৎকৃষ্ট কলেজ হইতে সর্বোচ্চ উপাধি লাভ করিতে সমর্থ হইলেন, ইহা সামান্য গৌরবের বিষয় নহে। এই গৌরবকর উৎসবে যোগদান করিবার জন্য কলেজ কর্ত্তৃপক্ষের অনুরোধে ও ব্যয়ে পণ্ডিতা রমা বাঈ ইংলণ্ড হইতে ফিলাডেলফিয়া নগরে উপস্থিত হইয়াছিলেন। উপাধি-লাভ উপলক্ষে আনন্দী বাঈ তাঁহার অনেক সঙ্গিনীর ও হিতৈষী সদাশয় ব্যক্তির নিকট হইতে উপঢৌকন ও পুরস্কারাদি প্রাপ্ত হন। এই সময়ে তত্রত্য কোনও সম্ভ্রান্ত মহিলা তাঁহাকে একখানি উৎকৃষ্ট সোণার ঘড়ি উপহার দিয়াছিলেন। অতঃপর সখীজন-পরিবৃতা হইয়া ভ্রমণ ও বনভোজন প্রভৃতিতে অতীব আনন্দে তাঁহার দুই তিন সপ্তাহকাল অতিবাহিত হয়।